কৃমিজাতীয় প্রাণী


কৃমিজাতীয় প্রাণী (Worm)  লম্বা, সরু, নরম দেহবিশিষ্ট উপাঙ্গহীন অমেরুদন্ডী প্রাণী। সাধারণভাবে Nematoda, Platyhelminthes, Acanthocephala, Nemertea এবং Annelida পর্বের অনেক সদস্য ওয়ার্ম (worm) নামে পরিচিত। ওয়ার্ম বা কৃমিজাতীয় প্রাণীদের অনেকেই বিভিন্ন প্রাণীতে পরজীবী; আবার অনেকেই মাটিতে বা জলজ পরিবেশে মুক্তভাবে বাস করে।

গোদরোগের কৃমি (Filarial worm) লম্বা ও সরু এক ধরনের পরজীবী নিমাটোড। এগুলির মধ্যে Wuchereria bancrofti বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চল, বিশেষত উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলিতে গোদ সংক্রমণ ঘটায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে Brugia malayi নিমাটোড রোগটির জন্য দায়ী। মশাবাহিত W. bancroftiB. malayi মানুষকে আক্রমণ করে এবং তাতে গোদ বা ফাইলেরিয়া রোগ দেখা দেয়। W. bancroftiB. malayi লসিকাতন্ত্রে থাকে। W. bancrofti ঘটিত লসিকার ফাইলেরিয়াকে ব্যানক্রফ্টিয়ান ফাইলেরিয়াও বলে। এদের পুরুষ ও স্ত্রী কৃমি যথাক্রমে ৪০ ও ৮২ মিমি লম্বা। স্ত্রী কৃমি হাজার হাজার লার্ভার (microfilariae) জন্ম দেয় এবং এগুলি রাত ১০টা থেকে রাত ২টার মধ্যে লসিকানালী দিয়ে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে। এগুলি লসিকাতন্ত্রে বৃদ্ধি পায় এবং বড় হয়ে লসিকাপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করলে লসিকানালী ফুলে ওঠে। গোদ হলো অন্ডকোষ, স্তন বা পায়ের স্ফীতি। কয়েক জাতের মশা W. bancrofti নিমাটোড বহন করে। বাংলাদেশে Culex quinquefasciatus এ রোগের প্রধান বাহক এবং সম্ভবত Cu. pipens fatigans মশাও। ঢাকা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর ও রাজশাহী জেলায় W. bancrofti পাওয়া গেছে। সাধারণত ১৫-৩০ বছর বয়সীরাই অধিকতর গোদপ্রবণ এবং সংক্রমণের হার ৭.২-৩২.৮%। Brugia malayiW. bancrofti জীবাণু অনেকটাই অভিন্ন। তবে পুরুষ B. malayi ১৩ মিমি লম্বা ও আকারে ছোট। কৃমিগুলি লসিকাতন্ত্রে থাকে এবং তাতে প্রধানত হাত ও পায়ে গোদ দেখা দেয়। বাহকদের মধ্যে আছে Mansonia, Aedes, এবং Culex গণের মশা।  [যোসেফ ডি’সিলভা]

হুকওয়ার্ম (Hookworm)  Nematoda পর্বের অন্তর্গত Strongiloidea বর্গের অধীনে এক ধরনের রক্তচোষা প্রাণী। মানুষ এবং অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের দেহে পরজীবী হিসেবে এরা বসবাস করে এবং হুকের সাহায্যে পোষকের অন্ত্রে আটকে থাকে। এদের দেহের সম্মুখভাগ কিছুটা সরু এবং সামান্য বাঁকা এবং এ কারণেই সম্ভবত এদের হুকওয়ার্ম নামকরণ করা হয়েছে। হুকওয়ার্মের দুটি প্রজাতি, Ancylostoma duodenaleNecator americanus মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়। গবাদি পশু, শূকর, কুকুর, বিড়াল এবং অন্যান্য প্রাণিদেহে হুকওয়ার্মের ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির সংক্রমণ ঘটে। হুকওয়ার্মের তীব্র আক্রমণে শরীরে রক্তক্ষরণ, রক্তশূন্যতা এবং লৌহঘাটতি দেখা দেয়। পুরুষ হুকওয়ার্ম ৮ থেকে ১১ মিমি এবং স্ত্রী হুকওয়ার্ম ৯ থেকে ১৩ মিমি লম্বা হয়। একটি স্ত্রী হুকওয়ার্ম প্রতিদিন গড়ে ৫০০০ থেকে ১০,০০০ ডিম পাড়ে। বাংলাদেশে হুকওয়ার্ম সংক্রমণের হার কুমিল্লা, নোয়াখালী, ঢাকা, বরিশাল, দিনাজপুর, রংপুর এবং ময়মনসিংহ জেলায় বেশি বলে জানা গেছে। শিশু ও নারীদের তুলনায় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের হুকওয়ার্ম সংক্রমণ বেশি হতে দেখা যায়। এর কারণ সম্ভবত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের অধিক সংখ্যায় কৃষিকাজে সংশ্লিষ্টতা।

