কোম্পানি আইন


কোম্পানি আইন ইংলিশ কোম্পানি অ্যাক্ট ১৮৪৪-এর ভিত্তিতে প্রণীত ১৮৫০ সালের ৪৩ নং আইন বলে কোম্পানি আইন চালু হয় এবং এতে করে রাজকীয় সনদ ছাড়াই প্রথম কোম্পানি গঠন ও নিবন্ধনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ভারতীয় আইন অনুসারে কলকাতা, মাদ্রাজ (চেন্নাই) ও বোম্বাইয়ের (মুম্বাই) প্রেসিডেন্সি শহরগুলিতে অবস্থিত সুপ্রিম কোর্টকে ঐসব অংশীদারদের অনিবন্ধিত কোম্পানিগুলির নিবন্ধন আদেশ প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যেসব অংশীদারেরা দলিলে লিপিবদ্ধ হস্তান্তরযোগ্য শেয়ারের শর্তে কোম্পানি গঠন করত। নিবন্ধিত নামে মামলায় বাদী বা বিবাদী হবার অধিকার কোম্পানিগুলিকে দেওয়া হলেও সীমাবদ্ধ দায়ের সুবিধা এ আইনে দেওয়া হয় নি। ১৮৫৭ সালে সদস্যদের সীমাবদ্ধ দায়ের সুবিধাসহ বা সুবিধা ব্যতীত জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও অন্যান্য ধরনের সংস্থা একত্রীকরণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি আইন পাশ করা হয়। কিন্তু এ সীমাবদ্ধ দায়ের সুবিধা বীমা বা ব্যাংক গঠনে ইচ্ছুক কোনো কোম্পানিকে দেওয়া হয় নি। ১৮৫৭ সালের ইংলিশ কোম্পানি অ্যাক্টের ভিত্তিতে প্রণীত ১৮৬০ সালের আইনে এ অসুবিধা দূর করা হয়। তারপর ১৮৬২ সালের কোম্পানি আইনের অনুসরণে ভারতেও ১৮৬৬ সালে ব্যবসায়িক কোম্পানি ও অন্যান্য সংস্থা একত্রীকরণ, নিয়ন্ত্রণ ও বিলুপ্তি সম্পর্কিত আইনগুলি সমন্বিতকরণ ও সংশোধনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কোম্পানি আইন পাস করা হয়। ১৮৬৬ সাল থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে আইনের পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ভারতেও কোম্পানি আইনে বহুবিধ সংশোধনী আনা হয়। ১৯১৩ সালের কোম্পানি আইনে কোম্পানি বিষয়ক সকল আইনকানুন পূর্ণাঙ্গভাবে বিধিবদ্ধ হয়। এ আইনটি মূলত ১৯০৮ সালের ইংলিশ কোম্পানি (একত্রীকরণ) আইনের ভিত্তিতেই প্রণীত হয়েছিল। ১৯০৮ থেকে ১৯৩৬ সালের মধ্যে ১৯১৩ সালের আইনে কিছু ছোটখাট সংশোধনী আনা হয়। ১৯২৯ সালের কোম্পানি আইন অনুসারে ভারতীয় কোম্পানি (সংশোধনী) আইন ১৯৩৬-এর মাধ্যমে ১৯১৩ সালের কোম্পানি আইনে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিধান সংযোজিত হয়। ১৯৩৬ সালের এ সংশোধনী আইন উপমহাদেশে এ প্রথমবারের মতো ম্যানেজিং এজেন্সি প্রথাকে স্বীকৃতি দেয়।

