ইসলাম, বাংলায়


ইসলাম, বাংলায়  তুলনামূলকভাবে বিলম্বে বাংলায় ইসলামের আগমন ঘটে। আবির্ভাবের মোটামুটি এ্রকশ বছরের মধ্যেই উত্তর-পশ্চিম ভারতে ইসলামের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং আরব বণিকরা বাংলাসহ ভারতের উপকূলবর্তী অঞ্চলের সংস্পর্শে আসে। কিন্তু বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য আরও প্রায় পাঁচশ বছর লেগে যায়। অসমর্থিত প্রচলিত কাহিনী মতে, মুসলমানদের রাজনৈতিক বিজয়ের আগেই কিছুসংখ্যক সুফি-সাধক বাংলায় এসেছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তেরো শতকের শুরুতে তুর্কি বিজয়ের মধ্য দিয়েই ইসলাম পূর্ণ শক্তিতে এখানে প্রবেশ করে। বর্তমানে বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুসিত দেশ। এর জনসংখ্যার প্রায় ৯০% ইসলাম ধর্মের অনুসারী।

প্রথম প্রায় তিনশ বছর বাংলা খলজী, ইলবারি ও করৌনাহ তুর্কিদের দ্বারা শাসিত হয়েছিল। পনেরো শতকের শেষ দিকে হাবশী ক্রীতদাসেরা কয়েক বছরের জন্য বাংলার সিংহাসন দখল করেন। এরপরে পর পর ক্ষমতায় আসেন সৈয়দ, আফগান ও মুগলরা। কাজেই সাধারণভাবে বলা যায় যে, বাংলার মুসলিম শাসকরা ছিলেন তুকিট্ট, আফগান ও মুগল এ তিন জাতিভুক্ত। শেষোক্তটি ছিল মূলত তুর্কিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

স্থল ও জল উভয় পথেই বাংলায় ইসলামের অনুপ্রবেশ ঘটে। স্থলপথে তুর্কি বিজেতারা তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও শাসন পদ্ধতির ধারণা নিয়ে এদেশে আসে। পক্ষান্তরে আরব বণিকরা জলপথে আসে তাদের বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের সূত্র ধরে। তারাও তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি নিয়ে এসেছিল, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ছিল তুর্কিদের চেয়ে ভিন্নতর। বিশেষত উপকূলবর্তী চট্টগ্রাম অঞ্চলসহ বাংলার কিছু অংশে  আরবদের প্রভাব লোক কাহিনীতে বিধৃত রয়েছে। কিন্তু আরবরা সম্ভবত তুর্কি বিজেতাদের মতো এত গভীরভাবে সমাজকে প্রভাবিত করেনি। তুর্কিরা রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়েই এদেশে এসেছিল। আরবরা আসত বাণিজ্য মৌসুমে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এবং মৌসুম শেষে তারা ফিরে যেত। কিন্তু তুর্কি বিজেতাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্নতর। তারা যে অঞ্চল জয় করেছে, সেখানে প্রতিষ্ঠা করেছে তাদের শাসন এবং নিজেদের অবস্থান মজবুত করার জন্য প্রয়োজনীয় অপরাপর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলায় মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এদেশে ক্রমাগত মুসলমানদের আগমন ঘটে। রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রধান অবলম্বন হিসেবে আসে সৈন্যরা; ধর্মপ্রচারের জন্য আগমন ঘটে সৈয়দ, উলামা ও মাশায়েখদের মতো ধর্মশাস্ত্রজ্ঞদের; আগমন ঘটে রাজনীতি, অর্থব্যবস্থা ও শাসনকার্যে দক্ষ বেসামরিক সরকারি কর্মচারী এবং ব্যবসায়ী ও দক্ষ কারিগরদের। তারা সবাই এসেছিল চাকরি অথবা উন্নততর জীবিকার সন্ধানে। তেরো শতকে মোঙ্গলদের হাতে বাগদাদের খিলাফতের ধ্বংসের ফলে মধ্য এশীয় মুসলমানদের ব্যাপক অভিভাসন ঘটে এবং তারা রাজধানী দিল্লি ও লক্ষ্মণাবতীতে আশ্রয় নেয়। এমনকি তারা প্রত্যন্ত এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। মধ্য এশিয়ার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলি থেকে আগত মুসলমানদের সাদরে গ্রহণ করা হয়। তারা ‘আইজ্জা’ বা সম্মানিতরূপে পরিচিত হয় এবং তাদের উপযুক্ত চাকরি বা মর্যাদা প্রদান করা হয়।

লখনৌতিতে যখন মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় তখন অন্তত তাত্ত্বিকভাবে হলেও তা ছিল আববাসীয় খিলাফতের অংশ। খলিফার ক্ষমতা হ্রাস পেলেও সর্বত্রই তাঁকে  সুন্নি মুসলমানদের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক প্রধানরূপে গণ্য করা হতো। বাংলার মুসলমানরাও ছিল এ মতের অনুসারী এবং বাংলার প্রথম দিকের কয়েকজন সুলতান বস্ত্তত তাদের মুদ্রায় আববাসীয় খলিফাদের নাম উৎকীর্ণ করেছিলেন। অপর কোনো কোনো সুলতান বস্ত্তত খলিফার নাম উৎকীর্ণ না করলেও তাদের মুদ্রায় খিলাফতের প্রতি আনুগত্য নির্দেশক উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। প্রাক-মুগল আমলে বাংলার মুসলিম রাজ্য ছিল প্রকৃতপক্ষে একটি স্বাধীন রাজ্য। এ গোটা আমলেই বাংলার শাসকরা সুলতান উপাধি গ্রহণ করেন এবং এ করে তাঁদের রাজ্যকে সালতানাতের বৈশিষ্ট্য দানের ঘোষণা দেন। বাংলার কোনো কোনো সুলতান নিজেরাই ‘খলিফা’ উপাধি ধারণ করেছিলেন। ভারতে (বা বাংলায়) মুগল শাসন প্রতিষ্ঠার বহু আগেই বাগদাদের খিলাফতের অবসান ঘটেছিল। কাজেই খিলাফত প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তাদের করণীয় কিছু ছিল না। মুগলরা ‘শাহীনশাহ’ (রাজাধিরাজ) উপাধি গ্রহণ করেন এবং শাহজাদাদের ‘সুলতান’ উপাধি প্রদান করেন। বাংলা বা সুবাহ বাঙ্গালাহ বরাবরই ছিল মুগল সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ।

তুর্কি বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে ইসলামের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং ধীরে ধীরে তা বাংলার সামাজিক-ধর্মীয় রূপ পাল্টে দেয়। রাজনৈতিকভাবে তা মুসলিম শাসনের বীজ বপন করে, কিন্তু সামাজিকভাবে গড়ে তোলে একটি মুসলিম সমাজ, যার ফলে তদানীন্তন মুসলিম বিশ্বের বিপুলসংখ্যক অভিবাসীদের জন্য বাংলার দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। এ অবস্থা তৎকালীন সমাজের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বাংলায় ইসলামের প্রসার ছিল এক সুদীর্ঘ প্রক্রিয়া।

