কুটির শিল্প


Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১৫:৫৬, ১৮ আগস্ট ২০১৪ পর্যন্ত সংস্করণে

(পরিবর্তন) ←পুর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ→ (পরিবর্তন)

কুটির শিল্প  বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী একটি শিল্প। এ শিল্পে বাংলার আবহমান সংস্কৃতির প্রতিভাস ফুটে ওঠে, যার নির্মাতা পল্লী অঞ্চলের মানুষ। নিজেদের জীবিকা এবং নিজসত ব্যবহারের জন্য তারা এ সকল পণ্য উৎপাদন করে। বাংলার প্রকৃতি, মানুষ, পশুপাখি, লতাপাতা, গাছপালা, নদ-নদী ও আকাশ কুটির শিল্পের ডিজাইনে বা মোটিভে দেখা যায়। কুটির শিল্পকে অনেকে হস্তশিল্প, কারুশিল্প, সৌখিন শিল্পকর্ম, গ্রামীণ শিল্পও বলেন। বর্তমানে শহর এলাকায়ও কুটির শিল্পের প্রসার ঘটছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এর মতে, ‘যে শিল্প কারখানা একই পরিবারের সদস্য দতারা পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচালিত এবং পারিবারিক কারিগর খন্ডকালীন বা পূর্ণ সময়ের জন্য উৎপাদন কার্যে নিয়োজিত থাকেন এবং যে শিল্পে শক্তিচালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহূত হলে ১০ জনের বেশি এবং এবং শক্তি চালিত যন্ত্র ব্যবহূত না হলে ২০ জনের বেশি কারিগর উৎপাদন কার্যে নিয়োজিত থাকেনা তাই কুটির শিল্প’। জাতীয় রাজসত বোর্ড শক্তিচালিত যন্ত্রপাতি ব্যতিরেকে অনুর্ধ্ব ৫০ জন শ্রমিক নিয়োজিত কারখানাকে কুটির শিল্প হিসেবে গণ্য করেন।  কৃষিশুমারি (১৯৮৩-৮৪) কুটির শিল্পকে গার্হস্থ্য স্তরের উৎপাদন শিল্প বলে আখ্যায়িত করেছে। শিল্পনীতি ২০১০-এ বলা হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে জমি এবং কারখানা ব্যতিরেকে স্থায়ী সম্পদের মূল্য প্রতিস্থাপন ব্যয়সহ ৫ লক্ষ টাকার নীচে এবং পারিবারিক সদস্য সমনতয়ে সর্বোচ্চ জনবল ১০-এর অধিক নয় এরূপ শিল্প প্রতিষ্ঠান হচ্ছে কুটির শিল্প।