ভারত বিভাগের (১৯৪৭) পর মূলত ১৯৪৮ সালের ইংলিশ কোম্পানি আইনের ভিত্তিতে এবং ভব কোম্পানি আইন কমিটির রিপোর্টের সুপারিশ অনুসারে ভারতে ১৯৫৬ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ কোম্পানি আইন পাস হয়। পাকিস্তানি আমলে একটি কোম্পানি আইন কমিশন গঠিত হয় এবং এ কমিশন ইংল্যান্ড ও ভারতে গৃহীত সংশোধনগুলি অনুসরণ করে ১৯৬২ সালে কিছু সংশোধনী প্রস্তাব সুপারিশ করে এবং তদনুযায়ী কিছু সংশোধনীও পাস হয়। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯ ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইন যাতে এ সময়কালের কর্পোরেট কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এতে করে ১৯৪৭ সালের পুঁজি বিলিবন্টন (অব্যাহত নিয়ন্ত্রণ) আইন সম্পূরণ করে পুঁজির বিলিবন্টন নিয়ন্ত্রককে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭৯ সালে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও আইনজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কোম্পানি আইন সংস্কার কমিটি গঠিত হয়। কমিটি অনেকগুলি পরিবর্তনের সুপারিশ করলেও ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত সংসদ নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ আইন পাস করে নি। ১৯৯৩ সালের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইনে গঠিত সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন পুঁজির বিলিবন্টন তত্ত্বাবধান করে। কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষাই এর উদ্দেশ্য। সংস্থাটিকে বিধি-বিধান প্রণয়নের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ১৯৪৭ ও ১৯৬৯ সালের আইনের আওতায় পুঁজির বিলিবন্টন নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বগুলি এ সংস্থার উপর ন্যস্ত আছে।

কোম্পানি আইনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো শেয়ার-মালিকদের ঘনিষ্ঠতা নির্বিশেষে কোম্পানির পৃথক আইনগত সত্তার ধারণা, বিনিয়োগকারীর নিরাপত্তা, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসা বিলুপ্তির ধরন এবং শেয়ার ক্রয়বিক্রয়।

কৃত্রিম সত্তা সদস্যদের পরিচয় ছাড়াও সমিতিবদ্ধ কোম্পানির পৃথক একটা কৃত্রিম সত্তা আছে। সাধারণ জয়েন্ট স্টক কোম্পানির এ সমিতিবদ্ধ সত্তা অপেক্ষাকৃত পরবর্তী পর্যায়ে লক্ষ্য করা গেছে এবং তাও সালমন বনাম সালমন (১৮৯৭) নামের বিখ্যাত মামলায় ইংল্যান্ডের লর্ডসভার সিদ্ধান্তের আগে নয়। ওই মামলায় লর্ডসভা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, একই পরিবারের স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি সহ ৭ জনকে নিয়ে গঠিত কোম্পানি বস্ত্তত আইনের দৃষ্টিতে সদস্যদের থেকে পৃথক একটি সত্তা বিধায় কোম্পানি কর্তৃক ওই পরিবারের প্রধানের নামে প্রস্ত্তত ও প্রদত্ত ঋণপত্র বৈধ লেনদেন হিসাবে গণ্য হবে। তা সত্ত্বেও আদালত, বিশেষত কর ও প্রতারণার ক্ষেত্রে, কোম্পানির এ পৃথক সত্তা সম্পর্কিত বিধির কিছু ব্যতিক্রম ঘটায়। তবে এ নীতি এখনও কার্যকর এবং রজব আলী বনাম মোকাররম হোসেন মামলায় (১৯৭৭) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে কোম্পানির পৃথক সত্তা পুনরায় স্বীকৃতি পায় এবং বলা হয় যে কোম্পানির সম্পত্তিতে শেয়ার মালিকের কোনো প্রত্যক্ষ স্বার্থ নেই।

