ইতিহাস লিখনধারা


ইতিহাস লিখনধারা

প্রাচীন যুগ উপমহাদেশের অন্যান্য অংশের মতো প্রাচীন বাংলার ইতিহাসেরও অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রকৃত ইতিহাস সম্বন্ধীয় সাহিত্যের অভাব। প্রাচীনকালের লিখনসমূহের মধ্যে সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম্ কাব্যটিকেই একমাত্র ঐতিহাসিক গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু সমকালীন তাম্র ও প্রস্তর লিপিমালা প্রাচীন বাংলার রাজবংশসমূহ ও পণ্ডিত সমাজের ইতিহাস সচেতনতার প্রমাণ দেয়। সভাকবি, মহাফেজখানার তত্ত্বাবধায়ক এবং কুলাচার্যদের দ্বারা রচিত তাম্রশাসন, শিলালিপি ও প্রশস্তিগুলিকে (প্রশংসা সূচক কাব্যসমূহ) ঐতিহাসিক লিখনের নমুনা হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস লিখনের অনুপস্থিতিকে কোনোক্রমেই এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না যে, পরবর্তী সময়ের আক্রমণকারীরা সবকিছুই ধ্বংস করে দিয়েছিল। বারো শতকের শেষের দিকে এবং তেরো শতকের প্রথমদিকে বাংলা ও বিহারে যখন মুসলমানদের অভিযান পরিচালিত হয় তখন অনেক সন্ন্যাসী ও পণ্ডিত ধর্মশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, জ্যোতিষবিদ্যা, ব্যাকরণ এবং সাহিত্যের অনেক মূল্যবান পাণ্ডুলিপি সঙ্গে নিয়ে নেপাল ও তিব্বতের দিকে পালিয়ে যান। তিব্বতীয় কালানুক্রমিক ঘটনাপঞ্জিসমূহে যেমন, ১৭৪৭ সালে সংকলিত Sumpa Mkhanpo-এর Pag Sam Zon Zang এবং Tyangur ক্যাটালগে অনেক বাঙালি পণ্ডিত ও তাদের গ্রন্থাদির উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু একমাত্র রামচরিতম কাব্যটিই নেপালে পাওয়া গেছে। আক্রমণকারীরা নিশ্চয়ই তাদের ধ্বংসের উপকরণ হিসেবে কেবল ঐতিহাসিক লিখনগুলিকেই বেছে নেন নি। একইভাবে প্রাচীন বাংলার ইতিহাস সাহিত্যের স্বল্পতা বিষয়ে আবহাওয়াজনিত কারণটিকেই একমাত্র বা প্রধান হিসেবে দায়ী করা চলে না।

প্রাচীন যুগে ভারতের অন্যান্য অংশের মতো বাংলায়ও ‘ইতিহাস’ শব্দটি অধিকতর ব্যাপক অর্থে ব্যবহূত হতো এবং এর মধ্যে প্রাচীন গল্প, কাহিনী, সংগীত ও লোকজ্ঞান সংবলিত পৌরাণিক কাহিনী অন্তর্ভুক্ত ছিল। ‘ইতিবৃত্ত’ বলতে ইতিহাস ও মহাকাব্য বোঝাত। ‘আখ্যায়িকা’ বলতে বোঝাত প্রাচীন কাহিনী বা গল্প বা কোনো অতি-মানবীয় এবং মানবীয় কর্মকান্ড। ‘উদাহরণ’ বলতে বিশেষ গল্প, জীবনী অথবা ঘটনার উল্লেখ বোঝায়। প্রাচীন আইন সম্পর্কে এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুসারীদের দিক নির্দেশনা দেওয়া হতো ধর্মশাস্ত্রের মাধ্যমে। ‘অর্থশাস্ত্র’ ছিল রাজনীতি বিজ্ঞান। ইতিহাসের সংজ্ঞায় ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে এবং তা স্থির হয় অতীত ঘটনাবলির দলিল হিসেবে। ইতিহাসের এ সনাতনি ধারণা গোটা প্রাচীন যুগের সকল ইতিহাস সাহিত্যে প্রভাব ফেলেছে।

সংখ্যাগত এবং বিষয়গত গুরুত্বের নিরিখে সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক লিখনগুলি হলো রাজা অথবা উচ্চ রাজকর্মচারীদের তাম্রশাসন, শিলালিপি এবং প্রশস্তি গাথা। তাম্রশাসনের শ্লোক অংশে সমকালীন রাজা এবং তাদের বংশের পূর্বসূরিদের ইতিহাস বর্ণিত আছে। এতে পৌরাণিক ও মহাকাব্যের চরিত্রসমূহ বার বার বর্ণনা করা হয়েছে এবং সার্বিকভাবে মনে হয় যে, এগুলিতে ব্রাহ্মণ্য চরিত্র স্পষ্ট। এগুলিতে রাজপুরুষগণ বিশ্ববিজেতা হিসেবে উল্লিখিত হয়েছেন এবং তাদের শক্তি ও সমর দক্ষতার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে পৌরাণিক ও মহাকাব্যের নায়ক যেমন কৃষ্ণ, অর্জুন ও কর্ণ-এর। রাজাদেরকে ইন্দ্র, শিব, বিষ্ণু এবং রাণীদেরকে লক্ষ্মী, রোহিনী ও গৌড়ী প্রমূখ দেব-দেবীদের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যুধিষ্ঠির, রাম, লক্ষ্মণ, ভীষ্মকে মনে হয় মানবসুলভ গুণাবলীর মূর্ত প্রকাশ। তাম্রশাসনের শ্লোক অংশ জুড়ে থাকত রোমান্টিসিজিম, বীরের বন্দনা, পৌরাণিক কাহিনী ও লোককাহিনী এবং এ সকল শ্লোক ছিল সাধারণত রাজ-প্রশস্তিমূলক কাব্য। ভাল গুণগুলি রাজার জন্য ব্যবহার করা হতো। এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তার বীরত্ব জানা মতে প্রায় সকল দেশেই বিজয় বয়ে আনত এবং উল্লেখ করার জন্য গুণাবলি ও দেশসমূহ ছন্দের চাহিদা অনুযায়ী নির্ধারিত হতো। কিন্তু এ বিশেষ বৈশিষ্ট্যাবলি থাকা সত্ত্বেও তাম্রলিপি ও প্রশস্তিসমূহ ঐতিহাসিক লিখন হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কারণ এগুলি প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ইতিহাস পুনর্গঠনে সহায়ক ছিল। প্রাচীন বাঙালিদের চিন্তা ধারায় জাতীয় চেতনা বলতে কিছু ছিল না। তাম্রলিপিসমূহে যে রাজনৈতিক ইতিহাস বিধৃত তার প্রকৃতি ছিল রাজবংশীয়। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট রাজবংশের শাসকের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করার সময় অন্যান্য রাজবংশেরও উল্লেখ করা হতো। লিপিগুলির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ঐতিহাসিকগণ লিপিমালার তথ্যাদির আলোকে বিদ্যমান বিভিন্ন রাজবংশের ইতিহাস তুলনামূলক বিচার করে প্রাচীন বাংলার একটি ধারাবাহিক বিবরণ দিতে সক্ষম হয়েছেন।