কুটির শিল্পের ইতিহাস খুবই প্রাচীন। পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণ বিবরণী থেকে জানা যায়, তৎকালে বাংলায় পৃথিবীখ্যাত মসলিন উৎপাদিত হতো। প্রাক-ব্রিটিশ বাংলায় সুতিবস্ত্র উৎপাদন বিশুদ্ধ কারুশিল্পরীতি বা গৃহে উৎপাদনের ব্যবস্থা দ্বারা সুসংগঠিত ছিল। মুগল যুগে কুটির শিল্প সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। ইংরেজ ও ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকরা প্রথমদিকে বাংলার কুটির শিল্পে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানির জন্য তাঁত ও অন্যান্য হস্তশিল্পকে অর্থ জোগান দিত। পরবর্তীকালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীগণ তাঁতবস্ত্র, বয়নশিল্প ও অন্যান্য কুটির শিল্পে নির্যাতন চালায়। যেখানে ১৮১৫ সালে এদেশ থেকে ১ কোটি ৩০ লক্ষ টাকার কাপড় রপ্তানি হয়েছে সেখানে ১৮৩২ সালে কমে গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ১০ লক্ষ টাকায়, পরের বছর তা শূণ্যের কোটায়। উল্টো ১৮৩২ সালে ইংল্যান্ড থেকে ৪০ লক্ষ টাকার বিদেশি কাপড় আমদানি করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ফলে এ দেশের কুটির শিল্পজাত পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ শিল্পের ব্যবসা প্রধানত হিন্দু মহাজন ও ব্যবসায়ীদের হাতে ছিল। দেশ বিভাগের ফলে তাদের অধিকাংশ দেশ ত্যাগ করে। ফলে কুটির শিল্পজাত ব্যবসায় বড় শূণ্যতার সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান আমলের গোড়ার দিক কুটির শিল্পে বৃহৎ বিনিয়োগ ছিল না বললেই চলে। এর মধ্যে প্রায় ৬৫% ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। প্রায় ১ হাজার ৬ শত পেশাজীবী কারিগর নিয়োজিত ছিল। তাঁত শিল্পে নিয়োজিত ছিল প্রায় ৪ লক্ষ লোক। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত এ শিল্প বস্ত্রের চাহিদা মিটিয়েছে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার এদেশের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৫৭ সালে সরকারি আইনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (ইপসিক) প্রতিষ্ঠা করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের কুটির শিল্পসহ সমগ্র শিল্পখাত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। বাংলাদেশ সরকার কুটির শিল্পকে পুনর্গঠন এবং কর্মসংস্থানের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থাকে পুনর্গঠন করে নতুন নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। এই প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যবাহী নৈপূণ্যভিত্তিক প্রযুক্তির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ, সমীক্ষা প্রণয়ন, বিপণন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে নিয়োজিত কারুশিল্পীদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। ১৯৮১ সালে বিসিক-এর একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ১৬০ ধরনের দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদনে ৩ কোটি ২২ লক্ষ কুটির শিল্পের কারখানা বিদ্যমান রয়েছে।

২০০৫ সালে বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, দেশে প্রায় ৭ লক্ষ শিল্প ইউনিট রয়েছে যার মধ্যে৬০০০ বৃহৎ, ৫০০০ মাঝারি, ৭৬,০০০ ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্প প্রায় ৬ লক্ষ ২০ হাজার রয়েছে। ১৯৯৯-২০০০ সালে বিসিকে মোট ৪,০৮৫টি শিল্প প্রতিষ্ঠান নিবন্ধীকৃত হয়। এর মধ্যে ৩,২৪০টি কুটির শিল্প। এ সময়ে কুটির শিল্পে মোট বিনিয়োগ ছিল ৫০ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা এবং এইসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে ৪০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়।