একটি কোম্পানির গঠন-কাঠামোর স্থায়িত্ব মেমোরেন্ডাম অব আর্টিক্যাল দ্বারা সুরক্ষিত থাকে যা বিধিবহির্ভূতভাবে সংশোধন বা পরিবর্তন করা যায় না। এসব ধারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিষিদ্ধ, যেমন পুঁজি থেকে লভ্যাংশ প্রদানের ক্ষমতা কোম্পানিকে দিতে পারে না, তেমনি কোম্পানি বা তার অংশীদারদের আইনদত্ত অধিকার যেমন কোম্পানির ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার আবেদনের অধিকার কেড়ে নিতেও পারে না। এসব শর্ত সত্ত্বেও কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা উপযুক্ত মনে করলে কোম্পানি পরিচালনার জন্য নিয়মাবলিতে এসব বিধান রাখতে পারে। এসব ধারা সমন্বয়েই কোম্পানি পরিচালনার নিয়মকানুনের কাঠামোটি গঠিত। প্রতিটি ধারা হলো কোম্পানি ও শেয়ার মালিকদের মধ্যকার এবং শেয়ার মালিক ও ব্যবস্থাপনার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের একেকটি বিধি। অস্পষ্টতা ও দ্ব্যর্থবোধক বিষয়ে এ ধারাগুলি মেমোরেন্ডামের ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারে।

মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন হলো কোম্পানির মূল গঠনতন্ত্র। শেয়ার ক্ষুদ্রতম ও নামমাত্র অঙ্কের হতে পারে এবং সদস্য হওয়ার জন্য একটি শেয়ারই যথেষ্ট। ৭ জন কিংবা বেসরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে ২ জন সদস্য থাকলেই আইনের শর্ত পূরণ হয়। ব্যক্তি বলতে কর্পোরেট সংস্থাও বোঝায় এবং একটি কোম্পানি আরেকটি কোম্পানির সদস্য হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিনিয়োগ বোর্ডের নির্ধারিত শর্তাদি সাপেক্ষে বিদেশি নাগরিকরাও শেয়ার মালিক হতে পারে। বর্তমানে বিদেশীদের শেয়ার মালিক হবার পথে কোনো বাধা নেই বললেই চলে, যদিও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বিদেশীদের কেনা প্রাথমিক উদ্ধৃত মূল্যের শেয়ার বিক্রয়ের ওপর শর্ত আরোপ করতে পারে।

মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন ও আর্টিক্যাল অব অ্যাসোসিয়েশন সমন্বয়েই কোম্পানির গঠনতন্ত্র গঠিত। কোম্পানি আইনের ২৬নং ধারা মোতাবেক প্রত্যেক সদস্য নির্দিষ্ট ফিস প্রদানের বিনিময়ে এ দলিলগুলির অনুলিপি গ্রহণ করতে পারে। কোনো সদস্য যাতে প্রতারিত না হয় সেজন্য এরূপ বিধান রয়েছে যে, মেমোরেন্ডাম ও আর্টিক্যালে কোনো পরিবর্তন ঘটালে অবশ্যই তা রেকর্ড করতে হবে। হাইকোর্ট ডিভিশনের এরূপ নির্দেশ রয়েছে যে, কোম্পানি আইনে মেমোরেন্ডাম ও আর্টিক্যালে করণিক ত্রুটি সংশোধনের কোনো বিধান নেই এবং প্রয়োজনে আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে এগুলি সংশোধন করা যেতে পারে।

বিনিয়োগকারীর স্বার্থরক্ষা ও হিসাবপত্র  বিনিয়োগকারীর স্বার্থরক্ষার জন্য একটি কোম্পানি অবশ্যই তার হিসাব নিরীক্ষা করাবে এবং নিরীক্ষা রিপোর্ট বছরে অন্তত একবার শেয়ার মালিকদের বার্ষিক সাধারণ সভায় পেশ করবে (১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন, ধারা ১৮৩)। কোম্পানির স্থিতিপত্র ও নিরীক্ষিত হিসাবে যেসব তথ্যাদি থাকা আবশ্যক সেগুলিও কোম্পানি আইনে উল্লিখিত আছে।

