উচ্চাঙ্গনৃত্য


উচ্চাঙ্গনৃত্য  বলতে প্রধানত ভরতনাট্যম, কথাকলি, কত্থক, ওড়িশি ও মণিপুরী নৃত্যকে বোঝায়। এগুলি প্রাচীন ভারতের একেকটি বিশেষ ধরনের নৃত্যশৈলী এবং বাংলাদেশসহ সর্ব ভারতে প্রচলিত। বিভিন্ন মন্দিরে দেবদেবীর প্রাচীন ভাস্কর্য ও প্রামাণিক তথ্য থেকে উচ্চাঙ্গনৃত্যের সৃষ্টি। বহু শতকের বিবর্তনের ফলে ভারতীয় এ নৃত্যকলা বর্তমানে এক অপূর্ব শিল্পে পরিণত হয়েছে। এ নৃত্যের নানা কৌশল, মুদ্রা, রসতত্ত্ব ও প্রণালীর নির্দেশ ভরতমুনি তাঁর নাট্যশাস্ত্রে (আনু. খ্রিস্টপূর্বাব্দ-খ্রিস্টীয় ৩য় অব্দ) লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এ থেকে জানা যায় যে, রস ও ব্যঞ্জনা ভারতীয় নৃত্যকলার প্রধান অঙ্গ। নাট্যশাস্ত্রে শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, বীর, ভয়ানক, রৌদ্র, বীভৎস, অদ্ভুত, শান্ত-এ নবরসের উল্লেখ আছে। নাট্যশাস্ত্রের  ভিত্তিতে সংগঠিত এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতি দ্বারা ঋদ্ধ হয়ে বিকশিত এ ধ্রুপদী নৃত্যধারাই এখন উচ্চাঙ্গনৃত্য নামে পরিচিত। ব্রিটিশ শাসনামলে এসব নৃত্যের শৈল্পিক মাধুর্য অনেকটা ক্ষুণ্ণ হয়েছিল। তখন পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে ভারতীয় উচ্চাঙ্গনৃত্য এক নতুন রূপ লাভ করে, যা তখনকার রাজা-মহারাজা এবং নবাব-জমিদারদের জলসাঘরে প্রচলিত ছিল। এ নৃত্য ‘বাইজি নৃত্য’ নামে পরিচিত ছিল এবং এর চর্চা হতো প্রধানত  কলকাতা ও লক্ষ্ণৌ নগরীতে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উচ্চাঙ্গনৃত্যের এ অবক্ষয় অনুধাবন করতে পেরে নৃত্যের ক্ষেত্রে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটান এবং পরবর্তীকালে  উদয়শঙ্কর ভারতীয় নৃত্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। উত্তর ভারতের আলমোড়ায় ছিল তাঁর নৃত্য প্রতিষ্ঠান। এঁদের প্রচেষ্টায় ভারতীয় উচ্চাঙ্গনৃত্য নবজীবন লাভ করে। ভারতের অন্যান্য অনেক প্রদেশের মতো বঙ্গদেশেও তখন উচ্চাঙ্গ নৃত্যের নিজস্ব কোনো ধারা ছিল না। তাই দক্ষিণ ভারত, মধ্যপ্রদেশ ও মণিপুর থেকে আগত গুরুদের নিকট কলকাতার বাঙালি শিল্পীরা উচ্চাঙ্গনৃত্যের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কিন্তু এ শিল্পের প্রতি তখনকার অভিজাত শ্রেণির কোনোরূপ পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় বাংলায় এর তেমন প্রসার ঘটে নি। শুধু রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে তাঁর নিজস্ব ধ্যান-ধারণায় ভারতীয় উচ্চাঙ্গনৃত্যকে গবেষণামূলকভাবে ব্যবহার করে নৃত্যের এক নতুন আদর্শ তৈরি করেন, যা রবীন্দ্রনৃত্য নামে পরিচিত।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময় বাংলা দুভাগ হয়ে যায় এবং বর্তমান বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিতি লাভ করে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়ায় এখানে বাঙালি সংস্কৃতিতে বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়। এ সময় নৃত্যজগতে আবির্ভূত হন উপমহাদেশের প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী  বুলবুল চৌধুরী। তাঁরই একাগ্র সাধনায় নৃত্য আবার নতুন রূপ লাভ করে। ভরতনাট্যম, কথাকলি, কত্থক ও মণিপুরী নৃত্যের ঢঙে তিনি নিজস্ব ধারায় বহু নৃত্য তৈরি করেন। ‘চাঁদ সুলতানা’, ‘আনারকলি’, ‘হাফিজের স্বপ্ন’ প্রভৃতি নৃত্যে উচ্চাঙ্গনৃত্যের বিভিন্ন মুদ্রা এবং শৃঙ্গার, বীর ও করুণ রস প্রয়োগ করে তিনি মুসলিম সংস্কৃতিতে নৃত্যের এক স্বতন্ত্র ধারার প্রবর্তন করেন। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সমর ভট্টাচার্য কত্থক নৃত্যের চর্চা করে একে জনপ্রিয় করে তোলেন। উপমহাদেশে কত্থক নৃত্যের লক্ষ্ণৌ ঘরানার কিংবদন্তিতুল্য গুরু আচ্ছন মহারাজের শিষ্য ওস্তাদ মনজুর হোসেন খান ১৯৬৫ সালে ঢাকায় আগমন করেন। তিনিই সর্বপ্রথম এ দেশে লক্ষ্ণৌ ঘরানার কত্থক নৃত্যের প্রচলন করেন। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদেশের সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র হয়  ঢাকা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগসূত্র স্থাপিত হলে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। নতুন চেতনা, উদ্দীপনা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এদেশের নৃত্যশিল্পীরা নৃত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন; ফলে নৃত্যের আঙ্গিকেরও পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশের বহু নৃত্যশিল্পী ভারতীয় উচ্চাঙ্গনৃত্যে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে তার চর্চা করেন, যা সুধীসমাজে সমাদৃত হয়। ঢাকা কেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে উচ্চাঙ্গনৃত্য এখন একটি সম্মানজনক আসনে প্রতিষ্ঠিত এবং এর চর্চা ও জনপ্রিয়তাও ক্রমপ্রসারমাণ।