বখতিয়ার খলজী-এর রাজ্য ছিল মুসলিম অধিকারের কেন্দ্রস্থল। গোটা বাংলাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে মুসলমানদের দুশো বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল। ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে  ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ এর অধীনে বাংলায় স্বাধীন সালতানাতের সূচনা হয়। এ সময় থেকে দুশ বছর ধরে বাংলা ছিল স্বাধীন। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় ক্ষেত্রেই এটা ছিল দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের কাল। এ যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো এ যে, এ সময়ই এ দেশ প্রথম বাঙ্গালাহ নাম পরিগ্রহ করে। এর আগে বাংলার কোনো ভৌগোলিক অখন্ডতা ছিল না এবং সমগ্র দেশের জন্য কোনো একক নামেরও উদ্ভব হয় নি। গৌড়, রাঢ়, বঙ্গ, প্রধানত এ তিন এলাকার নামেই বাংলা পরিচিত ছিল। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ এ তিন অঞ্চল জয় করে তাঁর অধীনে সমগ্র বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করার পরই বাঙ্গালাহ নামের উদ্ভব হয়। তিনি ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ এবং ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ’ উপাধি লাভ করেন। তখন থেকে বাংলার মুসলিম রাজ্য বাঙ্গালাহ রাজ্যরূপে পরিচিত হয়। ঐতিহাসিকরা এ রাজ্যকে লখনৌতির পরিবর্তে বাঙ্গালাহ রাজ্য রূপে অভিহিত করতে থাকেন। বিদেশিরাও এ নাম ব্যবহার করে যা থেকে পরবর্তী সময়ে মুগল সুবাহ বাঙ্গালাহ ও ব্রিটিশ আমলের বাংলা প্রদেশের নামকরণ হয়।

স্বাধীন সুলতানি আমলে উত্তরে কামরূপ, পূর্বে ত্রিপুরা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত দেশের সর্বত্র মুসলিম অধিকার বিস্তৃত হয়। ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ (১৩৩৮-১৩৪৯) চট্টগ্রাম জয় করেন, জালালুদ্দীন মুহম্মদ শাহ (১৪১৫-১৪৩৩) ফরিদপুর জয় করে এর নতুন নামকরণ করেন ফতেহাবাদ। নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ এর রাজত্বকালে (১৪৩৫-৩৬১৪৫৯-৬০) খান জাহান খুলনা-যশোর এলাকা মুসলিম শাসনাধীনে আনেন এবং রুকনুদ্দীন বারবক শাহ (১৪৫৯-৬০১৪৭৪) বাকেরগঞ্জ জয় করেন। এ সময় বাংলায় পুরোপুরি মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বখতিয়ার খলজী প্রতিষ্ঠিত লখনৌতির মুসলিম রাজ্য বাংলার মুসলিম রাজ্যে পরিণত হয়। মুগলরা এ রাজ্যের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রেখেছিল।  আওরঙ্গজেব এর মৃত্যুর পর মুগল শক্তির পতন যুগে সাম্রাজ্যের অন্যান্য প্রদেশের মতো বাংলাও নওয়াবদের দ্বারা মোটামুটি স্বাধীনভাবে শাসিত হয়। এ অবস্থা ১৭৫৭ সালের  পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠাই শেষ কথা নয়, মূল কথা হলো স্মরণাতীতকাল থেকে বিপুলসংখ্যক অমুসলিম অধ্যুষিত এ দেশে মুসলিম প্রভুত্ব অব্যাহত রাখা। ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এদেশের আদিবাসীরা ছিল নবাগতদের সম্পূর্ণ বিরোধী ভাবাপন্ন। তারা শুধু নিজেদের মৌলিক বিশ্বাসেই বিরোধী ছিল না, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি দিকেও তারা ছিল বিরোধী। কাজেই বাংলার মুসলিম শাসকরা গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত ইসলামে বিশ্বাসীদের মধ্যে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিস্তারের জন্য বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এ উদ্দেশ্যে তাঁরা মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলিম সমাজ ও সংস্কৃতিতে মসজিদগুলি ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলি ইসলামী ধর্মবিশ্বাসের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ  নামায আদায়ের সুযোগ দান করে। বস্ত্তত কোনো নতুন এলাকা অধিকৃত হওয়ার পর সেখানে মুসলমান বসতি স্থাপিত হলে মুসলমানদের নামায পড়ার সুবিধার্থে সেখানে মসজিদ নির্মাণ করা হতো। এভাবে আঠারো শতক পর্যন্ত যুগে যুগে অসংখ্য মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। এদের অনেকগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও কয়েকশ মসজিদ এখনও টিকে আছে। তৎকালের যে সব মসজিদ এখনও টিকে আছে তার সবগুলিই পাকা ইমারত। এ ছাড়াও ছিল মাটির তৈরী বা খড়ের চালাবিশিষ্ট অসংখ্য মসজিদ যার অস্তিত্ব বা সংখ্যা নির্ণয় করা যায় না। মসজিদের দেয়ালে স্থাপিত বা স্থানচ্যুত এবং জাদুঘরে রক্ষিত বা অন্যান্য নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরিত বহু আরবি ও ফারসি শিলালিপি পাওয়া গেছে। এ শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, মসজিদগুলি শাসকদের বা তাদের কর্মচারীদের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল। শিলালিপিগুলি সাধারণত কুরআনের আয়াত বা মহানবী (সঃ)-এর হাদীস, বা উভয় বাক্য দিয়েই শুরু হয়। শিলালিপিগুলিতে এ ধরনের ধর্মীয় ইমারত নির্মাণের জন্য পরকালে নির্মাতার জন্য অপেক্ষামান পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি থাকে। কাজেই শাসকরা তাদের ধর্মীয় কর্তব্য পালনের উপলব্ধি থেকে মসজিদগুলি নির্মাণ করেছিলেন।

অনুরূপভাবে তরুণ মুসলমান শিক্ষার্থীদের শিক্ষালাভের সুযোগ দানের উদ্দেশ্যে মাদ্রাসা, স্কুল বা কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শিশুদের প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষাদানের জন্য মসজিদগুলি মকতব হিসেবেও কাজ করত। প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্য বহু মাদ্রাসা ছিল, কিন্তু তারা বিশেষ করে শহর ও নগরগুলিতে উচ্চতর শিক্ষাদানের জন্য প্রতিষ্ঠানও স্থাপন করেছিলেন। শাসকবৃন্দ সরকারি খরচে তাদের কর্মচারীদের দিয়ে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন। মাঝে মধ্যে হিতৈষী ব্যক্তিবিশেষও এগুলি প্রতিষ্ঠা করতেন। ‘দার-উল-খয়রাত’ বা ‘বিনা-উল-খায়ের’ নামে পরিচিত কিছু কিছু আবাসিক প্রতিষ্ঠান ছিল যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীগণ থাকা ও খাওয়ার সুযোগ-সুবিধা পেতেন।  উলামা ও সুফীদের মতো ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তিরা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কিন্তু সেগুলি ছিল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট। উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ‘ইলম-ই-দ্বীন’ ও ‘ইলম-ই-শরা’ শিক্ষা দেওয়া হতো। ইলম-ই-দ্বীন বা ধর্মীয় জ্ঞান এবং ইলম-ই-শরা বা শরিয়তের জ্ঞান দ্বারা বহু কিছু বোঝানো যেতে পারে। বর্তমানের মতো ওই যুগেও আলিম হওয়ার জন্য একজন মানুষকে একটা বিশেষ স্তর পর্যন্ত লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হতো এবং তাকে কুরআন, হাদীস, তাসাওয়াফ, মন্তিক, কালাম, এবং অনুরূপ অন্যান্য বিষয় পড়তে হতো। তাকে আরবি এবং ফারসি ভাষাও শিখতে হতো।

