কোম্পানি অ্যাক্ট


কোম্পানি অ্যাক্ট (১৯৯৪-এর ১৩নং আইন)  বাংলাদেশে কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সকল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের আইন। আইনটি প্রথম প্রণীত হয় ১৯১৩ সালে, এরপর সংশোধিত হয় ১৯১৫, ১৯২০, ১৯২৬, ১৯৩০, ১৯৩২, ১৯৩৬, ১৯৩৮, ১৯৪৯, ১৯৬৯, ১৯৭৩ এবং ১৯৮৪ সালে। সর্বশেষ সংশোধনী-সহ কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায় এবং এর পরদিন তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। কোম্পানি আইনের গোড়ার ইতিহাস ব্রিটিশ কোম্পানি আইন ১৮৪৪ দ্বারা সূচিত হয়, যার ভিত্তিতে উপমাহদেশের প্রথম কোম্পানি আইন হিসেবে যৌথ মূলধনি কোম্পানি আইন ১৮৫০ প্রণীত হয়। যৌথ মূলধনি কোম্পানি আইনের সারমর্ম ছিল এ জাতীয় কোম্পানির দায় অসীম। ১৮৫৭ সালে এ আইনের ভিত্তি অসীম দায় থেকে সসীম দায়ে পরিবর্তনের মাধ্যমে আইনটিতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। এ সময় আইনের নতুন নাম দেওয়া হয় কোম্পানি আইন ১৮৫৭। উপমহাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানি আইন ১৮৫৭ কয়েক দফা (১৮৬০,১৮৬৬, ১৮৮২, ১৮৮৭, ১৮৯১, ১৮৯৫, ১৯০০ এবং ১৯০৮ সালে) সংশোধিত হয়। তবে এত সংশোধনীর পরও আইনটি ব্রিটিশ কোম্পানি আইন নামেই চালু ছিল। ভারতীয় কোম্পানি আইন ১৯১৩ ছিল ব্রিটিশ কোম্পানি আইন ১৯০৮-এরই সংশোধিত সংস্করণ।

কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এ মোট ১১টি অংশ আছে। প্রথম অংশে উল্লিখিত হয়েছে আইনের শিরোনাম, প্রয়োগকাল ও পরিব্যাপ্তি, আইনে ব্যবহূত সকল পরিশব্দের সংজ্ঞা এবং এ আইন যে আদালতের এখতিয়ারভুক্ত উল্লেখসহ একটি মুখবন্ধ। দ্বিতীয় অংশের বিষয়বস্ত্ত হচ্ছে কোম্পানির প্রতিষ্ঠা ও নিবন্ধন। এ অংশে একটি ব্যবসা বা ব্যাংক কোম্পানি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোক্তাদের সংখ্যা, বিভিন্ন ধরনের কোম্পানির সঙ্ঘস্মারক ও সঙ্ঘবিধিসহ কোম্পানি নিবন্ধন, অমুনাফা-ভিত্তিক সংগঠন ও গ্যারান্টি দ্বারা সীমিত কোম্পানি সম্পর্কিত বিধি-বিধান ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তৃতীয় অংশের প্রধান বিষয় হচ্ছে শেয়ার মূলধন, অসীম দায়ের কোম্পানিসমূহের সীমিত দায়ের কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন এবং কোম্পানির পরিচালকবৃন্দের সীমিত দায় সম্পর্কিত নিয়মাবলি। এ অংশে কোম্পানির শেয়ার মূলধন বণ্টন এবং শেয়ার মূলধন হ্রাসকরণের বিধানসমূহও বর্ণনা করা হয়েছে। কোম্পানি আইনের চতুর্থ অংশে কোম্পানিসমূহের ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট স্থানে সুনির্দিষ্ট নামসহ কোম্পানির একটি নিবন্ধিত কার্যালয় থাকার আবশ্যকতা, নাম গোপন রাখার জন্য জরিমানা এবং কোম্পানিসমূহের অনুমোদিত, ইস্যুকৃত ও পরিশোধিত মূলধন-বিষয়ক তথ্যাবলি প্রকাশের পদ্ধতি সম্পর্কে আইনকানুন বর্ণনা করা হয়েছে। এ অংশে বলা হয়েছে কিভাবে ও কোনো কোনো নিয়ম মেনে কোম্পানিকে সভা অনুষ্ঠান করতে হবে ও কোম্পানির পরিচালক নিয়োগ করা যাবে এবং তাদের কর্তব্য, অধিকার, দায়, ক্ষমতা, মেয়াদ, কোম্পানি থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ কী কী এবং অন্যকোনো কোম্পানির ব্যবস্থাপক ও ব্যবস্থাপনা প্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্পর্ক কী হবে। ব্যবস্থাপনা প্রতিনিধি নিয়োগের নিয়মকানুন, চুক্তি ও দলিলপত্র সম্পাদনের বিধান, বিদেশে কোম্পানির সিলমোহর ব্যবহারের ক্ষমতা, কোম্পানির প্রসপেক্টাস সংক্রান্ত নিয়মাবলি, সুদ, কমিশন ও বাট্টা পরিশোধ এবং অতিরিক্ত শেয়ার বরাদ্দ ও ছাড়করণের ক্ষমতা, বন্ধক ও অন্যান্য অনিবন্ধিত খাতে ব্যয় পরিশোধের নিয়ম ইত্যাদি সম্পর্কেও এ অংশে বিস্তারিত বলা হয়েছে।

