কৃষক প্রজা পার্টি


কৃষক প্রজা পার্টি  আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি সম্বলিত এ রাজনৈতিক দলটি ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত বাংলার রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কৃষক প্রজা পার্টি ছিল নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির ফসল। ১৯১৯ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় মুসলমান গণ্যমান্য ব্যক্তিদের রাজনৈতিক দলসমূহ ও সমিতিগুলির দ্রুত ভাঙ্গাগড়া চলতে থাকে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মুসলমান নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে  নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি (All Bengal Tenants Association) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৯ সালে। স্যার  আব্দুর রহিম এ সমিতির সভাপতি এবং আরও পাঁচজন সহ-সভাপতি ছিলেন।  .কে ফজলুল হক ছিলেন এ পাঁচজনের মধ্যে প্রথম সহ-সভাপতি। ১৯৩০ দশকের  মন্দার প্রেক্ষাপটে পূর্ব বঙ্গের প্রায় সকল জেলায় প্রজা সমিতি গঠিত হয়। ফজলুল হক প্রজা রাজনীতির মধ্যে উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখতে পান এবং পূর্ব বাংলার অংশকে সঙ্গে করে তিনি নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি থেকে বেরিয়ে এসে কৃষক প্রজা পার্টি (কে.পি.পি) নামে একটি নিয়মিত রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এ পদক্ষেপের পূর্বে সমিতির সভাপতির পদ পূরণ নিয়ে একটি বিবাদের সূত্রপাত হয়। ১৯৩৪ সালে ভারতের আইন সভার সভাপতি নির্বাচিত হলে স্যার আব্দুর রহিম নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সমিতির সদস্যরা পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা-এ বৃহূৎ আঞ্চলিক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পূর্ব বাংলার পক্ষ থেকে এ.কে ফজলুল হক সভাপতির পদের প্রত্যাশী ছিলেন, অন্যদিকে পশ্চিম বাংলা দলের পক্ষ থেকে খান বাহাদুর এ. মমিন এ পদের জন্য খুবই আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ পরিস্থিতিতে বিতর্ক মীমাংসার জন্য উভয় দল বিদায়ী সভাপতির মধ্যস্থতা মেনে নিতে সম্মত হয়। তিনি খান বাহাদুরের প্রতি সমর্থন দেন। এ প্রেক্ষাপটে এ. কে. ফজলুল হক পূর্ব বাংলায় তার সমর্থকদের নিয়ে প্রজা সমিতি ত্যাগ করলেন এবং ১৯৩৬ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় কৃষক প্রজা পার্টি প্রতিষ্ঠিত করেন।

