কলকাতা উন্নয়ন ট্রাস্ট


কলকাতা উন্নয়ন ট্রাস্ট (Improvement Trust of Calcutta) নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সংস্থা  হিসেবে ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত জোরেসোরেই এর কার্যক্রম চলে। কলকাতা উন্নয়ন ট্রাস্ট (অধুনা কলকাতা উন্নয়ন ট্রাস্ট) গঠনের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০২-০৩ সালে সরকার বেশ কয়েকটি বৃহৎ অথচ পৃথক সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত করে। এক্ষেত্রে সরকারের উদ্দেশ্য ছিল যে, ট্রাস্ট এর সংগৃহীত রাজস্বের বিপুল অর্থে নগর উন্নয়ন ও সড়ক সংস্কারের একটি সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে, অস্বাস্থ্যকর ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার উন্নয়ন সাধন করবে, এবং বাস্ত্তহারা জনগণের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতা উন্নয়ন ট্রাস্ট।

কলকাতা উন্নয়ন অ্যাক্ট ১৯১১ আইনটি ১৯১২ সালের ২ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। বস্ত্তত এক সঙ্কটময় পরিস্থিতি মোকাবেলায় এ আইনটি গৃহীত হয়। কলকাতায় প্লেগের প্রাদুর্ভাবের ফলে ১৮৯৬ সালে কলকাতার অবস্থা সম্পর্কে চিকিৎসা তদন্তের রিপোর্ট এবং কলকাতার ইমারত ও সড়ক সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের সুপারিশের জন্য ১৮৯৭ সালের এপ্রিল মাসে গঠিত বিল্ডিং কমিশন-এর প্রতিবেদন থেকেই এ সঙ্কটময় পরিস্থিতির উদ্ভব। ১৮৯৮ সালের বোম্বে ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট থেকে  লব্ধ অভিজ্ঞতাও কলকাতার জন্য অনুরূপ আইন প্রণয়নের প্রেরণা জোগায়। এর উদ্দেশ্য ছিল বোর্ড অব ট্রাস্টি গঠন করে এর মাধ্যমে সুচারুভাবে কলকাতার উন্নয়ন ও বিস্তৃতি সাধন করা। এ জন্য এ ট্রাস্টকে স্বাস্থ্য, ত্রুটিপূর্ণ ভেন্টিলেশন, যোগাযোগ, নদী ও অরণ্য সংরক্ষণ এবং ইমারত নির্মাণের স্থান নির্ধারণ বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা হয়।

শুরুতেই ট্রাস্টের প্রথম চেয়ারম্যান সিসিল হেনরি বম্পাস ট্রাস্টের কার্যক্রমের ধারা নির্ধারণ করে দেন। এগুলো হলো: সড়ক নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ও সুযোগ বিশ্লেষণ, শহরতলি এলাকার উন্নয়ন, শ্রমিকশ্রেণীর জন্য পুনর্বাসন পরিকল্পনা, কলকাতা শহরে প্রবেশের পথ প্রশস্তকরণের পরিকল্পনা তৈরি, এবং শহরতলির পৌরসভা এলাকায়  উদ্যান নির্মাণের  জন্য উন্মুক্ত এলাকা অধিগ্রহণ।

১৯১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাদ্রাজ কর্পোরেশনের প্রাক্তন প্রকৌশলী ই.পি রিচার্ডস কলকাতা উন্নয়ন ট্রাস্টের প্রধান প্রকৌশলী পদে যোগদান করেন। তাঁকে কলকাতা ও এর শহরতলি অভিমুখী গুরুত্বপূর্ণ প্রধান সড়কগুলোর একটি পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়। তবে এটা বোঝা গিয়েছিল যে, বর্তমানে আছে কিংবা ভবিষ্যতে নির্মাণ করা হতে পারে এমন সড়কগুলো কিভাবে মূল সড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে সে বিবেচনা ব্যতিরেকে একক কোনো প্রধান সড়ক নির্মাণ করা যাবে না। মোদ্দা কথায়, কলকাতা ও এর প্রান্তবর্তী এলাকায় যাতায়াত ও পরিবহণ সংক্রান্ত পুরো বিষয়টি ছিল একটি একক সমন্বিত সমস্যা এবং সমন্বিত প্রক্রিয়ায়ই এর সমাধান প্রয়োজন।

কলকাতা উন্নয়ন ট্রাস্টে রিচার্ডসের চাকরির মেয়াদ ছিল স্বল্পকালীন। তবুও  এ সময়ের মধ্যেই তিনি তৈরি করেন কলকাতার ওপর প্রথম পরিকল্পনা-দলিল। এ পরিকল্পনাটি ১৯১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯১৪ সালের মার্চের মধ্যে তৈরি হয়, অংশত কলকাতায় এবং অংশত লন্ডনে। এটি Report on the Condition, Improvement and Town planning of the City of Calcutta and Contiguous Areas শিরোনামে ১৯১৪ সালে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হয়। কলকাতার পরিকল্পিত উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ রিপোর্টটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এই যে, তা বিশ শতকের প্রথমদিকে উদ্ভূত শহর পরিকল্পনা সংক্রান্ত ইউরোপীয় চিন্তা-চেতনার সুফল লাভ করেছিল।