আইনত একটি পাবলিক কোম্পানি তাদের শেয়ার বা ঋণপত্র বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন প্রচারের সময় একটি বিবরণপত্র প্রকাশ করতে বাধ্য এবং তাতে থাকবে ব্যবস্থাপকদের বিস্তারিত তথ্য, কোনো প্রকল্পের জন্য অর্থ আবশ্যক এবং কোম্পানির সাধারণ আর্থিক অবস্থার বিবরণ (১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ১৩৫ নং ধারা)। কোম্পানি স্টক-এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত হলে বিবরণপত্রের জন্য সিকিউরিটিজ ও একচেঞ্জ কমিশনের অনুমোদন লাগে। জয়েন্ট স্টক কোম্পানির রেজিস্ট্রার নিজ উদ্যোগে অথবা বিক্রীত শেয়ারের এক-দশমাংশের মালিকদের অভিযোগক্রমে তদন্ত পরিচালনা করবেন তেমন ব্যবস্থা আইনে রয়েছে, তবে কার্যত এদেশে এমনটি দৈবাৎ ঘটে। অবশ্য কোম্পানির কার্যকলাপ শেয়ার মালিকদের বা শেয়ারের এক-দশমাংশ মালিকের স্বার্থের প্রতিকূলে পরিচালিত হলে সেক্ষেত্রে ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ২৩৩ ধারায় সংখ্যালঘু শেয়ার মালিকদের স্বার্থরক্ষার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষার ধারণাটি নতুন এবং কোম্পানিতে সংখ্যালঘু শেয়ার মালিকদের স্বার্থরক্ষা সম্পর্কিত কোনো রায় এখনও কোনো আদালত দেন নি। কোনো শেয়ার মালিক কোম্পানির বিলুপ্তি যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে পারলে তিনিও আদালতে এ মর্মে আবেদন দাখিল করতে পারেন। এভাবে কোনো শেয়ার মালিক কোম্পানির অর্জিত আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে মনে করলে প্রমাণ সাপেক্ষে তিনি আদালতে কোম্পানি গোটানোর আবেদন করতে পারেন।

কোম্পানি ব্যবস্থাপনা কোম্পানি পরিচালনা করে কোম্পানির পরিচালনা বোর্ড। বোর্ডের ক্ষমতা সাধারণত কোম্পানির আর্টিকেলে উল্লিখিত থাকে এবং এ ক্ষমতা বোর্ডের হাতে অর্পিত হলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় সাধারণ সভার হস্তক্ষেপের ক্ষমতা থাকে না। এক্ষেত্রে শেয়ার মালিকদের সাধারণ পরিষদ চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। পরিচালক বোর্ডের কার্যকলাপ অপছন্দ হলে তারা বোর্ডকে অপসারণ করতে এবং নিজেদের পছন্দসই লোক দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করতে পারে, তবে অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত বোর্ডই সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা সংস্থা থাকবে। সাধারণ সভার কার্যক্রম সচরাচর কোম্পানির মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেল সংশোধন, কোম্পানির বার্ষিক স্থিতিপত্র ও নিরীক্ষিত হিসাব অনুমোদন, সাধারণ সভায় অবসর গ্রহণকারী পরিচালকদের স্থলে নতুন পরিচালক নির্বাচন ইত্যাদিতে সীমিত থাকে। আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন কখনও কখনও নির্বাহি পরিচালকের হাতে ব্যবস্থাপনার পূর্ণক্ষমতা ন্যস্ত করে যেখানে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা নিজ হাতে ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ রাখতে চান। কিন্তু বর্তমান কোম্পানি আইনে কোনো নির্বাহি পরিচালক এক নাগাড়ে পাঁচ বছরের অধিক সময়ের জন্য নিযুক্ত হতে পারেন না এবং তার নিয়োগ সাধারণ সভায় অবশ্যই অনুমোদিত হতে হয়। আইনত তিনি অবশ্য কোম্পানিরই কর্মকর্তা এবং বোর্ড প্রয়োজনবোধে তাকে বরখাস্ত করতে পারে, তবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।

