ইত্তেফাক, দৈনিক


ইত্তেফাক, দৈনিক  ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি জাতীয় বাংলা দৈনিক পত্রিকা। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার বিলুপ্তি ঘটিয়ে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে ইত্তেফাক আত্মপ্রকাশ করে ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর। এর সম্পাদক ছিলেন  তফাজ্জল হোসেন, যিনি মানিক মিয়া নামে সমধিক পরিচিত। ঢাকার ৯ হাটখোলা রোডস্থ প্যারামাউন্ট প্রেস থেকে সম্পাদক কর্তৃক পত্রিকাটি মুদ্রিত ও প্রকাশিত হতো।

মুসলিম লীগ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলা এবং আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং পাকিস্তানের দু অংশের মধ্যকার বৈষম্য ও কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেয়। এ সময়েই তফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) কর্তৃক লিখিত কলাম ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রণ্টের বিজয়েও ইত্তেফাক বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখে। ষাটের দশকে আইয়ুবের মার্শাল ল’ এবং তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রবাদী সংবিধানের বিরুদ্ধেও ইত্তেফাক কঠোর অবস্থান নেয়। ১৯৬১ সালে মুক্তবুদ্ধির লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবীরা রবীন্দ্র জন্মবাষিকী উদযাপনের উদ্যোগ নিলে এক শ্রেণীর লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং প্রশাসন এর বিরোধিতা করে। ইত্তেফাক সে সময়ে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উদযাপনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখে।

১৯৬১ সালে স্বৈরশাসক  আইয়ুব খান সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার জন্য প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট জারি করে। ১৯৬৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তফাজ্জল হোসেন তাঁর বিখ্যাত কলাম রাজনৈতিক মঞ্চে এ আইনের কঠোর সমালোচনা করেন।

১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  ছয়দফা কর্মসূচি পেশ করলে ইত্তেফাক এর সমর্থক ও প্রচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে ইত্তেফাক পূর্ববাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের কণ্ঠস্বরে পরিণত হয়। একারণেই আইয়ুব সরকার প্রথম দফায় ১৯৬৬ সালের ১৭ জুন থেকে ১১ জুলাই এবং দ্বিতীয় দফায় ১৯৬৬ সালের ১৭ জুলাই থেকে ১৯৬৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ রাখে। পত্রিকার সম্পাদক তফাজ্জল হোসেনকে একাধিকবার কারান্তরীণ করা হয়।

উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থানকালে ১০ ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাক পুনরায় প্রকাশিত হয়। কিন্তু পত্রিকাটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুছিয়ে ওঠার আগেই ১ জুন তফাজ্জল হোসেন মৃত্যুবরণ করেন। পত্রিকা পরিচালনার দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর দুই পুত্র মইনুল হোসেন ও আনোয়ার হোসেনের ওপর।

একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী ইত্তেফাক অফিস জ্বালিয়ে দেয়। ফলে ঐদিন থেকে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য ২১ মে থেকে পুনরায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।

১৯৭৫ সালের ১৭ জুন তৎকালীন সরকারের ব্যবস্থাপনায় দৈনিক ইত্তেফাক নতুনভাবে প্রকাশিত হয়। এ সময়ে সম্পাদক ছিলেন নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী। পত্রিকাটি নিউনেশন প্রিন্টিং প্রেস, ১ রামকৃষ্ণ মিশন রোড, ঢাকা থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট পত্রিকাটির মালিকানা মানিক মিয়ার উত্তরাধিকারী মইনুল হোসেন ও আনোয়ার হোসেনের নিকট প্রত্যর্পণ করা হয়। ইত্তেফাক সাধু ভাষা রীতি অনুসরণ করে আসছিল জন্মলগ্ন থেকে। পরবর্তী সময়ে চলতি ভাষা রীতিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

বর্তমানে পত্রিকাটির সম্পাদক আনোয়ার হোসেন  এবং উপদেষ্টা সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিলন।  [মনু ইসলাম]