কপিরাইট


কপিরাইট  সম্পদ দু’ধরনের, বস্ত্তগত সম্পদ এবং মেধাসম্পদ। কপিরাইট আইন আছে মেধা সম্পদের জন্য। মেধা সম্পদের আওতায় আছে- গবেষণাকর্ম, সাহিত্যকর্ম, নাট্যকর্ম, শিল্পকর্ম, সঙ্গীতকর্ম, অডিও-ভিডিওকর্ম, চলচ্চিত্রকর্ম, ফটোগ্রাফি, ভাস্কর্যকর্ম, সম্প্রচারকর্ম, রেকর্ডকর্ম, সফট্ওয়্যার, ই-মেইল, ওয়েব-সাইট, বেতার ও টেলিভিশন সম্প্রচারকর্ম ইত্যাদি। World Intellectual Property Organization (WIPO) এর মতে, ‘Intellectual Property refers to creations of mind: Inventions, literary and artistic works, and symbols, names, images, and designs used in commerce’।

মানুষের বস্ত্তগত সম্পদ যেমন মালিক ছাড়া অন্য কেউ অনুমতি বা মূল্য পরিশোধ ব্যতীত ভোগ বা ব্যবহার করতে পারে না, মেধাসম্পদের ক্ষেত্রেও সে বিধান একইভাবে প্রযোজ্য। প্রতিটি মেধাকর্ম কপিরাইট আইনে গ্রন্থস্বত্ব বা লেখস্বত্ব দ্বারা রক্ষিত।

কপিরাইট সংক্রান্ত কর্মকান্ডে সব সময় একাধিক পক্ষ সংশ্লিষ্ট। সাহিত্যের ক্ষেত্রে লেখক, প্রকাশক ও পাঠক, সঙ্গীতের ক্ষেত্রে গীতিকার, সুরকার, গায়ক, যন্ত্রী ও সংগীত কর্মের প্রকাশক বা উৎপাদক, চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে কাহিনীকার, প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রী, গায়ক, সহশিল্পীসহ সংশ্লিষ্টরা সম্পৃক্ত হয়ে থাকেন। সমগ্র পৃথিবীতে জীবিত রচয়িতা এবং তার মৃত্যুর পর সেই রচয়িতার বৈধ উত্তরাধিকারীগণ পঞ্চাশ থেকে সত্তর বছর সৃষ্টিকর্মের রয়্যালটি পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশি আইনে একজন রচয়িতার মৃত্যুর পর ষাট বছর পর্যন্ত এই অধিকার বলবৎ থাকে। বাংলাদেশে কপিরাইট আইন, ২০০০ (২০০৫ সংশোধিত) বলবৎ থাকার পরও অনেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের আইনানুগ অধিকার থেকে। এ ক্ষেত্রে স্রষ্টা, উৎপাদক ও ভোক্তা সকল পক্ষেরই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে সৃষ্টিশীল কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিগণ তাঁদের কর্মসমূহ সংরক্ষণ বা আইনানুগ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার বিষয়ে উদাসীন। ঢাকার কপিরাইট অফিসের কার্যক্রম ষাটের দশকে শুরু হলেও ৩১ ডিসেম্বর ২০০৯ পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশনকৃত কর্মের সংখ্যা ৯৯৬১ (রেকর্ডকর্ম ৪৮৬, শিল্পকর্ম ৬১৫৪ এবং সাহিত্যকর্ম ৩৩২১)। পৃথিবীর অনেক দেশের কপিরাইট আইনের মতো আমাদের আইনেও (কপিরাইট আইন, ২০০০ এর ৪১ নং ধারায়) কপিরাইট সমিতি (Copyright Society) গঠন ও নিবন্ধন করার বিধান রয়েছে। অথচ  বাংলাদেশে কপিরাইট অফিস স্থাপনের বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি হলেও এখন পর্যন্ত সাহিত্য, সঙ্গীত বা অন্য কোন সৃষ্টিশীল কর্মের স্বত্ত্বাধিকারীদের স্বার্থরক্ষাকারি কোন সমিতির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। সমগ্র পৃথিবীতে এ জাতীয় সমিতি বা Society মেধাবী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের কর্মস্পৃহাকে বেগবান করে চলেছে।

মেধাসম্পদের ক্ষেত্রে মূল হুমকি হলো পাইরেসি (Piracy), যার মানে মেধাস্বত্ব চুরি। এখন দেশিবিদেশি গ্রন্থ, চলচ্চিত্র, সংগীত ও কম্পিউটার সফটওয়্যার ইত্যাদি ব্যাপকভাবে পাইরেসি হয়। বাংলাদেশে একটি সিনেমা তৈরি করতে বর্তমানে প্রয়োজন হয় ন্যূনতম এক থেকে দেড় কোটি টাকা। অথচ ছবি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, কোন কোন ক্ষেত্রে ছবি মুক্তি পাওয়ার আগেই তা পাইরেসি হয়ে বাজারে চলে আসতে পারে। ফলে লগ্নিকারী পুঁজি ঝুকিপূর্ণ হয়ে উঠে।

কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক নয়। আন্তর্জাতিক আইনেও কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ এড়ানোর জন্য কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন জরুরি। বাংলাদেশে কপিরাইট আইন মোতাবেক কপিরাইট সংক্রান্ত ফটোগ্রাফ, রেকডিং এবং চলচ্চিত্র ফিল্ম ব্যতীত কর্মের মেয়াদ কপিরাইট প্রণেতার মৃত্যুর পর ৬০ বছর থাকে। বাংলাদেশের কপিরাইট সংক্রান্ত বিষয়াদি কপিরাইট আইন-২০০০ (২০০৫ সালে সংশোধিত) দ্বারা পরিচালিত। বাংলাদেশ WIPO-এর সদস্য দেশ হিসেবে বার্ন কনভেনশন, ইউনির্ভাসেল কপিরাইট কনভেনশন (UCC) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) সদস্য হওয়ার কারণে এতদসংক্রান্ত TRIPS (Trade Related Aspects of Intellectual Property Rights) চুক্তিসহ কপিরাইট সংক্রান্ত সকল শর্ত মেনে চলতে বাধ্য। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কপিরাইটের গুরুত্ব অনুধাবন করে আন্তর্জাতিক কপিরাইট আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের কপিরাইট আইন- ২০০০ প্রণয়ন করা হয় এবং এ আইনটি যুগোপোযোগীকরণের লক্ষ্যে ২০০৫ সালে সংশোধন করা হয়। আইনের যথাযথ প্রয়োগসহ কপিরাইট ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে কপিরাইট আইনের ১০৩ ধারার বিধানমতে কপিরাইট রুলস-২০০৬ (এস. আর. ও নং ২১৯-আইন/২০০৬) প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশে প্রচলিত কপিরাইট আইনটিও বৃটিশ ও পাকিস্তানি আইনের রূপান্তরিত রূপ। ১৭০৯ সালে ইংল্যান্ডে কপিরাইট আইন প্রথম প্রণীত হয়। ১৯১৪ সালের এক সংশোধনীর মাধ্যমে এ উপমহাদেশকে কপিরাইট আইনের আওতাভূক্ত করা হয়। দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান সরকার ১৯১৪ সালের কপিরাইট আইন বাতিল করে ১৯৬২ সালে ‘কপিরাইট অধ্যাদেশ’ নামে একটি অধ্যাদেশ জারি করে করাচিতে কেন্দ্রীয় কপিরাইট অফিস প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীকালে ঢাকায় একটি আঞ্চলিক কপিরাইট অফিস স্থাপন করা হয়। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৪ সালে জাতীয় সংসদে অনুমোদিত আইনের মাধ্যমে ১৯৬২ সালের অধ্যাদেশের কিছু ধারা সংশোধন করে আঞ্চলিক অফিসকে জাতীয় পর্যায়ের দপ্তরের মর্যাদা প্রদান করে। সে সময় এ অফিসটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাথে কপিরাইট অফিসকে সংযুক্ত করা হয়। বর্তমানে কপিরাইট অফিস জাতীয় পর্যায়ের একটি আধা-বিচার বিভাগীয় (Quasi-judicial) প্রতিষ্ঠান। উল্লেখ্য, ২০০০ সালে কপিরাইট আইন জারীর পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি আমলের (১৯৬২ সালের) সংশোধিত অধ্যাদেশ ও ১৯৬৭ সালের কপিরাইট রুলস-এর আওতায় কাজ করেছে কপিরাইট অফিস, ঢাকা।

কপিরাইট আইন যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে গঠিত হয়েছে টাস্কফোর্স। ইতোঃমধ্যে টাস্কফোর্স রাজধানী ঢাকায় কয়েকটি বাজার থেকে পাইরেটেড পণ্য উদ্ধার করেছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে কপিরাইট বিষয়ক অপরাধসমূহের বিচার নিষ্পন্ন করার লক্ষ্যে কপিরাইট আইনটিকে মোবাইল কোর্ট অধ্যাদেশ, ২০০৯-এর তফসিলভূক্ত করার জন্য মন্ত্রণালয় পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সরকারের পক্ষ থেকে কপিরাইট আইন বাস্তবায়ন ও পাইরেসি বন্ধের চাপ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে কপিরাইট-এর অবস্থা নাজুক। কপিরাইট আইনে বুদ্ধিবৃত্তিক তাস্কর্য রোধে কার্যকর আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ সীমিত রয়েছে।  [মনজুরুর রহমান]

গ্রন্থপঞ্জি The History of The Copyright System: From Analogue To Digital To Commons, Document prepared by the International Bureau of WIPO, dated October 29, 2009; Copinger And Skone James, On Copyright, Sweet and maxwell, London, 1980; তমোতসু হোজুমি, এশিয়ান কপিরাইট হ্যান্ডবুক, এশিয়া/প্যাসিফিক কালচারাল সেন্টার ফর ইউনেস্কো ও কপিরাইট অফিস, ঢাকা, বাংলাদেশ, প্রথম বাংলা সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ২০০৮।