চতুর্থ অংশে ডিবেঞ্চার ইস্যু ও পর্যায়ক্রমে পরিশোধের মাধ্যমে প্রত্যাহার, রিসিভার নিয়োগ ও তাদের বিবরণী উপস্থাপন, তাদের ফি ও অন্যান্য খরচা ইত্যাদির বিধান দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এ অংশে কোম্পানির হিসাবপত্র যথাযথভাবে প্রণয়ন ও সংরক্ষণ, উদ্বর্তপত্র প্রস্ত্তত ও উপস্থাপন, অন্যান্য বিবরণী ও নথি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা এবং এসবের ব্যত্যয় ঘটলে তার জন্য জরিমানার উল্লেখ আছে। বলা হয়েছে, ব্যাংক এবং অন্যান্য কয়েক ধরনের কোম্পানির বিবরণী প্রকাশ করতে হবে, যেকোনো সময় যৌথ মূলধনি কোম্পানির নিবন্ধক হিসাব-সংক্রান্ত কাগজপত্র জব্দ করতে পারবেন এবং নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও নিয়মানুযায়ী কোম্পানি পরিদর্শন ও তার কাগজপত্র নিরীক্ষা করতে বা করাতে পারবেন। কোম্পানি আইনের চতুর্থ অংশের শেষভাগে কোম্পানির জন্য নিরীক্ষক নিয়োগের নিয়মাবলি, নিরীক্ষকদের ক্ষমতা ও কর্তব্য, যোগ্যতা, ফিস ইত্যাদি, কোম্পানির দলিলপত্র প্রণয়ন, ছাড়করণ ও প্রত্যয়ন সম্পর্কিত বিধান, বিবাদ নিষ্পত্তীকরণ ও সমঝোতার পদ্ধতি, প্রাইভেট কোম্পানি থেকে পাবলিক কোম্পানিতে রূপান্তরের নিয়মকানুন এবং সংখ্যালঘু শেয়ারমালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ ইত্যাদি সম্পর্কে বলা হয়েছে। কোম্পানি গুটিয়ে নিতে হলে তার পদ্ধতি ও ধরন, গুটিয়ে নেওয়া কোম্পানির পরিচালক ও শেয়ার মালিক এবং তাদের উত্তরসূরিদের দায়, কোম্পানি গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় জড়িত আদালতের নিয়মিত ও বিশেষায়িত ক্ষমতা, সরকারি বিলুপ্তীকরণ কর্তা নিয়োগ এবং তার ক্ষমতা ও কর্তব্য, কোম্পানির দায়-দেনা মিটমাটকরণ এবং পরিসম্পদ ও দায়সমূহ হস্তান্তর ও বণ্টন সংক্রান্ত বিধিবিধান আছে কোম্পানি আইনের পঞ্চম অংশে। ষষ্ঠ অংশের বিষয়বস্ত্ত হচ্ছে কোম্পানিসমূহের নিবন্ধিত কার্যালয়, সরকার কর্তৃক নিবন্ধক নিয়োগ ও তাদের ক্ষমতা ও কর্তব্য, নিবন্ধন ফিস পরিশোধ এবং কোম্পানি কর্তৃক নিবন্ধকের নিকট কোম্পানির আয়ব্যয় বিবরণী ও অন্যান্য দলিলপত্র প্রেরণ-সংক্রান্ত বিধিবিধান। সপ্তম অংশে কোম্পানি আইন ১৯৯৪ (১৯১৩) চালু হবার পূর্বে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিসমূহের জন্য বর্তমান কোম্পানি আইনের বিধিবিধানসমূহ কিভাবে প্রযোজ্য হবে তার ব্যাখ্যা রয়েছে।

