একমালিকানা কারবার


একমালিকানা কারবার  একজন ব্যক্তির মালিকানাধীনে তার দ্বারাই পরিচালিত ব্যবসায়িক সংগঠন। এটি একটি সনাতন কারবার ব্যবস্থা। প্রাচীনকালে মিশর, ইতালি এবং গ্রিসে একমালিকানা করবারের ব্যাপক প্রচলন ছিল। বর্তমানেও বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে এ ধরনের কারবার সংগঠনের উপস্থিতি ব্যাপক।

একমালিকানা কারবার-এর সকল দায়দায়িত্ব ও ঝুঁকি এর মালিক বহন করে। তবে এ ধরনের কারবার ব্যবস্থার বেশকিছু সুবিধাও রয়েছে। এ কারবার সংগঠন স্বল্প মূলধন ও সহজ প্রক্রিয়ায় আরম্ভ করা যায়, মালিক নিজস্ব কায়দা ও অভিজ্ঞতা দ্বারা এর সামগ্রিক কার্যাবলি পরিচালনার মাধ্যমে দায়-দায়িত্ব ও ঝুঁকি সহনীয় এবং নিম্ন পর্যায়ে রাখতে পারে। এ ধরনের কারবার গঠন ও পরিচালনায় আইনের বাধ্যবাধকতা সীমিত অথবা নেই বললেও চলে। একমালিকানা কারবারে মালিক নিজেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং নিজ তহবিল থেকেই পুঁজির সংস্থান করতে পারে। আয়কর ব্যতীত একক মালিকানাধীন কারবারের মালিককে কোনো ব্যবসায়িক কর প্রদান করতে হয় না। একমালিকানাধীন কারবার সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট আইনগত নির্দেশনা নেই। ফলে এ ধরনের কারবার সরকার বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে নানা ধরনের ফি পরিশোধের দায় থেকে মুক্ত। এ সকল কারণেই একমালিকানা কারবার বিশ্বব্যাপী সমধিক প্রচলিত এবং জনপ্রিয়।

একমালিকানাধীন কারবার সংগঠনের বেশকিছু অসুবিধাও রয়েছে। এরূপ কারবার ব্যবস্থায় সর্বপ্রকার ঝুঁকির ভার একজন মালিককেই বহন করতে হয়। তিনি তার মালিকানা ব্যবসায়ের সকল দায়দেনার জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকেন। এরূপ ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দায় এবং মালিকের দায়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করা চলে না। কারবার দেউলিয়া হলে মালিক নিজেই দেউলিয়া হিসেবে চিহ্নিত হন এবং দায়দেনা পরিশোধের জন্য তার সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তিও ব্যবহূত হয়। একমালিকানা কারবার মালিকের পরিচয়ের মাধ্যমে পরিচিত। একমালিকানা প্রতিষ্ঠানের মালিকের ব্যবসা পরিবর্তন কিংবা ব্যবসার স্থান পরিবর্তনের ওপর কোনো আইনগত বাধানিষেধ নেই। তিনি ইচ্ছে করলে আইনগত বিষয়াবলি অনুসরণপূর্বক একমালিকানা কারবারকে কর্পোরেশনে রূপান্তর করার জন্য নিজেই চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেন এবং নিজ নামে সম্পদ ধারণ ও সংরক্ষণ করতে পারেন।

বাংলাদেশের একমালিকানা কারবারসমূহ নিজস্ব তহবিল থেকে কিংবা বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, স্থানীয় দাদনকারী, সমবায় সমিতি, এনজিও, গ্রামীণ ব্যাংক এবং অন্যান্য  ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী এজেন্সি থেকে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে মূলধন সংস্থাপন করে এবং এর পরিচালন ব্যয়সমূহ নির্বাহ করে।

বাংলাদেশের কারবার ব্যবস্থার প্রায় ৮৫% একমালিকানা কারবার। সর্ববৃহৎ একমালিকানা ব্যবসার উদাহরণ হচ্ছে ভূ-সম্পত্তির ব্যবসা, তবে একমালিকানা কারবারের অধিকাংশই ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং এদের মধ্যে মুদি ও মনোহারী দ্রব্য, বস্ত্র, ঔষধ, হস্তশিল্পজাত দ্রব্যাদি, বই-পুস্তক, কনফেকশনারি, টায়ার, টিউব, পানের দোকান, মিষ্টির দোকান, হার্ডওয়ার দ্রব্যাদি ইত্যাদির ব্যবসা উল্লেখযোগ্য। বৃহদাকার একমালিকানা কারবারসমূহের মধ্যে আছে পাইকারি স্টোর, হোটেল, রেস্তোরাঁ, গেস্ট হাউজ, টেইলারিং দোকান, গার্মেন্টস কারখানা, হেয়ার ড্রেসিং, পরিবহণ যান ইত্যাদি। বাংলাদেশের এককমালিকানা ব্যবসাসমূহকে মূলধনের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহদায়তন এ তিনভাগে বিভক্ত করা হয়। যে সকল একমালিকানাধীন কারবার সংগঠনের পুঁজির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা সেগুলিকে ক্ষুদ্র একমালিকানা কারবার, মূলধনের পরিমাণ ৫,০০০ টাকা থেকে ১০,০০০ টাকা হলে মাঝারি এবং তদপেক্ষা বেশি হলে সেগুলিকে বৃহদাকার একমালিকানা করবার সংগঠন হিসেবে অভিহিত করা হয়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে রাজধানী পর্যন্ত সর্বত্র প্রচুর একমালিকানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।  [আবুল কালাম আজাদ]