বাংলাদেশে প্রচলিত  উচ্চাঙ্গনৃত্যসমূহের মধ্যে কত্থক মোটামুটি জনপ্রিয়। এর মাধ্যমে মুগল সংস্কৃতির কিছুটা ছোঁয়া এদেশে লেগেছিল বলে তা এখনও বাংলাদেশের মানুষকে অতীতের পানে নিয়ে যায়। ভরতনাট্যম, মণিপুরী ও ওড়িশি নৃত্য হিন্দুধর্মীয় ভাবধারা-সম্পৃক্ত বিধায় মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে এসবের আবেদন অপেক্ষাকৃত কম। তবে বর্তমানে ঢাকা শহরে বহু শিল্পীই ভরতনাট্যম, ওড়িশি এবং মণিপুরী নৃত্যের চর্চা করছেন।

ব্রিটিশ আমলে নবাব ও জমিদারদের জলসাঘরে যে নৃত্য হতো তা লক্ষ্ণৌ থেকে আনীত বাইজি নৃত্য, যাতে কত্থকের ছাপ ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে অত্যন্ত পরিশীলিত ও পরিমার্জিত যে উচ্চাঙ্গনৃত্যের চর্চা  হচ্ছে তা বিশুদ্ধ ভারতীয় উচ্চাঙ্গনৃত্য। রুচিশীল ও সৃজনশীল পরিবেশে ভরতনাট্যম, কত্থক, মণিপুরী ও ওড়িশি নৃত্য বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গীভূত হয়ে অনুশীলিত হচ্ছে। তবে কথাকলি নৃত্যের চর্চা বাংলাদেশে একেবারেই নেই। বর্তমানে ঢাকায় যেসব শিল্পী উচ্চাঙ্গনৃত্য চর্চায় নিয়োজিত রয়েছেন তাঁদের মধ্যে ভরতনাট্যমে সোমা মোমতাজ, শুক্লা সরকার, বেলায়েত হোসেন ও বেবী রোজারিও; কত্থকে সাজু আহমেদ, মুনমুন আহমেদ, শিবলী মোহাম্মদ, কচি রহমান, লাভলী কোরেশী, বিপ্লব কর ও লিখন রায়; মণিপুরী নৃত্যে তামান্না রহমান ও শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ওড়িশি নৃত্যে বেনজীর ছালাম ও মিনু বিল্লাহর নাম উল্লেখযোগ্য।