কোম্পানি আইনের অষ্টম অংশে কোনো ধরনের কোম্পানিসমূহকে নিবন্ধন করা যাবে বৈশিষ্ট্যসহ সেগুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছে, নিবন্ধনের জন্য যেসব বিষয় দরকার তা উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে সঙ্ঘস্মারক ও সঙ্ঘবিধির বিকল্প দলিল প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নবম অংশের বিষয়বস্ত্ত হচ্ছে কোম্পানির বিলোপ সাধন। এ অংশে অনিবন্ধিত কোম্পানির অর্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কোম্পানি গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং গুটিয়ে নেওয়া বা তা রহিতকরণ সংক্রান্ত মামলার বিষয়ে বলা হয়েছে এবং এক্ষেত্রে কোম্পানির সম্পদের বিহিত ব্যবস্থা কিভাবে হবে তার উল্লেখ আছে। বাংলাদেশে বিদেশি কোম্পানি স্থাপনের জন্য কি প্রয়োজন এবং সেগুলির নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, হিসাব প্রস্ত্ততকরণ, সংরক্ষণ ও নিরীক্ষা পদ্ধতি এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন, সেগুলির শেয়ার বিক্রয়-সংক্রান্ত বিধিবিধান এবং সেগুলি বন্ধ করে দেওয়ার নিয়মকানুন ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে কোম্পানি আইনের দশম অংশে। সর্বশেষ, একাদশ অংশটি অনেকটা সম্পূরক এবং এতে বিধি ভঙ্গ করার ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা, জরিমানা প্রয়োগ, অবৈধভাবে সম্পত্তি আটক রাখার শাস্তি ইত্যাদির বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

কোম্পানি আইনে সর্বমোট ১২টি বিষয়ভিত্তিক সংযোজনী আছে। এসব সংযোজনীতে উল্লিখিত বিষয়সমূহ হচ্ছে শেয়ার দ্বারা সীমিত কোম্পানির ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধককে প্রদেয় ফিসের তালিকা, প্রসপেক্টাস ও তাতে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন বিবরণী, প্রসপেক্টাসের পরিবর্তে প্রদত্ত ঘোষণাপত্র, শেয়ার দ্বারা সীমিত কোম্পানিসমূহের সঙ্ঘস্মারক, গ্যারান্টি দ্বারা সীমিত এবং শেয়ারমূলধনসহ কিংবা তা ব্যতীত নিবন্ধনযোগ্য কোম্পানিসমূহের সঙ্ঘস্মারক ও সঙ্ঘবিধি, সীমিত দায়ের কোম্পানিসমূহের সঙ্ঘস্মারক ও সঙ্ঘবিধি, শেয়ার মূলধনের সারসংক্ষেপ এবং কারা শেয়ার হোল্ডার বা পরিচালক হতে পারবেন তার তালিকা, কোম্পানির উদ্বর্তপত্রের নমুনা, লাভ-লোকসান হিসাব-সংক্রান্ত নিয়মাবলি এবং ব্যাংক ও  বীমা কোম্পানি ও জামানতমূলক, ভবিষ্য তহবিল গঠনমূলক বা সমাজকল্যাণমূলক সমিতি কর্তৃক প্রকাশিতব্য বিবরণী। [আবুল কালাম আজাদ]