কম্বোজ গৌড়পতি


কম্বোজ গৌড়পতি রাজবংশ পশ্চিম এবং উত্তর বাংলার কিছু অংশে পাল রাজা প্রথম মহীপালের (আনু. ৯৯৫-১৪০৩ খ্রি.) সিংহাসনারোহণের আগে কিংবা তাঁর রাজত্বের প্রথমদিকে দশ শতকের শেষভাগে কোনো এক সময়ে শাসন করেছিল। মহীপালের তাম্রশাসনগুলোতে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৃতিত্ব বলা হয়েছে যে তিনি তাঁর পিতৃরাজ্য (রাজ্যমপিত্র্যম্) তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে যাদের এর উপর কোনো অধিকার ছিল না। এই কৃতিত্বকে ধরে নেয়া হয় যে তিনি তাঁর রাজ্যের অংশ বিশেষ কম্বোজ গৌড়পতিদের দখল থেকে উদ্ধারে সাফল্য অর্জন করেছিলেন।

প্রথম মহীপালের দুইজন পূর্বপূরুষ, দ্বিতীয় গোপাল (আনু. ৯৫২-৯৬৯ খ্রি.) এবং দ্বিতীয় বিগ্রহপাল (আনু. ৯৬৯-৯৯৫ খ্রি.)-এর সময় পাল সাম্রাজ্য উত্তর ভারতের প্রতিহার সাম্রাজ্যের বিলুপ্তির পর উদীয়মান শক্তি চন্ডাল ও কলচুরিদের একাধিক আক্রমণের সম্মুখীন হয়। চন্ডাল ও কলচুরিদের সূত্রগুলিতে বাংলার বিভিন্ন অংশ পৃথকভাবে অঙ্গ, রাঢ়, গৌড় এবং বঙ্গাল হিসেবে উল্লেখ্য করা হয়েছে; এ থেকে সম্ভবত এ সময় বাংলার অভ্যন্তরেই বিভিন্ন স্বাধীন অঞ্চল ছিল বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইতোমধ্যে চন্দ্ররা পালদের পাশাপাশি দক্ষিণ পূর্ব বাংলার স্বাধীন স্বীকৃত শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। পাল রাজ্যসীমার মধ্যেই কম্বোজ গৌড়পতিরা উত্তর-পশ্চিম বাংলায় নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। প্রথম মহীপালের আগে কিছু সময়ের জন্য পাল রাজ্য অঙ্গ ও মগধেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল।

দিনাজপুর স্তম্ভলিপি (বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত) ও ইর্দা তাম্রশাসন, এই দু’টি লিপিতে কম্বোজ গৌড়পতিদের শাসনের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রথম লিপিটিতে কম্বোজ পরিবারের একজন গৌড়পতি (কম্বোজাণ্বয়জেন গৌড়পতিনা) দ্বারা একটি শিব মন্দির নির্মাণের উল্লেখ আছে। ইর্দা তাম্রশাসনটি ‘কম্বোজ বংশ তিলক’ রাজ্যপালের পরিবারের অন্তর্ভূক্ত নয়পাল নামে একজন রাজা কর্তৃক বর্ধমানভুক্তির অন্তর্গত দন্ডভুক্তিমন্ডলে ভূমি দান করার উদ্দেশ্যে জারি করা হয়েছিল। এই তাম্রশাসনটি আমাদেরকে কম্বোজ বংশের তিনজন রাজার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাঁরা হলেন, রাজ্যপাল এবং তার দুই পুত্র নারায়ণ পাল ও নয়পাল, যারা একের পর এক পশ্চিম বাংলোর দক্ষিণাংশে রাজা হয়েছিলেন।  তাঁদের রাজধানী প্রিয়ঙ্গু থেকেই ইর্দা তাম্রশাসনটি প্রকাশিত হয়েছিল যা এখনো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

