কবীর, রোকেয়া রহমান


রোকেয়া রহমান কবীর

কবীর, রোকেয়া রহমান (১৯২৫-২০০০)  শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক এবং নারীমুক্তি আন্দোলনের একজন জোরালো সমর্থক। ১৯২৫ সালের ৪ অক্টোবর রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মুজিবুর রহমান ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের একজন সদস্য ছিলেন। মায়ের নাম জোহরা খাতুন। রোকেয়ার শিক্ষা জীবন শুরু হয় শিয়ালদহের লরেটো কনভেন্ট স্কুলে। তিনি লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজ এ ভূগোল বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।

সে সময়ে বামপন্থী রাজনীতি চর্চার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজ সুপরিচিত ছিল। সেখানকার স্বল্প সংখ্যক সক্রিয় নারী কর্মীর একজন ছিলেন রোকেয়া রহমান। ইংরেজদের ভারত থেকে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্ততি গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছিল এবং হিন্দু ও মুসলমানের বিরোধ ভীষণ আকার ধারণ করছিল, তখন রোকেয়া রহমান ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন।

রোকেয়া রহমান ১৯৪৭ সালের পর পরই কলকাতা হতে পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) চলে আসেন। প্রথমে চট্টগ্রাম এবং পরে ঢাকায় স্কুল শিক্ষক হিসেবে তিনি কাজ করেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় হতে দ্বিতীয়বার ইতিহাসে এম.এ ডিগ্রি অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৫৭ সালে ইংল্যান্ড যান। ফিরে এসে তিনি ঢাকার ইডেন কলেজে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে ইতিহাস বিভাগে যোগ দেন। ইতিহাস বিষয়ে গভীর অনুরাগের পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের প্রতিও তাঁর প্রবল আকর্ষণ ছিল। তিনি ময়নামতী প্রত্নস্থলের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। এ প্রামাণ্যচিত্রটি পুরস্কার লাভ করেছিল।

সরকারি চাকুরিজীবী হলেও রোকেয়া রহমান ছিলেন নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য। ১৯৬৮ সালে তিনি চট্টগ্রাম মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। কিন্তু উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান। ১৯৭৬ সালে দেশে ফিরে তিনি আর শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন নি। তিনি ফরিদপুর জেলার ভূমিহীন মহিলাদেরকে স্বনির্ভর করার জন্য একটি সংস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর সংস্থার নামকরণ করেন ‘সপ্তগ্রাম নারী স্বনির্ভর পরিষদ’। ১৯৮০-র দশকের মধ্যেই কয়েকশত গ্রাম এবং কয়েক হাজার মহিলা এ সংস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়।

রোকেয়া রহমান কবীর ছিলেন প্রকৃতই একজন ব্যতিক্রমী মহিলা। দ্বিমুখী লড়াই-এ তিনি নিজের সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করেছিলেন। প্রথমত অনেকের পাশাপাশি তিনিও সব ধরনের সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। দ্বিতীয়টি ছিল একান্তই তাঁর নিজস্ব লড়াই, যা তিনি ধর্ম ও সংস্কৃতির নামে নারীর ওপর আরোপিত ‘নির্মম বিধিনিষেধ’ এবং গোড়ামির বিরুদ্ধে পরিচালনা করেন। ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে দুটি সংগ্রামকে অভিন্ন রূপ দান করে সামাজিক অবিচার ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণই রোকেয়া রহমানকে অনন্য এবং আপোষহীন করে তুলেছে। ২০০০ সালের ২৮ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়।  [আকসাদুল আলম]