সুফি-সাধকও তাঁদের অনুসারীদের নিয়ে আধ্যাত্মিক সাধনার সুযোগ-সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে খানকাহগুলি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেগুলি সুলতানগণ বা সুফিরা নিজেরাই প্রতিষ্ঠা করতেন, তবে সেগুলি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করত। শেখ জালালুদ্দীন তাবরিজি, শাহ জালাল, শেখ নূর কুতুব আলম এর মতো কতিপয় প্রখ্যাত সাধকের খানকাহগুলি আজও টিকে আছে। মুগল আমলের সুফিদের খানকাহগুলি এখনও বিদ্যমান। মুসলিম শাসকরা মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহর ব্যয় নির্বাহের জন্য জমি দান করতেন। তাঁরা উলামা এবং মাশায়েখদের মতো জ্ঞানী ব্যক্তিদের ভরণ পোষণের জন্যও জমি দান করতেন। এসব জমি ইনাম (পুরস্কার), ওয়াজিফা (ভাতা) এবং মদদ-ই-মাশ (জীবিকা নির্বাহের জন্য সাহায্য) রূপে প্রদান করা হতো। কাজেই উলামা ও সুফি সাধকরা জ্ঞানান্বেষণ ও আধ্যাত্মিক সাধনায় নিজেদের নিয়োজিত রাখার ক্ষেত্রে আর্থিক নিরাপত্তা ভোগ করতেন। মুসলিম শাসকরা বরাবরই উলামা, সুফি ও অপরাপর ধর্মীয় নেতাদের উৎসাহ দিয়ে এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে বাংলায় মুসলিম সমাজ বিকাশে সহায়তা করতেন।

বাংলায় মুসলিম সমাজ বিকাশ দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল। বিদেশি মুসলমানদের অভিবাসন ও স্থানীয় জনগণের মুসলিম সমাজে একীভূত হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই সমাজের গঠন বিভিন্ন শতকে ভিন্নতর ছিল। প্রাথমিক অভিবাসীরা ছিল তুর্কি এবং তারা ছিল খলজী, ইলবারি ও কারৌনা গোত্রীয়। তাদের সমর্থকরাও এসেছিল দূর-দূরান্ত থেকে। সরকারি চাকরি ও অন্যান্য বৃত্তিসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত আরব ও পারস্যবাসীরাও এসেছিল। বাংলার সুলতান রুকনউদ্দীন বারবক শাহ তাঁর প্রাসাদ ও রাজপরিবারের প্রহরার জন্য বেশ কিছুসংখ্যক হাবশী ক্রীতদাস এনেছিলেন এবং এতে মুসলিম সমাজে এক নতুন উপাদানের সংযোজন ঘটে। মুগলরা দিল্লিল অধিকার করলে আফগানরা উত্তর ভারতের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং তারা বাংলাসহ প্রত্যন্ত প্রদেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। আফগানরা বাংলায় শাসনও করেছিলেন এবং তাদের আধিপত্য কয়েক দশক ধরে বজায় ছিল। এরপরে আসে মুগলরা এবং বাংলায় নতুন করে মুসলমান অভিবাসনের সূত্রপাত হয়।

সতেরো শতকে বাংলা ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বৃদ্ধি সংস্কৃতিবান শিয়া, পারস্য দেশিয় পন্ডিত, চিকিৎসক, দার্শনিক এবং ব্যবসায়ীদের বাংলায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে প্রলুব্ধ করে। আফগান গিরিপথগুলির মধ্য দিয়ে বা সুরাট বন্দর হয়ে উত্তর ভারতের মধ্য দিয়ে স্থলপথে ভ্রমণের চেয়ে বন্দর আববাস বা বসরা থেকে সমুদ্র পথে হুগলি আসা ছিল সহজতর ও কম ব্যয়সাপেক্ষ।

মুগলদের বাংলা বিজয়ের পরে কিংবা তারও আগে থেকেই শিয়ারা বাংলায় আসতে শুরু করলেও মুগল সম্রাট জাহাঙ্গীর এর সিংহাসনারোহণের পরে সতেরো শতকের গোড়া থেকে শিয়ারা অধিক সংখ্যায় বাংলায় আসতে থাকে। শিয়া মতাবলম্বী নূরজাহানের সঙ্গে তাঁর বিয়ের পর নূরজাহানের পরিবার মুগল শাসন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে। সুবাহ্দার এবং অন্যান্য বহু উচ্চ পদের অধিকারী হিসেবে ওই পরিবারের সদস্যরাও বাংলায় আসেন। জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান এর রাজত্বকালে পারস্যবাসী বহু কবি বাংলার সুবাহদারদের দরবার অলঙ্কৃত করেছিলেন। এমনকি গোঁড়া সুন্নি মতাবলম্বী শাহ সুজা এর দরবারও ছিল বেশ কিছুসংখ্যক শিয়া পন্ডিত দ্বারা পরিবৃত। তিনি অবশ্য একজন শিয়া শিক্ষকের কাছে শিক্ষা লাভ করেছিলেন এবং তাঁর মা ও স্ত্রী ছিলেন শিয়া পরিবারভুক্ত। মীরজুমলা ও শায়েস্তা খানএর মতো বিখ্যাত মুগল সুবাহদাররা ছিলেন শিয়া। বহু শিয়া তাদের সঙ্গে বাংলায় এসে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছিলেন। শায়েস্তা খান তাঁর ছয় জন পূর্ণ বয়স্ক পুত্র নিয়ে বাংলায় এসেছিলেন এবং তাঁরা সবাই ছিলেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিক ও দক্ষ প্রশাসক। প্রাদেশিক রাজধানী থেকে সরকার ও  পরগণা, সামরিক বিভাগ থেকে রাজস্ব আদায় কেন্দ্র, র্বত্রই সুন্নি ও অন্যান্যদের সঙ্গে ইরানি ও শিয়াদের দেখা যেত।  মুর্শিদকুলী খান থেকে  সিরাজউদ্দৌলা পর্যন্ত অর্থাৎ আঠারো শতকে

