উপজেলা পরিষদ


উপজেলা পরিষদ  জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকার (১৯৮২-১৯৯০) কর্তৃক গঠিত প্রশাসনিক সংস্কার ও পুনর্গঠন কমিটির (সিএআরআর) সুপারিশমালা থেকে উপজেলা পরিষদের ঐতিহাসিক পটভূমি রচিত। বস্ত্ততপক্ষে এই সুপারিশমালা ১৯৫৯ সালের মৌলিক গণতন্ত্র আদেশক্রমে গঠিত থানা উন্নয়ন ও সমন্বয় পরিষদের (টিডিসিসি) অনুবৃত্তিমূলক দলিল। কুমিল্লা জেলায় অবস্থিত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক আখতার হামিদ খান কুমিল্লা অভিজ্ঞতাভিত্তিক পল্লী উন্নয়নের যে ধারণা গড়ে তোলেন ও প্রচার করেন তার ভিত্তিতে গঠিত হয় টিডিসিসি। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সামরিক সরকার টিডিসিসি’র ধারণা ও অনুশীলনকে আইনে অন্তর্ভুক্ত করেন। আদি ধারণার মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো থানা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা এবং ইউনিয়ন কাউন্সিল বা বর্তমানে কথিত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যানের সমন্বয়ে একটি সরকারি বেসরকারি অংশদারিত্ব গড়ে তোলা।

উপজেলা পরিষদ ও অধুনালুপ্ত টিডিসিসি’র মধ্যে মৌলিক পার্থক্য প্রধানত দুটো। প্রথমত টিডিসিসি’র চেয়ারম্যান হতেন তদানীন্তন মহকুমা প্রশাসকরা এবং ভাইস চেয়ারম্যান হতেন সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন)। আর থানা পর্যায়ের অফিসাররা এবং সেই থানার আওতাভুক্ত ইউনিয়ন পরিষদগুলোর চেয়ারম্যান হতেন এর সদস্য। টিডিসিসিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আধিপত্য থাকায় এর সমালোচনা করা হতো। আরোও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, সমালোচনাটা টিডিসিসির রাজনৈতিক চরিত্রের উপর কেন্দ্রীভূত ছিল এই কারণে যে, তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা ছিলেন সেই নির্বাচক মন্ডলীর অংশ যারা প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করত। আর এভাবেই সামরিক শাসক সেনাবাহিনী প্রধান ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করত। আওয়ামী লীগের মতো প্রধান বিরোধী দলগুলো এবং অন্যান্য গণতন্ত্রকামী দল নির্বাচকমন্ডলীর এই কাঠামোর প্রবল বিরোধিতা করেছিল। তদানীন্তন পাকিস্তানের উভয় অংশে রাজনৈতিক দলগুলোর গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালে এ ব্যবস্থা তুলে দেয়া হয়।

সংবিধানে স্থানীয় সরকার কাঠামোর ব্যবস্থায় নির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে স্থানীয় পরিষদের বিষয়াবলি পরিচালনার কথা বিবেচনা করা হয়েছে। সংবিধানে বাংলাদেশের প্রতিটি প্রশাসনিক ইউনিটে স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত পরিষদ গঠনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রশাসনিক ও চাকরি পুনর্বিন্যাস কমিটি (এএমআরসি, ১৯৭২) এমন পদক্ষেপের সুপারিশ করা সত্ত্বেও ১৯৮৪ সালের আগ পর্যন্ত কোনো সরকারই সেই ধারণাটি হূদয়ঙ্গম করে নি। সাংবিধানিক ধারণার সাথে সঙ্গতি রেখেই এএসআরসি সেই ধারণাটি বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছিল।

