ওয়াকিয়ানবিশ


ওয়াকিয়ানবিশ সংবাদ লেখক। ভারতবর্ষের মুসলিম শাসকবর্গ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে সংঘটিত ঘটনার খবর সংগ্রহের জন্য এক পদ্ধতির প্রয়োগ করেন যাকে সহজ কথায় গুপ্তচর প্রথা বলা যায়। মুগল আমলে আকবরই প্রথম সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রদেশের বিভিন্ন প্রশাসনিক অংশে কেন্দ্রের অনুরূপ ওয়াকিয়ানবিশ নিয়োগের প্রচলন করেন। এই সময়ে বিভিন্ন প্রদেশে প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত ওয়াকিয়ানবিশদের নিযুক্ত করা হতো। এ প্রথা মুগল আমলের শেষাবধি চালু ছিল, যদিও সময়ের ব্যবধানে এ বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের দক্ষতার তারতম্য ঘটতো।

মুগল প্রশাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় প্রশাসনের আদলেই প্রাদেশিক শাসন কাঠামো নির্ধারণ করা হত। সুবাদার ছাড়াও প্রত্যেক প্রদেশের নির্দিষ্ট বিভাগের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মকর্তা নিযুক্ত হতেন। যেমন, দীউয়ান, মীর-আদল, সদর প্রমুখ। তাঁদের মধ্যে ওয়াকিয়ানবিশ  সরকারের সংবাদ লেখক অথবা রাজকীয় দফতরের লেখক হিসেবে কাজ করতেন। মুগল প্রশাসন পূর্ববর্তী সুলতানি প্রশাসনের গোপনীয় বিভাগের কর্মকর্তা বা তাঁদের গোপন তথ্য সংগ্রহকারীদের দপ্তর কাঠামো পুনর্গঠন করে এবং দাপ্তরিক রেকর্ড সংরক্ষণের জন্য পৃথক শাখা গঠন করে। ফলে মুগল প্রশাসনিক কাঠামোতে চার জন দায়িত্বশীল ব্যক্তি দ্বারা দফতর সৃষ্টি করা হয় যাঁরা লিখিত এবং মৌখিক এ দুই ধরণের সংবাদ পরিবেশন করার জন্য তৈরি থাকতেন।  এ সময়ে তিন প্রকারের লিখিত এবং এক ধরনের মৌখিক সংবাদদাতা ছিলেন। লিখিতভাবে সংবাদ পরিবেশনের জন্য নিয়োজিত ছিলেন: (ক) ওয়াকিয়ানবিশ বা ওয়কিনিগার, একাধারে ঘটনার লেখক বা ঘটনার পর্যবেক্ষন; (খ) সাওয়ানিহ্ নবিশ বা সাওয়ানিহ্ নিগার, ঘটনার বিররনীর ধারক; (গ) খুফিয়া নবিশ বা গোপন লেখক।

মৌখিকভাবে সংবাদ পরিবেশককে বলা হত হরকরা। রীতিমাফিক হরকরা একজন সংবাদ বাহক মাত্র, কিন্তু কার্যত তিনি ছিলেন একজন গুপ্তচর এবং তিনি মৌখিক ভাবেই সংবাদ বহন করতেন। আবুল ফজলের বর্ণনানুসারে, সম্রাট আকবর চৌদ্দজন ওয়াকিয়ানবিশ নিয়োগ করেছিলেন। এরা ছিলেন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং নিরপেক্ষ কর্মকর্তা। তাঁদের কাজ ছিল রাজকীয় প্রধানদের আদেশ এবং কার্যক্রম লিপিবদ্ধ করা। নির্দিষ্ট রাজকর্মচারী কর্তৃক সংশোধিত  দিনলিপি ওয়াকিয়ানবিশ অনুমোদনের জন্য সম্রাটের নিকট পেশ করতেন। সম্রাট কর্তৃক চূড়ান্ত ভাবে অনুমোদিত রিপোর্টকে বলা হত ‘ইয়াদ্দাস্ত’ বা মেমোরেন্ডাম। রাজকীয় সংবাদ চার পর্বে পেশ করার রীতি ছিল; ডায়েরি লিখন, রাজকীয় অনুমোদন, প্রত্যায়িত মেমোরেন্ডাম এবং বিবরণী সংক্ষেপকরণ। ওয়াকিয়ানবিশ  অধিকাংশ ছোট পরগণা থেকে তাঁর স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে সংবাদ সংগ্রহ করতেন। তাছাড়াও প্রদেশের অন্যান্য কর্মকর্তা প্রতিদিন অপরাহ্নে দিনের সংঘটিত ঘটনার বিবরণ ওয়াকিয়ানবিশের কাছে পেশ করতেন। সুবাদারের সভাকক্ষে উপস্থিত থেকে ওয়াকিয়ানবিশ ঘটনার বিবরনী লিপিবদ্ধ করতেন। সম্রাটের নিকট পাঠানোর আগে বিবরণীর বিষয়বস্ত্ত নিয়ে তিনি সুবাদারের সঙ্গে আলোচনা করে নিতেন। ওয়াকিয়ানবিশ যেকোন একটি নির্দিষ্ট স্থানের বিবরণী বা সরকারি ইশতেহার প্রতি সপ্তাহান্তে সম্রাটের কাছে পাঠাতেন।

ওয়াকিয়ানবিশ তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীন ছিলেন। সরকারি কোনো বিবরণ সুবাদারের কাছে প্রকাশ করার ব্যাপারে তাঁর উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল এবং তিনি কেবলমাত্র সম্রাট ছাড়া রাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তার উপর নির্ভরশীলও ছিলেন না। ব্যক্তিগত সব ধরনের যোগাযোগ রক্ষা বন্ধ করার বিষয়ে তাঁর উপর নির্দেশ ছিল এবং সে কারণেই এই পদটি ছিল নাজুক ও দুঃসাধ্য। ওয়াকিয়ানবিশকে শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় কাজেই নয় সামরিক কাজেও সম্পৃক্ত করা হত। তিনি সাধারণত সব ধরণের সামরিক অভিযান এবং বিদেশে পাঠানো দূতের সফর সঙ্গী হতেন। তিনি যুদ্ধরত সেনা দলের সংবাদ সংগ্রহ করে তা সম্রাটের কাছে পাঠানোর আগে সেনাপ্রধানের কাছে পাঠাতেন। মূলত একজন ওয়াকিয়ানবিশ প্রদেশ সমূহের যাবতীয় ঘটনাবলি সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারকে অবিহিত করার দায়িত্ব পালন করতেন।  [নাসরীন আক্তার]

গ্রন্থপঞ্জি  IH Qureshi, The Administration of the Mughal Empire, University of Karachi, 1966; Abu-l-fadl, Ain-i-Akbari, (ed.) Blochmann and Jarret, Bib. Ind., Calcutta, 1894; Jadunath Sarkar, Mughal Administration, Calcutta, 1954।