ভূমি দান ও ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল তাম্রশাসনের গদ্য অংশ হতে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থার অনেক তথ্য পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণ্য সংগঠন, বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের উদ্দেশে দানকৃত ভূমির সীমানা চিহ্নিত করতে গিয়ে যে বিস্তৃত বর্ণনা প্রদান করা হতো তাতে অর্থনৈতিক অবস্থা এবং প্রাচীন বাংলার অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন ঘটত। তাম্রশাসন উৎকীর্ণকারীগণ এ বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতেন রাজকীয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী যেমন, পুস্তপাল (ভূমি সংক্রান্ত দলিলপত্র রক্ষণাবেক্ষণকারী), ক্ষেত্রপ (চাষাবাদ ও কৃষি সংক্রান্ত দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা), গ্রামপতি (গ্রাম প্রধান) প্রমূখের কাছ থেকে।

৮ম শতকের বৌদ্ধ গ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প পুরাণের মতোই ভবিষ্যত রাজনৈতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে ভাবীকথনের ছলে ইতিহাস বর্ণনা করত। এ গ্রন্থে যে সকল রাজার উল্লেখ রয়েছে তাদের সম্পূর্ণ নাম পাওয়া যায় না। রাজাদের ক্ষেত্রে তাদের নামের প্রথম অক্ষর অথবা সমার্থক নাম ব্যবহূত হয়েছে। দেখা যায়, এ গ্রন্থে শশাঙ্ক ও হর্ষবর্ধনের মধ্যকার সংঘর্ষ এবং শশাঙ্কের মৃত্যুর পর গৌড় রাজ্যের অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা সম্পর্কে তথ্য লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প গ্রন্থটি বৌদ্ধ জগতে প্রচলিত গল্প ও ঐতিহ্যেরই শুধু সংগ্রহ গ্রন্থ হওয়ায় এটিকে ঐতিহাসিক কালানুক্রমিক ঘটনাপঞ্জি হিসেবে অভিহিত করা যায় না।

রামচরিতম একটি অনন্য ঐতিহাসিক দলিল। এর থেকে ঐতিহাসিকগণ বাংলার ইতিহাসের প্রায় একশত বছরের (আনু. ১০৭৫-১১৬২ খ্রি:) বিশ্লেষণাত্মক বিবরণ পেতে পারেন। সন্ধ্যাকর নন্দীর মতে, তাঁর রচিত রামচরিতম ‘দুজন রামদেবের গৌরবময় কৃতিত্বের দলিল; একজন রঘুবংশের স্রষ্টা এবং অন্যজন গৌড়ের রাজা। সন্ধ্যাকর নন্দী তাঁর রচিত গ্রন্থকে কলি যুগের রামায়ণ এবং নিজেকে বাল্মীকি বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু সন্ধ্যাকর নন্দী রামপালের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কারণে কখনও কখনও ঘটনার ভুল তথ্য পরিবেশন করেন এবং উক্ত সময়ের ইতিহাসের সাথে রামায়ণের রামের গল্প মেলাতে গিয়ে ঘটনার ক্রমপঞ্জি অবহেলা করেছেন।

রামচরিতম কাব্যে পালদের বংশ বৃত্তান্ত শুরু হয়েছে ধর্মপাল থেকে। এরপর সন্ধ্যাকর নন্দী অন্যান্য পাল রাজাদের বাদ দিয়ে তাঁর কাব্যের নায়ক রামপালএর পিতা তৃতীয় বিগ্রহপালের নাম উল্লেখ করেন। এরপর তিনি দ্বিতীয় মহীপালএর রাজত্বকাল, তার ভাই শূরপাল ও রামপালের কারারুদ্ধকরণ, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মহীপালের মৃত্যু এবং কৈবর্ত প্রধান দিব্যের হাতে পালদের পিতৃরাজ্য বরেন্দ্রী (বরেন্দ্র)-এর পতন, তাঁর মামা রাষ্ট্রকূট প্রধান মথনদেব ও সামন্তদের সহযোগিতায় রামপাল কর্তৃক বরেন্দ্রী পুনরুদ্ধার, বরেন্দ্রীতে শান্তি ও শৃংখলা প্রতিষ্ঠা এবং ‘রামাবতী’ নামে একটি নতুন শহর প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে বিবরণ দেন।

সন্ধ্যাকর নন্দী ২৭টি শ্লোকে ‘বরেন্দ্রী’ এবং ১২টি শ্লোকে ‘রামাবতী’ সম্পর্কে বর্ণনা প্রদান করেন। রামাবতী ও বরেন্দ্রী সম্পর্কে প্রদত্ত তাঁর বর্ণনা প্রাচীন বাংলার অধিবাসীদের জীবন যাত্রা এবং বিশেষ করে উত্তর বাংলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যাবলি, গাছপালা, ফল-মূল, জীব-জন্তু বিষয়ে সবচেয়ে সুন্দর একটি বিবরণ। এ বিবরণে মাতৃভূমি বরেন্দ্রীর প্রতি কবির গভীর ভালবাসা প্রকাশ পায়। সন্ধ্যাকর নন্দী রামপালের উত্তরসূরি বিশেষত সর্বশেষ পাল রাজা হিসেবে পরিচিত মদনপাল পর্যন্ত সময়ের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এবং সমসাময়িক অন্যান্য ভারতীয় রাজাদের উল্লেখ করায় রামচরিতম কেবল রামপালেরই ইতিহাস নয়, বরং বাংলা ও বিহারে পাল শাসনের শেষ পর্যায়ের ইতিহাসে পরিণত হয়েছে। পিতৃভূমি পুনরুদ্ধারের কাজে রামপালের যুদ্ধ প্রস্ত্ততি এবং যুদ্ধের পেছনের ঘটনাবলি সম্পর্কে সন্ধ্যাকর নন্দীর বিবরণ থেকে এ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কবি তাঁর যুগের সামন্ততান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। যুদ্ধের কাহিনী বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে, তিনি যুদ্ধ পরিকল্পনার কলা-কৌশল ভালভাবেই বুঝতেন। সন্ধ্যাকর নন্দীর নায়ক রামপালের প্রধান শত্রু পরাজিত পক্ষ কৈবর্ত প্রধান ভীম সম্পর্কে প্রশংসা কবির নিরপেক্ষতা এবং সমকালীন ইতিহাসে তাঁর নৈর্ব্যক্তিকতাকে তুলে ধরে। সম্ভবত তিনি সমসাময়িক ভারতীয় ঐতিহাসিক কলহণ (যিনি ইতিহাসের আধুনিক অর্থেই প্রথম ভারতীয় ঐতিহাসিক ছিলেন) কর্তৃক প্রভাবিত হয়েছিলেন।

প্রাচীন বাংলার আর্থ-সামাজিক ইতিহাস পাওয়া যায় সংস্কৃত সাহিত্যের দুটি সংকলনে। দুজন বাঙালি কর্তৃক সংকলিত এ গ্রন্থদুটি হলো সুভাষিতরত্নকোষ এবং সদুক্তিকর্ণামৃত। সংকলন দুটিতে যে শ্লোক সমূহ স্থান পেয়েছে তাতে রাজনৈতিক ইতিহাসের কোনো প্রতিফলন নেই, বরং তাতে আছে মানব জীবনকাহিনী, অর্থনীতি, সম্পদ, দারিদ্র্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, জীবন-দর্শন এবং বাংলার ঋতু বৈচিত্রের বর্ণনা, বাংলার গ্রাম ও নগর জীবন এবং এর উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের বিবরণ।