ভরতনাট্যম   ভরতমুনির নামানুসারে প্রচলিত নৃত্য। ভাব, রস ও তালের সমন্বয় এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। সর্বাপেক্ষা লালিত্যযুক্ত ও লাবণ্যমন্ডিত নৃত্যধারা হিসেবে ভরতনাট্যম ভারতীয় নৃত্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। এ নৃত্যে শিল্পীর নানা অভিব্যক্তি বিভিন্ন মুদ্রায় বিভিন্ন অর্থ বহন করে। দৃষ্টি নিক্ষেপের মাধ্যমে লজ্জা ও উপেক্ষা, ভ্রূ-বিক্ষেপে ভয় ও সন্দেহসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিক্ষেপে মনের সূক্ষ্ম অনুভূতি এতে প্রকাশ পায়। এক কথায় বলা যায় যে, ভরতনাট্যম অনেক শিল্পকলার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে থাকে। শুধু তাই নয়, এ নৃত্য শিল্পকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুষঙ্গ বা অন্তর্নিহিত ভাব ও আবেগকে  দেয় প্রতীকী রূপ। তাই গাম্ভীর্য ও শৈলীর বাস্তবতা ভরতনাট্যমকে সুষমামন্ডিত করেছে। এ নৃত্যে প্রচন্ড শরীর-ঝাঁকুনি ও লম্ফ-ঝম্পের অবকাশ নেই। এতে সব কিছুই পরিমিত। এ নৃত্য ছন্দোময় কৌশল এবং আবেগপূর্ণ অনুভূতিকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করে।

ভরতনাট্যম প্রধানত আটটি পর্যায়ে বিভক্ত: আলারিপ্পু, যতিস্বরম্, শব্দম্, বর্ণম্, পদম্, তিল্লানা, শ্লোকম্ এবং অভিনয়ম্। আলারিপ্পু ভরতনাট্যমের প্রথম পর্যায়। এ পর্যায়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে তাল-বাদন সহযোগে ক্রমান্বয়ে নৃত্যোপযোগী করে তোলা হয়। ‘আলারিপ্পু’ শব্দের অর্থ পুষ্পিত, তাই এ অংশে ফুলের পাপড়ি মেলার মতো শিল্পী তার সর্বাঙ্গকে নৃত্যের মুদ্রা অনুযায়ী ধীরে ধীরে বিকশিত করে তোলেন। শিল্পী তাঁর পদদ্বয়কে সমপদভঙ্গিতে রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে হাত দুটিকে সামনের দিকে প্রসারিত করেন। তারপর হাত দুটিকে জোড় করে মাথার উপর রাখেন। এভাবে শিল্পী তাঁর গুরু ও দেবতাদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন।

