কাজী, জোহরা বেগম


জোহরা বেগমে কাজী

কাজী, জোহরা বেগম (১৯১২-২০০৭)  ডাঃ জোহরা বেগম কাজী প্রথম আধুনিক বাঙালি মুসলিম মহিলা চিকিৎসক। তিনি ভারতের যুক্ত প্রদেশের রঞ্জনগাঁওয়ে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯১২ সালের ১৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন।  একজন রাজনীতিক হিসেবে সুপরিচিত তাঁর পিতা ডাঃ কাজী আব্দুস সাত্তার ছিলেন বর্তমান মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার গোপালপুর গ্রামের কাজী পরিবারের সদস্য। একজন মেধাবী ছাত্রী হিসেবে জোহরা বেগম বাল্যকাল থেকেই প্রথম স্থান অধিকার করে সকল পর্যায়ের সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেন। ১৯৩৫ সালে দিল্লির হার্ডিং মহিলা মেডিক্যাল কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে শীর্ষ স্থান অধিকার করে তিনি এম.বি.বি.এস ডিগ্রি লাভ করেন এবং ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় কর্তৃক প্রদত্ত পদকে ভূষিত হন।

জনসেবা ও সমাজকল্যাণমূলক আদর্শকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে ডাঃ জোহরা কাজী মহাত্মা গান্ধীর ‘সেবাশ্রমে’ তার চাকরিজীবন শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পূর্বে তিনি ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দেশ বিভাগের পর তিনি পূর্ববাংলায় চলে আসেন। নরসিংদী জেলার রায়পুর উপজেলার হাতিরদিয়ার জমিদার পুত্র রাজুউদ্দিন ভূঁইয়ার (এম.পি) সাথে তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন।

ডাঃ জোহরা বেগম কাজীর বর্ণাঢ্যজীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের শুরু ১৯৪৮ সালে যখন তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন। তৎকালীন মেডিক্যাল কলেজে পৃথক ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিভাগ না থাকায় অনগ্রসর সমাজের গর্ভবতী মহিলারা হাসপাতালে এসে পুরুষ ডাক্তারদের নিকট চিকিৎসা নিতে অনাগ্রহী ছিলেন। ফলে গর্ভবতী মা ও শিশুদের যথাযথ চিকিৎসায় বিঘ্ন ঘটতো এবং অকাল মৃত্যুর ঘটনাও ছিল অনেক বেশি। ডাঃ জোহরা কাজীর ঐকান্তিক চেষ্টার ফলে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এবং পরে মিটফোর্ড হাসপাতালে স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিভাগ খোলা  হয়। ডাঃ জোহরা কাজী ১৯৫৫ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য ইংল্যান্ডে যান এবং সেখান থেকে অন্যান্য প্রশিক্ষণসহ  DRCOG, FCPS, FRCOG এবং MRCOG ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে তাঁর পূর্বতন কর্মস্থলে প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। তিনি হলি ফ্যামিলি রেডক্রস হাসপাতাল এবং কমতাইনড্ মিলিটারি হাসপাতালে সিনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবেও কর্মরত ছিলেন।

পৈতৃক নিবাসসূত্রে জোহরা বেগমের জন্ম এবং কর্মজীবনের বেশ কয়েক বছর বাংলার বাইরে অতিবাহিত হলেও  তিনি বাংলা পড়তে ও লিখতে পারতেন এবং হিন্দি, উর্দু ও আরবির পাশাপাশি সাবলীলভাবে বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারতেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। দীর্ঘকাল মানবতার সেবায় নিঃস্তার্থ কর্মকান্ডের স্তীকৃতিস্তরূপ ডাঃ জোহরা কাজীকে তমঘা-ই-পাকিস্তান (১৯৬৪), বেগম রোকেয়া পদক (২০০২) এবং একুশে পদক (২০০৮) প্রদান করা হয়। ২০০৭ সালের ৭ নভেমতর জোহরা কাজীর মৃত্যু হয়।  [শিরীন আখতার]