কোষ কাব্যের মধ্যে গোবর্ধনাচার্যের আর্যাসপ্তশতী গ্রন্থও অন্তর্ভুক্ত। এতে পৃথকাকারে প্রায় ৭০০ শ্লোক বা কবিতা রয়েছে। লক্ষ্মণসেনএর সভাকবি গোবর্ধন আচার্য ছিলেন বারো শতকের কবি। আর্যাসপ্তশতী প্রাচীন বাংলার সামাজিক ইতিহাসের, বিশেষ করে নারীদের ইতিহাসের চিত্র তুলে ধরে। নারীরা কিভাবে বহুগামী ও যৌথ পরিবারে বসবাস করত, তাদের দুঃখ, তাদের বিলাপ, স্বামীর উপর তাদের পূর্ণ নির্ভরতা এবং তাদের দৈনন্দিন জীবন এসব কিছুই আর্যাসপ্তশতী কাব্যে বিধৃত হয়েছে। কতিপয় শ্লোকে গ্রামের মাঠ, শস্য, শাকসবজি, পাখি এবং অন্যান্য জীবজন্তুরও বর্ণনা পাওয়া যায়।

প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের ওপর আলোকপাত করে লিখিত ঐতিহাসিক লিখনের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে বিদ্যমান লিখনগুলিতে প্রাচীন বাংলার অধিবাসীদের ইতিহাস সচেতনতার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে বলে বিবেচনা করা যায়। [শাহানারা হোসেন]

গ্রন্থপঞ্জি  RC Majumdar et al (ed) The Ramacaritam of Sandhyakaranandin, Rajshahi, 1939; CH Philips (ed), Historians of India, Pakistan and Ceylon, London, 1961; Daniel HH Ingalls (tr) An Anthology of Sanskrit Court Poetry, Vidyakara’s Subhasitatatnakosa, Harvard Oriental Series, 44, 1965; Sures Chandra Banerji (ed), Saduktikarnamrta of Sridharadasa, Calcutta, 1965; RR Mukherji and SK Maity (ed), Corpus of Bengal Inscriptions, Calcutta, 1967.

মধ্যযুগ (১২০০-১৭৬৫)  বাংলার মধ্যযুগ বলতে মোটামুটিভাবে তেরো শতকের প্রারম্ভে মুসলিম শাসনের শুরু থেকে মুগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম কর্তৃক ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সুবাহ বাংলার দীউয়ানি প্রদানের মধ্যবর্তী কালকে বুঝায়। এ আমলে বাংলার ইতিহাস লিখন ধারা ছিল বিচ্ছিন্ন ও অসংলগ্ন এবং এর অধিকাংশই লেখা হয়েছিল বাংলার বাইরে।

ভারতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা ভারতীয় ইতিহাস লিখনে এক নতুন যুগের সূচনা করে। এতে করে ভারতীয় সাহিত্য সম্ভারে যুক্ত হয় ইতিহাস সাহিত্য। ইতিহাস লিখন ছিল বস্ত্তত ‘ভারতীয় সংস্কৃতিতে মুসলমানদের এক মহান অবদান’। তবে এ অবদান বাংলায় পৌঁছেছিল বলে মনে হয় না।

সে আমলের ঘটনাবলি লিপিবদ্ধ করার জন্য ইতিহাসকারদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ইলিয়াস শাহী বা হোসেন শাহী সুলতানদের মধ্যে কারোরই উল্লেখ পাওয়া যায় না। মধ্যযুগের ইতিহাস লিখনে সৃষ্ট এ শূন্যতা বহুলাংশে পূরণ হয়েছে বাংলার বাইরের, প্রধানত দিল্লির, ঐতিহাসিকদের রচনা এবং বিদেশিদের রচিত কিছু বিবরণ দ্বারা।

বাংলার বাইরে রচিত বাংলা সম্পর্কিত তথ্য সম্বলিত ইতিহাস গ্রন্থগুলির মধ্যে প্রথম ও প্রধান হচ্ছে  মিনহাজ-ই-সিরাজএর  তবকাত-ই-নাসিরী। তিনি শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ (১২১০-১২৩৬) ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের অধীনে উচ্চ রাজপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদের রাজত্বকালে (১২৪৬-১২৬৬) তিনি এ গ্রন্থ রচনা করেন এবং সম্ভবত তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা লাভের আশায় তাঁর নামানুসারে এ গ্রন্থের নামকরণ করেন।

তবকাত-ই-নাসিরী মুসলিম বিশ্বের একটি সাধারণ ইতিহাস। এতে ২৩টি তবকাত বা অধ্যায় রয়েছে এবং ২২তম তবকাতে তিনি মুসলমানদের বঙ্গ বিজয় থেকে ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়ের বিবরণ দিয়েছেন। বাংলার বাইরের ঐতিহাসিকদের মধ্যে কেবল তিনিই বাংলায় এসেছিলেন (১২৪২-১২৪৪)। বাংলার মুসলমানদের ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহে তিনি বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেন। বিশেষত বখতিয়ার খলজীর বেঁচে থাকা সঙ্গীদের (যেমন জনৈক মুতামিদ্দৌলা) কাছ থেকে তিনি তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। কাজেই তাঁর বিবরণ হচেছ মুসলমানদের প্রথম বঙ্গবিজয় এবং এর শাসনকর্তাদের কর্মকান্ডের একমাত্র সমসাময়িক বিবরণ। তাঁর তথ্যাবলি বিশ্বাস ও নির্ভরযোগ্য এবং এগুলি আধুনিককালে আবিষ্কৃত মুদ্রাতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদি দ্বারা সমর্থিত ও প্রমাণিত।

সময় ও গুরুত্বের দিক থেকে এর পরেই জিয়াউদ্দীন বরনীর তারিখ-ই-ফিরুজশাহীর স্থান। বরনী তাঁর ইতিহাসে ১২৬৬ খ্রিস্টাব্দে  গিয়াসউদ্দীন বলবনএর দিল্লির সিংহাসনারোহণের সময় থেকে  ফিরুজশাহ তুগলকএর রাজত্বের ষষ্ঠ বছর (১৩৫৭) পর্যন্ত সময়কালের ঘটনাবলি বর্ণনা করেছেন। বরনী ছিলেন অভিজাত বংশোদ্ভূত। তাঁর পিতা ও পূর্বপুরুষরা দিল্লির দরবারে উচ্চ রাজপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি নিজেও ১৭ বছর মুহম্মদ বিন তুগলকএর নাজিম বা ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ছিলেন। বলবন এবং প্রথম দুজন খলজী সুলতান সম্পর্কে তথ্যের জন্য তিনি তাঁর আত্মীয় ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের ওপর নির্ভর করেছিলেন। বাকি সময়ের জন্য তিনি নিজেই ছিলেন তাঁর বর্ণিত ঘটনাবলির সমকালীন ব্যক্তি-উৎস।

বরনী কখনও বাংলায় আসেন নি। তিনি এ প্রদেশ থেকে প্রত্যাগত সৈনিকদের (তাঁর মাতামহ হিশামউদ্দীন ছিলেন তেমন একজন)  বা দিল্লির রাজদরবারের দবিরদের (সচিব) কাছ থেকে বাংলা সম্পর্কে তাঁর তথ্য সংগ্রহ করেন। তাঁর বর্ণিত ঘটনাবলির সময়ে (১২৬৬-১৩৫৭) বাংলার পরিস্থিতি ছিল অনেকটা অনিশ্চিত ও অশান্ত। কাজেই ঐকান্তিক ইচ্ছা সত্ত্বেও এ এলাকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া তারিখ-ই-ফিরুজশাহীতে বাংলার ঘটনাবলির বিবরণ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও অপ্রতুল। তবে এ সংক্ষিপ্ত বিবরণে ঘটনার তেমন বিকৃতি দেখা যায় না। অবশ্য সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করাই ছিল তাঁর ইতিহাস রচনার প্রধান উদ্দেশ্য। ফলে বিদ্রোহী বাংলার প্রতি তাঁর কোনো সহানুভূতিই ছিল না; বাংলার রাজধানী লখ্নৌতিকে তিনি ‘বলগাকপুর’ বা বিদ্রোহের নগর বলে আখ্যায়িত করে বাংলার স্বাধীন সুলতানদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। তা সত্ত্বেও তারিখ-ই-ফিরুজশাহী মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসের এক মূল্যবান উৎস।