সুবাহদার বা  নওয়াবগণ সবাই ছিলেন শিয়া। এ আমলে প্রশাসনের সকল শাখায়, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী (নওয়ারা ), রাজস্ব ও অন্যান্য বিভাগে শিয়াদেরই প্রাধান্য ছিল। নওয়াবরা, বিশেষত মুর্শিদকুলী খান ও তাঁর জামাতা  শুজাউদ্দীন মুহম্মদ খান রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে তাদের আত্মীয়দের নিয়োগ করতেন। আলীবর্দী খানের আমলে হিন্দু কর্মচারীরা উচ্চ পদে নিয়োজিত হলেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদগুলি তাঁর আত্মীয়, বিশেষত তাঁর পরিবারের সদস্য, এবং তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেন। ভ্রাতুস্পুত্ররা সবাই ছিলেন তাঁর জামাতা। ফলে প্রথম দিকে সুন্নি মুসলমানেরা সমাজে প্রভাবশালী হলেও মুসলিম শাসনের শেষ দিকে শিয়ারা ক্রমান্বয়ে তাদের জায়গা দখল করে নেয়।

চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বন্দর হওয়ায় বহু আরব, পারস্য দেশিয় এবং বিদেশি বণিক ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সেখানে আসে। উন্নততর জীবিকা ও লাভজনক ব্যবসার সম্ভাবনা বিদেশি মুসলমানদেরকে এদেশে আকর্ষণ করার অন্যতম কারণ। কেউ কেউ চলে গেলেও অনেকেই বাংলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। স্থানীয় অধিবাসীদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। শাসকবৃন্দসহ বহু অভিবাসীই স্থানীয় নারীদের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করয় মিশ্র বিবাহজাত সন্তানেরাও ছিল। দৃষ্টান্ত রয়েছে যে, এ সম্পর্কের ফলে জাত সন্তানেরা তাদের পিতার মর্যাদা অনুসারে সমাজে পদমর্যাদা লাভ করেছিল।

কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, মুসলমান সমাজে তুর্কি, আফগান, মুগল, আরব, পারস্যবাসী, স্থানীয় ধর্মান্তরিত লোক প্রভৃতি মিশ্র জাতির অস্তিত্ব ছিল। ১৩৫৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় অভিযানের প্রাক্কালে লখনৌতির অধিবাসীদের প্রতি জারিকৃত  ফিরুজ শাহ তুগলকের এক ঘোষণাপত্রে সমাজে বিভিন্ন শ্রেণির লোকের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। এ ঘোষণাপত্র সমাজের যে দু’স্তর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি জারি করা হয়েছিল তারা ছিলেন: (১) সাদাত, উলামা, মাশায়েখ এবং সম পর্যায়ের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ (২) খান, মালিক, উমারা, সদর, আকাবির ও মারিফ এবং তাদের অনুচর ও অনুসারীবৃন্দ। ১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে একজন হিন্দু কবির রচনায়  মুগল, পাঠান, শেখ, সৈয়দ, মোল্লা ও  কাজীর উল্লেখ করেছেন। ষোল শতকের প্রথম দিকে দুয়ার্তে বারবোসা গৌড়ের ধনী আরব, ইরানি, হাবশী ও ভারতীয়দের বিবরণ দিয়েছেন। তিনি এ সকল মুসলমানদের জীবনযাত্রার উঁচু মানের কথাও লিখেছেন। ফিরুজ শাহ তুগলকের ঘোষণাপত্র ছিল একটি সরকারি দলিল। প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলার সুলতানের বিরুদ্ধে যাদের সাহায্য সহযোগিতা তাঁর প্রয়োজন ছিল তাদের উদ্দেশ্যেই জারি করা হয়েছিল এ ঘোষণাপত্র। কাজেই তাঁরা ছিলেন সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষ যাদের বলা হত আশরাফ। এঁদের মধ্যে ধর্মীয় শ্রেণিভুক্তরা ছিলেন সাদাত, উলামা ও মাশায়েখ এবং সরকারি কর্মকর্তা শ্রেণিভুক্ত ছিলেন খান, মালিক ও উমারা।

সাদাত বা সৈয়দরা ছিলেন মহানবী (সঃ)-এর বংশধর। উলামা বা আলিমরা ছিলেন ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অথবা ধর্মতত্ত্বে পন্ডিত। তাঁরা মুসলিম আইন, যুক্তিবিদ্যা, আরবি বর্ণমালা ও ধর্মীয় সাহিত্যে প্রশিক্ষণ লাভ করতেন। মাশায়েখ বা সুফি সাধকরা ছিলেন আধ্যাত্মিক ব্যক্তি, কখনও কখনও বা সংসারত্যাগী বা কঠোর তাপস। এদের মধ্যে বিচার বিভাগীয় বা অন্যান্য ধর্মীয় পদে অধিষ্ঠিত থাকায় ধর্মতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ উলামা বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁরা ছিলেন আইনের ব্যাখ্যাকারী। বিতর্কিত বিষয়ের নিস্পত্তি করার মতো যথেষ্ট জ্ঞান ও বিশেষ দক্ষতা তাঁদের ছিল। শেখ শব্দটির অর্থ বৃদ্ধ, কিন্তু প্রায়োগিকভাবে এর অর্থ মুসলিম আইন ও ধর্মতত্ত্বে বিদ্বান ব্যক্তি। এ অর্থে তাঁরা উলামা ছিলেন। সুফিরা (শেখ) ছিলেন ওই সব আলিম যারা নিজেরাই আধ্যাত্মিক পূর্ণতা অর্জন করেছিলেন অথবা আধ্যাত্মিক পূর্ণতা অর্জনে অন্যদের সাহায্য করেছিলেন। বাংলার সুফিদের শেখ বলা হতো, কারণ বাস্তবে সুফিরা তাঁদের অতীন্দ্রিয় কার্য সম্পাদনের পাশাপাশি ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষাদানেও নিজেদের নিয়োজিত করেছিলেন। সুফিদের মখদুমও বলা হতো যার অর্থ সেবাপ্রাপ্ত। শেখ অথবা মখদুম, যে নামেই সুফিদের অভিহিত করা হোক, তাঁরা ছিলেন এমন মানুষ যারা আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত মেধার অধিকারী এবং ইসলামের মূলনীতির প্রতি অনুগত। সরল জীবনযাত্রা, চারিত্রিক বল, ধর্মের প্রতি গভীর অনুরক্তি ও শান্তির অন্বেষার জন্য তাঁরা ছিলেন বিখ্যাত। তাঁরা জনগণ ও সমাজকে অত্যন্ত গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। অন্য শ্রেণির মুসলমানরা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা ও আমলা শ্রেণিভুক্ত খান, মালিক ইত্যাদি। তারা ছিলেন সেনাবাহিনীর সদস্য, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকারী বেসামরিক কর্মকর্তা এবং মুসলিম রাজনৈতিক শক্তির প্রধান অবলম্বন।

