ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান


ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান  ১৯৬৮ সালের নভেম্বরে ছাত্র অসন্তোষকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শহর এবং গ্রামের শ্রমিক-কৃষক ও নিম্ন-আয়ের পেশাজীবীসহ বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের মধ্যে। অন্তত একটি সাধারণ দাবি আইয়ুবের পতনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন পাকিস্তানের সকল অংশের মানুষ একযোগে পথে নামেন। তবে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক এবং সাধারণভাবে নিম্ন ও মধ্য আয়ের পেশাজীবীদের মধ্যে আন্দোলন ক্রমাগতভাবে শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের রূপ পরিগ্রহ করতে থাকে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোয় পূর্ববাংলার জাতিগত নিপীড়ন ও বঞ্চনা এবং তার বিপরীতে ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামসহ পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ে গড়ে ওঠা স্বকীয় সত্তার বোধ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ প্রভাব রেখেছিল। বস্ত্তত, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা-পরবর্তীকালের সর্ববৃহৎ গণজাগরণ।

আটষট্টির ছাত্র অসন্তোষ গণআন্দোলনে রূপান্তরিত হয় মওলানা  আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঘোষিত গভর্নর হাউস ঘেরাও ও পরবর্তী দিনগুলোর কর্মসূচির মাধ্যমে। ৬ ডিসেম্বর ‘জুলুম প্রতিরোধ দিবস’ পালনের জন্য মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন  ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), তোয়াহার নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান শ্রমিক ফেডারেশন এবং আবদুল হকের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতি যৌথ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পল্টন ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করে। জনসভার পর একটি বিরাট মিছিল গভর্নর হাউস ঘেরাও করে। সেখানে জনতার সাথে পুলিশের সংঘর্ষের সূত্র ধরে মওলানা ভাসানী পরদিন ঢাকা শহরে হরতাল আহবান করেন। ৮ ডিসেম্বর ভাসানী ও মোজাফফর আহমেদের নেতৃত্বাধীন দুই ন্যাপ, আওয়ামী লীগ, পিপল্স পার্টি, নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামসহ প্রধান বিরোধী দলসমূহের ডাকে গোটা পূর্ববাংলায় হরতাল পালিত হয়। ১০ ডিসেম্বর ৬ দফাপন্থি আওয়ামী লীগ আহুত ‘নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ জোরেসোরে পালিত হয়। ১৪ ডিসেম্বরে ভাসানী ন্যাপের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় ঘেরাও আন্দোলনের কর্মসূচি। সে অনুযায়ী ২৯ ডিসেম্বর পাবনার ডিসির বাড়ি ঘেরাও করার মাধ্যমে ঘেরাও আন্দোলনের সূচনা ঘটে। ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ)-এর নেতৃবৃন্দ ‘ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করে এবং তাদের ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ১১ দফার মধ্যে ১৯৬৬ সালে  শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কিত ৬ দফার সাথে ছাত্র সমস্যাকেন্দ্রিক দাবি দাওয়ার পাশাপাশি কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ সংক্রান্ত দাবিসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বস্ত্তত ১১ দফা কর্মসূচীর মাধ্যমে ছাত্র নেতৃবৃন্দ যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটি আন্দোলনগত ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তাছাড়া এসময় থেকেই শেখ মুজিবের মুক্তি ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি প্রাধান্য পেতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-সহ ছাত্র সংগ্রাম কমিটির পূর্ব বাংলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ঊনসত্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১১ দফা কর্মসূচি ঘোষিত হওয়ার পরপরই ৮ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ও মোজাফফর ন্যাপসহ আটটি রাজনৈতিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় ডেমোক্রাটিক অ্যাকশন কমিটি (ডাক)। তারা ফেডারেল পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার, প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন, জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবুর রহমান, খান আবদুল ওয়ালী খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোসহ সকল রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি দাবি করে এবং দাবিগুলো বাস্তবায়নের পক্ষে গণআন্দোলন জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ‘ডাক’ভুক্ত উগ্র ডানপন্থি কয়েকটি সংগঠন ছাত্র সংগ্রাম কমিটির দেওয়া ১১ দফা কর্মসূচিকে সমর্থন করতে অস্বীকার করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আন্দোলন ক্রমশ দানা বেঁধে ওঠে এবং ১১ দফার চেতনা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি সরকারপন্থি ছাত্র সংগঠন এন.এস.এফ- এর একটি অংশও তাদের ‘সংগ্রামী ২২ দফা’ কর্মসূচি নিয়ে প্রকাশ্যে সরকার বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। সরকারি নিপীড়নের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্রসভা ও প্রতিবাদ মিছিলের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। এ মিছিলে পুলিশের গুলিতে মেনন গ্রুপ ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম নেতা আসাদউজ্জামান নিহত হলে গণজাগরণ রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানের। ২৪ জানুয়ারি গুলিতে নবম শ্রেণির ছাত্র মতিউর এবং ছুরিকাঘাতে রুস্তম নিহত হলে ঢাকার পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শহরের নিয়ন্ত্রণভার সেনাবাহিনীর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয় এবং অনির্দিষ্ট কালের জন্য সান্ধ্য আইন বলবৎ করা হয়। পরদিন সেনাবাহিনী ও ই.পি.আর-এর বেপরোয়া গুলিতে ঢাকার নাখালপাড়ায় আনোয়ারা বেগম ঘরের ভেতর বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হলে তার প্রতিক্রিয়া হয় তীব্র। ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হক বন্দি অবস্থায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গুলিতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যু সংবাদে পরিস্থিতি এমন উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠে যে, বিকেলে মওলানা ভাসানী লক্ষাধিক লোকের জনসভায় দ’ুমাসের মধ্যে ১১ দফার বাস্তবায়ন এবং সকল রাজবন্দির মুক্তি দেওয়া না হলে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি আরও বলেন যে, প্রয়োজন হলে ফরাসি বিপ্লবের মতো জেলখানা ভেঙ্গে শেখ মুজিবকে ছিনিয়ে আনা হবে। সভাশেষে জনতা মন্ত্রীদের গৃহে অগ্নিসংযোগ শুরু করে। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা নিহত হলে ক্রুদ্ধ ও ভাবাবেগে আপ্লুত হাজার হাজার ছাত্র জনতা সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে।