খাজা আবদুল মালিক ইসামীর ফুতুহ-উস-সালাতীনএ মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাস সম্পর্কিত তথ্য রয়েছে। বাহমনী সুলতান আলাউদ্দীন হাসানের রাজত্বকালে (১৩৪৭-১৩৫৮) তিনি ১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটি পদ্যে লেখা এবং একারণে অতিরঞ্জন-দোষদুষ্ট বলে পন্ডিতরা মনে করেন। ইসামীও কখনও বাংলায় আসেন নি, তবে এটা বিস্ময়কর যে বাংলা সম্পর্কে তাঁর গ্রন্থে এমন কিছু তথ্য রয়েছে যা বরনীর তারিখ-ই-ফিরুজশাহীতে উল্লেখ করা হয় নি। এ থেকে ধরে নেওয়া যায় যে, (দিল্লির দৃষ্টিতে) দুটি বিদ্রোহী রাজ্যের মধ্যে সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিল এবং দুদেশের অধিবাসীদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। ফলে ইসামী মধ্যযুগের বাংলা সম্পর্কে উপাদান সংগ্রহে সক্ষম হন। অবশ্য তারিখ-ই-ফিরুজশাহীতে বাংলার ঘটনাবলির যেমন বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় ফুতুহ-উস-সালাতীন-এ তেমনটি নেই।

ফিরুজশাহ তুগলকের রাজত্বকালের (১৩৫১-১৩৮৮) ঘটনাবলি বর্ণনা করে শামস-ই-সিরাজ আফিফ তারিখ-ই-ফিরুজশাহী  শিরোনামে একটি ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেন। এতে ফিরুজশাহের বাংলা-অভিযানগুলির (১৩৫৩ ও ১৩৫৮) বিবরণ রয়েছে। তবে এ আমলে বাংলা স্বাধীন থাকায় এতে অন্য কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। আফিফ ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং দিল্লির দরবারে তিনি উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ফলে স্বভাবতই তিনি তাঁর পৃষ্ঠপোষক ফিরুজশাহের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছেন এবং বাংলার সুলতানদের (ইলিয়াস শাহ ও সিকান্দর শাহ) বিরুদ্ধে তাঁর সুস্পষ্ট ব্যর্থতাকে আড়ালে রেখেছেন। তিনি দিল্লির সুলতানের প্রতি প্রশংসা বর্ষণ এবং বাংলার সুলতানদের বিদ্রোহীরূপে চিত্রিত করেছেন। তবে অন্যান্য বিষয়ে তাঁর বিবরণ নির্ভুল ও সহায়ক প্রমাণিত হয়েছে। ফিরুজশাহ তুগলকের রাজত্বকালের অপর একটি ইতিহাসগ্রন্থ হচ্ছে অজ্ঞাতনামা লেখকের সিরাত-ই-ফিরুজশাহী। এতে বাংলা সম্পর্কে অতি সামান্য তথ্য রয়েছে।

ইয়াহিয়া বিন আহমদ বিন আবদুল্লাহ সরহিন্দি দিল্লির সুলতান সৈয়দ মুবারক শাহের রাজত্বকালে (১৪২১-১৪৩৪) তাঁর তারিখ-ই-মুবারকশাহী রচনা করেন। এ গ্রন্থে তিনি মুহম্মদ ঘুরী থেকে শুরু করে ১৪২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দিল্লির সুলতানদের ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। দিল্লির সুলতানদের বর্ণনার পাশাপাশি তিনি নির্ভুলভাবে বাংলার ঘটনাবলিও উল্লেখ করেছেন।

আমীর খসরুর কিরাণ-উস-সাদাই (দুই নক্ষত্রের মিলন) ছিল প্রথম দিকে রচিত অপর একটি কাব্যগ্রন্থ। ১২৮০ খ্রিস্টাব্দে প্রথমবার সুলতান বলবনের বাংলা অভিযানের সূত্রে এবং দ্বিতীয়বার ১৩২৪-২৫ খ্রিস্টাব্দে সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুগলকএর সঙ্গে কবি মোট দুবার বাংলায় এসেছিলেন। এ দুটি তারিখের মধ্যবর্তী সময়ে দিল্লির সুলতান মুইজউদ্দীন কায়কোবাদ ১২৮৯ খ্রিস্টাব্দে তার পিতা ও তদানীন্তন বাংলার শাসক বুগরা খানএর বিরুদ্ধে অভিযান করলে আমীর খসরু কায়কোবাদের সহগামী হন। সরজু নদীর তীরে দু সুলতানের মিলন তাদের মধ্যে প্রীতিকর সমঝোতার সৃষ্টি করে। বস্ত্তত এটি ছিল বাংলা ও দিল্লি সালতানাতের অস্তিত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। মূলত  কাব্যগ্রন্থ হলেও এটি ওই গুরূত্বপূর্ণ ঘটনার সর্বশেষ্ঠ সমসাময়িক দলিল। গ্রন্থটি সেকালের দরবারের রীতিনীতি ও অনুষ্ঠানাদি সম্পর্কে ব্যাপক আলোকপাত করে। কালানুক্রমের দিক থেকে এ গ্রন্থ একদিকে তবকাত-ই-নাসিরীতে এবং অন্যদিকে দুটি তারিখ-ই-ফিরুজশাহীতে আলোচিত সময়ের মধ্যে এক ধরনের যোগসূত্র স্থাপন করেছে।

ইলিয়াসশাহী আমলের বৃহত্তর অংশ এবং সমগ্র হোসেনশাহী আমলে এমন কোনো ইতিহাসগ্রন্থ নেই যাতে বাংলার ঘটনাবলি উল্লিখিত হয়েছে, এমনকি দিল্লিকেন্দ্রিক কোনো গ্রন্থও নেই। বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ এ শূণ্যতা কিছুটা পূরণ করেছে। এগুলির মধ্যে বিশেষত বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস পুনর্গঠনের জন্য  ইবনে বতুতামা হুয়ান,  ভার্থেমা, ও  বারবোসার বিবরণ গুরুত্বপূর্ণ।

ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে (রেহলা) তৎকালীন বাংলার (১৩৪৬-৪৭) রাজনৈতিক, অর্থনেতিক ও সামাজিক অবস্থার উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে তাঁর বহু তথ্য ভুল প্রমাণিত হলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে তাঁর বিবরণ অত্যন্ত মূল্যবান। তিনি যে এলাকা সফর করেছেন সেখানে নিজেই তিনি দোকান ও বাজারে গিয়েছেন এবং বিভিন্ন পণ্যের মূল্য লিপিবদ্ধ করেছেন।

গিয়াসউদ্দীন আজম শাহএর রাজত্বকালে (১৩৯১-৯২১৪১০-১১) চৈনিক এক প্রতিনিধিদলের দোভাষী হিসেবে মাহুয়ান বাংলায় আসেন। বাংলা সম্পর্কে তাঁর বিবরণ ইং ইয়াই শেং লান নামক পুস্তকে লিপিবদ্ধ আছে। তাতে তিনি বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বর্ণনা করলেও সুলতান বা রাজধানীর নামোল্লেখ করেন নি।

