কাজীপাড়া মসজিদ


কাজীপাড়া মসজিদ রংপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার ও কারমাইকেল কলেজ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে ধর্মদাস গ্রামের কাজীপাড়া মৌজায় অবস্থিত একটি মুগল মসজিদ। একখন্ড উঁচুভূমির উপর স্থাপিত এ মসজিদটি ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়ে মূল মসজিদটির ছাদ পর্যন্ত উচ্চতায় চারদিকের দেওয়ালগুলিই কেবল টিকে রয়েছে। সম্প্রতি ইমারতটি আংশিকভাবে মেরামত করা হয়েছে। বর্তমানে এর উপরে আচ্ছাদন হিসেবে দেওয়া হয়েছে টিনের ছাদ এবং পূর্বদিকে একটি বারান্দা সংযোজন করা হয়েছে।

ভূমি নকশা, কাজীপাড়া মসজিদ, রংপুর

প্রচলিত রীতি অনুসারে মসজিদটির চারকোণে রয়েছে চারটি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ। পূর্ব দিকে রয়েছে তিনটি করে খিলানযুক্ত প্রবেশপথ এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে রয়েছে একটি করে খিলানযুক্ত জানালা। পার্শ্ব বুরুজগুলির মধ্যে দক্ষিণ পশ্চিম কোণের বুরুজটি বর্তমানে অনুভূমিক বপ্র (Parapet) পর্যন্ত টিকে রয়েছে। ছাদের কিনারা হতে অনেক উপরে উঠে যাওয়া এ বুরুজটির উপরের অংশে এক সময় ক্ষুদ্র গম্বুজ শোভিত ছত্রী ছিল। কেন্দ্রীয় প্রবেশপথটি সামান্য প্রশস্ত এবং বাইরের দিকে প্রক্ষিপ্ত। এ প্রবেশপথটি একটি উচু বহুখাঁজ বিশিষ্ট খিলানের নিচে উন্মুক্ত। পশ্চিম দেওয়ালের ভেতরের অংশে রয়েছে কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের সমান্তরালে স্থাপিত একটি অর্ধ অষ্টভুজাকৃতির মিহরাব। এ মিহরাবটি একটি আয়তাকার ফ্রেম দ্বারা বেষ্টিত এবং এ ফ্রেমের উপরে রয়েছে বদ্ধ পদ্ম পাপড়ি নকশার একটি সারি।

মসজিদের তিনটি বে’র উপর আচ্ছাদন হিসেবে তিনটি গম্বুজ ছিল। পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত দুটি প্রশস্ত খিলান এবং বাংলা পেন্ডেন্টিভ গম্বুজ গুলির ভার বহন করত। অভ্যন্তর ভাগের দেওয়ালের উর্ধ্বাংশে এর চিহ্ন এখনও লক্ষ করা যায়। পূর্ব দিকের সম্মুখভাগে গভীর আয়তাকার খোপ নকশা এবং ছাদের বপ্রের টিকে থাকা বদ্ধ পদ্মপাপড়ি নকশার সারি এখনও দেখা যায়। অবিকৃত রূপ নিয়ে টিকে থাকা দক্ষিণ পশ্চিম কোণের বুরুজটি কয়েকটি ছাঁচে ঢালা ব্যান্ড নকশা দ্বারা বিভক্ত। এ ব্যান্ড নকশার মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানে উৎকৃষ্ট মানের পোড়ামাটির অলংকরণ রয়েছে। মোটিফের ক্ষেত্রে এখানে বিষয়-বৈচিত্র দেখা যায়। যেমন পরস্পর সংযুক্ত বৃত্তের মধ্যে স্থাপিত গোলাপ নকশা, জালি নকশা, ফুলেল নকশা এবং জ্যামিতিক নকশা।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে দুটি মত প্রচলিত রয়েছে। এর একটি মত অনুসারে, মসজিদটি আকবর এর সময়কালে নির্মিত। কিন্তু এ মতটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আকবরের সময় এ এলাকা মুগলদের অধিকারে ছিল না। অন্য জনশ্রুতি অনুসারে, মসজিদটি আওরঙ্গজেব এর সময়ে নির্মিত। এটা সত্যি হলেও হতে পারে। মসজিদের টিকে থাকা স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যগুলি, বিশেষত এর পোড়ামাটির অলংকরণ সতেরো শতকের শেষ ভাগে বাংলায় নির্মিত অন্যান্য কয়েকটি মুগল ইমারতের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। [এম.এ বারি]