যতিস্বরম্  ভরতনাট্যমের দ্বিতীয় পর্যায়। ‘যতি’ অর্থ নানা রকম বাদ্যবর্ণ অর্থাৎ বোলপরম্ এবং ‘স্বরম্’ অর্থ সারগম। একটা নির্দিষ্ট রাগের স্বরমালিকার সঙ্গে যতি মিশ্রিত করে এ নৃত্য প্রদর্শিত হয় বলে এর নাম যতিস্বরম্। যতিস্বরমে নানা রকম দৃষ্টি, পদকর্ম এবং গ্রীবা ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে বিশেষ সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়। শব্দম্-এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বোলপরম্, সারগম ও গানের কথার সঙ্গে স্টেপ ও অঙ্গভঙ্গি। শব্দম্ দ্বারা প্রথম অভিনয় প্রদর্শিত হয়। ভক্তিমূলক অথবা রাজ-রাজন্যের বিষয় নিয়ে এটি রচনা করা হয়। বর্ণম্ গীত, বাদ্য ও নৃত্যের সমন্বয়ে কর্ণাটকি সঙ্গীতের রাগে নানা কাহিনী অবলম্বনে রচিত হয়। ভরতনাট্যমের এ পর্যায় বেশ জটিল ও দুরূহ। ‘বর্ণম্’ কথাটির অর্থ রঞ্জিতকরণ, অর্থাৎ এ অংশে নৃত্যাভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকমন্ডলীর হূদয়কে রাঙিয়ে তোলা হয়। এ নৃত্যে শৃঙ্গাররস খুবই উপজীব্য হয়ে থাকে। মুখাভিনয়, মুদ্রাবিন্যাস ও দ্রুতবর্ধনশীল পায়ের কাজের সমন্বয়ে বর্ণম্ নৃত্য খুবই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

ভরতনাট্যম


পদম্ বর্ণমের পরে অনুষ্ঠিত হয়। ভরতনাট্যমে পদম্ অভিনয়ই প্রধান। এতে দেবদেবীর কাহিনীর বর্ণনাসম্বলিত গান ও বোলসহ অভিনয় প্রদর্শিত হয়। এ নৃত্যে গানের রূপায়িত ভাবকে প্রধানত নানা মুদ্রাসহযোগে রূপায়িত করার প্রয়াস পান শিল্পীরা। তিল্লানা  পদমের পরে অনুষ্ঠিত হয়। এর গান দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকি ঢঙে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের তারানার মতো। তিল্লানায় দ্রুত লয়ে পায়ের কাজ থাকে বেশি। শ্লোকম্ হচ্ছে হিন্দু  পুরাণ অনুযায়ী নৃত্যের স্রষ্টা ও দেবতা নটরাজ শিবের প্রশস্তিগীতি। তাল ব্যতীত বিশেষ কোনো রাগে সংস্কৃত শ্লোক গেয়ে নৃত্যের মাধ্যমে নটরাজের চরণে শিল্পী নিজেকে সমর্পণ করেন। অভিনয়ম্  হচ্ছে অভিনয় প্রধান। এতে তামিল, তেলেগু এবং সংস্কৃত শ্লোকের অভিব্যক্তিকে রাগসঙ্গীতের সুরে অঙ্গভঙ্গি ও অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। এ নৃত্যে পায়ের কাজ তেমন উল্লেখযোগ্য নয়।

উল্লেখ্য যে, ভরতনাট্যমের প্রতিটি ভঙ্গির অঙ্গসৌষ্ঠব, মার্জিত ভাব, গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্য ব্যাহত হলে এর রসাস্বাদন হয় না। তাই ভরতনাট্যমের মতো সুষমামন্ডিত উচ্চাঙ্গ নৃত্যকলায় দক্ষতা অর্জন করা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। এ নৃত্যে পোশাকের বৈচিত্র্য রয়েছে। প্রাচীন মন্দিরের মূর্তি থেকে পোশাকের নকশা ও অঙ্গসজ্জার আদলে পোশাক এবং অলঙ্কারের বৈচিত্র্য আনা হয়েছে, যা নৃত্যকে সুষমামন্ডিত করতে সাহায্য করে। তাঞ্জোর ভ্রাতাদের অবদানের ফলে ভরতনাট্যম একটি আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।