ইতালির বণিক ভার্থেমা ১৫০৩ থেকে ১৫০৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশ সফর করেন। তিনি বাংলায়ও আসেন এবং বাঙ্গালা নগরী দেখে মুগ্ধ হন। একে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্ররূপে বর্ণনা করেছেন।

একই সময়কালে বারবোসা নামে এক পর্তুগিজ বণিক বাংলায় আসেন। তিনিও ‘বাঙ্গালা’ নগরীর উল্লেখ করেছেন। তার বিবরণে তৎকালীন বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থার বর্ণনা পাওয়া যায়। এসব বর্ণনায় সুলতানি আমলের (১৩৩৮-১৫৩৮) বিশেষ করে হোসেনশাহী আমলের (১৪৯৩-১৫৩৮) সমৃদ্ধি ও সম্পদের প্রতিফলন দেখা যায়।

১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে শেরশাহ বাংলা জয় করেন এবং ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত বাংলা আফগানদের শাসনাধীন থাকে। কয়েকজন আফগান ঐতিহাসিক এ আমলের আফগান সুলতানদের ইতিহাস রচনা করেন। এগুলি হচ্ছে আববাস খান সরওয়ানীর তারিখ-ই-শেরশাহী বা তোহফা-ই-আকবরশাহী, খাজা নিয়ামতউল্লাহর  তারিখ-ই-খান জাহানী ওয়া মাখজান-ই-আফগানী, আহমদ ইয়াদগারের তারিখ-ই-শাহী এবং আবদুল্লাহর তারিখ-ই-দাউদী। শেষোক্ত গ্রন্থটি সম্ভবত দাউদ খান কররানীর (১৫৭২-১৫৭৬) দরবারে রচিত এবং এটিকে সমসাময়িক রচনা বলে ধরে নেওয়া যায়। অপরাপর গ্রন্থগুলি মুগল আমলে রচিত হয়েছিল। আববাস খান সরওয়ানী ও খাজা নিয়ামতউল্লাহ যথাক্রমে আকবরজাহাঙ্গীর-এর অধীনে চাকুরিতে নিয়োজিত ছিলেন। বাংলায় আফগানদের ইতিহাস পুনর্গঠনে এ ইতিহাসগ্রন্থগুলি অত্যন্ত মূল্যবান উৎস।

১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দ পরবর্তী সময়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে রচিত কয়েকটি ইতিহাসগ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলি দিল্লিতে, কিছুসংখ্যক বাংলায় এবং মুগল সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশে বা এর বাইরে রচিত হয়েছিল। এগুলি প্রধানত মুগল সাম্রাজ্যের সাধারণ ইতিহাস এবং এতে শুধু মাঝেমধ্যে বাংলার ঘটনাবলির উল্লেখ রয়েছে। দিল্লি সাম্রাজ্যের স্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রয়োজন মিটানো ছিল এসব ইতিহাসগ্রন্থের উদ্দেশ্য এবং বাংলার ঘটনাবলির বর্ণনায় গ্রন্থকারদের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে। শেষত, এ প্রদেশের অধিবাসীদের সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞানের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বিবরণ অবাস্তব ও অতিরঞ্জিত বলে প্রমাণিত হয়েছে।

সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে (১৫৫৬-১৬০৫) তিনটি শীর্ষস্থানীয় গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। এগুলি হচ্ছে আবুল ফজলের আকবরনামা, নিজামউদ্দীন আহমদ বখশীর তবকাত-ই-আকবরী এবং মোল্লা আবদুল কাদির বদাউনীর মুনতাখাব-উৎ-তাওয়ারিখ। এ গ্রন্থগুলিতে কররানী সুলতানদের (১৫৬৩-১৫৭৬) পতনের বিবরণ ও আকবরের বাংলা বিজয়ের কাহিনী পাওয়া যায়। এসব গ্রন্থে বর্ণিত কাহিনী সমসাময়িক বিবরণ বলে বিবেচনা করা যায়। আকবরনামা তিন খন্ডে রচিত, আইন-ই-আকবরী এর তৃতীয় খন্ড। এটি আকবরের সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক তথ্য সম্বলিত এবং পরিসংখ্যান ভিত্তিক এক ধরনের গেজেটিয়ার। ১৫৯৩ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থটি আকবরের নিকট পেশ করা হয়। এতে বাংলা সম্পর্কে আবুল ফজলের তথ্যাবলি সব ক্ষেত্রে নির্ভুল নয়। সমগ্র বাংলাকে তিনি তাঁর মনিবের অধিকারভুক্ত বলে ধরে নিয়েছিলেন যা মোটেও সত্য নয়। এরপর তিনি বাংলার রাজস্ব ও প্রশাসনিক বিভাগগুলির বর্ণনা দিয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে এ বর্ণনা খুব সতর্কভাবে সন্নিবেশিত বলে মনে হলেও সেগুলি ছিল স্পষ্টত বিভ্রান্তিকর তথ্য ও পরিসংখ্যান। পূর্ববাংলার  বারো ভূঁইয়াদের নেতা  ঈসা খান সম্পর্কে তার বক্তব্যও পরস্পরবিরোধী ও বিভ্রান্তিকর।

বাংলার ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে তবকাত-ই-আকবরী অনেক বেশি মূল্যবান। ১৫৯২-৯৩ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থটির রচনা সমাপ্ত হয়। প্রথম দিকের গজনী শাসকদের আমল থেকে শুরু করে আকবরের রাজত্বকালের ৩৬তম বছর (১৫৯২) পর্যন্ত সময়ের ব্যক্তিগত উদ্যোগে রচিত একটি সাধারণ ইতিহাসগ্রন্থ হলেও তবকাত-ই-আকবরীতে পূর্বতন রচনার ওপর ভিত্তি করে লিখিত প্রাক-মুগল বাংলার মুসলিম শাসকদের সম্পর্কে একটি বিশেষ অধ্যায় রয়েছে। এতে দাউদ খান কররানীর সঙ্গে আকবরের যুদ্ধের বর্ণনাও তথ্যনির্ভর ও নির্ভুল। দিল্লির সুলতানদের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে বদাউনী তাঁর মুনতাখাব-উৎ-তাওয়ারিখ-এ বাংলার ঘটনাবলির উল্লেখ করেছেন।

আবুল কাসিম ফিরিশতার (১৫৭০-১৬২৩) তারিখ-ই-ফিরিশতায় বাংলার ঘটনাবলি সম্পর্কিত তথ্য আছে। তিনি বিজাপুরের ইবরাহিম আদিল শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় দাক্ষিণাত্যে তাঁর ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেছিলেন (১৫৯৪)। ইতিহাসের মৌলিক তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ফিরিশতাহ সারা ভারতীয় উপমহাদেশে ভ্রমণ করেন। তাঁর ইতিহাসগ্রন্থটি একটি ভূমিকা, বারোটি অধ্যায় ও একটি উপসংহারে বিভক্ত। সপ্তম অধ্যায়ে তিনি বাংলা ও বিহারের সুলতানদের সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এ অঞ্চলের ইতিহাস লিখতে গিয়ে ফিরিশতা জনৈক হাজী মুহম্মদ সাফাহারির পান্ডুলিপির সাহায্য নিয়েছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে।

