এঁটেল


এঁটেল (Tick)  বিভিন্ন মেরুদন্ডী প্রাণীর একদল বহিঃপরজীবী। এসব পরজীবী Arachnida শ্রেণির Acarina বর্গের অন্তর্ভুক্ত। মাছ ছাড়া সব ধরনের মেরুদন্ডী প্রাণীকে এরা আক্রমণ করে। উষ্ণমন্ডলীয় দেশেই এদের প্রাধান্য, স্তন্যপায়ীদের দেহে বেশি দেখা যায়, তবে পাখি আর  সরীসৃপ এবং দৈবাৎ উভচরের দেহেও এদের চোখে পড়ে। জানা প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৩০০। Ixodidae ও Argasidae গোত্রের সদস্যরা যথাক্রমে শক্ত এঁটেল (hard ticks) ও নরম এঁটেল (soft ticks) নামে পরিচিত। শরীর খন্ডে বিভক্ত নয়, একীভূত বক্ষদেশ ও উদর নিয়ে গোটা শরীর একটি থলের মতো দেখায়। এদের পৃথক কোনো মাথা নেই, প্রায়শ মুখাংশের একটি কাঠামো বা ক্যাপিচুলাম (capitulum) দেখা যায়। Arachnida শ্রেণির অন্যান্য অধিকাংশ সদস্যের মতো পূর্ণদেহী ও অপূর্ণদেহী এঁটেলের থাকে ৪ জোড়া পা, লার্ভাগুলি ষড়পদী। Ixodidae গোত্রের শক্ত এঁটেলের পুরুষদের পিঠের বেশিরভাগ বা পুরোটাই শক্ত আবরণী বা স্কুটামে (scutum) ঢাকা। অপরিণত ও স্ত্রী এঁটেলের স্কুটাম পিঠের সামনের দিকে মুখোপাঙ্গের পেছনে সীমিত থাকে। নরম এঁটেলে স্কুটাম বা ফেস্টুন (festoon) নেই; যৌনদ্বিরূপতা সুচিহ্নিত নয়। অধিকাংশ এঁটেল ছোট আকারের (২-৯ মিমি), কোনো কোনো স্ত্রী এঁটেল ভরাপেটে ১৪ মিমি পর্যন্ত চওড়া হতে পারে।

এঁটেল বিভিন্ন প্রাণী ও মানুষের অন্যতম প্রধান বহিঃপরজীবী ও রোগবাহক। মানুষের রোগবাহক হিসেবে মশার পরেই এদের স্থান। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত গরু, ছাগল, ভেড়া, কুকুর, বন্যপ্রাণী, পাখি ও টিকটিকির এক ডজনেরও বেশি এঁটেল শনাক্ত করা গেছে। সর্বাধিক সংখ্যায় আছে গরুর এঁটেল Boophilus microplus, তারপর Haemaphysalis bispinosa, Hyaloma truncatum এবং H. anatolicum। অন্যান্য বহুদৃষ্ট শক্ত এঁটেল প্রজাতি হলো Aponoma gervaisi, Hyaloma canestrini, H. kinneari, Rhipicephalus sanguineus, R. evertsi এবং Amblyoma variegatum। নরম এঁটেলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মোরগ-মুরগির বহিঃপরজীবী Argas persicus। Boophilus microplus মাঝে মধ্যে মানুষকেও আক্রমণ করে।

মুরগির এঁটেল (Fowl tick)  নরম এঁটেল পোকা Argas persicus-এর সাধারণ নাম। এটি Acarina বর্গের Argasidae গোত্রভুক্ত এবং পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলেই বিস্তৃত। এটি মূলত পাখির এঁটেল হলেও বিশেষ করে মুরগিকেই বেশি আক্রমণ করে। এরা আকারে অপেক্ষাকৃত বড়, ধূসর লাল, ডিম্বাকৃতির, স্ত্রী পোকার দৈর্ঘ্য হয় ৭-১০ মিমি এবং পুরুষের ৪-৫ মিমি। এরা সাধারণত রাতে আহার করে, দিনে মুরগির বাসার ফাঁক-ফোঁকড়ে সময় কাটায়, ফলে এদের কদাচিৎ দেখা যায়। এদের অপরিণত লার্ভাদশা পোষকের উপর কয়েকদিন থাকে এবং সাধারণত তখনই এদের চোখে পড়ে।

