করতোয়া নদী


করতোয়া নদী (Karatoya River)  উত্তরবঙ্গের এক কালের সর্বপ্রধান ও পবিত্র  নদী। প্রাচীন নগরী পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী (বর্তমান মহাস্থানগড়, বগুড়া) এ নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। ভুটান সীমান্তের উত্তরে  হিমালয় পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে বিভিন্ন উপনদীর জলধারা বক্ষে ধারণ করে পশ্চিমবঙ্গের  দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এখানে বৃহত্তর রংপুর, বগুড়া ও পাবনা জেলার মধ্য দিয়ে রংপুরের প্রায় ১৯ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে কতিপয় জলধারার সংযোগে সৃষ্ট নতুন উৎসমুখ থেকে আনুমানিক ২৪২ কিমি দক্ষিণে  ইছামতী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। উত্তরতম প্রবাহে এর নাম তিস্তা, এ তিস্তার জলধারা তিনটি খাতে প্রবাহিত হতো  করতোয়া, আত্রাই ও পুনর্ভবা। গতিপথের বিভিন্ন অংশে করতোয়া এখনও পুরাতন তিস্তা নামে আখ্যায়িত হয়ে থাকে। বর্তমান করতোয়া কিছুটা পথ দিনাজপুর ও রংপুর জেলার সীমানা নির্ধারণ করে প্রবাহিত হয়েছে, অতঃপর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা অতিক্রম করে বগুড়া জেলায় পড়েছে। রংপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় নদীটি পূর্বদিক থেকে আসা দুটি উপনদী সর্বমঙ্গলা এবং যমুনেশ্বরীকে গ্রহণ করেছে।

করতোয়া ছিল একসময়  তিস্তা নদীর একটি শাখা। করতোয়ার মাধ্যমেই তিস্তার জলরাশি  গঙ্গা নদীতে প্রবাহিত হতো। ১৭৮৭ সালের ২৭ আগস্ট তিস্তায় এক প্রলয়ঙ্করী  বন্যা হয়। এ বন্যার ফলেই করতোয়ার সঙ্গে তিস্তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তিস্তার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর করতোয়া তার মূল স্রোতধারা হারিয়ে খর্বকায় হতে থাকে। ধীরে ধীরে করতোয়া পাঁচটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। উত্তরের অংশের নাম হয় দিনাজপুর-করতোয়া। প্রকৃতপক্ষে এটিই আত্রাইয়ের প্রধান উৎস। দিনাজপুর-করতোয়া পূর্বে খানসামা উপজেলার উত্তরে রংপুর-করতোয়ার সঙ্গে মিলিত হতো। কিন্তু বর্তমানে সে নদী দিয়ে অতি সামান্য পানি প্রবাহিত হয়ে থাকে। সৈয়দপুর জেলার কাছে রংপুর-করতোয়ার উৎপত্তি। এখান থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এঁকে বেঁকে গোবিন্দপুর উপজেলা পর্যন্ত গিয়েছে। সেখান থেকে মূল স্রোত কাটাখালির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে  বাঙ্গালী নদীতে পতিত হয়। শিবগঞ্জ উপজেলায় এ নদীর যে অংশ প্রবাহিত তা বছরের প্রায় অধিকাংশ সময় শুকনা থাকে। এটি রংপুর-করতোয়াকে বগুড়া-করতোয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করেছে। বগুড়া-করতোয়া বগুড়ার কাছ দিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে বাঙ্গালী নদীতে গিয়ে পড়েছে। বাঙ্গালী নদী ফুলঝুড়ি নদীতে পড়েছে। এ ফুলঝুড়ি নদী আবার  হুরাসাগর নদীতে গিয়ে পড়েছে। এ পঞ্চম অংশের নাম পাবনা-করতোয়া। পাবনা-করতোয়া বাঘাবাড়ীর নিকট হুরাসাগরে পতিত হয়েছে। উপরের পাঁচটি করতোয়া ছাড়াও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ছোট ছোট নদীর নাম করতোয়া নামে প্রচলিত আছে।

করতোয়া, আত্রাই, গুর, গুমানি, হুরাসাগর নদীপ্রণালীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৯৭ কিমি। করতোয়ার গড় বিস্তার ২০০মি এবং গড় গভীরতা ৭মি। নদীতে কোনো  জোয়ারভাটা হয় না।

[মাসুদ হাসান চৌধুরী]

মানচিত্রের জন্য দেখুন ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীপ্রণালী