ওল্ডহাম, টমাস


টমাস ওল্ডহাম

ওল্ডহাম, টমাস (১৮১৬-১৮৭৮)  ভূতত্ত্ববিদ, মানচিত্রকর ও প্রশাসক। আইরিশ বিজ্ঞানী টমাস ওল্ডহাম ছিলেন ভারতীয় ভূতত্ত্ব জরিপ অধিদপ্তরের প্রথম সুপারিনটেনন্ডেন্ট। তিনি ১৮১৬ সালে আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ডাবলিন ট্রিনিটি কলেজে এবং স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও ভূতত্ত্ব বিষয়ে পড়ালেখা করেন। এ সময় তিনি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের যশস্বী প্রফেসর রবার্ট জেমিসনের (চার্লস ডারউইনের শিক্ষক) প্রকৃতি বিজ্ঞানের ইতিহাসের উপর নেওয়া ক্লাসসমূহে উপস্থিত থাকতেন এবং ভূতত্ত্ব ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের উপর জ্ঞান অর্জন করেন। ১৮৩৮ সালে তিনি আয়ারল্যান্ডের অর্ডিন্যান্স সার্ভে-এর প্রধান যোসেফ ইলিসনের প্রধান সহকারী হিসেবে যোগ দেন। ১৮৪০ সালে ওল্ডহাম তাপ বিকরণকারী পাখা আবিষ্কার করে ইংরেজ জীবাশ্মবিদ এডয়ার্ড ফরবস-এর কাছে নিয়ে যান। ফরবস আনন্দিত হয়ে আবিষ্কৃত বসুতটির নাম রাখেন ওল্ডহামা।

১৮৫১ সালে স্যার টমাস ওল্ডহাম ভারতের ভূতত্ত্ব জরিপ অধিদপ্তরে প্রথম সুপারিনটেন্ডেন্ট হিসেবে যোগদান করেন। ১৮৫২ সালে ওল্ডহাম ভারতে ভূতত্ত্ব জরিপ অধিদপ্তরের কাজের পরিধি বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করেন। তাঁর নেতৃত্বে এক ঝাঁক বিজ্ঞানী ভারতের ভূতাত্ত্বিক সম্পদ সমূহের উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার সম্পন্ন করেন। ভারতীয় ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রধান হিসেবে দীর্ঘ পঁচিশ বছর চাকুরিকালে ওল্ডহাম সংস্থাটিকে দৃঢ ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে কলকাতায় সংস্থাটির সদর দপ্তর স্থাপন, একটি যাদুঘর এবং লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা। একজন ঔপনিবেশিক প্রশাসক ও পেশাদার বিজ্ঞানী হিসেবে ওল্ডহাম অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে ভারতীয় কয়লা সম্পদের যথার্থ পরিমাপ সমাপ্ত করেন। ১৮৫৮-৫৯ সালে ওল্ডহামের নেতৃত্বে ভারতীয় ভূতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ থেকে মেমওয়ারস প্রকাশনা শুরু হয়। ১৮৬৩ সালের একটি মেমওয়ারসে রাণীগঞ্জ কয়লাখনির প্রথম ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র (১ ইঞ্চি = ১ মাইল) প্রকাশিত হয়। ওল্ডহামের সময়কালে আসামের কয়লা ও তৈল সম্পদের উপর একটি জরিপ কাজ সম্পন্ন করেন বিজ্ঞানী মেলেট। ওল্ডহাম অনুসন্ধান করে দেখেন যে, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে ভারতীয়দের মধ্যে ভূতত্ত্ব জ্ঞানের যথেষ্ঠ অভাব রয়েছে। এই অবস্থা দূরীকরণের লক্ষ্যে তিনি রাম সিং, কিসেন সিং ও হিরালাল নামে তিনজন ভারতীয় নবীন ভূতাত্ত্বিকদের তাঁর দপ্তরে নিয়োগ প্রদান করেন। তিনি তাঁদেরকে প্রেসিডেন্সী কলেজে ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানের উপর বক্তৃতামালায় উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেন। ওল্ডহামের এই উদ্যোগ অনেকটাই সফল হয়েছিল এবং তাঁর অবসর পর্যন্ত কিসেন সিং ও হিরালাল উপসহকারী ভূতত্ত্ববিদ হিসেবে কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

এসব বিজ্ঞানীদের অবদান ও দূরদৃষ্টির কারণে ভারতবর্ষে ভূতত্ত্ব গবেষণা ও জরিপ একটি সূদৃঢ় কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে যায়। ওল্ডহাম নিজেই ছিলেন তাঁর সময়ের একজন সেরা ভূতত্ত্ববিদ। ভারতের ভূতত্ত্ব দপ্তরে যোগ দেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন ডাবলিন ভূতত্ত্ব সমিতির কিউরেটর। আইরিশ ভূতত্ত্ববিদদের মধ্যে তিনিই প্রথম ভারতে আগমন করেন এবং এরপর তাঁর সহদর চার্লস, কুইন্স কলেজের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রফেসরের পুত্র উইলয়াম কিং, ভেলেনটাইন বলসহ ১২ জন আইরিশ ভূতত্ত্ববিদ ভারতে আসেন। ওল্ডহাম ও তাঁর সহযোগীদের কর্মতৎপরতার ফলে ভারতে ভূতত্ত্ব বিদ্যায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয় এবং ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক কাঠামোর উপর গবেষণা অব্যহত থাকে।

১৮৫০ সালে ওল্ডহাম লিভারপুলের লুইসা মাটিলডা ডিক্সনকে বিবাহ করেন। তাঁর প্রথম পুত্র রিচার্ড ডিক্সন ওল্ডহাম ১৮৯৭ সালে আসামে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পের উপর গবেষণা করে দেখান যে, ভূমিকম্পের ফলে তিন ধরনের পৃথক চাপ সৃষ্টি হয়। এসব নতুন তথ্য ও ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে রিচার্ড এই অভিমত পোষণ করেন যে, পৃথিবীর মূল অংশ তরল জাতীয় পদার্থ দ্বারা তৈরি।

১৮৭৬ সালে ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে ওল্ডহাম ভারতীয় ভূতত্ত্ব জরিপ দপ্তরের প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি ইংল্যান্ডে গিয়ে রাগবি শহরে বসবাস করেন এবং ১৮৭৮ সালে ১৭ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।  [আশফাক হোসেন]