ইস্পাহানি পরিবার


ইস্পাহানি পরিবার  দেশের অন্যতম পুরনো পুঁজিপতি পরিবার। এই পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের সদস্যরা ঢাকা ও চট্টগ্রামে তাদের ব্যবসায়ে বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করে চলেছেন। এই পরিবারের মালিকানাধীন ১৯০ বছরের পুরনো কোম্পানিটি এই উপমহাদেশে গুণগত পণ্য ও সেবা প্রদানে অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত রেখে চলেছে। ইস্পাহানি পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা হাজী মোহাম্মদ হাশেম ইস্পাহানি (১৭৮৯-১৮৫০)। তিনি ১৮২০ সালে পারস্যের ইস্পাহান শহর থেকে ভারতবর্ষের বোম্বে নগরীতে এসে প্রথম ব্যবসা শুরু করেন। উনিশ শতকের তিরিশের দশকে তিনি তার ব্যবসা কলকাতায় প্রসারিত করেন। ভারতের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হিসেবে উক্ত দশকে হাজী হাশেম কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত আসাম টি কোম্পানির একমাত্র মুসলিম সদস্য ছিলেন। এরপর ইস্পাহানিদের ব্যবসার পরিধি ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন পশ্চিমে বোম্বে, দক্ষিণে মাদ্রাজ এবং পূর্বে বার্মা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। হাজী হাশেমের দৌহিত্র মির্জা মেহেদী ইস্পাহানি (১৮৪১-১৯১৩) ব্যবসায়িক সদর দপ্তর মাদ্রাজে স্থানান্তর করেন। তিনি দীর্ঘ ১২ বছর মিসরের কায়রোতে অবস্থান করে চামড়া, চা, মসলা এবং অন্যান্য ভারতীয় পণ্যের বিশাল ব্যবসা গড়ে তোলেন। ১৮৮৮ সালে মির্জা মেহেদী ইস্পাহানি ঢাকায় কোম্পানির একটি শাখা অফিস স্থাপন করেন। তাঁর পুত্র মির্জা মোহাম্মেদ ইস্পাহানি (১৮৭১-১৯২৫) ১৯০০ সালে কলকাতায় এমএম ইস্পাহানি এন্ড সন্স-এর একটি অফিস স্থাপন করেন। একই বছর তিনি লন্ডনেও একটি শাখা অফিস খোলেন। তার তিন পুত্র মির্জা আহমেদ ইস্পাহানি, মির্জা আবুল হাসান ইস্পাহানি ও মির্জা মাহমুদ ইস্পাহানি ১৯৩৪ সালে এমএম ইস্পাহানি নামে একটি লিমিটেড কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৭ সালের মধ্যে এমএম ইস্পাহানি লিমিটেড শাল্যাক (বার্নিশ/গালার পাত) কেইপক (জাজিম, লাইফবেল্ট), হোসিয়ান (চটের সুতা ও কাপড়), পাটের ব্যাগ, চা ও রাসায়নিক দ্রব্যের অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারক কোম্পানি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে।

বাম থেকে: মির্জা মেহেদী ইস্পাহানি (১৮৪১-১৯১৩), মির্জা মোহাম্মেদ ইস্পাহানি (১৮৭১-১৯২৫), মির্জা আহমেদ ইস্পাহানি (১৮৯৮-১৯৮৬), মির্জা মেহেদী ইস্পাহানি (১৯২৩- ), মির্জা আলী ইস্পাহানি (বর্তমান চেয়ারম্যান)

বিশ শতকের ত্রিশের দশকে মির্জা আবুল হাসান ইস্পাহানি পারিবারিক ব্যবসা পরিত্যাগ করে রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি ১৯৩৬-৩৭ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এর কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৪১-৪২ সালে কলকাতা কর্পোরেশনের ডেপুটি মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে তিনি পরপর বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। মির্জা আবুল হাসান ইস্পাহানি ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতাস্থ মুসলিম চেম্বার্স অব কমার্সের সভাপতি ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে সফররত ভারতীয় বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আবুল হাসান ইস্পাহানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন এবং ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী।