কুটির শিল্পের শ্রেণিকরণ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কুটির শিল্প আট শ্রেণিভুক্ত। এগুলো হলো ক) খাদ্য, পানীয়, তামাক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প: দুগ্ধজাত, ফল প্রক্রিয়া ও টিনজাতকরণ, মৎস্য প্রক্রিয়া ও টিনজাতকরণ, আদা শুষ্ককরণ, ডালমিল, আটামিল, ময়দামিল, অন্যান্য শস্য কারখানা, তেল কল, চাল কল, মসলা চূর্ণকরণ, বেকারি, গুড় তৈরি, পশু খাদ্য, মুরগির খাদ্য, বরফ, খয়ের, লবণ তৈরি, মিষ্টান্ন, মধু প্রক্রিয়াকরণ, পানীয়, বিড়ি, হুক্কা, তামাক, জর্দা, মৌমাছি পালন, মৎস্য চাষ, ঘানির তৈল, হাঁস, মুরগি পালন, চিড়া ও মুড়ি তৈরি। খ) বস্ত্র ও চামড়া শিল্প: সুতা কাটা,  রেশমজাত দ্রব্য, হস্তচালিত তাঁত, বস্ত্র মুদ্রণ, জামদানি, সুচিকর্ম, হোসিয়ারি, মোজা তৈরি, উলজাত দ্রব্য, নারিকেলের ছোবড়াজাত দ্রব্য, পাটের সুতা, ছিকা, মাছ ধরার জাল, পোশাক শিল্প, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়াজাত দ্রব্য, বাটিক, সতরঞ্জি, কার্পেট। গ) কাঠজাত শিল্প:  নৌকা তৈরি, খেলনা, কাঠের আসবাবপত্র, বেত ও বাঁশজাত দ্রব্যাদি ও আসবাবপত্র,  খেলাধুলার সামান, হুক্কা তৈরি, বাদ্যযন্ত্র, মাদুর শিল্প, কাঠ খোদাই, কাঠের কৃষি সরঞ্জামাদি, ঘর সাজানোর দ্রব্যাদি এবং কাঠের উপজাত। ঘ) মুদ্রণ ও মোড়কসহ কাগজ শিল্প: পুরনো কাগজজাত দ্রব্য, মুদ্রণালয়, বই বাঁধাই, কাগজের হস্তশিল্প, কাগজের ব্যাগ, কাগজের ফুল ইত্যাদি। ঙ) রাসায়নিক, পেট্রোলিয়াম ও রসায়নজাত শিল্প: এ্যালোপ্যাথিক, ইউনানী আয়ুর্বেদীয় ঔষধ, ছাপা ও রঞ্জন শিল্প, রঙ এবং বাণিজ্য, আগরবাতি, প্রসাধনী সামগ্রী, সাবান তৈরি, বুট পলিশ, মোম তৈরি, চিরনি ও বোতাম, মৃৎ শিল্প, কাঁচ শিল্প, চুনজাত দ্রব্যাদি, শিল পাটা, চক তৈরি, শ্লেট ও পেন্সিল, প্লাস্টিকের খেলনা ও ফুল ব্যাগ ইত্যাদি। চ) অধাতব খনিজ শিল্প: চুনাপাথর ও শামুকজাত চুন, রঙীন চক, খড়ি মাটি, শঙখজাত দ্রব্য, বোতাম ও চুড়ি ইত্যাদি। ছ) মেশিনারি ও যন্ত্রপাতিসহ ধাতব শিল্প: লৌহজাত আসবাবপত্র, ইলেট্রোপ্লেটিং, তারের জাল, ধাতব পাত ও মুদ্রণ, তারকাটা, কাঁসা ও পিতল, স্টীল ট্যাংক, মেশিনারি সামগ্রী, কৃষি যন্ত্রপাতি, চুলের ক্লিপ, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, জুয়েলারী, হালকা ইঞ্জিনিয়ারিং, কামার শিল্প প্রভৃতি। জ) হস্ত শিল্পসহ অন্যান্য শিল্প।

মৃৎশিল্প

মৃৎ শিল্প ১৯৮৫ সালে বিসিক কারুপল্লী নামে একটি সমীক্ষাভিত্তিক বই প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায় বাংলাদেশে ৬৬৬টি কারুপল্লীতে ১৮ হাজার পরিবার প্রায় ৭৬ হাজার মৃৎশিল্পী কারিগর রয়েছে। এই শিল্পে মোট বিনিয়োগ ১০ কোটি ৬০ লক্ষ, বাৎসরিক পণ্য উৎপাদন ৩৬ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকার। মৃৎ শিল্প পরিবার, পাড়া ও স্থানীয় কাঁচামালভিত্তিক। এ শিল্পের কারিগর প্রায় সকলেই হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী, কুম্ভকার হিসেবে পরিচিত এবং এদের উপাধি পাল। এরা বিভিন্ন ধরনের পুতুল, দেবদেবীর মুর্তি, গার্হস্থ্য দ্রব্যাদি, মাটির ভাস্কর্য, টালি, শখের হাঁড়ি, মনশাঘট ও ফুলদানি তৈরি করে। উল্লেখযোগ্য মৃৎ শিল্প পল্লী কুমিল্লার বিজয়পুর, পটুয়াখালীর মদনপুরা, ফেনীর চম্পকনগর, শরিয়তপুরের কার্ত্তিকপুর এবং ঢাকার রায়ের বাজার।