মুসলিম বিজয়কালে বাংলা ছিল হিন্দু-বৌদ্ধ প্রধান দেশ। হিন্দু ও বৌদ্ধদের সংখ্যার অনুপাত নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এটা সত্য যে, বখতিয়ারের বিজয়ের সময় হিন্দু সেন বংশীয়রা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলেও বহু শতক ধরে বৌদ্ধরা বাংলা শাসন করেছিল। রাজা লক্ষ্মণ সেন তখন সারা বাংলায় রাজত্ব করছিলেন। তাছাড়া অনার্য উপাদান সব সময়ই বাংলায় ছিল, বিশেষত শহুরে কেন্দ্রগুলির বাইরে এবং নদীবেষ্টিত বাংলায়। নিজ জন্মভূমি অর্থাৎ উত্তর ভারত থেকে উদ্ভূত বৌদ্ধধর্ম ছিল মুসলমান বিজয়ের প্রাক্কালে হিন্দু ধর্মের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। অনার্য উপাদানগুলি কোনো না কোনো ভাবে অধঃপতিত বৌদ্ধদের সঙ্গে নিজেদের একীভূত করেছিল এবং এভাবে যখন সমাজে হিন্দু-বৌদ্ধ প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছিল তখন ইসলাম এক ত্রাতা-শক্তি রূপে আবির্ভূত হয়েছিল এবং অনেকেই এতে মুক্তি ও সাফল্যের সহজ পথ খুঁজে পেয়েছিল। এটা সম্ভবত স্থানীয় জনগণকে ইসলামে ধর্মান্তরণে প্রলুব্ধ করেছিল। এটা লক্ষ করার ব্যাপার যে, বহু শতক ধরে রাজকীয় নিয়ন্ত্রণাধীন উত্তর ভারতে ইসলাম শহুরে কেন্দ্রগুলিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলার বদ্বীপ অঞ্চলে ইসলাম গ্রামীণ মানবগোষ্ঠীকে জয় করেছিল। এ অঞ্চলে বহিরাগত লোকদের আগমন মুসলমানদের সংখ্যাধিক্যের তত বড় কারণ ছিল না যতটা ছিল হিন্দুধর্মের কঠোর বর্ণপ্রথার কারণে ইসলামে ধর্মান্তরণ। ভারত বা বাংলায় বলপূর্বক ধর্মান্তরণের কোনো প্রমাণ নেই। মুসলিম শাসনের কয়েক শত বছরে এটা আশা করা যায় না যে, সব শাসকই ধর্মীয় পক্ষপাতমুক্ত বা বলপূর্বক ধর্মান্তরণের প্রবণতা থেকে মুক্ত ছিলেন, তবে সাধারণ মত হচ্ছে যে, তা ছিল নিতান্তই সীমিত। বাংলায় ব্যাপক ধমান্তরণকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার তত্ত্ব দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায় না, কারণ বহু হিন্দু মন্ত্রীর পদসহ অন্যান্য সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। হিন্দুধর্ম একই গ্রামে দ্বিজ-ব্রাহ্মণের সঙ্গে পতিতের বসবাস নিষিদ্ধ করেছিল, তাকে সাধারণ দাসসুলভ কাজ ও ঘৃণ্য পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য করেছিল এবং বস্ত্তত করুণার অযোগ্য এক জীব হিসেবে তার সঙ্গে আচরণ করেছিল। কিন্তু ইসলাম দরিদ্র ও ধনী, ক্রীতদাস ও তার প্রভু, কৃষক ও রাজা সকলকে সৃষ্টিকর্তার দৃষ্টিতে সমান ঘোষণা করেছিল। সর্বোপরি ব্রাহ্মণরা সবচেয়ে বেশি ধার্মিক ভূমিদাসদের পরকালের জন্য কোনো আশা দিতে পারে নি। অন্যদিকে মোল্লারা যে শুধু এ জগতে সুখের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাই নয়, তারা পরজগতেও অনন্ত সুখের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সুতরাং কাঠুরে ও পানিওয়ালার মতো অতি নিম্ন শ্রেণির শ্রমজীবী, বহু হতাশ চন্ডাল ও কৈবর্ত সাম্যবাদী ইসলাম ধর্ম সানন্দে গ্রহণ করেছিল।

ধর্মান্তরণের কারণ হতে পারে রাজকীয় অনুগ্রহ লাভ, চাকরির সুযোগ ও অর্থনৈতিক সুবিধার মতো জাগতিক বিষয় অথবা ধর্মের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। উঁচু বর্ণের মানুষের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার ইচ্ছাও এর কারণ হতে পারে। শেষোক্ত কারণটি মনে হয় বাংলায় ধর্মান্তরণের ব্যাপারে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। স্থানীয় গোটা সমাজ যখন বৈষম্য ও বর্ণগত পীড়নে বিক্ষত তখন সামাজিক ন্যায়বিচার, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের নীতি নিয়ে ইসলাম ত্রাতা হিসেবে নিপীড়িত মানুষের সামনে হাজির হয়েছিল। মুসলমান সমাজে তাদের আদর্শ রাজা ও অভিজাত ব্যক্তিরা নিশ্চয়ই ছিলেন না, বরং সুফি ও আলিমরা তাঁদের আড়ম্বরহীন সরল জীবনযাত্রার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আদর্শে পরিণত হয়েছিলেন।

মুসলমানদের কত অংশ সালাত (নামায), সিয়াম (রোজা), যাকাত (দরিদ্র-কর) ও  হজ্জ এর মতো ধর্মীয় মূলনীতির প্রতি অবিচল ছিলেন সে সম্পর্কে ধারণা করতে যাওয়া নিস্প্রয়োজন, কারণ মুসলমানদের জন্য এগুলি ছিল অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। এসব মূলনীতির অনুশীলন করার সুযোগ সুবিধাও ছিল এবং এগুলি প্রচার করার জন্য ধর্মীয় নেতারাও ছিলেন।

জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগুরু অংশের, বিশেষত যারা পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল তাদের পক্ষে তেমন ধর্মনিষ্ঠ হওয়া সম্ভব ছিল না। মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসে কিছু কিছু লোকজ উপাদানের অনুপ্রবেশ অস্বাভাবিক ছিল না। এটা স্বীকার করতে হবে যে, ধর্মান্তরিত বহু মুসলমান উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া তাদের দীর্ঘদিনের রীতিনীতি, সামাজিক আচরণ এবং এমনকি হিন্দু মহাকাব্য-প্রীতি বজায় রেখেছিল। জোলা (তাঁতি), মুকেরি (পশুপালক), পিঠারি (পিঠা বিক্রেতা), কাবারি (মাছ বিক্রেতা), গরসল (মিশ্রবিবাহজাত ধর্মান্তরিত ব্যক্তি), সনকার (তাঁত প্রস্ত্ততকারক), হাজাম (খৎনাকারী), তীরকর (তীর প্রস্ত্ততকারী), কাগজী (কাগজ প্রস্ত্ততকারক), কলন্দর (ভ্রাম্যমান ফকির), দর্জি (পোশাক প্রস্ত্ততকারক), রংরেজ (বস্ত্রাদি রঞ্জনকারী), কল (রাত্রিকালীন ভিক্ষুক), কসাই (মাংস বিক্রেতা), গোলা বা গোয়ালা (দুধ বিক্রেতা) প্রভৃতি তাদের পুরনো পেশা বজায় রেখেছিল। এ শ্রেণির কোনো কোনোটি গ্রামের অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। অন্যরা বস্ত্রশিল্পে, তীরকরের মতো শ্রেণি সামরিক বাহিনীর জন্য অস্ত্র সরবরাহে জড়িত ছিল। কাগজী বা কাগজ প্রস্ত্ততকারক দফতরে বেসামরিক কর্মচারীদের জন্য এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য বই লেখার কাজে কাগজ সরবরাহ করত। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার আগে তারা যে সব পেশায় নিয়োজিত ছিল সে সব পেশা তারা অব্যাহত রেখেছিল।

হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে কয়েক শতকের পারস্পরিক সম্পর্ক উভয়কেই দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল যার ফলে মুসলমানদের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনচর্চা গভীরভাবে হিন্দুধর্মকে প্রভাবিত করে এবং একইভাবে হিন্দুদের কিছু রীতিও মুসলমানদের জীবনচর্চায় ঢুকে পড়ে। এর ফলে মুসলমানদের ধর্মীয় রীতিতে কিছু লোকজ উপাদানও দেখতে পাওয়া যায়। লোকজ উপাদানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণটি দেখা যায়  পীর প্রথায়। ফারসি ‘পীর’ শব্দটি এখন অত্যন্ত শিথিলভাবে ব্যবহূত হয় যা দিয়ে আধ্যাত্মিক পথ-নির্দেশককে বোঝানো হয় যার জন্য আগে আরবি শেখ, মুর্শিদ শব্দগুলি ব্যবহূত হতো। প্রথম দিকে পীর বলতে জীবনের আদর্শ ও নীতির প্রতি সবচেয়ে বেশি অনুগত মানুষকে বোঝাত। তারা কঠোর আত্মসংযমী ও বিশুদ্ধ জীবন যাপন করতেন। পীর প্রথা বংশানুক্রমিক ছিল না, কারণ পীরদের আধ্যাত্মিক পূর্ণতা অর্জন করতে হতো। কিন্তু পীর প্রথার এমনি অধঃপতন হয়েছিল যে কৃত্রিম কবর তৈরি করা হতো এবং পীরদের দরগাহগুলি বিখ্যাত হয়ে পড়েছিল। ভ্রাম্যমান মুসলমান ফকিররা হিন্দু মন্দির ও বৌদ্ধ বিহারগুলির অনুকরণে মধ্য এশিয়ার সুবিখ্যাত মুসলমান সুফিদের নামে কবর এবং জাঁকজমকপূর্ণ সমাধিসৌধ নির্মাণ করে জীবিকা নির্বাহ করত এবং সেখানে মানুষকে একত্রিত করার উপায় বের করত। এ দরবেশদের অলৌকিক কার্যাবলি সম্পর্কে নিষ্ঠার সাথে অবিরাম প্রচারণা চালিয়ে তারা মানুষকে, বিশেষ করে নিম্নশ্রেণীর মানুষকে আকর্ষণ করত। বাংলায়  সত্যপীর ও  পাঁচপীর সম্পর্কিত কর্মকান্ডও বিকাশ লাভ করে এবং সত্যপীর ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে বেশ কিছু গ্রন্থও রচিত হয়। মুসলমান লেখকরা তাকে সত্যপীর নামে অভিহিত করে এবং হিন্দুদের কাছে তিনি সত্যনারায়ণ রূপে পরিচিত হন। প্রকৃতপক্ষে, সত্যপীর ও সত্যনারায়ণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। বিশ শতকের গোড়ার দিকেও বাংলার উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে সত্যপীর বা সত্যনারায়ণের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ লক্ষ করা যায়। কিন্তু তাদের সম্পর্কে প্রচলিত কাহিনীগুলি ষোল শতক থেকে লোকের মুখে মুখে চলে এসেছে। পাঁচ পীরের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনও লোকপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। অনেক স্থানেই পাঁচ পীরের দরগাহ দেখা গেলেও পাঁচ জন পীরের স্বীকৃত কোনো তালিকা পাওয়া যায় না। স্থানীয় দুএকজন পীরের নাম সার্বজনীনভাবে সব তালিকায় পাওয়া গেলেও তালিকাগুলিতে পীরদের নামের বিভিন্নতা দেখা যায়। সরল বিশ্বাসী জনগণের কাছে বেশ কিছু কল্পিত পীরও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল। তাদেরকে মানিক পীর, ঘোড়া পীর, কুম্ভীরা পীর এবং মাদারী পীরের মতো বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়। বিপদ থেকে মুক্তি কামনা করে তাদের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন করা হয়। উদাহরণ, মানিক পীরকে দুধ ও ফল অর্ঘ্য হিসেবে নিবেদন করা হয় এবং বিভিন্ন অঞ্চলে মানিক পীরের গান নামে পরিচিত লোকগীতি রচিত ও গীত হয়। কোনো কোনো দরগাতে লোকে নিকটবর্তী গাছের ডালে রঙিন সূতা বাঁধে এবং পাথর বা দেওয়াল চুনকাম করে। মাঝে মাঝে লোকজন দরগাহ সংলগ্ন পুকুরে মাছ বা কচ্ছপের জন্য ভোজ্যদ্রব্য উৎসর্গ করে। এসব মাছ বা কচ্ছপ মাদারি নামে অভিহিত। বদিউদ্দীন শাহ মাদারের শিষ্যদের মাদারি বলা হয়। কিন্তু মাছ বা কচ্ছপকে মাদারি নাম দেওয়া থেকে বোঝা যায় যে, লোকে এর আদি অর্থ ভুলে গিয়েছিল।

ইসলামের অন্য একটি লোকজ উপাদান হলো মোল্লাতন্ত্র। সাধারণত অল্প শিক্ষিত মুসলমানরা তাদের কাছে উপদেশ চেয়ে থাকে এবং মোল্ললারা গ্রামের মুসলমানদের বিয়ে-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে পর্বসংক্রান্ত বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পশু জবেহ করে এবং কুদৃষ্টি থেকে মুক্তিপ্রার্থীকে তাবিজ দান করে তাদের সাহায্য করে। তারা মসজিদ ও মকতবে শিশুদের শিক্ষাদানও করে এবং এ কাজের জন্য তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। মুসলমানরা পাথরে উৎকীর্ণ মহানবী (সঃ)-এর পদাঙ্ককেও শ্রদ্ধা করে। বাংলাদেশে মহানবী (সঃ)-এর পদাঙ্ক সম্বলিত বহু ইমারত রয়েছে যেমন, নারায়ণগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জের কদম রসুল, চট্টগ্রাম শহরের কদম মুবারক এবং চট্টগ্রামের চন্দনাইশের অন্তর্গত বাগিচাহাটের  কদম রসুল