বাংলায় কর্মরত কতিপয় মুগল কর্মকর্তা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এ প্রদেশের অধিবাসী ও ঘটনাবলি সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেন। এসব ইতিহাসগ্রন্থের কয়েকটি ছিল সাধারণ ইতিহাস, অন্যগুলিকে প্রাদেশিক ইতিহাসরূপে চিহ্নিত করা যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, মুহম্মদ সাদিকের সুবহ-ই-সাদিক গ্রন্থে মুগল সাম্রাজ্য সম্পর্কে ব্যাপক বর্ণনায় বাংলার বিবরণ রয়েছে। যে সকল মুগল কর্মকর্তা বাংলায় অবস্থান করে গ্রন্থ রচনা করেন ও বাংলার ইতিহাসের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন তাদের মধ্যে বাহারিস্তান-ই-গায়েবীর রচয়িতা মির্জা নাথান এবং আজিবা-ই-গরীবা (ফতোয়া-ই-ইবরিয়া নামেও পরিচিত) ও তারিখ-ই মুলক-আসাম-এর গ্রন্থকার শিহাবউদ্দীন তালিশের নাম উল্লেখযোগ্য।

বাহারিস্তান-ই-গায়েবীর রচয়িতা মির্জা নাথান ভারতে বসবাসকারী এক ইরানি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইহতিমাম খান নামে পরিচিত তার পিতা মালিক আলী সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ২৫০ জন অশ্বারোহীর সেনাপতি এবং কিছুকালের জন্য আগ্রার  কোতোয়াল ছিলেন। ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাকে বাংলার নওয়ারার (নৌবাহিনী) মীর বহর নিযুক্ত করেন। যুবক মির্জা নাথান বাংলার নৌবাহিনীতে পিতার সহকারীরূপে বাংলার বারো ভূঁইয়া এবং  মগ ও ফিরিঙ্গি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে নৌ-যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এধরনের অনেক অভিযান ও যুদ্ধে তিনি নেতৃত্ব দেন এবং বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

বাংলায় কর্মরত থাকাকালেই মির্জা নাথান তার গ্রন্থ সংকলন করেন। এ গ্রন্থে তিনি ‘গায়েবী’ (অদৃশ্য) তাখাল্লুস বা ছদ্মনাম গ্রহণ করেন এবং সেজন্যই তার গ্রন্থের নামকরণ হয় বাহারিস্তান-ই-গায়েবী। জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে (১৬০৫-১৬২৭) বাংলা ও আসামে যেসব ঘটনার সংগে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন তার বিশ্বস্ত ও অনুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তিনি তার ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি তার উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।

বাহারিস্তান-ই-গায়েবী গ্রন্থে বাংলার সুবাহদার হিসেবে ইসলাম খা এর নিযুক্তিকাল (১৬০৮) থেকে শুরু করে ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহী শাহজাদা শাহজাহান এর আকবরমহল ত্যাগ পর্যন্ত সময়কালের ঘটনাবলির বর্ণনা রয়েছে। বাংলায় পর পর তিন জন সুবাহদারের সুবাহদারি আমল ও শাহজাদা শাহজাহানের অবস্থানের ভিত্তিতে এ গ্রন্থ যথাক্রমে (১) ইসলামনামা, (২) কাসিমনামা, (৩) ইবরাহিমনামা ও (৪) ওয়াকিয়াত-ই-জাহানশাহী এ চার খন্ডে বিভক্ত। গ্রন্থকার শাহজাহানের রাজত্বের পঞ্চম বছরে (১৬৩২) তার গ্রন্থের প্রথম তিন খন্ড সমাপ্ত করেন। চতুর্থ খন্ডে রচনার তারিখের কোনো উল্লেখ নেই, তবে ধারণা করা হয় যে, এটিও ওই একই বছর সংকলিত হয়েছিল।

বাহারিস্তান-ই-গায়েবী ব্যক্তিগত স্মৃতিকথার আকারে রচিত। গ্রন্থকার স্বীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে গ্রন্থটি লিখেন। বাংলায় তিনি প্রায় বিশ বছর কর্মরত ছিলেন এবং এর ভূগোল, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থা এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমির সঙ্গে সুপরিচিত ছিলেন। বাংলায় তার কর্মকালে পরিচালিত সামরিক অভিযানগুলির বিস্তারিত বিবরণ তিনি দিয়েছেন। এ বিবরণে এ প্রদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থারও প্রতিফলন ঘটেছে। এ গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের বাংলার ইতিহাসের এক বিশাল শূন্যতা পূরণ করেছে। এটি এ প্রদেশের এক ধরনের প্রথম ধারাবাহিক ইতিহাসও বটে। এর আগে এ প্রদেশের কোনো ধারাবাহিক ইতিহাস রচনার চেষ্টা করা হয় নি। অপর সব ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বাংলার কিছু কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছেন।

একজন মুগল কর্মকর্তা বিধায় বাংলার ইতিহাস রচনায় মির্জা নাথান রাজকীয় ঐতিহাসিকের পক্ষপাতিত্বের উর্ধ্বে উঠতে পারেন নি। এ সীমাবদ্ধতা সত্বেও তার গ্রন্থটি বাংলার অধিবাসীদের জীবনধারা, এর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, জনগণের সাফল্য, সামাজিক রীতিনীতি ও কুসংস্কার এবং এ প্রদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কিত তথ্যের এক সমৃদ্ধ ভান্ডার হিসেবে বিবেচিত।

বাহারিস্তান-ই-গায়েবী গ্রন্থের যেখানে সমাপ্তি সেখান থেকেই শুরু মুহম্মদ সাদিকের সুবহ্-ই-সাদিক ইতিহাসগ্রন্থের। ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি নবনিযুক্ত সুবাহদার কাসিম খান জুইনি এর সাথে ওয়াকিয়ানবিশ (সংবাদ লেখক) রূপে বাংলায় আসেন এবং শাহ শুজার সুবাহদারি পর্যন্ত (১৬৩৯) বাংলায় অবস্থান করেন। তিনি বহু বছর জাহাঙ্গীরনগরে (ঢাকা) বসবাস করেন এবং ১৬৩৭-৩৮ খ্রিস্টাব্দে মুগলদের কোচ-হাজো অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন। সাদিক ছিলেন সুপন্ডিত ব্যক্তি। বিশ্বের ইতিহাস ও ভূগোল গ্রন্থরূপে সুবহ্-ই-সাদিকের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। চার খন্ডে বিভক্ত এ গ্রন্থের তৃতীয় খন্ডে রয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস এবং এ খন্ডের দ্বাদশ পরিচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে গ্রন্থকারের নিজের কথা ও বাংলার ঘটনাবলি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বাংলার যে বিবরণ তাঁর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে গেছেন এ প্রদেশের ইতিহাসে তার মূল্য অপরিসীম। গ্রন্থটি সমকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাবলি এবং বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন সম্পর্কে যথেষ্ট আলোকপাত করে। শাহজাদা শুজার সুবাহদারি আমলে (১৬৩৯-৬০) পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক শিয়া অভিজাত ব্যক্তির বাংলায় আগমনের কথা সাদিক বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষত সুজার শাসনকালের ইতিহাস সম্বলিত অপর একটি গ্রন্থ হচ্ছে মুহম্মদ মাসুম রচিত  তারিখ-ই-শাহ সুজাই

