ইবরাহিম খান ফতেহ জঙ্গ


ইবরাহিম খান ফতেহ জঙ্গ  ওরফে মির্যা ইবরাহিম বেগ, বাংলার মুগল সুবাহদার (১৬১৭-১৬২৪)। তিনি ছিলেন মির্যা গিয়াস বেগের পুত্র ও সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ভ্রাতা এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত মনসবদার। সম্রাট আকবরের সময়ের একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ রাজকর্মচারী হিসেবে ইবরাহিম খান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এক সময় তিনি প্রাসাদের ওয়াকিল-ই-দার (প্রধান কর্মাধ্যক্ষ) এবং পরে বিহারের শাসনকর্তা ছিলেন। বিহারের শাসনকর্তা থাকাকালে তিনি খোকার এলাকা অধিকার করেন এবং সেখানে বহুমূল্য হিরক খনি তাঁর আয়ত্তে আসে। এই সাফল্যের স্বীকৃতি স্বরূপ একজন মনসবদার হিসেবে তাঁর পদমর্যাদা উন্নীত করা হয় এবং তিনি ‘ফতেহ জঙ্গ’ খেতাবে ভূষিত হন।

নতুন সুবাহদার হিসেবে ঢাকায় আসার পথে তিনি পদচ্যুত সুবাহদার কাশিম খান চিশতি কর্তৃক প্রবলভাবে বাধাপ্রাপ্ত হন। কাশিম খান চিশতি পূর্বতন সুবাহদার ও তাঁর ভাই ইসলাম খান চিশতির সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছিলেন। এ সম্পত্তির অধিকার নিয়ে তিনি নতুন সুবাহদার ইবরাহিম খানের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষে লিপ্ত হন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বিতাড়িত হন।

ইবরাহিম খানের উল্লেখযোগ্য সামরিক কৃতিত্ব হচ্ছে ত্রিপুরা রাজ্য জয় (১৬১৮), কামরূপে বিদ্রোহ দমন, মগদের আক্রমণ প্রতিহত করা (১৬২০) এবং হিজলির জমিদার বাহাদুর খানের বিদ্রোহ দমন (১৬২১)। তাঁর সুবাহদারি আমলে বহিঃশত্রুর বড় ধরনের কোনো আক্রমণ থেকে বাংলা সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল।

অভ্যন্তরীণ শাসনের ক্ষেত্রে ইবরাহিম খান রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও রাজবন্দিদের মুক্তিদানের নতুন নীতির সূচনা করেন। সম্রাটের নিকট তাঁর সুপারিশের ফলে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের পুত্রগণ এবং কোচ রাজা লক্ষ্মী নারায়ণ ও পরীক্ষিৎ নারায়ণকে মুক্ত করে বাংলায় ফেরত পাঠানো হয়। ইসলাম খানের সময় থেকে মুসা খানের নেতৃত্বাধীন যে সকল প্রভাবশালী জমিদার জাহাঙ্গীরনগরে কড়া নজরদারিতে আটক ছিলেন, তাদেরও মুক্তি দেওয়া হয় (১৬১৮)। এ রাজনৈতিক অনুকম্পার ফলে দুই কোচ রাজা ও জমিদারবর্গ বাংলায় মুগল শাসনের অনুকূলে মূল্যবান অবদান রাখেন।

ইবরাহিম খান ফতেহ জঙ্গের শাসনকালে দেশে পূর্ণ শান্তি ও শৃঙ্খলা বিরাজ করে। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সাধনে সৎ প্রয়াস, স্বীয় মেজাজের উপর নিয়ন্ত্রণ, সংযম ও মিতাচার, সৌহার্দ্য ও সমঝোতার মনোভাব এবং সর্বোপরি সহজাত মহত্ত্ব ও মার্জিত আচরণ ছিল তাঁর প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এসকল গুণাবলি তাঁর বন্ধু ও শত্রুদের নিকট তাঁকে সমভাবে প্রিয় করে তুলেছিল। তাঁর সময়ে কৃষি ও বাণিজ্যকে উৎসাহিত করা হয় এবং শিল্প কারখানায় উৎপাদনের মানের উৎকর্ষ সাধিত হয়। এ সময় ঢাকাই মসলিন ও মালদহের রেশম বস্ত্র গুণগত মানে চরমোৎকর্ষ লাভ করে। তাঁর শাসনকালেই বাংলায় প্রথম ইংরেজদের আগমন ঘটে পথের ধারের ফেরিওয়ালারূপে এবং তারা বালাশোরের নিকটে পিপলের কোনো এক স্থানে একটি ছোট বসতি গড়ে তোলে। ইবরাহিম খান ঢাকায় একটি দুর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করান (বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগার অঙ্গনে)।

বিদ্রোহী শাহজাদা শাহজাহানের বাংলায় প্রবেশের (নভেম্বর ১৬২৩) ফলে ইবরাহিম খানের সময়ে প্রদেশের শান্তি শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়। আগ্রা ও দাক্ষিণাত্য থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর শাহজাহান এখানে একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল খুঁজে পান। সম্রাট ও তাঁর পুত্রের মধ্যকার এ সংঘর্ষে ইবরাহিম খান এক অপ্রীতিকর অবস্থার মুখোমুখি হন। অবশ্য তিনি আমৃত্যু সম্রাটের পক্ষেই ছিলেন। কিন্তু তিনি বিদ্রোহী শাহাজাদার অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন। শাহজাহান বিনা বাধায় মেদিনীপুর ও বর্ধমানে প্রবেশ করেন। ইবরাহিম খানের সংশয় এবং কার্যতঃ নিষ্ক্রিয়তার ফলে শাহজাহান আকবরনগরে প্রবেশ করার সুযোগ পান। অবশেষে ইবরাহিম খান বিদ্রোহীর মোকাবেলার জন্য সমর প্রস্ত্ততি নেন। বিদ্রোহী বাহিনীর সংখ্যাধিক্য তাদের বিজয় নিশ্চিত করে। ইবরাহিম খান মুষ্টিমেয় সৈন্য নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নিহত হন (২০ এপ্রিল ১৬২৪)। তিনি রাজমহলে একটি সৌধে সমাহিত আছেন।  [মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]