এ নীতিমালায় শহরতলি এবং বস্ত্তত কলকাতা শহরের পৌরসীমার বাইরের সমগ্র এলাকার গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রিচার্ডস এ মর্মে কলকাতা উন্নয়ন ট্রাস্টের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেন যে, কোনও শহর প্ল্যানিং অ্যাক্টের আওতায় এটি গঠিত  হয় নি। বস্ত্তত ১৮৯০ সালের ইংরেজ শ্রমিক-শ্রেণীর গৃহায়ন অ্যাক্টের ওপর ভিত্তি করে ১৯১১ সালের কলকাতা উন্নয়ন অ্যাক্ট প্রণীত হয়। কাজেই রিচার্ডস তাঁর প্রতিবেদনে ১৯১১ সালের কলকাতা উন্নয়ন অ্যাক্টের সম্পূরক হিসেবে টাউন প্ল্যানিং অ্যাক্টের এমন একটি  খসড়া তৈরি করেন যা শহরতলি ও সন্নিহিত এলাকা এবং শহরের অভ্যন্তরে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পাদনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়ক হবে। এরপর তিনি ১৯১১ সালের অ্যাক্টের আওতায় সম্পন্ন করা সম্ভব এমন সব কার্যক্রমের পরিকল্পনা তৈরিতে উদ্যোগী হন। আর তাহলো মোটামুটি সার্কুলার রোড (বর্তমান আচার্য জে.সি বসু রোড ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড) দ্বারা পরিবেষ্টিত সে সময়কার খোদ ‘নগর কলকাতার’  উন্নয়ন-পরিকল্পনা।

রিচার্ডস তাঁর রিপোর্টের মুখবন্ধে বিশ্বের প্রধান নগরগুলোর সঙ্গে কলকাতার একটি তুলনামূলক আলোচনা তুলে ধরেন। এ তুলনামূলক পর্যালোচনায় তিনি দেখিয়েছেন যে, প্রতি বর্গমাইলে কলকাতার বড় সড়ক ও ছোট রাস্তার অনুপাত অস্বাভাবিকভাবে কম। আগেভাগে প্রধান সড়ক নির্মাণ না করেই শহরে ছোট ছোট রাস্তা তৈরি করা হয়েছে, আর এ রাস্তাগুলো থেকে অপরিকল্পিতভাবে তৈরি হয়েছে অলিগলি।

পরবর্তী চল্লিশ বছরে বা এর কাছকাছি সময়ে কয়েকজন প্রথিতযশা প্রধান প্রকৌশলীর যোগ্য নির্দেশনায় কলকাতা উন্নয়ন ট্রাস্ট সড়ক উন্নয়ন, এলাকার শ্রীবৃদ্ধি, বস্তি এলাকায় নতুন গৃহায়ন ও বস্তির পরিস্থাপন, পার্ক ও খেলার মাঠ নির্মাণসহ শতাধিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে এবং এরূপে পৌরসভা এলাকার উন্নয়নে জোরালো প্রচেষ্টা চালায়। ট্রাস্ট রিচার্ডসের সুপারিশমতে বড় ধরনের কোনো সংযোগ সড়ক তৈরি করতে না পারলেও, পার্ক স্ট্রিট সম্প্রসারণ, শ্যামবাজার স্ট্রিটের উন্নয়ন এবং ভূপেন বসু অ্যাভেনিউ ও প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড নির্মাণ করেছে। ট্রাস্টের সবচেয়ে কৃতিত্বপূর্ণ কাজ ছিল নর্থ-সাউথ প্রধান সড়ক ও সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ (বর্তমান চিত্তরঞ্জন অ্যাভেনিউ ও যতীন্দ্র মোহন অ্যাভেনিউ) নির্মাণ। ট্রাস্ট আরও নির্মাণ করে উত্তর কলকাতায় বিবেকানন্দ রোড ও বি.কে পাল অ্যাভেনিউ এবং দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতায় ড. সুন্দরী মোহন অ্যাভেনিউ। শহরে নতুন এলাকা পত্তনের ক্ষেত্রে ট্রাস্ট ঢাকুরিয়া লেকসহ (রবীন্দ্র সরোবর) সাদার্ন অ্যাভেনিউ এবং বেলিয়াঘাটা লেকসহ (সুভাষ সরোবর) পূর্ব কলকাতা গড়ে তুলে কলকাতার পরিকল্পনা ও উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করে। ভবানীপুরে এলাকা উন্নয়ন কর্মসূচিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ কর্মসূচির আওতায় একটি পুরনো আবাসিক শহরতলি এলাকা আধুনিক মানের পরিকল্পিত শহরে উন্নীত হয়।

আল্টাডাঙ্গা ও ঢাকুরিয়ায় নতুন পৌরকেন্দ্র স্থাপন কলকাতা উন্নয়ন ট্রাস্টের শেষের দিকের একটি কৃতিত্বপূর্ণ কাজ। এতে বোঝা যায় যে, ট্রাস্ট তখনও সক্রিয় এবং কাজ করছে। কিন্তু বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা ট্রাস্টের কর্মধারাকে সম্পূর্ণ অচল করে দেয় এবং এর আর্থিক সঙ্গতি নিঃশেষ হয়ে যায়। ট্রাস্টের টিকে থাকার উপযোগী পরিকল্পের কাজ অব্যাহত রাখার সামর্থ্যও সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। এটা বেশি করে স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে কিভাবে বিশ শতকের প্রথমার্ধ জুড়ে কলকাতা উন্নয়ন ট্রাস্ট কলকাতাকে সে যুগের শহর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সর্বাধিক সুফল প্রদান করেছে।  [দিলীপ ব্যানার্জী]