১৯৪৭ সালের পর ইস্পাহানি পরিবারের কর্পোরেট হেড অফিস পূর্ববাংলার বন্দরনগরী চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। তখন থেকে মির্জা আহমেদ ইস্পাহানির পুত্র মির্জা মেহেদী ইস্পাহানি (এ.কে.এ সদরী ইস্পাহানি) ইস্পাহানি কোম্পানির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪৯ সালে এম.এ ইস্পাহানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০০৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কোম্পানির প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মেহেদী ইস্পাহানির নেতৃত্বে কোম্পানির  মালিকানাধীন সিলেটের চা বাগানগুলোতে প্রচুর বিনিয়োগ হয় এবং চা শিল্পে ইস্পাহানি গ্রুপ ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। পাকিস্তান আমলেই ইস্পাহানি গ্রুপ ছিল চা শিল্পে একটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকার সিলেটে চা বাগানের মালিকানার উপর একটি জরিপ চালায়। এতে দেখা যায়, ১৭০টি বাগানের মধ্যে ৭৪টির মালিকানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি উদোক্তাদের হাতে, যার অন্যতম ছিল আদমজী এবং আমিন গ্রুপ। তবে শীর্ষে অবস্থানকারী কোম্পানিটি ছিল ইস্পাহানি লিমিটেড। ভারত বিভক্তির পর মুসলিম উদ্যোক্তাদের সবাই পশ্চিম পাকিস্তানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। একমাত্র ইস্পাহানি পরিবার বসবাসের জন্য পূর্ববঙ্গকে বেছে নেন। ১৯৪৭ সালের পর থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশে ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসার ও শিল্পায়নে ইস্পাহানি পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও খুলনা অফিসের মাধ্যমে ইস্পাহানি কোম্পানি চা, টেক্সটাইল, পাট, শিপিং প্রভৃতির ব্যবসা অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে কোম্পানিটি বাংলাদেশে ব্যক্তিখাতে অন্যতম বৃহৎ চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশের চা শিল্পে ইস্পাহানি গ্রুপের অবস্থান শীর্ষে। বৃহত্তর সিলেটে তাদের রয়েছে তিনটি বৃহৎ বাগান, মির্জাপুর, গাজীপুর ও জেরিন বাগান এবং চট্টগ্রামে রয়েছে নেপচুন বাগান। এসব বাগানে প্রতিবছর আনুমানিক ২৫ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়। ইস্পাহানি কোম্পানির মালিকানাধীন বাগানগুলিতে একরপ্রতি চা উৎপাদন হচ্ছে ১৮০০ কিলোগ্রামের বেশি যা বাংলাদেশে একর প্রতি চা উৎপাদনের সর্বোচ্চ মাত্রা। ইস্পাহানির বাগানগুলিতে উচ্চমানের চা উৎপাদিত হয় এবং প্রতিবছর চট্টগ্রামে প্রিমিয়াম মানের চা হিসেবে নিলামে বিক্রি হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬৭টি চা বাগান রয়েছে এবং এর মধ্যে মির্জাপুর, গাজীপুর ও জেরিন চা বাগান শীর্ষ দশটি চা বাগানের অন্তর্ভুক্ত।

ইস্পাহানি গ্রুপ দীর্ঘকাল পাট, টেক্সটাইল ও শিপিং ব্যবসার সাথে জড়িত। ১৯৪৭ সালের আগে ইস্পাহানি কোম্পানি ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় পাট রপ্তানিকারক ছিল। পূর্ববঙ্গের পাট শিল্পে এ শিল্পগ্রুপের ব্যাপক পরিমাণ বিনিয়োগ ছিল। ইস্পাহানি গ্রুপ ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় ভিক্টরী জুট প্রোডাক্টস লিমিটেড নামে একটি জুট মিল প্রতিষ্ঠা করে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর এই জুট মিল চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ইস্পাহানি গ্রুপ চিটাগাং জুট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিজেএমসিএল) নামে ব্যক্তিখাতে সর্ববৃহৎ পাটকল প্রতিষ্ঠা করে। ইস্পাহানি গ্রুপের মালিকনাধীন ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত পাহাড়তলী হোসিয়ারি মিলস (পিটিএইচএম) পূর্ববাংলায় টেক্সটাইল শিল্পের পথিকৃৎ হিসেবে ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া গত ৫০ বছর ধরে ইস্পাহানি গ্রুপ বিশ্বখ্যাত শিপিং কোম্পানিগুলোর পক্ষে এবং নন ভেসেল অপারেটিং কমন ক্যারিয়ার্স-এর স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। বস্ত্তত বাংলাদেশে শিপিং ব্যবসায়ে অন্যতম প্রাচীন সংস্থা হলো ইস্পাহানি গ্রুপ।

