উদ্ভিদভূগোল


উদ্ভিদভূগোল (Phytogeography)  উদ্ভিদের ভৌগোলিক সম্পর্ক নির্ধারক বিদ্যা। অতীত ও বর্তমানে উদ্ভিদবিস্তারের ধরন লিখন ও ব্যাখ্যা এ বিদ্যার বিষয়বস্ত্ত এবং তা উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা ও নৃতত্ত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মহাদেশ, মহাসাগর, দ্বীপপুঞ্জ, পবর্তমালা ও মরুভূমিসহ পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভূগোলের প্রায় সবগুলি দিকই এর অন্তর্ভুক্ত।

জলবায়ু ও ভৌম (edaphic) কারণসমূহ দ্বারা উদ্ভিদবিস্তার নিয়ন্ত্রিত। ভূতাত্ত্বিককালের বিবর্তনের সঙ্গে পৃথিবীর ভূগোলের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। সৃষ্টির পর উদ্ভিদকুল বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক কালপর্বে বিস্তার লাভ করেছে, নতুন নতুন আবাসস্থল পেয়েছে ও সেসব স্থানে আজও বিদ্যমান রয়েছে। পৃথিবীর উদ্ভিদ জীবন এখন তিনটি মূখ্য অক্ষাংশ-অঞ্চলে ব্যাপৃত: মেরুমন্ডল, নাতিশীতোষ্ণ মন্ডল, উষ্ণমন্ডল। ভূমির উচ্চতা ও জলবায়ুর ভিত্তিতে অক্ষাংশসহ এগুলি আবার বিভিন্ন উপমন্ডলে বিভক্ত- নিরক্ষীয় (equatorial), ক্রান্তীয় (tropical), উপক্রান্তীয়, উষ্ণ-নাতিশীতোষ্ণ, শীতল-নাতিশীতোষ্ণ, ও মেরুমন্ডলীয়।

উদ্ভিদকুলগত শ্রেণিবিন্যাসে পৃথিবীর ভূভাগ ৩৭টি অঞ্চলে বিভক্ত। এক্ষেত্রে মূখ্য ইউনিটগুলি উপ-সুমেরীয় (boreal) বর্গ, পুরাক্রান্তীয় (paleotropic) বর্গ, নবক্রান্তীয় (neotropic) বর্গ, দক্ষিণ-আফ্রিকীয় বর্গ, অস্ট্রেলীয় বর্গ, কুমেরু বর্গ। ভৌগোলিক দিক থেকে বাংলাদেশ অংশত উষ্ণমন্ডলের অংশত নাতিশীতোষ্ণ মন্ডলের অন্তর্গত। এদেশের মূল ভূখন্ড বঙ্গোপসাগর দ্বারা গঠিত চাপের চূড়ায় অবস্থিত। এটা ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এ দু উপমহাদেশের মধ্যবর্তী অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ একটি যোজকস্বরূপ। উদ্ভিদকুলগত দিক থেকেও বাংলাদেশ দুটি বৃহৎ অঞ্চলের আকর্ষণীয় সন্ধিস্থলে রয়েছে- পশ্চিমে ভারতীয় অঞ্চল এবং পূর্বদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চল। এ সঙ্গে বাংলাদেশ চীন-জাপানী অঞ্চলের পশ্চিম দিকেরও ঘনিষ্ঠ, যে জন্য এখানে কতিপয় বৃহৎ উদ্ভিদকুলগত অঞ্চলের মিশ্রণ ঘটা সম্ভব।

ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে বাংলাদেশ বঙ্গীয় অববাহিকা (Bengal Basin) থেকে উত্থিত এবং হিমালয়, রাজমহল ও মেঘালয় অধিত্যকার মধ্যস্থলে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ। বঙ্গীয় অববাহিকার উত্থান অন্ত্য-প্লাইওমিস পর্বে (৭০ লক্ষ- ২.৫ কোটি বছর আগে) শুরু হয়ে সম্ভবত প্লাইস্টোসিন পর্বে (১০ লক্ষ- ১.২ কোটি বছর আগে) সম্পূর্ণ হয়েছিল। শিবালিক আন্দোলনের পর ব্রহ্মপুত্র মহানদ চীন-জাপানী উদ্ভিদকুলগত অঞ্চলের পশ্চিমাংশ দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং অনেকগুলি উপনদী ও  খোদ ব্রহ্মপুত্র দূরবর্তী উচ্চভূমির উদ্ভিদসম্ভারের কিছুটা বয়ে আনে এবং বাংলাদেশে সেগুলির গোড়াপত্তন ঘটিয়ে এখানে তিনটি বৃহৎ উদ্ভিদকুলাঞ্চলের মধ্যে অজস্র বৈচিত্র্য সংযোজন করেছে। আয়তনে পৃথিবীর ০.০১ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে রয়েছে গোটা বিশ্বের নালিকাধর (vascular) উদ্ভিদের ১.৫ শতাংশ।  [মোস্তফা কামাল পাশা]