A. duodenale-এর তুলনায় N. americanus দ্বারা বেশি সংক্রমণ হতে দেখা যায়। বাংলাদেশের মানুষের অজ্ঞতা, অনুন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং জীবন-যাপন পদ্ধতি হুকওয়ার্ম সংক্রমণ ঘটাতে সহায়ক।

গ্রামের মানুষের হুকওয়ার্ম সংক্রমণ খুব বেশি হতে দেখা যায়। কারণ সেখানকার মাটি মানুষের মল দ্বারা দুষিত হয়ে থাকে এবং মানুষের পক্ষে সবসময় জুতা কিংবা মোজা পরে থাকা সম্ভব হয় না। হুকওয়ার্মের লার্ভা ভিজে মাটি কিংবা কাদায় আশ্রয় গ্রহণ করে এবং খুব সহজেই অনাবৃত ত্বক বিশেষ করে পায়ের নিচের ত্বক ছিদ্র করে দেহের ভিতরে প্রবেশ করে। এরপর রক্তপ্রবাহের দ্বারা হূৎপিন্ড, ফুসফুস, খাদ্যনালী হয়ে একসময় অন্ত্রে পৌঁছায়। হুকওয়ার্ম সংক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ হচ্ছে এর লার্ভার প্রবেশপথে ত্বকের প্রদাহ যা ‘পদ চুলকানি’ হিসেবে পরিচিত। হুকওয়ার্ম সংক্রমণে মানুষের শরীরে রক্তশূন্যতা, দুর্বলতা এবং পেট ব্যথা হতে দেখা যায়।

A. caninum সাধারণত কুকুরকে সংক্রমিত করে, তবে বিড়াল এবং শিয়ালের দেহেও এ হুকওয়ার্ম দেখা যায়। সর্বোচ্চ ২৮% কুকুর এদের দ্বারা সংক্রমিত হতে দেখা গিয়েছে। Bunostomum bovis হুকওয়ার্ম গবাদি পশুকে সংক্রমিত করে। তবে বাংলাদেশে এদের সংক্রমণের হার মাত্র ৫%।  [এ.ডব্লিউ.এম শামসুল ইসলাম এবং যোসেফ ডি’সিলভা]

গোলকৃমি (Roundworm)  এটি Nematoda পর্বের সদস্যদের সাধারণ নাম হলেও মানুষের অন্ত্রবাসী Ascaris lumbricoides কৃমিকেই বোঝায়। তবে মানুষের গোলকৃমির মধ্যে আছে চাবুককৃমি Trichuris trichura, কুচোকৃমি Enterobius vermicularis, হুককৃমি Ancylostoma duodenale, সুতাকৃমি Strongyloides stercoralis ইত্যাদি। দেখা গেছে, গোলকৃমির প্রকোপ পুষ্টির অভাব, কম ওজন ও কম হিমোগ্লোবিনের সাথে সংশ্লিষ্ট। A. lumbricoides কৃমির সংক্রমণের হার সর্বোচ্চ ৯২% ও সর্বনিম্ন ২৫% হতে পারে। ডিম উদরস্থ হলেও সংক্রমণ ঘটে। মলের সঙ্গে ডিম নির্গত ও পানিতে পরিবাহিত হয়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে খোলা পায়খানা থেকেই প্রধানত সংক্রমণ ছড়ায়। এদের ডিম মাটি ও শাকসবজিতে লেগে থাকে। কাঁচা সবজি, পানি ও না-ধোয়া হাত সংক্রমণের উৎস হতে পারে। প্রতিটি স্ত্রী A. lumbricoides প্রতিদিন ২ লক্ষ ৫০ হাজার পর্যন্ত ডিম পাড়ে এবং ডিমগুলি মাটিতে কয়েক মাস জীবন্ত থাকে। চাবুক কৃমির লেজের দিক চওড়া ও মাথার দিকের দুই-তৃতীয়াংশ সুতার মতো হওয়ার জন্যই এ নাম। এগুলি ৩০-৫০ মিমি লম্বা, পুরুষ কৃমি স্ত্রী কৃমির চেয়ে সামান্য খাটো। এ জাতের স্ত্রী কৃমি প্রতিদিন ৩০০০-৫০,০০০ ডিম পাড়ে। খাবার বা পানির সঙ্গে ডিম উদরস্থ হলে সংক্রমণ ঘটে।