কথাকলি  দক্ষিণ ভারতের নৃত্য। মহারাজ বীর কেরলা বর্মা এর প্রবর্তক। এ নৃত্য মন্দির প্রাঙ্গণ অথবা উন্মুক্ত ময়দানে হয়ে থাকে। মধ্যযুগের সূচনা থেকে এ ধ্রুপদী নৃত্যের ধারা ও শৈলীতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষণীয়। কেরালার বিভিন্ন সংস্কৃতির সমন্বয়ে এবং আর্য ও দ্রাবিড় সংস্কৃতির সংমিশ্রণে কথাকলিতে যুক্ত হয়েছে কেরালার প্রাচীনতম নানা স্টাইলাইজড নৃত্যের উপাদান। এর মূল উৎস ছিল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং বিবর্তনে ছিল কালারী বা জিমনাসিয়ামের প্রভাব। কালারী হচ্ছে যুদ্ধবিদ্যা শেখার আখড়া। এখানে গোষ্ঠীপ্রধান ছাড়াও বিভিন্ন যোদ্ধা রণকৌশল শিখত। পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণরা কালারী থেকে রণবিদ্যা শিখে একে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত করে এবং তাকে নৃত্যের মাধ্যমে এক বিশেষ মর্যাদা দেয়। দৈহিক কসরত ও মনোরঞ্জনের উপাদানই ছিল কথাকলি নৃত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। বৈচিত্র্যময় চরিত্রগুলিতে নাট্যধর্মিতা ছিল অনেক বেশি। তাই কথাকলি কাহিনীমূলক নৃত্যনাট্যে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে কথাকলি নৃত্যনাট্যে অভিনয় এবং নন্দিকেশ্বরের অভিনয়দর্পণের মুদ্রার প্রয়োগ খুব বেশি। কথাকলি নৃত্যনাট্যে প্রতিটি চরিত্রের অভিনয় ও মুদ্রার ব্যবহারে নাটকীয় ভাবধারায় জাগতিক ব্যঞ্জনা ফুটে ওঠে। এ নৃত্য সাধারণত পুরুষরাই করে থাকে। নারী-চরিত্রেও পুরুষরাই অংশগ্রহণ করে। কথাকলি নৃত্যে নানা রঙের পোশাক, অলঙ্কার ও মুখোশের মতো বিচিত্র সাজসজ্জায় আবৃত থাকে শিল্পীর মুখমন্ডল, যা দর্শকমনে বিস্ময়কর অনুভূতি জাগায়। মুখে নানা রঙের জটিল নকশা, বর্ণাঢ্য এবং জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক কথাকলি নৃত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

কত্থক  উত্তর ভারত, লক্ষ্ণৌ এবং জয়পুর অঞ্চলের নৃত্য। এর শুরু কবে হয়েছিল তা জানা যায় না। এ সম্পর্কে অনেক কিংবদন্তি আছে। তবে বিভিন্ন ধর্মীয় কাহিনী থেকে অনুমিত হয় যে, ভারতীয় অন্যান্য উচ্চাঙ্গনৃত্যের মতোই মন্দিরপ্রাঙ্গণে কত্থকের জন্ম। বিভিন্ন কারণে সেসব মন্দির ধ্বংস হয়ে গেলে কত্থক শিল্পীরা যাযাবরের মতো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

চতুর্দশ শতকের পর থেকে মুগল বাদশাহদের পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতীয় নৃত্যে প্রাণ ফিরে আসে। এ সময় বাদশাহরা সব বিদ্যাকেই মর্যাদা দিতেন। মুগল মিনিয়েচার এবং আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরীতে আকবরের রাজসভায় যে নৃত্যের প্রচলন ছিল তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়। এ সময় কত্থক নৃত্যের অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়। শিল্পীরা নতুন নতুন চিন্তায় কত্থক নৃত্যকে নব নব ভঙ্গি ও রসে বিকশিত করে তোলেন। প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞরা যেমন রাগসঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি কত্থক শিল্পীরাও নতুন উদ্দীপনায় নৃত্যের আঙ্গিকে পরিবর্তন আনেন। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নতুন নতুন ছন্দ, লয় ও তাল উদ্ভাবন করে সৃষ্টি করেন বিভিন্ন গৎ, যেমন হুসনু, সেলামী, আদা, মেহবুবা, মুস্কুরাহাট, নাজ, ঘুংঘট ইত্যাদি। নৃত্যের পোশাকেও বৈচিত্র্য আসে। পুরুষদের ধুতি ও নগ্ন শরীর, মেয়েদের ঘাগরা ও কাঁচুলির পরিবর্তে পারস্য ঢঙে চোগা-চাপকান, চুড়িদার-পাজামা ও পেশোয়াজের ব্যবহার শুরু হয়। উভয়েরই মাথায় থাকত টুপি। এ সব পোশাক ছিল জরিবুটি খচিত এবং দেখতে খুব সুন্দর ও আকর্ষণীয়। কত্থক নৃত্য শিল্পীদের প্রাণঢালা আবেগ-উষ্ণতায় পরিপূর্ণ। অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্ ছিলেন ধর্মীয় গোড়ামি মুক্ত। তিনি স্বয়ং কত্থক নৃত্যের অনুরাগী ছিলেন এবং এর চর্চা করতেন। তাঁর আমলেই কত্থক নৃত্য ভারতবর্ষে ব্যাপক প্রসার লাভ করে।

