কার্তিকপুর জমিদার পরিবার


কার্তিকপুর জমিদার পরিবার  মুগল আমলে প্রতিষ্ঠিত ফরিদপুরের একটি জমিদার পরিবার। পূর্বে কার্তিকপুর জমিদারি এলাকা দক্ষিণ বিক্রমপুর পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিক্রমপুরের জমিদার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম কেদার রায়ের মৃত্যুর (১৬০৩ খ্রি.) পর তাঁর বিস্তীর্ণ জমিদারি কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়। মন্ত্রী রঘুনন্দন দাস চৌধুরী লাভ করেন মূল বিক্রমপুর পরগনার বন্দোবস্ত, এবং সেনাপতি রঘুনন্দনগুহ চৌধুরী পান ইদিলপুর পরগণার জমিদারি। দক্ষিণ বিক্রমপুরের কার্তিকপুর পরগণার জমিদারি লাভ করেন শেখ কালু। এ পরগণার প্রাচীন দলিল মতে হিজরী ১১৫২ সনের (১৭৪০ খ্রি.) এক  ফরমান বলে শেখ কালু এ জমিদারি লাভ করেন। শেখ কালুর মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র কন্যা নূরন্নেছার উপর জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব পড়ে। এদিকে মানসিংহের সঙ্গে বাংলায় আগত মুগল সেনাপতি ফতেহ মুহম্মদের সাথে নূরন্নেছার বিবাহ হয়। পূর্ববাংলা থেকে পর্তুগিজ বিতাড়নে ফতেহ মুহম্মদের কৃতিত্বের জন্য সম্রাট  শাহজাহান ১৬৪৩ সালে তাঁকে কার্তিকপুরে স্বাধীন জমিদারি প্রদান করেন।

ফতেহ মুহম্মদের পুত্র মইনউদ্দিনের সময় এই পরিবার ‘মুন্সি’ উপাধি লাভ করে। মইনউদ্দিনের মৃত্যুর পর তার দুই পুত্র ইমামউদ্দিন ও নঈমউদ্দিন নাবালক থাকায় তাদের বিশ্বস্ত কর্মচারী রঘুনন্দন সেনের হাতে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয়। মুন্সী ইমামউদ্দিন মুর্শিদাবাদে অধ্যয়নকালে দিল্লির সম্রাটের একখানি পত্রের পাঠোদ্ধার করায় নবাব খুশি হয়ে তাঁকে কার্তিকপুরের রাঘব চৌধুরীর জমিদারির অংশ দান করেন। ফলে ‘রসুলপুর’ নামক একটি নতুন পরগণার উদ্ভব ঘটে। এভাবে কার্তিকপুর পরিবারের জমিদারি সম্প্রসারিত হয়। এ বংশের নঈমউদ্দিন কৃতি লোক ছিলেন। তাঁর পুত্র মুন্সী জহিরউদ্দিন প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর সঙ্গে দেওয়ান রাজবল্লভের পরিবারের সখ্যতা ছিল।

কার্তিকপুরের মুন্সিদের জমিদারি ইমামউদ্দিন ও নঈমউদ্দিনের উত্তরাধিকারিদের মাঝে যথাক্রমে ছয় আনি ও দশ আনিতে বিভক্ত হয়। মুন্সী ইমামউদ্দিনের শেষ জীবনে নবাবের দেওয়ান রাজবল্লভ সেখ কালুর বংশধরদের কিছু অংশ স্বীয় জমিদারির অন্তর্ভুক্ত করেন। এভাবে কার্তিকপুর জমিদারির একটা অংশ রাজনগরের অধীন হয়ে পড়ে। কিন্তু রাজবল্লভ তাঁর জীবদ্দশায় এ অংশ হস্তগত করতে পারেন নি। এদিকে ইমামউদ্দিন ও নঈমউদ্দিনের উত্তরসূরীদের গৃহবিবাদের সুযোগে মুন্সী নঈমউদ্দিনের পুত্র মুন্সী জহিরউদ্দিনের সহায়তায় রাজবল্লবের পুত্র রায়গোপাল কার্তিকপুর পরগণা অধিকারের জন্য দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। এ দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত মুন্সী পরিবারের পরাজয় ঘটে এবং কার্তিকপুর পরগণা রাজনগর জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয়।

