কুটিলা মুড়া


কুটিলা মুড়া  স্তূপ তিনটি আনন্দ বিহার-এর নিকটে লালমাই শৈলশিলার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অংশে সর্বোচ্চ টিলার শীর্ষদেশে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। এ স্তূপগুলি ঘটনাক্রমে সর্বোত্তম অবস্থায় অদ্যাবধি সংরক্ষিত ময়নামতীর সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় সৌধগুলির অন্তর্ভুক্ত। ময়নামতীর শালবন বিহার ও অন্যান্য পুরাকীর্তিস্থলগুলির তুলনায় এ স্তূপগুলি আঙ্গিক ও শৈলী বিচারে মূলত ভিন্ন। স্তূপগুলি ঐতিহ্যানুগ (traditional); পক্ষান্তরে, শালবন বিহার ও আরও অন্যসব বিহার বিবর্তিত (বাড়ষাবফ) শৈলীর। এখানে তিনটি প্রধান  স্তূপ উত্তর-দক্ষিণে একই সারিতে বিন্যস্ত দেখা যায়। আপাতদৃষ্টে এগুলি বৌদ্ধ ধর্মীয় দর্শনের ‘তিন রত্ন’ (ত্রি-রত্ন) বিশেষ, যেমন, বুদ্ধ (জ্ঞান), ধর্ম (নৈতিকতা), ও সংঘ (শৃঙ্খলা)।

ত্রিরত্ন স্তূপ, কুটিলা মুড়া, লালমাই, কুমিল্লা

মধ্যস্থলের স্তূপটির বুনিয়াদ তথা স্তম্ভমূলটি ‘ধর্মচক্র’ আকারে গড়া হয়েছে। এ চক্র বা চাকার চক্রনাভিটি (hub) এক ভারি স্তম্ভদন্ড বিশেষ ও চাকার পাখিগুলির (spokes) আদল তৈরি হয়েছে আটটি বাক্স আকৃতির কক্ষ দিয়ে। এখানেই রয়েছে অসংখ্য অতিক্ষুদ্র টেরাকোটা বা পোড়ামাটির নকশি ফলকে অলঙ্কৃত মৃত্তিকা নির্মিত নানা উপাসনা  স্তূপ। এগুলির মোহরাঙ্কনসমূহকে পবিত্র মাহাত্মমন্ডিত করা হয়েছে নরম ধূসরবর্ণের কর্দমশিলায় ভাস্কর্যখোদাইকৃত (shale sculpture) এক ধরনের বড় বড় চমৎকার বৌদ্ধমূর্তি সহকারে। অন্যান্য সূতপের স্তম্ভমূল (shaft) বা বুনিয়াদের গোড়ার দিকে রয়েছে একই ধরনের অলঙ্করণ, তবে কোনো ভাস্কর্যকর্ম নেই।

খনন থেকে প্রাপ্ত নানা সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে বোঝা যায়, সম্ভবত সাত শতকে এসব সৌধের নির্মাণ শুরু হয় ও তেরো শতক পর্যন্ত তা চলতে থাকে। খননস্থলে অপেক্ষাকৃত উঁচুস্তরে আববাসীয় আমলের খলিফাদের স্বর্ণমুদ্রা প্রাপ্তি তা প্রমাণ করে। ময়নামতী এলাকায় আবিষ্কৃত পাঁচটি প্রাচীন শিলালিপি নিদর্শনে দেবপর্বতএ দুটি ‘রত্নত্রয়’ উপাসনাপীঠ বা মন্দিরএর অবস্থানের উল্লেখ রয়েছে। যুক্তিসঙ্গত কারণেই তাই ধরে নেওয়া চলে যে, কুটিলা মুড়ার স্থাপনাটি সেগুলিরই অন্তর্ভুক্ত।  [মো. হারুনুর রশিদ]