বাংলাদেশে খামারের হাঁস-মুরগির চেয়ে গ্রামাঞ্চলের গৃহপালিত মুরগিতে এঁটেল অধিক সংখ্যায় দেখা যায়। এদের সংক্রমণে রক্তশূন্যতা সৃষ্টি হয়, ফলে পাখির ডিম পাড়ার সংখ্যা কমে যায়। এটি মুরগির স্পাইরোকিটোসিস (spirochaetosis) জীবাণু ও পাখিদের অন্যান্য রোগের বাহক।  [এস.এম হুমায়ুন কবির]

এঁটেলঘটিত পক্ষাঘাত  এঁটেল পোকা দ্বারা শরীরে অধিবিষ প্রবেশজনিত মানুষ ও পশুদের একটি রোগ। পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী এঁটেল প্রায়শ পোষকের মাথা ও ঘাড়ে সেঁটে থাকার সময় সাধারণত রক্তচোষণের শেষপর্যায়ে পোষকের শরীরে অধিবিষ ঢুকিয়ে থাকে। অধিবিষ উৎপাদন স্ত্রী এঁটেলের ডিম উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয় এবং ডিমের নির্যাসে (extract) এ অধিবিষ শনাক্ত করা গেছে যা পশুদেহে ঢুকিয়ে দিয়ে পক্ষাঘাত ঘটানো যায়। পক্ষাঘাতের মাত্রা পোষকদেহে এঁটেলের সংখ্যা ও রক্তচোষণের সময়ের সঙ্গে আনুপাতিক। হূৎপিন্ড ও শ্বাসকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত না হলে এঁটেল সরিয়ে ফেললেই রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। এ ধরনের পক্ষাঘাত রোগ এককভাবে মানুষ ও গবাদি পশুর ক্ষেত্রে ঘটে। তবে কখনও কখনও গোটা গবাদি পশুর পালে এমনটি ঘটতে পারে এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এঁটেলঘটিত পক্ষাঘাতে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় গরু, ভেড়া, ছাগল, শূকর, নানা ধরনের বন্যপ্রাণী, ও গিনিপিগ আক্রান্ত হওয়ার তথ্য জানা গেছে। যেসব এঁটেল পক্ষাঘাত ঘটায় সেগুলির মধ্যে রয়েছে নরম এঁটেলের (Argasida) Argas persicus ও Ornithodoros lahorensis এবং শক্ত এঁটেলের Ixodes, Demacentor, Rhipicephalus, Haemaphysalis, Hyalomma এবং Amblyoma-এর কয়েকটি প্রজাতি।

গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে আছে Argas persicus এবং Rhipicephalus sanguineus। প্রথমটি মুরগি ও কবুতরের এঁটেল ও দ্বিতীয়টি কুকুরের, যা মাঝে মধ্যে গরুও আক্রমণ করে। Otobius megnini ও Hyalomma kutchensis ভারতে থাকলেও এখনও বাংলাদেশে পাওয়া যায় নি। এদেশে আজ পর্যন্ত এঁটেলঘটিত পক্ষাঘাতের তেমন কোনো ঘটনা শনাক্ত হয় নি।

মানুষ ও গরুতে এঁটেলঘটিত বিষক্রিয়ার ঘটনা টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহের মধুপুর এবং হালুয়াঘাট বনাঞ্চল এলাকা থেকে মাঝে মধ্যে জানা যায়। ঘাম, ব্যাপক একজিমা, মিউকাস আবরণীতে অত্যধিক রক্ত জমা ইত্যাদি এর প্রধান উপসর্গ। সাধারণত গরু, ছাগল ও ভেড়ায়, দৈবাৎ মানুষেও সাধারণ এঁটেলের (Boophilus microplus) আক্রমণে এ রোগ দেখা দিতে পারে।  এক ধরনের ভাইরাসজনিত রোগও এঁটেল দ্বারা সংক্রামিত হয়। এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি কাঁপুনিসহ তীব্র জ্বর, ব্যথা এবং অন্যান্য উপসর্গে ভুগতে থাকে, এমনকি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রও আক্রান্ত হতে পারে।  [মোঃ হাফেজুর রহমান]