ইবনে বতুতা


ইবনে বতুতা (১৩০৪-১৩৭৮)  মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় সফর করেন। তাঁর পুরো নাম শেখ আবু আবদুল্লাহ মুহম্মদ। বাংলায় সফরের উদ্দেশ্য তিনি নিজেই তাঁর ভ্রমন কাহিনীতে উল্লেখ করেছেন এবং তা ছিল কামরূপের পার্বত্য অঞ্চলে বিখ্যাত সুফিসাধক শেখ জালালউদ্দিনের (হযরত শাহজালাল মুজার্রদ-ই-ইয়েমেনী) দর্শন লাভ। ইবনে বতুতা ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে একুশ বছর বয়সে বিশ্ব সফরে বের হন এবং আট বছরের মধ্যে সমগ্র উত্তর আফ্রিকা, আরব, পারস্য, ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরবর্তী অঞ্চল ও কনস্টান্টিনোপল পরিভ্রমণ করেন। এরপর তিনি ভারতে আসেন। ১৩৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিল্লিতে পৌঁছেন। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুগলক তাঁকে দিল্লির কাজী নিযুক্ত করেন। প্রায় আট বছর তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। এরপর সুলতান তাঁকে চীনে রাষ্ট্রদূত করে পাঠান (১৩৪২)। পথে জাহাজডুবির ফলে তাঁর আর চীনে যাওয়া হয় নি। তিনি মালয় দ্বীপপুঞ্জে যান এবং সেখানে এক বছর বিচারক পদে কাজ করেন। ১৩৪৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি সিংহল অভিমুখে রওনা হন এবং সেখান থেকে দক্ষিণ ভারতে পৌঁছেন। মাদুরায় কিছুকাল অবস্থানের পর তিনি বাংলা অভিমুখে রওনা হন।

বাংলার যে শহরে ইবনে বতুতা প্রথম পৌঁছেন (৯ জুলাই ১৩৪৬) তার নাম তিনি উল্লেখ করেছেন সাদকাঁও (চাটগাঁও)। সেখান থেকে সরাসরি তিনি কামারু (কামরূপ) পার্বত্য অঞ্চল অভিমুখে রওনা হন। সাদকাঁও থেকে কামারু তাঁর বর্ণনায় এক মাসের পথ। এরপর সেখানে তিনি সুফিসাধক শেখ জালালউদ্দিনের সঙ্গে তাঁর খানকায় সাক্ষাৎ করেন। দরবেশের খানকায় তিন দিন অবস্থানের পর তিনি আন-নহর উল-আয্রাক (নীল নদী অর্থে) নদীর তীরবর্তী হবঙ্ক শহর অভিমুখে রওনা হন। এই নদীপথে ১৫ দিন নৌকায় ভ্রমণের পর তিনি সুনুরকাঁও (সোনারগাঁ) শহরে পৌঁছেন (১৪ আগস্ট ১৩৪৬)। সোনারগাঁ থেকে একটি চীনা জাহাজে করে তিনি জাভার উদ্দেশে রওনা হন।

সাদকাঁও (চট্টগ্রাম) শহরে উপস্থিতির সময় থেকে সুনুরকাঁও (সোনারগাঁ) ত্যাগ করে জাভার উদ্দেশে রওনা হওয়া পর্যন্ত সময়কালে বাংলায় ইবনে বতুতার সফরের মেয়াদ ছিল দুই মাসেরও কম সময় (১৩৪৬ সালের জুলাই ও আগস্ট মাস)।

ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনী ১৩৫৫ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হয়। ১৩২৫ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে সফর সম্পন্ন করে ইবনে বতুতা তাঁর নিজ ভূমি মরক্কোতে ফিরে যান এবং জীবনের অবশিষ্ট সময় সেখানেই কাটান (মৃত্যু ১৩৭৮ খ্রি:)। মরক্কোর সুলতান আবু ইনান মারিনির নির্দেশে ইবনে বতুতা তাঁর সফরের অভিজ্ঞতা সুলতানের সচিব আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদ বিন মুহম্মদ ওরফে ইবনে জুযাইর নিকট বর্ণনা করেন। ইবনে জুযাই ভ্রমণবৃত্তান্ত আরবি ভাষায় লিপিবদ্ধ করে ‘রেহ্লা’ শিরোনামে সংকলন করেন। ইবনে বতুতার ভ্রমণ কাহিনী সম্বলিত এ গ্রন্থের পুরো নাম তুহফাতুন-নুজ্জার ফি গারাইবিল আমসার ওয়া আজাইবিল আস্ফার।

ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও নদীর ভৌগোলিক বিবরণ দিয়েছেন। স্থানগুলো হলো সাদকাঁও, কামারু, হবঙ্ক ও সুনুরকাঁও এবং নদী গঙ্গা, যুন ও আন-নহর উল-আয্রাক। সাদকাঁওকে তিনি বলেছেন বিশাল সমুদ্র উপকূলবর্তী বাঙ্গালাহ এক বৃহৎ শহর। এর নিকটেই গঙ্গা ও যুন নদী মিলিত হয়ে সমুদ্রে পতিত হয়েছে। কামারুকে (কামরূপের অসম্পূর্ণ প্রকাশ) বর্ণনা করা হয়েছে চীন থেকে তিববত পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল পার্বত্য অঞ্চলরূপে। ইবনে বতুতা কামারু নামীয় যে স্থানটি পরিদর্শন করেন সম্ভবত তা ছিল খাসিয়া, জৈন্তিয়া ও ত্রিপুরা পাহাড় বেষ্টিত আসামের অন্তর্গত শ্রীহট্ট। ইবনে বতুতা হবঙ্ককে বর্ণনা করেছেন আন-নহর উল-আয্রাকের তীরবর্তী একটি অতি সমৃদ্ধ ও সুদৃশ্য নগররূপে। এই হবঙ্ক শহরকে সিলেটের পূর্বদিকে অবস্থিত ভাঙ্গারূপে শনাক্ত করা যায়। ইবনে বতুতা বর্ণিত এ শহরের ধ্বংসাবশেষের কোনো হদিস পাওয়া যায় নি। ঐতিহাসিক নগরী সোনারগাঁকে (সুনুরকাঁও) বলা হয়েছে একটি সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য নগর। ইবনে বতুতা প্রায়শ লক্ষ্ণৌতি রাজ্যের উল্লেখ করেছেন, কিন্তু তা তিনি প্রত্যক্ষ করেন নি।

ইবনে বতুতা তাঁর বিবরণে তিনটি নদীর উল্লেখ করেছেন, গঙ্গা, যুন ও আন-নহর উল-আয্রাক। তাঁর বর্ণনায় গঙ্গা ও যুন নদী সাদকাঁওয়ের নিকটে মিলিত হয়ে সমুদ্রে পড়েছে। পর্যটক এখানে আজকের পদ্মা ও যমুনা নদীর কথাই বলেছেন। যে নহর-উল-আয্রাক (নীল নদী) হবঙ্ক শহরের নিকট দিয়ে প্রবাহিত এবং যে নদীপথে বাঙ্গালাহ ও লক্ষ্ণৌতি রাজ্যে পৌঁছানো যায়, সেই নীলাভ জলের নদীকে স্পষ্টতই সুরমা রূপে চিহ্নিত করা যায়। আর এই সুরমা নদীপথে লক্ষ্ণৌতি রাজ্যে যেমন পৌঁছানো যায় তেমনি পৌঁছানো যায় সোনারগাঁয়ে।

ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে বাংলার জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। বাংলার সুদৃশ্য শ্যামল সবুজ প্রান্তর, পল্লীর ছায়াসুনিবিড় সবুজের সমারোহ তাঁকে এতটাই মুগ্ধ করেছে যে, তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা পনের দিন নদীর দুপাশে সবুজ গ্রাম ও ফলফলাদির বাগানের মধ্য দিয়ে নৌকায় পাল তুলে চলেছি, মনে হয়েছে যেন আমরা কোনো পণ্যসমৃদ্ধ বাজারের মধ্য দিয়ে চলছি। নদীর দুই কূলে জমিতে জলসেচের পানি কল, সুদৃশ্য গ্রাম ও ফলের বাগান, যেমনটি রয়েছে মিশরের নীলনদের দুই তীরে।’ জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর প্রাচুর্য ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেশটিকে বসবাসের জন্য খুবই আকর্ষণীয় করে তুললেও, কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়া (মেঘাচ্ছন্ন ও গুমোট আবহাওয়া) এবং তার সঙ্গে ভ্যাপসা গরম বিশেষত গ্রীষ্মকালে নদীনালা থেকে উদ্ভূত দাবদাহ এতটাই পীড়াদায়ক ছিল যে, খোরাসানিরা (বিদেশিরা) যে একে ‘দোজখ-ই-পুর নিয়ামত’ অর্থাৎ প্রাচুর্যপূর্ণ নরক বলে অভিহিত করত, ইবনে বতুতা তা যথার্থ বলেই মনে করেছেন।

