কারিতাস


কারিতাস  বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। ১৯৬৭ সালে সমাজকল্যাণ, উন্নয়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ ক্যাথলিক বিশপ সম্মিলনী এ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসের প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ের পরপরই প্রতিষ্ঠানটি খ্রিস্টান ত্রাণ ও পুনর্বাসন সংস্থা (কোর) নামে পুনর্গঠিত হয়। কোর ১৯৭১ সালের ১৩ জানুয়ারি জাতীয় সংস্থার রূপ লাভ করে এবং ১৯৭২ সালের ১৩ জুলাই দি সোসাইটিস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট ১৮৬০ অনুযায়ী নিবন্ধন গ্রহণ করে। ১৯৭৬ সালে এটি ‘কারিতাস বাংলাদেশ’ নাম ধারণ করে। কারিতাস  এনজিও বিষয়ক ব্যুরো কর্তৃক ১৯৮১ সালের ২২ এপ্রিল নিবন্ধিত হয়, যার নম্বর ০০৯। ১৯৯৭ সালে কারিতাস রজতজয়ন্তী পালন করে।

কারিতাস-এর প্রধান কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত। বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, দিনাজপুর, খুলনা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীতে কারিতাস-এর সাতটি আঞ্চলিক বা ধর্মপ্রদেশীয় কার্যালয় আছে। বৃহত্তর সিলেট এলাকায় এর একটি এরিয়া অফিস রয়েছে। কারিতাস শিক্ষা ও সক্ষমতা বিকাশের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, দরিদ্র জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, পরিবেশ উন্নয়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উপর অগ্রাধিকার প্রদান করে।

কারিতাস বর্তমানে ৪,২৩৮ জন কর্মী ও ৩,৭২৪ জন স্বেচ্ছাকর্মী নিয়ে ৬৩টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৪৬টি জেলার ১৫৪টি উপজেলায় সমন্বিত উন্নয়ন, সমাজ কল্যাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কাজ করছে। কারিতাস উন্নয়ন শিক্ষা সম্প্রসারণ কার্যক্রম (ডিডস), জেন্ডার ও উন্নয়ন কর্মসূচি (জিডিপি), সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প (আইসিডিপি), সমন্বিত মানব উন্নয়ন প্রকল্প (আইএইচডিপি) এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের (এনআরএমপি) মাধ্যমে ১৯,১৫৬টি প্রাথমিক দল নিয়ে ৪০৮,৬৩৭ জন গ্রামীণ দরিদ্র মহিলা এবং পুরুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কারিতাস বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে যাচ্ছে। কারিতাস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (সিডিআই)-এর মাধ্যমে ২০০৯ সালে ৫৩টি বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদান করে যেখানে ১,৫৭০ জন কারিতাস এবং সহযোগী সংস্থার বিভিন্ন কর্মী, যুবক ও যুবমহিলা এবং সমাজের অন্যান্য পেশার লোকজন অংশগ্রহণ করে। এছাড়া কারিতাস তিন মাসব্যাপী সমাজ বিশ্লেষণ ও উন্নয়নের উপর ডিপ্লোমা কোর্স পরিচালনা করে। ২০০৯ সালে কারিতাস থেকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মোট ৩,২১৩ জন ছাত্রছাত্রী কারিগরি প্রশিক্ষণ পেয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। ২০০৯ সালে মোবাইল টেকনিক্যাল ট্রেনিং প্রকল্পের মাধ্যমে কারিতাস বিভিন্ন বিষয়ে ১,৪২৬ জনকে এবং আঞ্চলিক টেকনিক্যাল স্কুলস-এর মাধ্যমে ৩২১ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করে।

কারিতাস কোর-দি-জুট ওয়ার্কস প্রকল্পের মাধ্যমে ২০০৯ সালে ২১টি দেশে ৭০টি কোম্পানির কাছে নিজস্ব উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করেছে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৫.৫৯ কোটি টাকা। এই প্রকল্পে বাংলাদেশের ১৯টি জেলায় ১৪০টি দলে মোট ৩,৫২৪ জন হস্তশিল্পী মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে। এছাড়া কারিতাস এই প্রকল্পের মাধ্যমে ১১টি বাংলাদেশী হস্তশিল্প রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে বিগত বছরে দক্ষতাবৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করে।

