কেসী, ব্যারণ রিচার্ড গ্যাভিন গার্ডিনার


কেসী, ব্যারণ রিচার্ড গ্যাভিন গার্ডিনার (১৮৯০-১৯৭৬)  বাংলা প্রদেশের গভর্নর জেনারেল (১৯৪৪-৪৬)। ১৮৯০ সালের ২৯ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন শহরে তাঁর জন্ম। তিনি ছিলেন রিচার্ড গার্ডিনার কেসীর জ্যেষ্ঠ সন্তান। রিচার্ড কেসী ছিলেন একাধারে একজন প্রকৌশলী, কূটনীতিক ও একজন সফল রাজনীতিবিদ।

কেসীর শিক্ষা জীবনের সূচনা হয় সেন্ট কিল্ডার কলোডেন (Cumloden) স্কুলে দিবা শাখার ছাত্র হিসেবে। এরপর ইংল্যান্ডের মেলবোর্ন চার্চ এর নিকটস্থ গ্রামার স্কুলে তিন বছরের জন্য শিক্ষা গ্রহণের পর ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রার পূর্বে মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র এক বছরের জন্য (১৯০৯) প্রকৌশলবিদ্যা বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। কেসী কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজ থেকে ১৯১৩ সালে যন্ত্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতক ও ১৯১৮ সালে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ক্যাসীর কর্মজীবনের সূচনা হয় ১৯১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার রাজকীয় বাহিনীর একজন অধঃস্তন অফিসার হিসেবে। তিনি ব্রিটিশ বাহিনীর সৈনিক হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ও ১৯১৫ সালের আগস্ট মাসে মেজর হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৩১ সালে অস্ট্রেলিয়ায় প্রত্যাবর্তনের পর কেসী হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ এর সদস্য নির্বাচিত হন।

কূটনীতিক হিসেবে সাফল্যজনকভাবে কর্তব্য পালন করে তিনি প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে সন্তুষ্ট করেন। ফলে তিনি ১৯৪৩ সালের নভেম্বরে কেসী গার্ডিনারকে ভারতের বাংলা প্রদেশের গভর্নর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহনের প্রস্তাব করেন। কেসীই ছিলেন প্রথম অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক যিনি একটি অ-শ্রমিক দলের সরকার কর্তৃক গভর্নর-জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য মনোনিত হন।

১৯৪৪ সালের ২২ জানুয়ারি কেসী বাংলা প্রদেশের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন। বাংলা তখন ছিলো দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চাপে বিধ্বস্ত প্রায়। তিনি এখানে গভর্নরের শাসন আরোপ করেন ও বাংলার কল্যাণকর সরকার ব্যবস্থার জন্য দায়ভার নিজ কাঁধে তুলে নেন। তিনি বাংলার সিভিল সার্ভিসের প্রভূত উন্নতি সাধন করেন এবং নতুন দিল্লি থেকে তহবিল সংগ্রহের কাজেও সফলতা অর্জন করেন। বাংলার উন্নয়ণধর্মী প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উৎসাহ প্রদান করতেন ও নিজ কর্মকর্তাদের একটি সুন্দর পরিবেশে ও দক্ষতার সঙ্গে কাজে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করতেন। ব্রিটিশদের বর্ণবাদী উনাণাসিকতায় তিনি ছিলেন বীতশ্রদ্ধ। সে কারনে তিনি কলকাতার গভর্মেন্ট হাউজ ও সাধারণ জনগণের মধ্যকার দূরত্বের দেয়াল ভাঙ্গার চেষ্টা করেছেন। বাংলার জলবায়ু ও দীর্ঘ সময়ের বাংলার চাকুরি তাঁর স্বাস্থ্য হানী ঘটালেও দীর্ঘ সময় এখানে অবস্থানের কারনেই কলকাতার রাজনীতিবিদদের সাথে তাঁর বেশ সখ্যতা গড়ে উঠে। বিশেষ করে মুসলমানদের সঙ্গে, যাঁরা পরবর্তীতে পাকিস্তানী হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। কেসি মনে করতেন বাংলায় তিনি তাঁর অন্যতম সফল সময় অতিবাহিত করেছেন।

কেসী ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে পুনরায় ফেডারেল রাজনীতিতে (একারনেই যে, বাংলায় অবস্থানকালে তিনি অনুরূপ সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন) সক্রিয় হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। সদস্যপদ ছাড়াও তিনি ১৯৩৯ থেকে একজন প্রিভি কাউন্সেলর এবং ১৯৪৪ সালে সিএইচ হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। কেসী ১৯৬০ সালে ভিক্টোরিয়া স্ট্যাট এর বেরউইক এর ব্যারন হন। ব্যারন কেসী তাঁর কর্মময় জীবনের সাফল্যের জন্য ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক Knight Grand Cross of the Order of St Michael and St George  GCMG (1965) এবং Knight of the Order of the Garter KG (1969) পদকে ভূষিত হন।

এশিয়া বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে এমন ব্যাক্তিকে তিনি নিরবিচ্ছিন্নভাবে এশিয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বর্ননা করতেন। তিনি প্রায়ই এশিয়াতে ভ্রমণ করতেন এবং অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ মাধ্যম সমূহের মাঝে এ ব্যাপারে আগ্রহ বাড়াবার জন্য চাপ সৃষ্টি করতেন। কেসী এশীয় দেশসমূহের আনুকল্যের দিকে নজরদারী করতেন ও তাঁর তরুণ কূটনীতিকদের ইওরোপ এর পরিবর্তে এশীয় দেশ সমূহের প্রতি অধিক আগ্রহী হতে অনুরোধ করতেন।

বিশ শতকের নববইয়ের দশক জুড়ে কেসী একাধারে কমনওয়েল্থ এর সাইনটিফিক এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ মন্ত্রি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কেসী বেশ কয়েকটা  গ্রন্থ রচনা করেন। এদের মধ্যে উল্লেলখযোগ্য হচ্ছে Australia's Place in the World (Melbourne, 1931), An Australian in India (London, 1947), Double or Quit (Melbourne, 1949), Friends and Neighbours (Melbourne, 1954), Personal Experience 1939-1946 (London, 1962), The Future of the Commonwealth (London, 1963), Australian Father and Son (London, 1966), এবং  Australian Foreign Minister (edited by T. B. Millar, London, 1972). ১৯৭৬ সালের ১৭ জুন মেলবোর্ন শহরে তাঁর মৃত্যু হয়। [নাসরীন আক্তার]