উদীচী


উদীচী (শিল্পিগোষ্ঠী)  প্রগতিশীল চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। শাব্দিক অর্থে উদীচী মানে উষালগ্নে উত্তর আকাশে উঠা দিক নির্দেশক দ্রুবতারা। ধ্রুবতারার মতো সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনে দিক নির্দেশনা দেবার লক্ষ্যে ১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় উদীচী শিল্পিগোষ্ঠী। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা  সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১) ছাড়া প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্বের মধ্যে আছেন গোলাম মোহাম্মদ ইদু, রণেশ দাস গুপ্ত, মঞ্জুরুল আহসান খান প্রমুখ। এ গোষ্ঠীর প্রাথমিক সংগঠকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গোলাম মোহাম্মদ ইদু, রনেশ দাস গুপ্ত, মঞ্জুরুল আহসান খান, মোস্তফা ওয়াহিদ খান, কামরুল আহসান খান, ইকরাম আহমেদ, আখতার হোসেন ও রিজিয়া বেগম। উদীচী শিল্পিগোষ্ঠীর লক্ষ্য-শিল্পচর্চার মাধ্যমে সবধরণের আর্থসামাজিক শোষণ, দলন, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। অচিরেই উদীচীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আন্দোলনের পটভূমি রচনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে উদীচী শিল্পিগোষ্ঠী। উদীচীর মঞ্চায়িত ‘আলো আসছে’, ‘শপথ নিলাম’ প্রভৃতি নাটক স্বাধীনতা চেতনাবোধে অসাধারণ ভূমিকা রাখে। দেশের অধিকাংশ প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী উদীচীর গণজাগরণ কর্মকান্ডে অংশীদার হন। আবুল ফজল, কবীর চৌধুরী, কলিম শরাফী, শেখ লুৎফর রহমান, সনজিদা খাতুন, জহির রায়হান, আলতাফ মাহমুদ, সরদার ফজলুল করিম, জাহানারা ইমাম, পান্না কায়সার প্রমুখ বরেণ্য লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিকের উদীচীর কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ অনেককেই উৎসাহ প্রদান করে। স্বাধীনতার পর দেশের সাংস্কৃতিক নীতি নির্ধারণে উদীচীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে সরকারের সহযোগিতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে উদীচীর শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে উদীচীর শাখা ২৪০টি এবং কর্মী প্রায় ১০,০০০। এ ছাড়া যুক্ত রাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং ফ্রান্স-এ এর শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৯৭৫-এর পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রগতিশীল উদীচী শিল্পিগোষ্ঠী সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হয়। উপরন্তু, প্রগতিশীল নীতির জন্য উদীচী প্রায়শই মৌলবাদীদের নানারকম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৯৯ সালে যশোরে এবং ২০০৫ সালে নেত্রকোনায় উদীচীর সম্মেলনে গ্রেনেড হামলা হয়। ফলে অনেক শিল্পিকর্মী হতাহত হয়। [ইকরাম আহমেদ]