মুন্সী ইমামউদ্দিনের তিন পুত্র মনিরউদ্দিন, ওয়াজিরউদ্দিন ও ফয়েজউদ্দিন মর্যাদাসম্পন্ন জমিদার ছিলেন। ইমামউদ্দিনের দৌহিত্র মমতাজউদ্দিন চৌধুরী খুবই তেজস্বী লোক ছিলেন এবং জমিদার ও নীলকর ওয়াইজের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। এ বংশের সবচেয়ে প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন মুন্সী নাজিমউদ্দিন চৌধুরী। তিনি পৈত্রিক ও মাতামহের সম্পত্তি লাভ করে বার আনা অংশের মালিক হন এবং জমিদারির ব্যাপক উৎকর্ষ সাধন করেন। পরে রাজনগর জমিদারি পাঁচ ভাগে বিভক্ত হলে কার্তিকপুর পরগণাও অনুরূপ বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বকেয়া খাজনার দায়ে সম্পত্তি নিলাম হলে নাজিমউদ্দিন চৌধুরী ওই সম্পত্তি পত্তন নিয়ে অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখেন।

মুন্সী ইমামউদ্দিনের তিন পুত্রের মধ্যে মনিরউদ্দিন ছিলেন উদার মতাবলম্বী এবং ধর্মনির্বিশেষে প্রজাসাধারণের কল্যাণে নিয়োজিত। এ বংশের মুন্সী ফেরউদ্দিন ও মুন্সী করিমউদ্দিন চৌধুরীও হিন্দু প্রজাদের অনুরূপ পৃষ্ঠপোষকতা করেন। করিমউদ্দিন অষ্টধাতু নির্মিত কালিমূর্তি নিজ ব্যয়ে হিন্দুপল্লীতে সংস্থাপন করেন এবং দোল, চড়ক প্রভৃতি অনুষ্ঠানের ব্যয়ভার বহন করতেন। তারা হিন্দু মন্দিরে এবং ব্রাহ্মণদের প্রচুর দেবোত্তর ও ব্রহ্মোত্তর সম্পত্তি দান করেন।

কার্তিকপুরে মুন্সী মনিরউদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী বখ্তেন্নেছার অনেক কীর্তি এখনও বিদ্যমান আছে। এর মধ্যে কার্তিকপুরে তিন গম্বুজ মসজিদ, কাঠহুগলি দিঘি ও ভূমিগাঁয়ের দিঘি উল্লেখযোগ্য। নাজিমউদ্দিন চৌধুরী ১২৭৩ সনে (১৮৬৬ খ্রি.) কার্তিকপুরে ইংরেজি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১২৮৪ সনে (১৮৭৭ খ্রি.) কার্তিকপুর থেকে ঘড়িসার পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেন। তাঁর পুত্র সেরাজউদ্দিন চৌধুরীও ছিলেন খ্যাতিমান  জমিদার। সেরাজউদ্দিন চৌধুরীর পুত্রদের মধ্যে গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী পাকিস্তান গণপরিষদ সদস্য ও মন্ত্রী ছিলেন। ঢাকা নওয়াব পরিবার, ইদিলপুর পরগণা ও ভাসাইল ভোগের চৌধুরীদের সঙ্গে এ পরিবারের সামাজিক ও জমিদারি সম্পর্ক ছিল। ঢাকার নবাব আব্দুল গণির পুত্র নবাব  আহসানুল্লাহর সঙ্গে নাজিমউদ্দিন চৌধুরীর এক কন্যার বিয়ে হয়। পরবর্তী সময়ে ঢাকার নবাবদের সঙ্গে এ পরিবারের আরও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।   [দেলওয়ার হাসান]