কত্থক নৃত্য সাধারণত সাতটি পর্যায়ে বিভিক্ত: আন্দাজ, আমদ, ঠাঁট বা নিকাষ, গৎ, গৎভাও, বোলপরম ও বাঁট। আন্দাজ হচ্ছে প্রথম দাঁড়ানোর ভঙ্গি, আমদ আরম্ভের কাল, ঠাঁট বা নিকাষ এক প্রকার দাঁড়ানোর ভঙ্গি, গৎ ছোট ছোট বিষয়ের অভিব্যক্তি, যেমন ঘোমটা, কলসি, বাঁশি ইত্যাদি; গৎভাও কোনো বিষয়বস্ত্তকে ভাবে-ভঙ্গিতে প্রকাশ করা, যেমন হোলি, গিরিগোবর্ধনধারণ, নৌকাবিলাস ইত্যাদি; বোলপরম মুখে বোল বলে পায়ে দেখানো এবং বাঁট অঙ্গ-ভঙ্গি ব্যতীত শুধু পায়ে নানারকম ছন্দ দেখানো।

কত্থক নৃত্য


কত্থক নৃত্যের তিনটি ঘরানা আছে লক্ষ্ণৌ, জয়পুর ও বেনারস  ঘরানা। তবে লক্ষ্ণৌ ঘরানার জনপ্রিয়তাই সবচেয়ে বেশি। কত্থক নৃত্য পায়ের জটিল কাজ এবং ঘূর্ণায়মান দৈহিক ভঙ্গিমায় পরিবেশিত হয়।  তবলা ও পাখোয়াজের বোলে প্রাণবন্ত হয় এ নৃত্য। কত্থক নৃত্যে অভিনয় বা নাটকীয় ভাবধারার সমন্বয়ে ধর্মীয় চেতনা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে ওঠে। রাগসঙ্গীতের  ঠুংরি গান এ নৃত্যকে সুষমামন্ডিত করেছে। কত্থক নৃত্যের গুরু আচ্ছন মহারাজ বাদশাহদের পৃষ্ঠপোষকতায় এর প্রাচীন ধারায় পরিবর্তন আনেন এবং পরবর্তীকালে নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্ এ নৃত্যকে আরও পরিমার্জিত করেন।

মণিপুরী নৃত্য  ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রাজ্য মণিপুরে উদ্ভূত। আর্য সভ্যতার বহু পূর্ব থেকেই এ অঞ্চলের সংস্কৃতি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নৃতাত্ত্বিকদের মতে এ এলাকায় অনেক উপজাতির বাস ছিল। নাগা, মিজো প্রভৃতি উপজাতি অতি প্রাচীনকাল থেকেই এ পার্বত্য এলাকায় বসবাস করে। এখানকার অধিবাসীরা জাতি হিসেবে মৈতি নামে পরিচিত। মৈতিরা অতি প্রাচীনকাল থেকেই বনদেবতার পূজা করে আসছে। মণিপুরী সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো নৃত্য। মণিপুরী নৃত্য  হিন্দুধর্ম দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত। রাধা-কৃষ্ণের রাসলীলা এর অন্যতম প্রধান বিষয়। সাধারণত  কীর্তন এবং মণিপুরী ভাষা ও  ব্রজবুলি মেশানো গানের সঙ্গে এ নৃত্য পরিবেশিত হয়। মণিপুরীরা অধিকাংশই বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী। তারা অতি সরল, বিনয়ী ও কৃষ্ণভক্ত। তাই তাদের নৃত্যও ভক্তিরসাত্মক এবং অতি কোমল ও মধুর। আর কৃষ্ণভক্তির কারণে তাদের নৃত্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমোপাখ্যানের গুরুত্বও অনেক বেশি।