শিহাবউদ্দীন মুহম্মদ তালিশের আজিবা-ই-গরীবা গ্রন্থে তারিখ-ই-শাহ শুজাইতে বর্ণিত ঘটনাবলির কতকটা ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়েছে। তিনি মীরজুমলা এর সুবাহদারি আমলে (১৬৬০-১৬৬৩) বাংলায় তার অধীনস্থ একজন কর্মকর্তা ছিলেন। মীরজুমলার আসাম অভিযানে তিনি অংশ নেন। এ গ্রন্থে প্রধানত আসামে পরিচালিত অভিযানগুলির বর্ণনা রয়েছে। তিনি শায়েস্তা খান এর সুবাহদারি আমলের (১৬৬৪-১৬৭৮, ১৬৭৯-১৬৮৮) বিশেষ করে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বিজয়ের ঘটনাবলি বর্ণনা করেছেন। গ্রন্থকার বাংলার দুজন বিশিষ্ট সুবাহদারের আমলে বাংলার ঘটনাবলি সম্পর্কে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভিত্তিতে গ্রন্থটি রচনা করেন বলে এটি যথার্থই একটি মূল্যবান গ্রন্থ। বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কেও এ গ্রন্থে আলোকপাত করা হয়েছে।

আওরঙ্গজেব এর মৃত্যুর (১৭০৭) সময় থেকে বাংলার শাসক বা নওয়াবদের সম্পর্কে রচিত বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রয়েছে। এগুলির অধিকাংশ লেখা হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকে (অঠারো শতকের তৃতীয় পাদে)। তবে এসব গ্রন্থের রচয়িতারা ছিলেন বাংলার শাসকদের ঘনিষ্ট সহযোগী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং তাদের বর্ণিত ঘটনাবলিতে প্রায় ক্ষেত্রেই তারা নিজেরা অংশ গ্রহণ করেছিলেন। এ গ্রন্থগুলির মধ্যে সর্বপ্রথম হলো আজাদ হোসেনের নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খানী। আজাদ হোসেন ছিলেন জাহাঙ্গীরনগরে (ঢাকা) অভিবাসনকারী পারস্যদেশীয় এক বিদ্বান ব্যক্তি। তিনি তাঁর পৃষ্ঠপোষক মির্জা লুৎফুল্লাহ্ ওরফে দ্বিতীয় মুর্শিদকুলী খান রুস্তম জঙ্গকে তাঁর গ্রন্থটি উপহার দেন। মির্জা লুৎফুল্লাহ্ নওয়াব শুজাউদ্দীনের (১৭২৮-৩৯) কন্যা দুর্দনা বেগমকে বিয়ে করেছিলেন। ১৭২৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে দ্বিতীয় মুর্শিদকুলী খান ছিলেন জাহাঙ্গীরনগরের নায়েব নাজিম। পরবর্তী সময় তাকে উড়িষ্যায় বদলি করা হয়। এ গ্রন্থে বাংলার সুবাহদার ও নওয়াবদের কাহিনী ও উপদেশাবলি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এ গ্রন্থে মুসলিম শাসনামলে বাংলার শাহী দরবার ও সমাজের পরিশীলিত রীতিনীতি ও সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটেছে।

আলীবর্দী খান এর বিশ্বস্ত বন্ধু ও পদস্থ কর্মকর্তা এবং নওয়াব সরফরাজ খান এর (১৭৩৯-১৭৪০) জামাতা ইউসুফ আলী নওয়াব আলীবর্দী খানের শাসনামলের (১৭৪০-১৭৫৬) ইতিহাস রচনা করেন। পরবর্তীকালে ইউসুফ আলী নওয়াব মীর কাসিম এর (১৭৬০-১৭৬৪) অধীনে চাকুরি গ্রহণ করেন। ইংরেজদের পাটনা দখলের পর (৬ নভেম্বর, ১৭৬৩) বিহার থেকে নওয়াবের পলায়নকালে তিনি তার সহগামী হন এবং এলাহাবাদে আশ্রয় নেন (৩ জানুয়ারি, ১৭৬৪)। কিন্তু পরে মীর কাসিম অযোধ্যার নওয়াব শুজাউদ্দীনের সঙ্গে মিলিত হয়ে বুন্দেলখন্ড জয় ও বিহারে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলে তিনি তাঁর প্রভুর দুর্ভাগ্যের অংশীদার না হয়ে তাঁকে ত্যাগ করে অসুস্থতার অজুহাতে এলাহাবাদে থেকে যান। তিনি পুনরায় অধিষ্ঠিত নওয়াব মীরজাফর এরও কোপানলে পতিত হন। তবে মীরজাফরের মৃত্যু হলে (৬ ফেব্রুয়ারি, ১৭৬৫) তাঁর সব দুশ্চিন্তার অবসান ঘটে।

ইউসুফ আলী আলীবর্দীর ইতিহাস রচনার কাজ শেষ করতে পারেন নি। গ্রন্থটিতে কোনো শিরোনামও নেই। আলীবর্দীর কর্মজীবন ও রাজত্বকালের ঘটনাবলি নিয়ে রচিত বিধায় তাঁর মৃত্যুর পর পরবর্তী ঐতিহাসিকরা গ্রন্থটির নামকরণ করেন আহওয়াল-ই মহববত জং। শুধু আলীবর্দীর জীবনকাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ক্ষেত্রেই তিনি মাঝেমধ্যে শাহ সুজা ও সরফরাজ খানের রাজত্বকালের ঘটনাবলির উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর গ্রন্থে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আলীবর্দীর শাসনকালের প্রামাণ্য ও বিস্তারিত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁর বক্তব্য থেকেই জানা যায় যে, তাঁর ইতিহাস গ্রন্থের অবশিষ্ট অংশকে ধারাবাহিক ও সুবিন্যস্ত রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাঁর মনিব মীর কাসিমের পরাজয় ও পলায়ন, তাঁর বৃদ্ধ পিতার মৃত্যু এবং এলাহাবাদে তার নিজের অসুস্থতা, মীরজাফরের তীব্র রোষ এবং সরকারি দলিলপত্র থেকে তথ্য সংগ্রহের সুযোগের অভাব এর কারণ বলে তিনি জানিয়েছেন।

ইউসুফ আলী নওয়াব আলীবর্দীর শাসনকালের ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দ পরবর্তী সময়ের ঘটনাবলি প্রধানত স্মৃতির উপর নির্ভর করে বর্ণনা করেছেন। ফলে তাঁর বিবরণ সংক্ষিপ্ত এবং ঘটনার তারিখগুলি সঠিক না হওয়াই স্বাভাবিক। তা সত্বেও আগের অংশের মতোই এ অংশেও তিনি ঘটনাবলির বিশ্বস্ত বর্ণনার উঁচু মান বজায় রেখেছেন। তাঁর বিবরণের প্রামাণিকতা তাঁর ইতিহাসকে বিশেষ মূল্য দান করেছে। সমকালীন লেখকরা গ্রন্থটির যথার্থ মূল্যায়ন ও প্রশংসা করেছেন। গোলাম হুসেন তাবাতাবাঈ তাঁর সিয়ার গ্রন্থে প্রায়শ ইউসুফ আলীর ইতিহাসের বরাত দিয়েছেন এবং বহু ক্ষেত্রে তিনি আহওয়াল-ই-মহবত জং এর হুবহু অনুকরণ করেছেন।

আলীবর্দী খানের আত্মীয় এক অভিজাত করম আলী বাংলার নায়েব দীউয়ান মুহম্মদ রেজা খান মুজাফফর জঙের পৃষ্ঠপোষকতায় মুজাফফর নামা রচনা করেন এবং তাঁর নামানুসারেই গ্রন্থটির নামকরণ করা হয়। রেজা খান ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এর অধীনে এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। করম আলী ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে তাঁর নিজ সময়কাল পর্যন্ত বাংলার ইতিহাস লিখেন। তিনি ছিলেন সিরাজউদ্দৌলার খালাতো ভাই ও প্রতিদ্বন্দ্বী শওকত জঙ্গ-এর সমর্থক। ফলে এ গ্রন্থে সিরাজের প্রতি কিছুটা অবিচারই করা হয়েছে।