গ্রামীণ সমাজের নেতা হিসেবে ফজলুল হক আসন্ন নির্বাচনে জনগণের মন জয় করার জন্য একটি কৃষি-ভিত্তিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভালভাবে ওয়াকিবহাল ছিলেন। কে.পি.পি কর্মসূচিতে কৃষককে জমির একচ্ছত্র মালিকানা দিয়ে জমিদারি প্রথা বিলোপ, খাজনার হার হ্রাস, কৃষক সম্প্রদায়ের ঋণ মওকুফের মাধ্যমে মহাজন শ্রেণির শৃঙ্খল থেকে তাদের মুক্তিদান, কৃষকের মাঝে সুদমুক্ত ঋণ বিতরণ, দেশব্যাপী খাল খননের মাধ্যমে সেচ সুবিধা সৃষ্টি, সর্বগ্রাসী কচুরীপানা পরিষ্কার করে নৌচলাচল সচল করা, বিনাবেতনে প্রাথমিক শিক্ষা চালু ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কৃষককুলের কাছে ফজলুল হকের বক্তৃতা ছিল তার কর্মসূচির মতই আকর্ষণীয়। ফজলুল হকের আবেদন ছিল অসম্প্রদায়িক এবং সে কারণে তিনি নিম্নবর্ণের হিন্দু কৃষক সমাজের কাছেও শ্রদ্ধাভাজন হয়ে ওঠেন। কে.পি.পি নির্বাচনী ইশতাহার শেষ পর্যন্ত সকলের জন্য ‘ডাল ভাত’ এ একটি শ্লোগানে পরিণত হয়। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কে.পি.পি-র প্রধান দু প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ। কৃষক ভোটাররা হকের প্রতি বিশাল সমর্থন জানায়। যদিও তার দল মাত্র এক বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু নির্বাচনে প্রাপ্ত আসন হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে কেপিপি তৃতীয় স্থান দখল করে। কংগ্রেস পায় ৫২টি আসন, মুসলিম লীগ ৩৯টি, কে.পি.পি ৩৬টি এবং অন্যান্য খন্ডিত দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ২৫০ আসনের বাকিগুলি দখল করে। কে.পি.পি-র টিকেটে নির্বাচিত ৩৬ আসনের ৩৩টি আসে পূর্ব বঙ্গ থেকে। এর ফলে কে.পি.পি পূর্ব বঙ্গের একটি দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অভাবনীয় নির্বাচনী বিজয়ের পর পরই কে.পি.পির পতন শুরু হয়। কে.পি.পি নেতা এ.কে ফজলুল হক মুসলিম লীগ ও আরও কয়েকটি ক্ষুদ্র দল ও স্বতন্ত্র সদস্যের সমর্থনে ও অংশগ্রহণে একটি কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ফজলুল হককে দলকে সংহত করার পরিবর্তে ক্ষমতার রাজনীতিতে বেশি মনোযোগী হতে দেখা যায়। তার মন্ত্রিসভার ১১ জনের মধ্যে মাত্র ২ জন ছিলেন কে.পি.পি এবং বাকিরা মুসলিম লীগ ও সংখ্যালঘু দলগুলি থেকে। দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে অসন্তষ্ট কে.পি.পি নেতৃবৃন্দ সংসদে আলাদা দল হিসেবে আসন গ্রহণ করেন। বিদ্রোহী গ্রুপটি ১৯৩৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর রংপুরের গাইবান্ধায় দলের সাধারণ সভা ডাকেন এবং হক ও তার অনুসারীদের দল থেকে বহিষ্কার করেন। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হকও বিদ্রোহীদের বহিষ্কার করেন। কংগ্রেসের প্রচন্ড বিরোধিতার মুখে ক্ষমতা ধরে রাখতে, ১৯৩৭ সালের ১৫ অক্টোবর লক্ষ্ণৌ অধিবেশনে ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগদান করেন। লীগের চাপে হকের মন্ত্রিসভার কে.পি.পি সদস্য নওশের আলীকে ১৯৩৮ সালের ২২ জুন পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। এদিকে মন্ত্রিসভায় হক কে.পি.পি-র একমাত্র সদস্য থাকেন।

নভেম্বর ১৯৩৭ সাল থেকে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ তৃণমূল পর্যায় থেকে দলকে সংগঠিত শুরু করেন। মুসলিম লীগের দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে কে.পি.পি সংকুচিত হতে থাকে। লীগের উত্থান এতটাই দ্রুত ও সাবলিল ছিল যে, ১৯৪৩ সালে যখন হক মন্ত্রিসভার পতন হয়, তখন বাস্তবে কে.পি.পি অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। এ ক্ষয়িষ্ণু দল অবশ্য ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং মাত্র ৪টি আসন লাভ করে। অন্যদিকে ১৯৩৭ সালে তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম লীগ ১১৪টি আসন পায়। দেশ বিভাগের পর এ.কে. ফজলুল হক ঢাকায় চলে আসেন এবং কৃষক-শ্রমিক পার্টি নামে তার দলকে নতুন নামে পুনরজ্জীবিত করেন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত এ দল কোন মতে অস্ত্বিত্ব রক্ষা করে। [সিরাজুল ইসলাম]