ইসলাম, এম আমিরুল


ইসলাম, এম আমিরুল (১৯১৮-২০০১)  বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ; জন্ম  নোয়াখালী জেলায়। আমিরুল ইসলাম ১৯৩৬ সালে এন্ট্রান্স ও ১৯৩৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন এবং উভয় পরীক্ষাতেই প্রথম বিভাগ লাভ করেন। তিনি রসায়ন বিভাগ,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিসহ ১৯৪১ সালে বি.এসসি (সম্মান) ডিগ্রি এবং ১৯৪২ সালে এম.এসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। এম আমিরুল ইসলাম ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে প্রথম শ্রেণি অর্জনকারী প্রথম মুসলমান ছাত্র। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৯ সালে মৃত্তিকা বিজ্ঞানে পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

এম আমিরুল ইসলাম

পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জনের পর ড. ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নব প্রতিষ্ঠিত মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫০ সালে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং ১৯৬১ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কৃষি রসায়নবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তিনি  কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি সংক্রান্ত গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মৃত্তিকা ও কৃষি গবেষণায় তাঁর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে  পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)-এর মৃত্তিকার প্রথম প্রযুক্তিগত শ্রেণিবিন্যাস। এ শ্রেণিবিন্যাসে সমগ্র দেশকে সাতটি প্রধান মৃত্তিকা এককে বিভক্ত করে  সেভেন সয়েল ট্র্যাক্ট হিসেবে নামকরণ করা হয়। এ শ্রেণিবিন্যাস পরিকল্পনাকে পরবর্তী সময়ে ‘Seven Soil Tracts System of Bangladesh’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের মৃত্তিকার আধুনিক শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তি হিসেবে পরিচিত। কৃষিক্ষেত্রে  সার প্রয়োগের ফলাফল পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সার নির্দেশিকার উন্নয়ন সাধন ড. ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তিনি ১৯৬১ সালে মৃত্তিকা জরিপ অধিদপ্তরে যোগদান করেন এবং ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ দায়িত্বে থাকাকালে তিনি বাংলাদেশে আধুনিক  মৃত্তিকা জরিপ প্রক্রিয়ার প্রবর্তন করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি মৃত্তিকা জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে উন্নীত হন। ড. ইসলাম ১৯৬৭ সালে তৎকালীন সরকারের কৃষি বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রথম পরিচালক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। তিনি ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত  বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিরি)-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে  ধান গবেষণার একটি উৎকর্ষ কেন্দ্ররূপে গড়ে তোলেন। আধুনিক বৈচিত্র্যপূর্ণ উচ্চ ফলনশীল ধান উদ্ভাবনে তাঁর অবদানের ফলে বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন অনেকটা সম্ভব হয়েছে। আমিরুল ইসলাম ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা পরিষদ-এর নির্বাহি সহ-সভাপতি হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৯ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য (বহিরাগত) হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়া তিনি ফাও, ইউএনডিপি, সিরডাপ প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটকে একটি উৎকর্ষ ধান গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলায় আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) তাঁকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করে এবং ইরি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে তাঁর নিষ্ঠাপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ আমিরুল ইসলাম পুনরায় ইরি-র সম্মাননা স্মারক লাভ করেন। বিরি-তে তাঁর প্রশংসাপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিরি-র বোর্ড অব গভর্নরস তাঁর জীবদ্দশায়ই বিরির গবেষণাগারকে ‘আমিরুল ইসলাম গবেষণাগার’ হিসেবে নামকরণ করে। ড. ইসলাম সুশীল সমাজের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তিনি  বাংলাদেশ মৃত্তিকা বিজ্ঞান সমিতি এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর দা অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স-এর সদস্য এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমীর ফেলো ছিলেন। ২০০১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়।  [আমিনুল ইসলাম]