১৯৪৬ সালের ২৩ অক্টোবর মির্জা আহমেদ ইস্পাহানি ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ লিমিটেড নামে একটি বিমান কোম্পানি কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল পূর্ববাংলার  প্রথম বেসরকারি ও বেসামরিক বিমান পরিবহণ কোম্পানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে রাজকীয় ভারতীয় বিমানবাহিনী পূর্ব ফ্রন্টে জাপানিদের মোকাবেলার লক্ষ্যে তেজগাঁয়ে একটি বিমান অবতরণ ক্ষেত্র তৈরি করে। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে এটিকে বেসামরিক পরিবহণের কাজে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। এর সুযোগ নিয়ে ইস্পাহানি গ্রুপ ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ গঠন করে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর এটি ছিল পূর্ববঙ্গের একমাত্র বেসামরিক বিমান পরিবহণ কোম্পানি। ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালে ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজের বিমান ঢাকা ও করাচির মধ্যে চলাচল করত।  সে সময় কোম্পানিটি মাত্র দু ধরনের বিমান ব্যবহার করত, ডিসি-৩ (ড্যাকোটা) এবং ডিএইচসি-৬ (টুইন ওটার)। পাকিস্তান সরকার পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন (পিআইএ) গঠন করে বিমান পরিবহণ সম্পূর্ণভাবে সরকারি খাতে নিয়ে গেলে ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজ কোম্পানি ১৯৪৮ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশে ইস্পাহানি পরিবার সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করে চলেছে। বিশেষ করে শিক্ষার  বিস্তার ও উন্নয়নে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। এ পর্যন্ত ইস্পাহানি পরিবার নয়টি স্কুল ও কলেজ স্থাপন করেছেন। এগুলো হলো ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, মির্জা আহমেদ স্মৃতি বিদ্যালয়, সিজেএম হাই স্কুল, ওয়াইসিয়া দারুস্ সুন্না দাখিল মাদ্রাসা, মির্জা আহমেদ হাই স্কুল, ভিক্টরী হাই স্কুল, কুমিল্লা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ, ইস্পাহানি গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ (ঢাকা) ও সিদ্বেশ্বরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ।

বাংলাদেশে ইস্পাহানি পরিবার অসংখ্য দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হলো ঢাকার ফার্মগেটে অবস্থিত ইস্পাহানি চক্ষু হাসপাতাল ও এম.এ ইস্পাহানি ইন্সটিটিউট অব অফ্থ্যালমিআলজি। এই হাসপাতালটি এখন বিশ্বখ্যাত চক্ষু প্রতিষ্ঠান সাইট সেইবার্স ইন্টারন্যাশনাল এবং অরবিস-এর সাথে যৌথ কর্মসূচি পরিচালনা করেছে। এছাড়া বহুজাতিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান  স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক লিমিটেড-এর সহায়তায় এই হাসপাতাল বাংলাদেশে অন্ধত্ব দূরীকরণের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। ইস্পাহানি ইন্সটিটিউট অব অফ্থ্যালমোলজি চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথভাবে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে থাকে।  [আশফাক হোসেন]

গ্রন্থপঞ্জি SNH Rizvi, East Pakistan District Gazetteers: Sylhet, (Dacca, East Pakistan Govt. Press, 1969) pp. 191-209; Antrobus, A History of the Assam Company (Edinburgh, T and A Constable, 1957); Enayetullah Khan, New Age, 22 January 2004, Delwar Hassan (ed), Commercial History of Dhaka (DCCI, 2008).