ইবনে বতুতার বিবরণে আমরা বাংলার রাজনৈতিক অবস্থার বর্ণনা পাই। তিনি তখনকার বাংলার সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহকে একজন খ্যাতিমান নরপতি হিসেবে প্রশংসা করেছেন যিনি বহিরাগতদের বিশেষত ফকির ও সুফি দরবেশদের পছন্দ করতেন। ইবনে বতুতা সোনারগাঁয়ের সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ ও লক্ষ্ণৌতির সুলতান আলাউদ্দিন আলী শাহের মধ্যকার তীব্র সংঘর্ষের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদের সময় থেকে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ ও আলাউদ্দিন আলী শাহের ক্ষমতা লাভের সময় পর্যন্ত বাংলার রাজনৈতিক ঘটনাবলির বর্ণনা দিয়েছেন। ইবনে বতুতা এ জন্য প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য যে, নিজে সুলতান মুহম্মদ তুগলকের একজন দূত হয়েও তিনি ফখরুদ্দিনকে দিল্লির সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হিসেবে অবজ্ঞা করার মতো মানসিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছেন, এবং স্পষ্টত তাঁকে উন্নত চারিত্রিক গুণাবলির অধিকারীরূপে বর্ণনা করে তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।

ইবনে বতুতার বিবরণ বাংলার কতিপয় সামাজিক বিষয়ের উপর আলোকপাত করে। তিনি উল্লেখ করেছেন হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকের উপর সুফি-দরবেশদের প্রভাবের কথা। তিনি বলেছেন যে, দেশের মুসলিম ও অমুসলিম অধিবাসীরা শেখ জালালউদ্দিনের খানকায় সমবেত হতো, দরবেশের সাক্ষাৎ গ্রহণ করত, এবং তাঁর জন্য নজর-নেওয়াজ নিয়ে আসত। এই উপহার সামগ্রী দিয়েই দরগায় আগত ফকির ও মুসাফিররা জীবন ধারণ করত। সুলতানের ফরমান অনুসারে নদী পারাপারের জন্য সাধক ফকিরদের কোনো অর্থ প্রদান করতে হতো না এবং স্থানীয় জনগণের কর্তব্য নির্ধারিত ছিল ফকির দরবেশদের বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করা। রাষ্ট্রীয় নির্দেশ মতে এমন রেওয়াজ ছিল যে, কোনো ফকির দরবেশ কোনো শহরে পৌঁছলে তাকে অর্ধ দীনার ভাতা প্রদান করতে হতো।

ইবনে বতুতা শেখ জালালউদ্দিনের জীবনাচরণ ও কর্মধারার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি দরবেশের দৈহিক গঠন, বয়স, তাঁর প্রতিদিনের আহার ও পরিধেয় বস্ত্র, অভ্যাস ও জীবনধারা, তপস্যা ও কৃচ্ছ্বসাধন, আধ্যাত্মিক শক্তি ও কেরামত, তাঁর আতিথেয়তা, সাফল্য ও জনপ্রিয়তা এবং তাঁর দরগাহের পারিপার্শিক অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন।

ইবনে বতুতার বিবরণ থেকে তখন বাংলায় দাসপ্রথার প্রচলনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর সাক্ষ্যমতে তখন খোলাবাজারে দাস দাসী বেচাকেনা হতো। বাজারে দ্রব্যমূল্যের তালিকা প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, উপপত্নী হিসেবে ব্যবহারের যোগ্য এক সুন্দরী তরুণী বাজারে তাঁর সামনে এক স্বর্ণমুদ্রায় বিক্রি হয়েছে। তিনি নিজে প্রায় অনুরূপ মূল্যে আশুরা নামীয় এক যুবতী দাসী ক্রয় করেন। সে ছিল পরমা সুন্দরী। তাঁর এক সঙ্গী তখন লুলু (মুক্তা) নামে এক সুদর্শন দাস বালককে দুই স্বর্ণ দীনারে ক্রয় করেন।

গঙ্গা নদীর বর্ণনায় ইবনে বতুতা পবিত্র নদী হিসেবে এর গুরুত্ব এবং নদীতে হিন্দুদের তীর্থস্নানের উল্লেখ করেছেন। তাঁর বর্ণনায়ই আমরা প্রথম কামরূপের অধিবাসীদের যাদুবিদ্যা ও সম্মোহনী মন্ত্রতন্ত্র চর্চা এবং এ বিদ্যায় তাদের নৈপুন্য ও অনুরক্তির উল্লেখ পাই।