এএসআরসির এসব সুপারিশ ১৯৮২ সালে সরকারের অনুমোদন লাভ করে এবং ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। পরবর্তী পর্যায়ে স্থানীয় সরকার (থানা পরিষদ ও থানা পুনর্গঠন) অধ্যাদেশ ১৯৮২ এবং থানা পরিষদকে উপজেলা পরিষদ হিসেবে নতুন নামকরণ করে ১৯৮৩ সালের সংশোধনী আইনের অধীনে এক ব্যক্তি এক ভোট নীতির ভিত্তিতে সরাসরিভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়। স্থানীয় পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের ভোটাধিকারহীন সদস্য করা হয়। অপরদিকে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা হয়ে দাঁড়ান ভোটাধিকার সম্পন্ন সদস্য। একজন চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে উপজেলা পরিষদ গঠনের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে। উপজেলা পরিষদের কার্যকালের পাঁচ বছর মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার পর ১৯৯০ সালে একজন চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে উপজেলা পরিষদ গঠনের দ্বিতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে। জেলার অংশ মহকুমা বলে অভিহিত যুগ পুরাতন প্রশাসনিক ইউনিট এবং এর প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা এসডিওর পদ বিলোপ করা হয় এবং অধিকাংশ মহকুমাকে জেলার মর্যাদায় উন্নীত করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি প্রাক্তন থানার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ব্যবহারিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে উন্নীত জেলা ও উন্নীত থানার নতুন নাম ব্যবহূত হতে থাকে।

উপজেলা ব্যবস্থা চালু হওয়ার অব্যবহিত পূর্বে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোটে বিভক্ত সকল রাজনৈতিক দল এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রবল বিরোধিতা করে। এই ইস্যুতে তাদের বিঘোষিত অবস্থান ছিল এই যে, বিষয়টা সাংবিধানিক পরিকল্পনার অংশ এবং সেই কারণে তা নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। তাদের এই অবস্থান আরও জোরদার করে তোলার পিছনে এই যুক্তি কাজ করে যে, কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে কর্মদায়িত্ব ভাগাভাগির ব্যাপারটা এমন এক ইস্যু যার উপর যথাযথভাবে নির্বাচিত জাতীয় সংসদের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। এসব যুক্তির পিছনে সকল বিরোধী রাজনৈতিক দলের এই আশঙ্কা ছিল যে, উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে সামরিক সরকারের ভিত গড়ে তোলা। অবশ্য জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকার উপজেলা পরিষদ গঠন করে উপজেলা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়।

জেনারেল এরশাদ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে ১৯৮৯-৯০ সালের গণ-আন্দোলনের পরিণতিতে ১৯৯১ সালে নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন পুনর্গঠন,(বাতিল) অধ্যাদেশ ১৯৯১ বলে উপজেলা ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়। ব্যবস্থাটি বিলুপ্ত হওয়ার আগেও উপজেলা পরিষদে জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের মধ্যকার কার্যগত সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছিল।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী এবং আরও গতিশীল করে তোলার লক্ষে ২০০৭ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে কমিটি গঠন করে তার সুপারিশ ছিল এই যে, (ক) জাতীয় সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদে যেকোন ধরনের ভূমিকা পালনের বাইরে রাখতে হবে। এই সুপারিশ ১৯৯১ সালের পর বিএনপি সরকার এবং ১৯৯৬ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠিত দুই উপর্যুপরি স্থানীয় সরকার কমিশনের প্রদত্ত সুপারিশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। পূর্বোল্লেখিত কমিটি (২০০৭) স্থানীয় সরকারের সকল স্তরের কাজকর্ম দেখাশোনার জন্য স্বতন্ত্র আইনগত ক্ষমতা দিয়ে একটি স্থায়ী স্থানীয় সরকার কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করেছিল। আইনবলে শেষ পর্যন্ত একটি স্থানীয় সরকার কমিশন হলেও ২০০৯ সালের নির্বাচিত সরকার পরে তা বাতিল করে দেয়।

এভাবে নির্বাচিত উপজেলা পরিষদের ইস্যুটি স্থানীয় সরকার কাঠামোর চৌহদ্দির বাইরে থেকে যায়। পরে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুটি পুনরুজ্জীবিত করে তোলে। এই প্রশ্নে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য দেখা দেয়। পরিশেষে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন পরবর্তী নির্বাচিত সরকার উপজেলা পরিষদ আইন ২০০৯ প্রণয়ন করে সংসদ-সদস্যদের কিছু নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে পরিষদের উপদেষ্টা বানায়। এতে নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যানদের তরফ থেকে তীব্র বিরোধিতা আসে। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ-সদস্যদের মধ্যে সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠে। মিডিয়ার সর্বশেষ খবরে জানা গেছে সরকার বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য পদক্ষেপ নেয়ার কথা গুরুত্ব সহকারে ভাবছেন।  [এ.এম.এম শওকত আলী]

আরও দেখুন উপজেলা পরিষদ আইন ২০০৯