কারিতাস মানব উন্নয়নে এবং গঠনমূলক সমাজ নির্মাণে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাকার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। ২০০৯ সালে কারিতাস পরিচালিত ১৯২টি প্রি-স্কুলে ১৪,০৯৯ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয় যেখানে ১,৯৮৮ জন ছাত্রছাত্রী পাস করে। পাশাপাশি ৩৭০ জন শিক্ষককে শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষাপদ্ধতির উপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।  নটর ডেম কলেজ লিটারেসি এন্ড হেলথ কেয়ার প্রোগ্রামের মাধ্যমে ২০০৯ সালে ১৪০০ বস্তিবাসী ছাত্রছাত্রীকে স্কুলে ভর্তি করা হয়। বিগত বছরে ৯,৫৯৪ জন রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় এবং ৪,৫১১ জন রোগীকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ করে দেওয়া হয়। ৬০ জন পথশিশুকে কারিতাসে আশ্রয় ও শিক্ষা দেওয়া হয়।

কারিতাস প্রাকৃতিক দুর্যোগে আর্থিক ও বস্ত্তগত সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি দুর্যোগ আক্রান্ত জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। ২০০৯ সালে ৩০টি সাইক্লোন সেন্টার মেরামত এবং ৭,৬৩৮টি স্বল্প মূল্যের গৃহ নির্মাণ করা হয়। ৩,৩৮২টি পরিবারকে পেশাগত সহায়তা প্রদান করা হয় এবং ২০,৩৫৬ জনকে কাজের বিনিময়ে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। কারিতাস মা ও শিশু স্বাস্থ্য, কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য, নেশাগ্রস্ত ও প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন, আধ্যাত্মিক উন্নয়ন এবং এইচআইভি/এইডস সম্পর্কে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

সাধারণ সভা ও একটি নির্বাহী পরিষদ দ্বারা কারিতাসের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ৩১ জন প্রতিনিধি নিয়ে গঠিত সাধারণ সভা কারিতাসের নীতি নির্ধারণ করে, বার্ষিক বাজেট ও অডিট প্রতিবেদন অনুমোদন করে, অডিটর নিয়োগ করে এবং নির্বাহী পরিষদ গঠন করে। নির্বাহী পরিষদের সদস্য সংখ্যা ১২। প্রতিষ্ঠানের প্রধান হচ্ছেন নির্বাহী পরিচালক। তাঁকে সহায়তা করেন উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত তিনজন নির্বাহী কর্মকর্তা বা পরিচালক। কারিতাসের প্রতিটি আঞ্চলিক অফিসে একজন আঞ্চলিক পরিচালক আছেন এবং তার অধীনে কাজ করেন তিনজন কর্মকর্তা। এরা হচ্ছেন মহিলা উন্নয়ন, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণ এবং হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা। উপজেলা পর্যায়ে কারিতাসের সকল প্রকল্পের দায়িত্বে আছেন একজন মাঠ কর্মকর্তা। তাঁকে সহায়তা করেন সহকারী মাঠ কর্মকর্তা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের সংগঠকগণ।

কারিতাসের কার্যক্রম মূলত দাতা সংস্থাসমূহের অর্থ সাহায্যে পরিচালিত হয়। স্থানীয় পর্যায়েও কিছু তহবিল সংগৃহীত হয়। ২০০৯ সালে এটি ১,৩৮১ মিলিয়ন টাকার বিদেশি সাহায্য পায় এবং স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত তহবিলের পরিমাণ ছিল ৪৩৩ মিলিয়ন টাকা। ২০০৯ সালে ব্যয় হয় ১,৪১৪ মিলিয়ন টাকা এবং উল্লেখিত বছরে কারিতাস ২.৭ মিলিয়ন মানুষের জন্য কাজ করে।  [শামসুল হুদা]