পিনওয়ার্ম (Pinworm)  Oxyuridae গোত্রের পিনসদৃশ লেজবিশিষ্ট ক্ষুদে নিমাটোড। মানুষের পরজীবী দুই প্রজাতির পিনওয়ার্ম হলো Enterobius vermicularis এবং E. gregorii। অল্পবয়সে এ কৃমিতে আক্রান্ত হয় নি এমন লোক এদেশে দুর্লভ। মানুষের অন্ত্রে, বিশেষত নিচের অংশে এ কৃমির পুরুষ ও স্ত্রী যথাক্রমে ১-৪ ও ৮-১৩ মিমি লম্বা হয়। অনেক সময় শত শত কৃমি সন্ধ্যায় পায়ুমুখে জড় হয়ে সুড়সুড়ি লাগাতে থাকে। সাধারণত দশ-এগারো বছর বয়সীরা হামেশা ও প্রাপ্তবয়স্করা মাঝেমধ্যে এদের সংক্রমণে ভোগে। লোকে এতে সাড়া দিয়ে পায়ুমুখ চুলকায় ও তা অব্যাহত থাকলে জায়গাটিতে প্রদাহ দেখা দেয়। স্ত্রী কৃমি ৪৬০০-১৬০০০ ডিম পাড়ে। এরা পায়ু অঞ্চলে এসে ডিম ছাড়ে। আঠালো ডিমগুলি সহজেই পায়ুমুখে আটকে যায়। সুড়সুড়ি শুরু হলে শিশুরা পায়ুমুখ চুলকায়, ডিমগুলি এদের আঙুলে লেগে যায় এবং আঙুল চুষলে উদরস্থ হয়। অন্ত্রে ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়। এগুলি বড় হতে সময় লাগে ১৫-৪৩ দিন। লার্ভা বড় হওয়ার আগে রূপান্তরিত হতে থাকে। এ সংক্রমণ বাংলাদেশে খুবই ব্যাপক। ঘনবসতি অব্যাহত রোগবিস্তারের সহায়ক। কিছুটা সংক্রমণ ক্ষতিকর নয়, কিন্তু চুলকানো ও অাঁচড়ানো থেকে কুন্ডুতি (pruritus) দেখা দিতে পারে। মেয়েদের যৌনাঙ্গেও সংক্রমণ ঘটে থাকে। পায়ুমুখে এক টুকরো সেলোটেপ লাগিয়ে কিছুক্ষণ পর অণুবীক্ষণে দেখলেই সহজে এদের শনাক্ত করা যায়। মলপরীক্ষায় এগুলি তেমন ধরা পড়ে না। প্রচলিত পরীক্ষার জন্যই সম্ভবত বাংলাদেশে পিনওয়ার্ম সংক্রমণে রকমফের দেখা যায়। তথ্যমতে স্ত্রী ও পুরুষের ক্ষেত্রে যথাক্রমে সর্বনিম্ন হার ৯% ও ১৩%। স্বচ্ছল পরিবারের তুলনায় বস্তিবাসী ও এতিমখানার শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ অধিক।  [যোসেফ ডি’সিলভা]

আরও দেখুন অ্যাসক্যারিয়াসিস; নিমাটোড