বেতের তৈরি আসবাবপত্র

বাঁশ-বেত শিল্প বিসিকের সমীক্ষা (১৯৮৫) অনুযায়ী মোট শিল্প ইউনিট সংখ্যা ৪২ হাজার, নিয়োজিত শ্রমিক সংখ্যা ১ লক্ষ ২২ হাজার জন। মোট ব্যবহূত কাঁচামালের বাৎসরিক মূল্য ২২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। উৎপাদিত সামগ্রির মূল্য ৫০ কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য বাঁশ বেত সামগ্রী, বেড়া, চাটাই, মাছধরার ফাঁদ, হাতপাখা, মোড়া, সোফাসেট, টেবিলম্যাট, ওয়ালম্যাট, ট্রে, ফুলদানি, ছাইদানি প্রভৃতি। উৎপাদন এলাকা কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী।

পাটজাত শিল্প  পাট দিয়ে বিভিন্ন মোটিভের সিকা, টেবিলম্যাট, শতরঞ্জি, কার্পেট, সৌখিন হ্যান্ডব্যাগ, থলে ইত্যাদি তৈরি হয়। বিসিকের সূত্র মতে বাংলাদেশে ৪ হাজার কারখানায় ১১ হাজার কারিগর নিয়োজিত। মোট বিনিয়োগ ২ কোটি টাকা, উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ৩ কোটি ৪ লক্ষ টাকা।

বস্ত্রশিল্প

বস্ত্রশিল্প বস্ত্রশিল্পে ১৯৭৮ সালে সমগ্র বাংলাদেশে ১.৯৮ লক্ষ কারখানায় ৪.৩৭ লক্ষ খটখটি তাঁত, গর্ত তাঁত ও সতয়ংক্রিয় তাঁতে ৯ লক্ষ ৪৭ হাজার ব্যক্তি কর্মরত ছিল। এই সকল তাঁতে প্রতি বছর গড়ে ১০৪ কোটি ৫০ লক্ষ গজ শাড়ি, লুঙ্গি, ধুতি, গামছা, মশারি, তোয়ালে, মসলিন, জামদানি, কাতান, মলমল ও উপজাতীয় বস্ত্র উৎপাদিত হয়। বস্ত্র শিল্পের মধ্যে বাংলাদেশের বিখ্যাত এলাকা হলো: নরসিংদী, রায়পুরা, ডেমরা, টাঙ্গাইল, শাহজাদপুর, বেড়া, মুরাদনগর, কুমারখালি মাগুরা রাজশাহী, খাদিমনগর, মীরগড়, নাসিরনগর প্রভৃতি অঞ্চল। সাম্প্রতিককালে ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় বস্ত্র, মসলিন, জামদানী, মলমল টরোয়ো শাড়ি, পাবনার শাড়ি, টাঙ্গাইলের শাড়ি, রেশমবস্ত্র ও খদ্দর বস্ত্র থেকে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাশন পরিচ্ছদ প্রস্তুত হচ্ছে।

নকশি কাঁথা

নকশি কাঁথা বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ সুচিকর্ম হলো নকশিকাঁথা। ১৩ ধরনের নকশি কাঁথা এদেশে তৈরি হয়। এগুলি হলো: চিত্রিত কাঁথা, মাটিকাঁথা ও পাইড় কাঁথা। বাংলাদেশের সর্বত্র কাঁথা প্রস্তুত হলেও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, ফরিদপুর ও কুষ্টিয়ার কাঁথা সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট মানের। এসকল অঞ্চলে লেপ কাঁথা, দুজনী কাঁথা, দুরনীকাঁথা, আরশীলতা, ওড়কাঁথা, বাতায়নকাঁথা ও দস্তরখানা প্রস্ত্তত হয়। বিসিকের সূত্রমতে বাণিজ্যিকভিত্তিতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শত কুটির শিল্প কারখানায় ৩ হাজার কর্মী নিয়োজিত, উৎপাদিত পণ্যের বাৎসরিক মূল্য ১৬ কোটি ১০ লক্ষ টাকা।

