উইলসন, হোরেস হ্যামেন


উইলসন, হোরেস হ্যামেন (১৭৮৬-১৮৬০)  প্রাচ্যবিদ, লেখক, মুদ্রা বিশারদ, অক্সফোর্ডের অধ্যাপক এবং ইন্ডিয়া অফিসের গ্রন্থাগারিক। লন্ডনের সোহো স্কয়ার ও সেন্ট টমাস হাসপাতালে শিক্ষাপ্রাপ্ত হোরেস হ্যামেন উইলসন ১৮০৮ সালে কলকাতায় আগমন করেন এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মেডিক্যাল সার্ভিসে যোগদান করেন। কিন্তু অচিরেই তিনি চিকিৎসা পেশা ত্যাগ করে কলকাতা টাকশালে মুদ্রা-ধাতু পরীক্ষক (Assay Master) হিসেবে যোগদান করেন। ১৮৩২ সালে ভারতবর্ষ ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। মুদ্রা-ধাতু পরীক্ষক হিসেবে উইলসন মুদ্রা প্রস্ত্ততকরণ প্রক্রিয়ার বহু সংস্কার সাধন করেন এবং মুদ্রাবিদ্যার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখেন। তবে প্রাচ্যবিদ্যা ও সাহিত্যকর্মে বিশেষত সংস্কৃত সাহিত্যে তাঁর অবদানের জন্যই বস্ত্তত তিনি খ্যাতি অর্জন করেন।

চার্লস উইলকিন্সহেনরি টমাস কোলব্রুক এর অনুপ্রেরণায় উইলসন প্রাচ্য বিষয়ক চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। মুদ্রা-ধাতু পরীক্ষক হিসেবে মুদ্রা ও মুদ্রা প্রস্ত্ততকরণ বিষয়ে অধ্যয়নকালে তিনি উইলকিন্স ও কোলব্রুকের সংস্পর্শে আসেন। সংস্কৃত অধ্যয়নের প্রতি তাঁরা তাঁকে উদ্যোগী করে তোলেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ভারতীয় ভাষাসমূহের আদি উৎস সংস্কৃত ভাষায় প্রভূত দক্ষতা অর্জন করেন এবং শেষ পর্যন্ত সংস্কৃত ভাষা চর্চায় তার উপদেষ্টা কোলব্রুককেও অনেকটা ছাড়িয়ে যান। কালিদাস এর মেঘদূত অনুবাদ করে (১৮১৩) সঙ্গে সঙ্গেই তিনি প্রাচ্যবিদ্যার জগতে সুনাম অর্জন করেন। এক বছর বেনারসে অবস্থান করে (১৮২০) তিনি সেখানকার সবচেয়ে খ্যাতিমান পন্ডিতদের নিকট সংস্কৃত শিক্ষালাভ করেন। সেখানে তিনি সংস্কৃত ভাষায় রচিত অনেক প্রাচীন নাটকের মূল কপি আবিষ্কার করেন। বেনারসে গবেষণাকর্মের উপর ভিত্তি করে তিনি তাঁর বিশাল কর্ম Sanskrit English Dictionary (১৮১৯) ও Theatre of the Hindus (১৮২০) রচনা করেন। তাঁর রচিত Religious Sects of the Hindus গ্রন্থে হিন্দুদের সামাজিক ক্রিয়াকর্ম, রীতিনীতি ও সামাজিক বিধিবিধান বর্ণিত হয়েছে।# #

  1.  #

উইলসন দশকুমার চরিত, মহাভারত, ঋগ্বেদ, বিষ্ণু পুরাণ অনুবাদ করেন এবং এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল ও রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালসহ সমকালীন বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রাচ্যবিদ্যা বিষয়ে বহুসংখ্যক নিবন্ধ প্রকাশ করেন।

১৮৩২ সালের শেষ দিকে অক্সফোর্ডে বোডেন অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের জন্য উইলসন ভারতবর্ষ ত্যাগ করেন। কলকাতা টাকশালের একজন মুদ্রা-ধাতু পরীক্ষক সরাসরি অক্সফোর্ডের অধ্যাপকের পদে নিয়োজিত হলেন। এটি নিঃসন্দেহে প্রাচ্যবিদ্যা বিশারদ হিসেবে তাঁর সুউচ্চ খ্যাতির পরিচায়ক। অক্সফোর্ডে তিনি Lectures on the Religious and Philosophical Systems of the Hindus (১৮৪০), Ariana Aqtinua (সংস্কৃত ব্যাকরণ) এবং A Historical Account of the Burmese War সহ বেশ কিছুসংখ্যক মৌলিক রচনা প্রকাশ করেন। উইলসন কর্তৃক সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মিলের History of British India-র দ্বিতীয় সংস্করণ এবং ম্যাকনাটেন রচিত Hindu Law-এর দ্বিতীয় সংস্করণ। সংস্কৃত ছাড়াও উইলসন বাংলা, ফারসি, আরবি ও হিন্দুস্তানি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। এ সব ভাষা ও স্থানীয় বিধিবিধান সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের ব্যাপ্তি তাঁর রচিত Glossary of Judicial and Revenue Terms (১৮৫৫) গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এটি অদ্যাবধি পন্ডিতবর্গ, আইনজীবী ও প্রশাসকদের জন্য মানসম্পন্ন রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত।

জ্ঞানসাধক হিসেবে উইলসন অসামান্য অবদান রেখেছেন। স্বল্পকালীন বিরতিসহ ১৮১১ থেকে ১৮৩২ সাল পর্যন্ত তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল-এর সেক্রেটারি ছিলেন। ১৮৩৭ সাল থেকে আমৃত্যু তিনি রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। ১৮৩৬ সালে তাঁর অন্যতম উপদেষ্টা স্যার চার্লস উইলকিন্সের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীরূপে ইন্ডিয়া হাউসের গ্রন্থাগারিক পদে যোগদানের জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অতি লোভনীয় এ দপ্তরের কর্মকান্ডের পাশাপাশি তিনি হেইলিবেরি কলেজ এ প্রাচ্যবিদ্যার অতিথি অধ্যাপকের দায়িত্ব পালন করেন। অবশ্য উইলসনের নতুন নিয়োগ অক্সফোর্ডে তাঁর পেশাগত অবস্থানের পরিসমাপ্তি ঘটায় নি। সেখানে তিনি প্রতি বছর তিনবার এক নাগাড়ে তিন সপ্তাহ ধরে বক্তৃতা দিতেন।  [সিরাজুল ইসলাম]