শিয়ারাও বেশ কিছু রীতি নীতি ও ধর্মীয় পর্ব নিয়ে এসেছিল। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারবালায় ইমাম হোসেন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের শোকাবহ মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত মহরমের পর্ব। মুগল আমলের শেষ দিকে এ উৎসব ঢাকা ও মুর্শিদাবাদের মতো স্থানে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা হতো। এ উৎসব পালনে শিয়া  নওয়াব ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। মুসলমান কবিরা মহরম নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছিলেন। জারিগান নামে অভিহিত লোকগীতি আজও অত্যন্ত জনপ্রিয়। তখনকার দিনে জাঁকজমক, সমারোহ এবং কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মরণে তীব্র শোকের সঙ্গে তাজিয়া মিছিল করা হতো।

মুসলমানদের জন্ম, বিয়ে ও মৃত্যু সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা সুনির্দিষ্ট কিছু বিধিবিধান দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু এখানেও হিন্দু রীতির অনুপ্রেবেশ ঘটে। সামাজিক জীবনেও মুসলমানরা কিছু কিছু হিন্দু রীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, যেমন, মুসলমানদের আশরাফ এবং আতরাফের (আজলাফ) মধ্যে পার্থক্য হিন্দুদের বর্ণবৈষম্যের চেয়ে তেমন কিছু ভিন্নতর ছিল না। মুসলমান আমলের প্রথমার্ধে সামাজিক পার্থক্য তেমন তীব্র ছিল না। কিন্তু মুগল আমলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বিশেষ করে নদীবেষ্টিত অঞ্চলে ইসলাম বিস্তার লাভ করলে কৃষক, তাঁতি এবং অনুরূপ পেশাগ্রহণকারীরা নিম্ন বা আতরাফ শ্রেণিভুক্ত হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদ্পদ লোকেরাও ছিল আতরাফ শ্রেণিভুক্ত, কারণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তারা তাদের ভাবাদর্শগত স্তরকে উন্নীত করলেও তাদের অর্থনৈতিক মানের উন্নতি ঘটাতে পারে নি।

বাংলায় ইসলামের আবির্ভাব ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যকে প্রচন্ড আঘাত হানে। রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে উচ্চ বর্ণের গুরুত্ব যথেষ্ট হ্রাস পায়। শুধু ইসলামই নয়, বরং মনসা, চন্ডী ও ধর্মপূজার মতো অপরাপর অনেক শক্তিই ছিল ব্রাহ্মণ্য রীতির বিরোধী এবং তাদেরকে ইসলামে ধমান্তরণের প্রভাবাধীন করা ছিল সহজতর। এসব প্রতিদ্বন্দ্বিতার মোকাবেলা করতে গিয়ে ব্রাহ্মণরা তাদের বর্ণ-প্রথা আরও কঠোর করে তোলে। ন্যায়ের নবদ্বীপ ধারা প্রতিষ্ঠা, রঘুনন্দন ও তার সমকালীন ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক বেশ কয়েকটি স্মৃতিগ্রন্থ রচনা এবং সংস্কৃত গ্রন্থগুলিতে অন্তর্ভুক্ত সংস্কৃতির পুনঃপ্রচলন থেকে ব্রাহ্মণদের মনোভাবের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এটা অবশ্য ছিল নেতিবাচক পথ। ধর্মীয় বিধিবিধানকে আরও উদার করে বৈশ্য ও শুদ্রদের মতো নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের ইসলামের প্রভাব থেকে দূরে রাখার বদলে তারা বর্ণ-বিধিগুলিকে কঠোর করে ফেলে। এভাবে তারা নিজেদেরকে জনসাধারণের কাছ থেকে আরও দূরে সরিয়ে নেয়। তারা সমাজের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায়  মনসাচন্ডী ও  নাথ পূজা পদ্ধতির অনুরাগীরা সংখ্যায় অন্যদের বহুগুণে ছাড়িয়ে যায়। দীর্ঘ দিন ব্রাহ্মণদের পক্ষে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। একই দেশে বাস করে তাদের ম্লেচ্ছ বা অস্পৃশ্যরূপে বিবেচিত মুসলমান, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের সংস্পর্শে আসা ছিল অবশ্যম্ভাবী। এতে তাদের বর্ণের পবিত্রতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগকে বলা হতো যবন-দোষ। যবন-দোষ ছাড়া নিঃসন্তান হওয়া, নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে বিয়ে করা, দুষ্ট নারীকে বিয়ে করা, ব্রাহ্মণ হত্যা, ব্যাভিচারের অপরাধ ব্রাহ্মণদের সামাজিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারত এবং এর ফলে তারা তাদের বর্ণের পবিত্রতা হারাত। কাজেই ব্রাহ্মণদের নিজেদের মধ্যেই এ নঞর্থক ও আত্মঘাতী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কোনো কোনো শ্রেণির মধ্যে এ ধারনা বিস্তার লাভ করে যে, ব্রাহ্মণরা সমকালীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে পাল্লা দিতে এবং নিজেদের সামাজিক বিধিনিষেধগুলিকে উদার করতে না পারলে তারা ইসলামের অগ্রগতিকে রোধ করতে পারবে না। এ শ্রেণি ছিল প্রগতিশীল শ্রেণির প্রতিনিধি এবং তাদের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদের প্রতিষ্ঠাতা চৈতন্যদেব। শ্রী  চৈতন্য ছিলেন একজন মহান সংস্কারক। তিনি বর্ণহীন সমাজের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। কাজেই বাংলায় ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব দেখা যায় ব্রাহ্মণদের ক্ষয়িষ্ণু প্রাধান্যে, ব্রাহ্মণদের নিজেদের মধ্যে সামাজিক বিপ্লবে মনসা, চন্ডী এবং নাথদের মতো স্থানীয় পূজা পদ্ধতির প্রসারে এবং হিন্দুধর্মকে রক্ষার উপায় হিসেবে প্রধানত বর্ণহীনতার আবেদন নিয়ে গৌড়ীয়  বৈষ্ণববাদএর উদ্ভবে।

মুসলমানরা তাদের সঙ্গে নিজেদের খাদ্যাভ্যাস, রন্ধনকলা ও পোশাক নিয়ে এসেছিল। কিন্তু স্থানীয় আবহাওয়া অনুযায়ী তাদের এগুলিকে মানিয়ে নিতে হয়েছিল। মুসলমানদের বাংলায় আসার আগেই ইসলামী স্থাপত্যশিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। স্থাপত্যশিল্পে গম্বুজ ও মিনার শিখর বা পিরামিড আকৃতির স্থান দখল করে। ধর্মীয় এবং পার্থিব উভয় ধরনের ইমারতগুলিই মুসলমান স্থাপত্যশিল্পের প্রতিনিধিত্ব করে। মসজিদ ও মাযার (সমাধি) ছিল ধর্মীয় স্থাপত্যশিল্পের অন্তর্গত। পক্ষান্তরে পার্থিব ইমারতগুলি ছিল বাসভবন, প্রদর্শনী শিবির, তোরণ, কূপ, সেতু, বাগান ইত্যাদির মতো বিভিন্ন স্থাপত্য নমুনার। মুসলমানরা তাদের অট্টালিকাগুলিতে চুন, বালি ও পানির মিশ্র ব্যবহারেরও প্রচলন করেছিল।

