উকুন


উকুন (Louse)  মানুষসহ বিভিন্ন স্তন্যপায়ী ও পাখির ক্ষুদ্র ডানাবিহীন বহিঃপরজীবী। এদের দুটি পৃথক বর্গ Anoplura এবং Mallophaga-তে শ্রেনিবিন্যাস করা হয়। Anoplura-এর সদস্যরা সাধারণভাবে ‘সাকিং লাইস’ (sucking lice) এবং Mallophaga-এর সদস্যরা ‘চিউয়িং লাইস’ (chewing lice) নামে পরিচিত। প্রথম দলটি একান্তভাবেই বিভিন্ন  স্তন্যপায়ী প্রাণীতে পরজীবী, অন্যদিকে দ্বিতীয় দলের সদস্যদের অধিকাংশই পাখিতে এবং গুটি কয়েক প্রজাতি স্তন্যপায়ীতে পরজীবী।

উভয় ধরনের উকুনের দেহ পৃষ্ঠীয়-অঙ্কীয়ভাগ বরাবর চ্যাপটা, দৈর্ঘ্যে মাত্র ২-৩ মিমি; পা খাটো, নখরবিশিষ্ট এবং লোম অথবা পালকের মধ্য দিয়ে দ্রুত দৌড়াবার জন্য অভিযোজিত। অপরিণত উকুন বা নিম্ফ (nymph)-এর চেহারা ও স্বভাব পরিণত বয়সের উকুনের মতোই। সংখ্যায় পর্যাপ্ত হলে উকুন পোষকদেহে এক বিরক্তিকর অবস্থা সৃষ্টি করে এবং কতক প্রজাতি বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ ঘটায়।

মাথার উকুন
কাঁকড়া উকুন

শোষণক্ষম উকুনদের মুখোপাঙ্গ পোষকের ত্বক ছিদ্র করার এবং রক্ত শোষণের উপযোগী। এদের বক্ষ এলাকার দেহ খন্ডগুলি একীভূত এবং মাথা বক্ষের চেয়ে সরু। Anoplura বর্গের ছয়টি গোত্রে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৫০টি প্রজাতির উকুনের কথা জানা গেছে। তিনটি গোত্রের অনেক প্রজাতি মানুষের এবং গবাদি পশুর কতিপয় রোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মানুষের পরজীবী উকুন Pediculidae গোত্রের Pediculus এবং Phthirus-এর সদস্যরা। উভয় গণ বিশ্বের সর্বত্র বিস্তৃত। Pediculus humanus-এর দুটি উপপ্রজাতি রয়েছে, এর একটি P. h. humanus মাথার উকুন এবং অপরটি P. h. corporis দেহের উকুন নামে পরিচিত। Phthirus pubis-কে পিউবিক লাউস (pubic louse) বা কাঁকড়া উকুন (crab louse) বলা হয়। বাংলাদেশে মাথার উকুনের উপস্থিতি এক মামুলি ব্যাপার। গ্রাম বাংলার শতকরা প্রায় ১০০ ভাগ ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীলোক এবং শহরের বস্তি এলাকায় বসবাসকারী বহু লোকজনের মাথায় উকুন বাস করে। দেহের উকুন এদেশে তেমন দেখা যায় না এবং পিউবিক লাউস-এর অস্তিত্ব এদেশে নেই বললেই চলে। দেহের উকুন অনেক সময় পরিধেয় কাপড়-চোপড়ের মধ্যে থাকে, যেখান থেকে তারা সহজেই পোষকদেহের নিবিড় সান্নিধ্যে আসতে পারে। তবে পোষকদেহে বসবাসের জন্য এদের পছন্দনীয় স্থান বগলতলা, বুকের মধ্যরেখা, ঘাড় এবং কাঁধ। আক্রমণ জোরালো হলে মাথার উকুন চামড়ায় প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে অথবা মাথার ত্বকে রঞ্জক পদার্থের গভীর সমাবেশ ঘটে।

বাংলাদেশে যেসব উকুন গবাদি পশুকে আক্রমণ করে তার মধ্যে গরুর উকুন Haematopinus erysternus, ঘোড়ার উকুন H. asini এবং শুকরের উকুন H. suis উল্লেখযোগ্য। Linognathus-এর কয়েকটি প্রজাতি গরু, ভেড়া,  ছাগল, এবং কুকুরকে আক্রমণ করে। মানুষ এবং  গবাদি পশু ছাড়াও অনেক উকুন প্রজাতি বণ্যপ্রাণীর দেহে পরজীবী।

Mallophaga কীটপতঙ্গদের শ্রেণি Insecta-এর একটি পৃথক বর্গ হিসেবে বর্তমানে বিবেচিত হলেও এক সময় এ বর্গকে Anoplura-এর একটি উপবর্গ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা হতো। চর্বনক্ষম মুখোপাঙ্গবিশিষ্ট এ বর্গের অধিকাংশ সদস্য পাখির বহিঃপরজীবী এবং পাখির উকুন হিসেবেই সুপরিচিত। সারা বিশ্বে এদের প্রায় ৩০০০ প্রজাতির কথা জানা গেছে। মুখোপাঙ্গ শোষণের উপযোগী না হওয়ার কারণে এরা পোষক দেহ থেকে সরাসরি কখনও রক্ত শোষণ করে না। ত্বকোদ্ভূত বস্ত্ত, লোম ও পালকের অংশ ইত্যাদি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এদের কোনো প্রজাতিই মানুষে পরজীবী নয়। মানুষের কোনো রোগের সংক্রামক অথবা বাহক হিসেবে এদের কোনো ভূমিকাও নেই। কুকুরের উকুন Trichodectes canis এক পরজীবী ফিতাকৃমি Dipylidium caninum-এর মাধ্যমিক পোষক এবং এর মাধ্যমেই এ পরজীবী এক কুকুর থেকে অন্য কুকুরে সংক্রামিত হয়।

বাংলাদেশে হাঁস-মুরগিজাতীয় পাখিদের উল্লেখযোগ্য উকুন প্রজাতিগুলি হলো Menopon gallinae, Menacanthus stramineus, Goniocotes gigas, Lipeurus caponis, এবং Chelopistes meleagridis। গরুর উকুন Bovicola bovis এদেশে প্রায় সর্বত্রই বিস্তৃত।  [এস.এম হুমায়ুন কবির]