পাল রাজবংশের রাজ্য পাল এবং ইর্দা তাম্রশাসনের রাজ্যপালের পরিচয় নিয়ে কিছুটা সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। অধিকন্তু তাদের দুইজনের রানীর নামও ছিল ভাগ্যদেবী। কিন্তু ইর্দা তাম্রশাসনের রাজ্যপালকে স্পষ্টভাবে ‘কম্বোজবংশ তিলক’ বলা হয়েছে এবং তার ছেলেদের নাম নারায়ণপাল ও নয়পাল, যারা ক্রমান্বয়ে শাসন করেছেন। অতএব এই রাজাদ্বয়কে তাদের তাম্রশাসনের লিপি সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সমসাময়িক ধরা যায়। এই দুইজন রাজাকে অভিন্ন বলে মনে করার তেমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং তাদের দুইজনকে পৃথক ব্যক্তি বলেই ধরা হয়, যাদের একজন পাল বংশের এবং অন্যজনের পারিবারিক নাম পাল হলেও তিনি ‘কম্বোজান্বয়জ’ ও ‘কম্বোজবংশতিলক’ বলে পরিচিত। অধিকন্তু প্রাপ্ত উৎসের আলোকে উভয়পাল বংশের বংশ লতিকাতে অনেক অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়।

তিরুমূলাই লিপির (১০২১-২৪ খ্রি.) তথ্যানুসারে প্রমাণিত যে, দন্ডভুক্তি অঞ্চলের (উড়িষ্যার সীমান্তবর্তী পশ্চিম বাংলার দক্ষিণাঞ্চল) শাসক ধর্মপাল তার নিজ রাজ্য থেকে রাজেন্দ্র চোলের বিজয়ী সেনাবাহিনী কর্তৃক বিতাড়িত হয়েছিলেন। মনে করা হয় যে, এই রাজা কম্বোজ গৌড়পতিদের পরিবারেরই। ইর্দা তাম্রশাসনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, দন্ডভুক্তির কম্বোজ শাসক নয়পালের অধীন। শ্রীচন্দ্রের পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনে বলা হয়েছে যে, সমতট দখল করার পর কম্বোজদের বিস্ময়কর সংবাদ দেবপর্বতে অগন্তুকদের বিস্ময়রসের উদ্রেক করেছিল। (য়ত্রাগন্তুজনস্য বিস্ময়রসঃ কম্বোজবার্তাদ্ভূতৈঃ) চন্দ্রদের তাম্রশাসনের এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে পাল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরেই কম্বোজদের উত্থানকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং এটি নিশ্চয়ই সমতটে একটি বিস্ময়কর সংবাদ।

কারা এই কম্বোজ যারা খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গৌড়পতি হয়েছিল? এই প্রশ্নটির ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেয়া কষ্টকর। কতিপয় পন্ডিতের মতে কম্বোজদেশ তিববতে। অন্যদের মতো কম্বোজরা হিন্দুকুশ পর্বতমালার একটি সুপরিচিত আদিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত। তিববতী উপাখ্যান পাগ-সাম জোন্-যাঙ্গ অনুসারে বাংলা ও বার্মার মধ্যবর্তী লুসাই পাহাড়ে কম্বোজ দেশ অবস্থিত এবং এ অনুমান তেমন অসংগত হবে না যে কম্বোজরা এই এলাকা থেকেই বাংলায় এসেছিল। এরূপও অনুমান করা হয় যে, কম্বোজরা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকে প্রতিহার ও চন্ডেলদের আক্রমণের সাথে বাংলায় এসেছিল। আর এমন চিন্তা করাও অসঙ্গতিপূর্ণ হবে না যে কম্বোজ অভিযাত্রীরা পাল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ধীরে ধীরে ক্ষমতা দখল করে নেয়। আরেকটি সম্ভাবনা হতে পারে যে, কম্বোজরা পাল সাম্রাজ্যের কর্মচারী ছিল এবং পাল রাজত্বের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে। যা হোক এটি বলতে হয় যে, তাদের আদি পরিচয় এবং বাংলায় উত্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে দশ শতকের শেষদিকে এবং এগারো শতকের শুরুতে তারা তিনপুরুষ ধরে বাংলার কিছু অংশে শাসন করেছিল। [আবদুল মমিন চৌধুরী]