তবে বাংলায় মুসলমানদের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বাংলা সাহিত্যের বিকাশে। দুটি ভাষা নিয়ে মুসলমানরা বাংলায় এসেছিল, ধর্মীয় ভাষা হিসেবে আরবি এবং সংস্কৃতির ভাষা হিসেবে ফারসি। তাদের মাতৃভাষাও ছিল ক্ষেত্রানুসারে তুর্কি বা পশ্তু। বাংলার ভাষা ছিল  বাংলা ও  সংস্কৃত। তবে সংস্কৃত ছিল ধর্ম ও সংস্কৃতি দুটিরই ভাষা। ব্রাহ্মণরা বেদের ভাষা অর্থাৎ সংস্কৃত ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় ধর্মীয় গ্রন্থ রচনাকে ধর্মদ্রোহিতার শামিল বিবেচনা করত। ধর্মগ্রন্থগুলি ছিল শূদ্রদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সুতরাং হিন্দু আমলে ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য ছিল বাংলা সাহিত্যের বিকাশের পথে এক বিরাট অন্তরায়। হিন্দু আমলে দরবারের ভাষাও ছিল সংস্কৃত। ফলে শাসক ও শিক্ষিত লোকের আগ্রহ ছিল শুধুমাত্র সংস্কৃত ভাষায়। মুসলমানদের বিজয়ের পরে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে; ফারসি হয় দরবারের ভাষা এবং সংস্কৃত পেছনে পড়ে যায়। স্থানীয় গুণীব্যক্তিরা নিজেদের ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় প্রেরণা লাভ করে। সৌভাগ্যক্রমে মুসলমান শাসকরা সহিষ্ণু ছিলেন। তারা স্থানীয় ভাষা ও সাহিত্য চর্চাকে উৎসাহিত এবং হিন্দু কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। এর ফলে সুলতানি আমলে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। কবিদের প্রায় সকলেই মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে বারবক শাহ,  হোসেন শাহনুসরত শাহ এবং মুসলিম কর্মকর্তা পরাগল খান ও ছুটি খানের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। ষোল শতক থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে মুসলিম কবিরা নিজেরাই বাংলা ভাষায় কবিতা লিখেছিলেন। তাছাড়া মুসলমান শাসনের ফল হিসেবে বাংলা ভাষায় বহু আরবি ও ফারসি শব্দ মিশে যায়। এ ভাষাগুলি থেকে বাংলা ভাষায় ধার করা শব্দের সংখ্যা কয়েক শ বা এমনকি হাজারও হতে পারে এবং এর ফলে বাংলা ভাষার শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হয়। মুসলমানরা বাংলা ভাষায় রোমান্টিক সাহিত্যের প্রচলন করে। হিন্দুরা প্রধানত দেবদেবী কেন্দ্রিক ধর্মীয় বিষয়বস্ত্ত নিয়ে লিখেছিল, পক্ষান্তরে মুসলমানরা সাহিত্যে মানব-মানবীর প্রেম কাহিনীর প্রচলন করে।

মুসলমানরা বিভিন্নভাবে স্থানীয় অধিবাসীদের সংস্পর্শে আসে। ‘থানা’-র মতো সামরিক প্রতিষ্ঠান বা শান্তিপ্রিয় মানুষের বসতিগুলিতে তারা বিচ্ছিন্ন ও নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে নি। তাদের প্রাত্যহিক জীবনে, বাজারে, বন্দরে এবং বাণিজ্যকেন্দ্রগুলিতে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই পরস্পরের অধিকতর কাছাকাছি এসেছিল। মুগল রাজস্ব ব্যবস্থা সাধারণ মানুষকে আরও কাছে নিয়ে এসেছিল। টোডরমলের ‘জাবতি’ নামে অভিহিত ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা কখনও বাংলায় প্রয়োগ করা হয় নি, কিন্তু মুগল প্রাদেশিক শাসনে সম্প্রসারিত সচিবালয় সংক্রান্ত কর্মকান্ডে অংশ লাভের জন্য বাংলা মাতৃভাষাভাষী উচ্চাকাঙক্ষী স্থানীয় মুসলমান ও হিন্দু উভয়েই ফারসি শিখতে বাধ্য হয়েছিল। বাংলায় দালালদের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব সংগ্রহ করা হতো। বাংলার সুলতানদের থেকে ভিন্ন মুগল সুবাহদারদের বাংলা শেখার কোনো কারণ ঘটে নি। এ কারণে  সুবাহদারএর দরবারে স্থানীয়  জমিদারদের প্রতিনিধিদের ফার্সিতে দক্ষ ব্যক্তি হতে হতো। এভাবে সুবাহদারের দরবার থেকে বাংলার রাজা ও জমিদারদের দরবারে পারস্যদেশীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটে। মুগল শাসনামলের প্রথম দিকে রাজস্ব, হিসাব এবং সচিব সংক্রান্ত বিভাগের উচ্চতর পদগুলি পাঞ্জাব ও আগ্রার ক্ষত্রিয় এবং উত্তর প্রদেশের লালাদের মতো উত্তর ভারতীয় মুসলমান ও হিন্দুদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। মুর্শিদকুলী খানের সময় থেকে এ নীতি পরিত্যাগ করা হয়। তিনি স্থানীয় এক শাসকশ্রেণীর প্রতিষ্ঠা করেন এবং উচ্চ পদগুলিও ফারসি ভাষায় অত্যন্ত দক্ষ হিন্দু ও মুসলমানদের হাতে চলে যায়। এভাবে ফারসি ভাষা হিন্দু সমাজেও মুসলমানদের চেয়ে কম বিস্তার লাভ করে নি। সুতরাং জন্মভূমিতে আবির্ভাবের কয়েকশ বছর পরে বাংলায় আগত ইসলাম ধর্ম এদেশের মানুষ ও সমাজকে অত্যন্ত গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।  [আবদুল করিম]

গ্রন্থপঞ্জি  JN Sarkar, Islam in Bengal, Calcutta, 1972; A Karim, Social History of the Muslims in Bengal, 2nd edition, Chittagong, 1985; M Titus, Indian Islam, London, 1930; Richard M Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760, OUP, 1994; James Wise, ‘The Muhammadans of Eastern Bengal’, Journal of the Asiatic Society of Bengal, vol. 63, 1894, pp. 28-63; Abdul Momin Chowdhury, ‘Conversion to Islam in Bengal: An Exploration’, Islam in Bangladesh (ed. Rafiuddin Ahmad), Dhaka 1983; Rahim M Abdur, Social and Cultural History of Bengal, vol. I, Karachi, 1963; Asim Ray, The Islamic Syncretistic Tradition in Bengal, 1983; Akbar Ali Khan, Discovery of Bangladesh: An Explorations into the Dynamics of a Hidden Nation, 1997.