ম্যানেজিং এজেন্ট ব্রিটিশ আমলে এ উপমহাদেশে প্রচলিত কোম্পানি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল ম্যানেজিং এজেন্সি প্রথা। বাংলাদেশে ধীরে ধীরে তা লোপ পাচ্ছে। ভারতবর্ষের সঙ্গে ব্রিটিশ যোগাযোগের গোড়ার দিকেই ম্যানেজিং এজেন্সি প্রথার সূত্রপাত হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসা চালাত এবং কখনও কখনও ব্যবসায়ে এজেন্ট নিয়োগ করত। অচিরেই ম্যানেজিং এজেন্সির মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা একটি রেওয়াজে পরিণত হয়। শুরুতে এসব সওদাগরি প্রতিষ্ঠান মূলত ব্রিটিশ ফার্মের এজেন্ট হিসেবে ব্রিটিশ পণ্য আমদানি এবং ভারতীয় পণ্য ও কাঁচামাল রপ্তানি করত। এসব প্রতিষ্ঠান পরবর্তীকালে প্রায়শ লগ্নিকারী ব্যাঙ্কের কাজ করত এবং নীলচাষ, চা-বাগান, পাটকল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য তহবিল যোগাত। এগুলির কোনো কোনোটির গুরুত্ব এমনই ছিল যে সেগুলির ম্যানেজারদের কখনও কখনও ‘মার্চেণ্ট প্রিন্স’ বলা হতো। ম্যানেজিং এজেন্সিগুলি বিকাশমান ইংরেজ বাণিজ্যের সুযোগ গ্রহণ করে এবং এদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো তাদের ব্যবসা গজিয়ে উঠতে থাকে। ম্যানেজিং এজেন্সিগুলি ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলির স্বার্থ দেখাশোনার জন্য পরিচালক সরবরাহ করত। অচিরেই নবগঠিত কোম্পানি কর্তৃক এসব ম্যানেজিং এজেন্সির হাতে ব্যবসার দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাপক প্রচলন ঘটে। তারা ভারতে ঐসব কোম্পানির স্বার্থ দেখাশোনা করত এবং ইংল্যান্ডে অবস্থান করে বিনিয়োগকারীরা ব্যবস্থাপনার ঝুটঝামেলা এড়িয়ে শান্তিতে ব্যবসার সুফল ভোগ করত। ম্যানেজিং এজেন্সিগুলি নির্ধারিত বেতন ও কমিশনের ভিত্তিতে পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক পেত। সুযোগ্য ভারতীয় সওদাগররা ব্রিটিশদের পদাঙ্ক অনুসরণ করত। পারসিক, গুজরাটি ও মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানগুলিতে তারাই ছিল ম্যানেজিং এজেন্ট।

১৯০৫ সালের স্বদেশী আন্দোলন দেশীয় ব্যবসায়ে বাড়তি প্রেরণা যোগায়, অনেক নতুন কোম্পানি গড়ে ওঠে। এসব কোম্পানি ম্যানেজিং এজেন্সি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। ম্যানেজিং এজেন্সিগুলি অর্থ ও ব্যবসায়িক কলাকৌশলের যোগান দিয়ে বিকাশমান বাজারে মূল্যবান অবদান রাখে। সেসময় যেকোন উদ্যোক্তার পক্ষে কোনো ম্যানেজিং এজেন্সির শরণাপন্ন হওয়া একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর্শ্চযের বিষয়, ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত আইন প্রণেতাগণ কমিশন হিসেবে ম্যানেজিং এজেন্টদের প্রাপ্য সীমিত করার জন্য তৎকালীন ১৯১৩ সালের কোম্পানি আইনে কোনো বিধি সংযোজন আবশ্যক মনে করেন নি। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর উদ্যোক্তারা স্ব স্ব উদ্যোগে ব্যবসা চালাতে পারছে এবং এদেশে ম্যানেজিং এজেন্সির স্বাভাবিক বিলুপ্তি ঘটেছে, যদিও ভারতে এখনও এ ধরনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান টিকে আছে।