শীতলপাটি

শীতলপাটি শীতলপাটি এক ধরনের চাটাই যা মোরতা নামক গাছেল বাকল তৈরি। পশুপাখি, লতাপাতা এবং পারিপার্শ্বিকতার ডিজাইন ও মোটিভে শীতলপাটি তৈরি করা হয়। এতে লাল, নীল, সবুজ, কালো ও বেগুনিরঙের বাহার থাকে। সিলেটের রাজনগর, বালাগঞ্জ, বড়লেখা ও মোল্লার বাজার নোয়াখালীর সোনাগাজী ও রায়পুর, বরিশালের স্বরূপকাঠি ও নীলগাতি এবং ফরিদপুরের সাতেচে উন্নতমানের শীতলপাটি তৈরি হয়। কারুপাড়াভিত্তিক প্রায় ১৫ হাজার কারিগর শীতলপাটি উৎপাদন করে, যার বাৎসরিক মূল্য ৫ কোটি টাকা। এদেশে এক সময় রৌপ্য ও হাঁতির দাঁতের পাতি দিয়ে করে শীতলপাটি তৈরি হতো।

গহনা শিল্প গহনা বাংলাদেশের নৃতাত্বিক শিল্পের উল্লেখযোগ্য কুটির শিল্প। অঙ্গের শোভাবর্ধনের জন্য বাঙালি মেয়েরা বিভিন্ন ডিজাইনের গহনা ব্যবহার করে। ডিজাইনের মূল উৎস লতাপাতা, ফলমুল, পশু পাখি, নক্ষত্ররাজির মতো প্রাকৃতিক মোটিভ। এর নামকরণ বৈচিত্র্যময় যেমন: সিঁথিতে ঝাপা, কানে কানপাশা, হীরাম মুল কুড়ি, ঝুমকা, নবরত্ন ও চক্রবালি, নাকে বেশর নথ, ফুরফুরি, গলায় পুষ্পহার, সীতাহার, সাতনরীহার, চম্পাকলি, মোহনমালা, হাতে তাগা, মাদুলি বাজার মান্তাশা, রত্নচূড়, আঙ্গুলে আঙ্গুষ্ঠার শাহনামী, অ্যানওয়ান, কোমরে বিছা, চন্দ্রহার কিন্ধিনী পায়ে, ঝাঝুরা পায়েল, তোড়া প্রভৃতি। বিসিক সূত্রমতে বাংলাদেশে গহনাশিল্প ইউনিট সংখ্যা ১২ হাজার ২৫০, কারিগর সংখ্যা ২৭ হাজার এবং বিনিয়োকৃত মূলধন ১৩ কোটি টাকা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট ও ফরিদপুর অঞ্চল গহনা শিল্পে উল্লেখযোগ্য।

কাঁসা-পিতল শিল্প

কাঁসা-পিতল শিল্প  কাঁসা-পিতলজাত শিল্প এ দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঢাকার ধামরাই, সাভার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জামালপুরের ইসলামপুর, রংপুর, টাঙ্গাইল ও শরিয়তপুরে পারিবারিক শিল্প হিসেবে বংশ পরম্পরায় তৈরি হয়ে আসছে। কাঁসা-পিতলের কুটির শিল্প সংখ্যা প্রায় ৩৯০ এবং কারিগর প্রায় ২ হাজার। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩৩ কোটি ৩৭ লক্ষ টাকা মূল্যের কাঁসা-পিতল সামগ্রী তৈরি হয়।

কুটির শিল্পের উন্নয়নে বিসিক, যুব ও ক্রীড়া দপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মহিলা ও সমাজ সেবা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি সাহায্য সংস্থা (NGO) শ্রমিকদের আর্থিক, কারিগরি এবং বিপণনে সহায়তা করে থাকে। এ খাতে অর্থ প্রবাহ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সরকার ১৯৮৯ সালে  বেসিক ব্যাংক লিমিটেড নামে একটি বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে।  [মাসুদ রেজা]


গ্রন্থপঞ্জি  শিল্প মন্ত্রণালয়, শিল্পনীতি ২০০৫, ঢাকা; শিল্প মন্ত্রণালয় শিল্পনীতি ২০০৯-২০১০ (খসড়া), মোহাম্মদ সিরাজুদ্দিন, কুটির শিল্প, বাংলা একাডেমী, ঢাকা; এমআইএস বিভাগ, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র  ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), ঢাকা।