মণিপুরী নৃত্যের মধ্যে ভঙ্গিনৃত্যই প্রধান। ভঙ্গিনৃত্য আবার দু প্রকার তান্ডব ও লাস্য। তান্ডব সাধারণত ছেলেরা পরিবেশন করে এবং লাস্য মেয়েরা। মণিপুরী নৃত্যে বহু জটিল তালের ব্যবহার হয়। সে সবের মধ্যে কোকিলপ্রিয়, ধরো, পঞ্চমসোয়ারি, রুদ্রতাল ও বিষ্ণুতাল উল্লেখযোগ্য। মৈরাং (মতান্তরে সিলেটের কমলগঞ্জ) ছিল মণিপুরী সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল। একে ঘিরে অসংখ্য মণিপুরী  লোককাহিনী ভিত্তিক রোমান্টিক নৃত্যের প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। সেগুলির মধ্যে খাম্বা-থৈবী নৃত্য উল্লেখযোগ্য। কথিত আছে, খাম্বা এক কৃষক যুবক ও থৈবী এক রাজকুমারী। এদেরই জীবনকাহিনী এ লোকগাথা। তাই খাম্বা-থৈবীর প্রেমকাহিনী স্মরণে খাম্বা-থৈবী নৃত্যের সৃষ্টি হয়েছে।

মৈতীরা বনদেবতার পূজা করে লাইহারাওবা উৎসবের মধ্য দিয়ে। ‘লাই’ অর্থ দেবতা ও ‘হারাওবা’ অর্থ আনন্দ। এ নৃত্যে পৌরোহিত্য করে মহিলা পুরোহিত মাইবী ও পুরুষ পুরোহিত মাইবা। এ ছাড়া খুবাকইশে, পুংচালন অর্থাৎ খোলনৃত্য মণিপুরী নৃত্যধারাকে সমৃদ্ধ করেছে। মণিপুরী নৃত্যে আরও একটি ধারা আছে যা অত্যন্ত বীরত্বব্যঞ্জক, তা হলো যুযুৎসু কলা, যা তমুখনা ও থাংতা জাগোই নামে পরিচিত। বিনা অস্ত্রে আত্মরক্ষার কলা হলো তমুখনা এবং ‘থাং’ অর্থ তলোয়ার, ‘তা’ অর্থ বর্শা। এ নৃত্য পুরুষরাই করে থাকে। থাংতা জাগোই নৃত্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শারীরিক অঙ্গভঙ্গির বলিষ্ঠ প্রকাশ। এসব ভঙ্গিমায় অনেকটা চীনা কুংফু কারাতে ও অ্যাক্রোবেটিকের ছাপ পাওয়া যায়।

মণিপুরী নৃত্য

মণিপুরী নৃত্যের পোশাক-পরিচ্ছদ খুবই আকর্ষণীয়; বিশেষ করে রাসনৃত্যে মেয়েদের ঘাগরা কাঁচ ও এমব্রয়ডারির নানা নকশায় পূর্ণ; সঙ্গে থাকে কোমরবন্ধনী ও হালকা-পাতলা ওড়নায় ঢাকা মস্তক-চূড়া। ছেলেদের, বিশেষ করে কৃষ্ণের পোশাক ধুতি ও মাথায় ময়ূরের পাখায় আবৃত চূড়া। এ ছাড়াও লাইহারাওবা নৃত্যে থামি ব্যবহার করা হয়। ছেলেদের অন্যান্য নৃত্যে ধুতির ব্যবহার করা হয়। গুরু মৈষ্ণাম অমুবী, হাওবাম অতোম্বা ও অমুদন মণিপুরী নৃত্যে সনাতনী মনোভাবের পরিবর্তন এনেছেন। বাংলাদেশে বাবুরাম সিং ও কার্তিক সিং ঐতিহ্য বজায় রেখে মণিপুরী নৃত্যকে জনপ্রিয় করেছেন। বর্তমানে মণিপুরী নৃত্যের দুটি ঘরানার উল্লেখ পাওয়া যায় বিষ্ণুপ্রিয়া ও ইম্ফল ঘরানা। বিষ্ণুপ্রিয়া ঘরানা বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলভিত্তিক এবং ভারত থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনেকে ইম্ফল ঘরানার চর্চা করছেন।

