কাশেম, প্রিন্সিপাল আবুল


কাশেম, প্রিন্সিপাল আবুল (১৯২০-১৯৯১)  শিক্ষাবিদ, ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ, লেখক। ১৯২০ সালের ২৮ জুন চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার ছেদন্দি গ্রামে তাঁর জন্ম। আবুল কাশেম ১৯৩৯ সালে বরমা হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৪১ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। তিনি ১৯৪৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে বিএসসি (অনার্স) এবং ১৯৪৫ সালে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের লেকচারার পদে যোগ দেন। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন।

আবুল কাশেম, প্রিন্সিপাল

আবুল কাশেমের উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিশ। তিনি ছিলেন এর সাধারণ সম্পাদক। এই সংগঠনের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম তিনি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদানের দাবি উত্থাপন করেন। এই লক্ষ্যে ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা: বাংলা না উর্দু’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। এই মূল পুস্তিকায় আবুল কাশেম প্রণীত একটি সংক্ষিপ্ত প্রস্তাবনাও ছিল, এবং তাতে ছিল বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম এবং পূর্ববাংলার অফিস আদালতের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবি। তাঁরই উদ্যোগে তমদ্দুন মজলিশ ১৯৪৭ সালের ১ অক্টোবর সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনে নেতৃত্ব দেয়। নূরুল হক ভূইয়াকে সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক এবং আবুল কাশেমকে কোষাধ্যক্ষ করা হয়।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদই ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে এবং ১৯৪৮ সালের প্রথমদিকে ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করে। ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বে আবুল কাশেম ছিলেন আন্দোলনের মধ্যমণি। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবির সপক্ষে ব্যাপক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে তিনি অসামান্য অবদান রাখেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির সপক্ষে যুব সমাজ এবং বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও ছাত্রদের সমর্থন লাভে তাঁর সাফল্য ছিল অভাবনীয়। ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত প্রথম প্রতিবাদ সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ দেশব্যাপী ধর্মঘট সংঘটনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এই ধর্মঘটের ফলে তদানীন্তন প্রাদেশিক সরকার বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিশ্রুতিতে ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ অ্যাকশন কমিটির সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য হয়।

আবুল কাশেম ছিলেন বাংলা সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটি ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর ঢাকা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। তমদ্দুন মজলিশের মুখপত্র হিসেবে এই পত্রিকাটি ভাষা আন্দোলনের আদর্শ ও লক্ষ্য প্রচারে সক্রিয় ছিল। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত পত্রিকাটি চালু থাকে।

আবুল কাশেম এবং তমদ্দুন মজলিশের কতিপয় নেতৃস্থানীয় সদস্য অচিরেই উপলব্ধি করেন যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকালে যে রাষ্ট্রীয় আদর্শের কথা বলা হয়েছিল, পাকিস্তান তখন আর সে আদর্শে পরিচালিত হচ্ছে না। এর ফলে তমদ্দুন মজলিশের অধিকাংশ সদস্য মুসলিম লীগ থেকে সরে যান। আবুল কাশেম তখন একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নেন। ফলে ১৯৫২ সালে আবুল হাশেমকে সভাপতি করে গঠিত হয় খিলাফতে রববানী পার্টি। আবুল কাশেম যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৫৪ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া-বোয়ালখালী নির্বাচনী এলাকা থেকে পূর্ববাংলা আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি আইন পরিষদে শিক্ষার সকল স্তরে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালু করার প্রস্তাব পেশ করেন।

ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ আবুল কাশেম কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় বাংলা মাধ্যম প্রবর্তনের অপরিহার্যতা উপলব্ধি করেন এবং এতদুদ্দেশ্যে তিনি ঢাকায় ১৯৬২ সালে বাংলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এ কলেজ প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলা মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা লাভের দ্বার উন্মুক্ত হয়। তিনি দীর্ঘ উনিশ বছর (১৯৬২-১৯৮১) বাংলা কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। এর অধিকাংশ সময়ই তিনি কলেজ থেকে কোনো পারিশ্রমিক বা বেতন গ্রহণ করেন নি।

একজন বহুমুখী লেখক, প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম পদার্থবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের অপরাপর শাখায় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠ্যবইসহ প্রায় এক শত গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর সুপরিচিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা (১৯৪৭), একমাত্র পথ (১৯৪৯), ঘোষণা (১৯৫২), বিবর্তনবাদ (১৯৫২), ইসলাম কি দিয়েছে এবং কি দিতে পারে (১৯৫২), মুক্তি কোন পথে (১৯৫২), শ্রেণি সংগ্রাম (১৯৫৩), একুশ দফার রূপায়ন (১৯৫৫), দুটি প্রশ্ন (১৯৫৫), শাসনতান্ত্রিক মূলনীতি (১৯৫৫), সংগঠন (১৯৬৪), আধুনিক চিন্তাধারা (১৯৬৪), ইসলামী রাষ্ট্রনীতি, কুরআনের অর্থনীতি, বিজ্ঞান বস্ত্তবাদ ও আল্ললাহর অস্তিত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব ও আল্লাহর অস্তিত্ব, বিজ্ঞান সমাজ ও ধর্ম, Islam Science and Modern Theory, Universal Ideology in the light of Modern Thought। বাংলা বানান এবং বাংলা লিখনরীতি সংস্কারের লক্ষ্যে তিনি একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।

আবুল কাশেম বাংলা একাডেমী, আর্ট কলেজ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, সিটি কলেজসহ পঞ্চাশটিরও অধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। জাতির সেবায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম জাতীয় ও সামাজিক পুরস্কার লাভ করেন। এদের মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান রাইটার্স গীল্ড পুরস্কার (১৯৬৪), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮২), একুশে পদক (১৯৮৭), ইসলামিক ফাউন্ডেশন অ্যাওয়ার্ড (১৯৮৮), চট্টগ্রাম সমিতি পদক (১৯৮৮), বাংলা কলেজ ছাত্র মজলিশ পুরস্কার, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৩, মরণোত্তর)। ১৯৮৯ সালে তাঁকে ঢাকায় জাতীয় সম্বর্ধনা দেয়া হয়। এই সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও ভারতের খ্যাতনামা পন্ডিত ও সাহিত্যিকগণ অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে আবুল কাশেমকে জাতীয় সম্বর্ধনা স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়।

প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম ১৯৯১ সালের ১১ মার্চ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।  [মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]