কোম্পানির বিলুপ্তি কোম্পানি স্বেচ্ছায় কিংবা আদালতের আদেশে বাধ্য হয়ে ব্যবসা গুটাতে পারে। সচরাচর হাইকোর্ট বিভাগের কোম্পানি বেঞ্চে ব্যবসা গুটাতে আগ্রহী অজস্র দরখাস্তকারী এ মর্মে ধরনা দেয় যে কোম্পানি দেনাশোধে (নোটিশ পাওয়া সত্ত্বেও ৩ সপ্তাহ ধরে সর্বনিম্ন ৫০০০ টাকা শোধ করতে) অপারগ অথবা ব্যবস্থাপনায় অচলাবস্থা, শেয়ার মালিকদের প্রতারণা ও নিপীড়ন ইত্যাদি কারণে কোম্পানির বিলুপ্তিই এখন ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত। সাধারণত কোম্পানি বিলোপ করতে হলে কোম্পানির সম্পদ দেখাশোনার জন্য একজন লিকুইডেটর নিযুক্ত হন। তিনি কোম্পানির ব্যবসা গোটান, পাওনাদারদের দেনা মেটান এবং উদ্বৃত্ত সম্পদ সদস্যদের মধ্যে বন্টন করেন। কার্যত, কোম্পানির সম্পদ নামমাত্র মূল্যে বিক্রয় হয়ে যায় এবং কোম্পানি গোটানোর আবেদনকারী সামান্য কিছু পায় অথবা কিছুই পায় না।

এখতিয়ার কোম্পানি আইনের অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলি বিচারের জন্য হাইকোর্ট বিভাগ বিশেষ সংবিধিবদ্ধ এখতিয়ার প্রয়োগ করে। কোম্পানি আইনের ৩নং ধারা অনুসারে কোম্পানি সংক্রান্ত যেকোনো আরজি হাইকোর্ট বিভাগে পেশ করতে হয়। ঢাকা জুট মিল লিমিটেডের সি.জে মুর্শেদ ও আবু সায়ীদ চৌধুরী বনাম সতীশ চন্দ্র বণিক গং মামলাটি (১৯৬৭) খোদ ওই আইনে কোর্টের উপর ন্যস্ত বিশেষ সংবিধিবদ্ধ এখতিয়ারেই নিষ্পত্তি হয়েছিল। কিন্তু মোঃ শামসুজ্জামান খান বনাম এম.এস ইসলাম মামলার (১৯৭৬) রায়ে দেখা গেল যে কোম্পানি আইনের ৩নং ধারা কোম্পানি আইনে বিরোধ মীমাংসার জন্য হাইকোর্টকে মাত্র নির্দিষ্ট কয়েকটি এখতিয়ার দিয়েছে। বিচার্য বিষয় সম্পূর্ণ দীউয়ানি বিরোধ হলে কোনো যোগ্য দীউয়ানি আদালতই কেবল তা বিচার করতে পারে।

সিকিউরিটিজ আইন স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার ও ঋণপত্রের ক্রয়বিক্রয় সংশ্লিষ্ট আইন। বাংলাদেশে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ আছে। ১৯৯৩ সালের সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন আইনের অধীনে গঠিত সিকিউরিটিজ কমিশনের উপর সিকিউরিটিতে বিনিয়োগকারীর স্বার্থরক্ষায় শেয়ার ও ঋণপত্রের যথাযথ প্রদান নিশ্চিতকরণ এবং দেশে পুঁজি ও সিকিউরিটিজ বাজারের বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের সিকিউরিটিজ আইনের ইতিহাসও প্রধানত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনের এ শাখার বিকাশকেই অনুসরণ করেছে। ১৯২৯ সালে ওয়াল স্ট্রীটের মহাবিপর্যয়ের পর ডেমোক্রাট দল দেশের শেয়ার বাজার ও ব্যবসার আইনে ব্যাপক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং ১৯৩৩ ও ১৯৩৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুটি আইন পাস করে সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠন করে। তখন থেকে এ কমিশন মার্কিন অর্থনীতির রক্ষক হিসেবে বেশ খ্যাতি অর্জন করে। পাকিস্তান আমলে সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ শেয়ার ব্যবসায়ে প্রতারণামূলক লেনদেন নিষিদ্ধ করে, কিন্তু ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত আইনটি গুরুত্ব সহকারে কার্যকর করা হয় নি।  [এম জহির]