ওড়িশি নৃত্য  ভারতের উড়িষ্যা প্রদেশের নৃত্য। এর সন্ধান পাওয়া যায় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দে। উড়িষ্যার বহু প্রাচীন মন্দিরে নানা দেবদেবীর ভাস্কর্যে নৃত্যগীতের প্রমাণ আছে। এসব মন্দিরে নর্তকীরা দেবতাদের উদ্দেশ্যে নৃত্য পরিবেশন করত, যাদের বলা হতো মাহারী। বারো ও ষোল শতকে ওড়িশি নৃত্য উন্নতির শিখরে পৌঁছায়। উড়িষ্যার সূর্যমন্দিরে এ নৃত্যের অনেক নিদর্শন আছে। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর বহু গবেষণার মাধ্যমে ওড়িশি নৃত্যের ঐশ্বর্য প্রকাশ পায়। মাহারীদের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি, মন্দিরের ভাস্কর্যে প্রাচীন মুদ্রা ও নৃত্যের অন্যান্য উপাদান যত্নসহকারে পরিমার্জন ও সুচারুরূপে পুনঃসংস্থাপনের মাধ্যমে ওড়িশি নৃত্যের শৈলী আবিষ্কার করা হয়। মন্দিরের স্থাপত্যচিত্রে প্রচুর নৃত্যভঙ্গিমার উপস্থাপনা থেকে বোঝা যায় যে, উড়িষ্যাবাসীদের জীবনের অন্যতম অঙ্গ ছিল নৃত্য। উড়িষ্যার বিভিন্ন স্থানে নির্মিত মন্দিরগাত্রে অপরূপ সুন্দর নৃত্যশিল্পীদের ত্রিভঙ্গ শৈলীর বহু ভাস্কর্যচিত্র দেখা যায়। ওড়িশি নৃত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর সৌন্দর্য ও অনুপম ভঙ্গিমা। এ নৃত্যের মূল পর্যায় চৌক এবং ত্রিভঙ্গি। চৌক হলো চতুষ্কৌণিক ভঙ্গিতে শিল্পীসৃষ্ট চারটি কোণ- যা কাঁধ, হাত, হাঁটু এবং পায়ের সাহায্যে তৈরি করা হয়। ত্রিভঙ্গিতে তিনটি ভঙ্গিমা নিতম্ব, কোমর ও মাথার বঙ্কিম ভঙ্গি দ্বারা উপস্থাপিত হয়। অন্যান্য ধ্রুপদী নৃত্যের মতো ওড়িশি নৃত্যেও কয়েকটি পর্যায়-বিভাগ আছে, যেমন মঙ্গলাচরণ (প্রার্থনা), বোট্টু (সূচনা), পল্লভী (বিস্তৃতি), অভিনয় (নাট্যরূপায়ণ) এবং মোক্ষ (মুক্তি)। পোশাক ও অলঙ্করণে ভরতনাট্যমের সঙ্গে ওড়িশি নৃত্যের বহুলাংশে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়, তবে অঙ্গভঙ্গিতে পার্থক্য আছে।

ওড়িশি নৃত্য

ওড়িশি নৃত্যের বিভিন্ন প্রয়োগ-কৌশল আয়ত্ত করা সহজ, কিন্তু এর প্রধান বিষয় ছন্দ বা তাল রপ্ত করা খুব কঠিন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পন্ডিত কেলুচরণ মহাপাত্র, পঙ্কজচরণ দাস, মায়াধর রাউত প্রমুখ পন্ডিতের অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও সাধনার ফলে ওড়িশি নৃত্য ভারতীয় উচ্চাঙ্গনৃত্যে স্থান পেয়েছে।  [আমানুল হক]