ইবনে বতুতার বর্ণনায় ঐ সময়ে বাঙ্গালার অর্থনৈতিক অবস্থার বিবরণ পাওয়া যায়। দেশে খাদ্যশস্যের প্রাচুর্য এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের সস্তা দর উল্লেখ করে তিনি বলেছেন যে, পণ্যের এমন প্রাচুর্য ও সস্তা দর তিনি পৃথিবীর আর কোথাও দেখেন নি। তিনি দেশের অভ্যন্তরে ব্যবসার প্রসার এবং বাঙ্গালার অধিবাসীদের বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্কের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি নদীতে মানুষ ও ব্যবসায়ের পণ্যবাহী অসংখ্য নৌকা চলাচল করতে দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন, নদীর তীরে বাজারের অবস্থানের কথা বলেছেন এবং সোনারগাঁ বন্দরে যাভা অভিমুখে যাত্রার জন্য অপেক্ষমান নোঙ্গর করা একটি বৃহৎ চীনা জাহাজের উল্লেখ করেছেন। তিনি মালয় দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে বাঙ্গালার ধানচালের ব্যবসায়ের কথাও উল্লেখ করেন। ইবনে বতুতা বলেছেন, নদীতে পণ্য বোঝাই প্রতিটি নৌকায় একটি করে ঢাক রাখা হতো। দু’টি পণ্য বোঝাই নৌকা রাতে পরস্পরের কাছাকাছি এলে নৌকার মাঝিমাল্লারা ঢাক পিটিয়ে পারস্পরিক শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করত। নৌকায় ঢাক বাজানোর এ রীতি সম্ভবত তখন ছিল দেশিয় বাণিজ্য-তরীর পরিচয় শনাক্তকরণের একটি সংকেত এবং নদীতে সম্ভাব্য জলদস্যুতা প্রতিরোধের উপায় হিসেবে ভিনদেশী বা আগন্তক নৌকা চিহ্নিত করণের একটি কৌশল।

ইবনে বতুতার বাঙ্গালা সফরের সময় দেশে নিত্য ব্যবহার্য পণ্যসামগ্রীর বাজার মূল্যের একটি তালিকা তিনি তাঁর বিবরণীতে দিয়েছেন। পণ্যের এ মূল্য তালিকা তিনি তৈরি করেন বাজারে তাঁর সরেজমিন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। ইবনে বতুতা পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেছেন দীনার ও দিরহামে এবং পণ্যের ওজন নির্ধারণ করেছেন দিল্লির ‘রতল’ পরিমাপের ভিত্তিতে। বর্তমান সময়ের প্রচলিত মুদ্রায় পণ্যমূল্যের নিরীখে তুলনামূলক যাচাই ব্যতীত তাঁর উল্লেখিত পণ্যের সস্তা দর কোনক্রমেই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই আধুনিক মুদ্রায় ঐ দ্রব্যমূল্য রূপান্তর একান্তই বাঞ্ছনীয়।

ইবনে বতুতা প্রদত্ত পণ্যের বাজার মূল্য আধুনিক মুদ্রা ও ওজনের নিরীখে রূপান্তর করে নিম্নে পণ্যের মূল্য তালিকা সন্নিবেশ করা হলো। দ্রব্যমূল্য রূপান্তরের ক্ষেত্রে এক রৌপ্য দীনারকে মোটামুটি আধুনিক এক টাকার সমান এবং এক দিল্লি রতলকে আমাদের সময়ের মোটামুটি ১৪ সের ওজনের সমতুল্য ধরে নিয়ে মূল্য তালিকার তুলনামূলক আধুনিকায়ন করা হলো। পণ্যের তুলনামূলক আধুনিক মূল্য নিম্নরূপ:

চাল প্রতি মণ ১১ পয়সা
ধান প্রতি মণ ৩ পয়সা
চিনি প্রতি মণ ১.৪২ পয়সা
গোলাপজল প্রতি মণ ২.৮৫ পয়সা
ঘি বা মাখন প্রতি মণ ১.৪২ পয়সা
তিল তৈল প্রতি মণ ৭১ পয়সা
সূক্ষ্মতম সূতীবস্ত্র প্রতি গজ ১৩ পয়সা
দুধেল গাভী (মহিষ)                     প্রতিটি ৩ টাকা
মোটা তাজা মুরগী ৮টি ১২ পয়সা
পায়রা ১৫টি ১২ পয়সা
মোটা তাজা ভেড়া প্রতিটি ২৫ পয়সা
সুন্দরী যুবতী দাসী একজন ১০ টাকা
সুদর্শন দাস বালক একজন ২০ টাকা

ইবনে বতুতার বিবরণেই আমরা বাংলার অধিবাসীদের জীবন সম্পর্কে সর্বপ্রথম প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভ করি। তিনি তাঁর বিবরণের তথ্য সংগ্রহ করেছেন এদেশে তাঁর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে এবং আপামর জনগণের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগের মাধ্যমে। তাঁর বিবরণ সংক্ষিপ্ত হলেও তাতে বাংলার মানুষের জীবনের প্রায় সকল দিক সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকনে তাঁর প্রাণবন্ত অনুভূতি, সূক্ষ্ম হূদয়াবেগ এবং তাঁর সাবলীল প্রকাশভঙ্গি নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।  [মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]

গ্রন্থপঞ্জি Rehla, English translation by Mahdi Husain as the Rehla of Ibn Battuta, Boroda, 1953; Muazzam Hussain Khan, Fakhruddin Mubarak Shah of Sonargan, Dhaka, 2005.