ঊনসত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার বিরোধিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে অধ্যাপক আবদুল হাইয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় ‘ভাষা-ভিত্তিক জাতীয়তার সংগ্রাম’ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করা হয়। গণঅভ্যুত্থানের প্রবল চাপে আইয়ুব খান ঘোষণা করেন যে, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। একই দিন শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্তগণ এবং নিরাপত্তা আইনে আটক ৩৪ জন নেতা মুক্তি পান। গণতন্ত্রের দাবিতে স্বৈরশাসন বিরোধী এ সংগ্রামে গ্রাম-গঞ্জের খেটে খাওয়া মানুষ  তখন শুধু সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারণ করেই থেমে থাকেনি, বরং স্ব স্ব ক্ষমতা বলয়ে অধিষ্ঠিত শোষক শ্রেণি বা তাদের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়ে ওঠে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, বহু স্থানে কৃষকেরা ছাত্রদের সহযোগিতায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বহু স্থানে ছাত্ররা কৃষকদের সহযোগিতায় নায়েব, তহশিলদার, পুলিশ, দারোগা, সার্কেল অফিসারদের বিচার করে গলায় জুতার মালা পরিয়ে ঘুরিয়েছে। ঘুষ হিসেব করে ফেরত নিয়েছে, জরিমানা করেছে, চেয়ারম্যান-মেম্বারদের পদত্যাগ করিয়েছে, বেশ্যাবাড়ি তুলে দিয়েছে, মদ গাঁজার দোকান ভেঙ্গে দিয়েছে, চোর-ডাকাতদের শায়েস্তা করেছে। এ ছাড়া শহরাঞ্চলে ক্ষমতা অপব্যবহারকারী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের প্রকাশ শারীরিক আক্রমণ বা নথিপত্রাদি তছনছ এবং অফিসে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ঘটেছে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের পেশাজীবীরা তাদের দীর্ঘদিনের অপূর্ণ দাবিদাওয়া উত্থাপন করেছেন এবং রাজপথে নেমে মিছিলে উচ্চকিত হয়েছেন, হাজার হাজার শ্রমিক তাদের ন্যূনতম অধিকার আদায় করার লক্ষ্যে ঘেরাও আন্দোলনকে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

এমতাবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে আইয়ুব খান আহুত গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের কথা ঘোষণা করেন এবং শান্তি বজায় রাখার আহবান জানান। অন্যদিকে মওলানা ভাসানী গোলটেবিল বৈঠককে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ঊনসত্তরের গণজাগরণকে ‘জালেম’ ও ‘মজলুম’এর মধ্যকার সংঘাত হিসেবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে prophet of violence হিসেবে পরিচিতি পান। গণঅভ্যুত্থানের জোয়ারের মুখে টিকতে না পেরে শেষাবধি ২৫ মার্চ পাকিস্তানের ‘লৌহ মানব’ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। সারা দেশে নতুন করে জারি হয় সামরিক শাসন, তবে প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচন এবং অচিরে দেশে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা চালু করার দাবি স্বীকৃত হয়। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের ফলে আমলা, পুলিশ ও মিলিটারি সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে আগে যে ভীতি ছিল তা বহুলাংশে হ্রাস পায়, তাদের মর্যাদা ও গুরুত্ব জনচেতনায় হ্রাস পায়। এ ছাড়া গ্রাম ও শহরাঞ্চলে শ্রেণি চেতনার উন্মেষ এবং শ্রেণি সংগ্রামের আংশিক বিকাশ সাধিত হয়। পাশাপাশি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পূর্ববাংলার জনগণের মধ্যে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের আকাঙক্ষা বৃদ্ধি পায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করার মতো পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে।

[মেসবাহ কামাল এবং আরিফাতুল কিবরিয়া]

গ্রন্থপঞ্জি  Tariq Ali, Pakistan : Military Rule or People’s Power, London & New York , 1970; মেসবাহ কামাল, আসাদ ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ঢাকা, ১৯৮৬; লেনিন আজাদ, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান : রাষ্ট্র সমাজ রাজনীতি, ঢাকা, ১৯৯৭।