গভর্নর হেনরী ভ্যান্সিটার্ট-এর (১৭৬০-১৭৬৪) নির্দেশে সলিমুল্লাহ  তাওয়ারিখ-ই-বাঙ্গালাহ শিরোনামে একটি সংক্ষিপ্ত ও মূল্যবান ইতিহাস লিখেন। এ গ্রন্থে সুবাহদার ইবরাহিম খানএর (১৬৮৯-৯৭) সময় থেকে আলীবর্দী খানের মৃত্যু (১৭৫৬) পর্যন্ত সময়কালের বাংলার ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে। দীউয়ান-নাজিম মুর্শিদকুলী খান ও নওয়াব আলীবর্দী খানের কর্মজীবন ও প্রশাসন সম্পর্কিত তথ্যের জন্য গ্রন্থটি বিশেষভাবে মূল্যবান। গ্রন্থটিতে বিধৃত কালানুক্রম ত্রুটিপূর্ণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর বিবরণ পরস্পরবিরোধী। তবে প্রতিপাদ্য সময়কালে এ প্রদেশের রাজস্বব্যবস্থা ও সামাজিক জীবন সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য রয়েছে এ গ্রন্থে।

ওয়াকিয়াত-ই-ফতেহ্ বাঙ্গালা নামে আলীবর্দী খানের রাজত্বকাল সম্পর্কে অপর একটি গ্রন্থ রয়েছে। এটি ওয়াকিয়াত-ই-মহবত জং নামেও অভিহিত। নওয়াবের এক আত্মীয় মুহম্মদ ওয়াফা গ্রন্থটি রচনা করেন। আলীবর্দীর অধীনে চাকুরি করায় তিনি এ গ্রন্থে তাঁর প্রভুর স্তাবকের ভূমিকা পালন করেন।

ইলাহি বখশ নামে মালদহের এক স্কুল-শিক্ষক খুরশীদ জাহান নুমা শিরোনামে একটি সাধারণ ইতিহাস রচনা করেন। এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি হেনরী বেভারীজ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন এবং তা এশিয়াটিক সোসাইটি এর জার্নালে (৬৪তম খন্ড, ১৮৯৫) প্রকাশিত হয়। সামাজিক ইতিহাসের জন্য গ্রন্থটি খুবই সহায়ক।

আঠারো শতকে হিদায়েত আলী খানের পুত্র গোলাম হুসেন তাবাতাবাঈ কর্তৃক বঙ্গদেশে রচিত সিয়ার-উল-মুতাখ্খেরীন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসগ্রন্থ। তাঁকে মুসলিম ভারতের শেষ শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিকরূপে গণ্য করা হয়। তাঁর শিক্ষা, পারিবারিক সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতা ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহের অনুকূল ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিল এবং তাঁকে জুগিয়েছিল সমকালীন ইতিহাস রচনার যোগ্যতা। তাঁর পিতা হিদায়েত আলী খান দিল্লি ও আজিমাবাদের (পাটনা) শাহী দরবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তাঁর আত্মীয়রা নওয়াব আলীবর্দীর অধীনে চাকুরি করেছেন। তিনি নিজেও ছিলেন আলীবর্দীর আত্মীয় এবং তাঁর সরকারে ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের নিজামতে চাকুরি করেছেন। তিনি দিল্লি, আজিমাবাদ, অযোধ্যা, মুর্শিদাবাদ, পুর্ণিয়া এবং সে সময়ের অপরাপর প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলিতে বসবাস করেছেন। এভাবে তিনি তৎকালীন ঘটনাবলি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন এবং সমকালীন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসেন।

শাহজাদা আলী গওহরের (পরবর্তী সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম) দরবারে রামনারায়ণের, মীর কাসিমের দরবারে মেজর কার্ণাকের এবং পুনরায় ইংরেজ দরবারে মীর কাসিমের দূত হিসেবে গোলাম হোসেন তাবাতাবাই তাঁর সময়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। অতএব পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও ঘটনাবলির প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি তাঁর গ্রন্থের উপাদান সংগ্রহ করেন। সুতরাং ওই আমল সম্পর্কিত তথ্যাদির ক্ষেত্রে তাঁর গ্রন্থ ইতিহাসের এক শূণ্যতা পূরণ করেছে।

সিয়ার-উল-মুতাখ্খেরীন তিন খন্ডে রচিত। প্রথম খন্ডে অতি প্রাচীনকাল থেকে আওরঙ্গজেবের রাজত্বকাল পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় খন্ড শুরু হয়েছে ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর সময় থেকে এবং এতে তাঁর উত্তরাধিকারীদের বিষয়াবলি আলোচিত হয়েছে। এতে মুর্শিদাবাদ নিজামতের এবং বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় ইংরেজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এ গ্রন্থে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে এ প্রদেশের আইনবিধান এবং প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। তৃতীয় খন্ডে দ্বিতীয় শাহ আলমের সময়কার ঘটনাবলি এবং অযোধ্যা, হায়দ্রাবাদ, হায়দার আলী ও মারাঠাদের বিষয় আলোচিত হয়েছে। এতে নওয়াব মীর কাসিমের মৃত্যুর উল্লেখ আছে এবং ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইংরেজদের কার্যক্রমের আলোচনা দিয়ে এ খন্ড শেষ হয়েছে। এম. রেমন্ড নামে একজন ফরাসি দ্বিতীয় খন্ডের অধিকাংশ ফারসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তাঁর নাম হয়েছিল হাজী মুস্তফা। বক্সারের যুদ্ধের (২২ অক্টোবর, ১৭৬৪) পর ইংরেজদের সঙ্গে নওয়াব শুজাউদ্দৌলার সন্ধি সম্পাদনের ঘটনার সঙ্গেই এ অনুবাদকর্ম শেষ হয়েছে।

গোলাম হুসেন তাবাতাবাঈ ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর গ্রন্থ রচনা শেষ করেন। তিনি ইতিহাসকে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও মানুষের শিক্ষা গ্রহণের পুস্তক হিসেবে বিবেচনা করেছেন। অতীতের সংশ্লিষ্ট ও অবিচ্ছিন্ন বিবরণ তুলে ধরার উদ্দেশ্যে তিনি সিয়ার-উল-মুতাখ্খেরীন রচনা করেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে তাঁর নিজের সময়কাল পর্যন্ত ইতিহাসের শূন্যতা পূরণই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তিনি দাবি করেছেন যে, তিনি তাঁর ইতিহাসে সত্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন এবং বিষয়াবলির বিশ্বস্ত বিবরণ দিয়েছেন; হিংসা, ভালবাসা, ভীতি বা অনুগ্রহের কোনো বিবেচনা তাঁকে পক্ষপাত-দুষ্ট করেনি। ঘটনার যথাযথ বর্ণনা গোলাম হোসেনকে উত্তম মুসলিম ঐতিহ্যের ধারকরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সিয়ার-উল-মুতাখ্খেরীনে’র প্রথম খন্ডটি আকবরনামা, আইন-ই-আকবরী এবং অপরাপর কয়েকটি গ্রন্থের মোটামুটি সংক্ষিপ্ত অনুলিপি এবং এ কারণে গোলাম হুসেন তাবাতাবাঈ কোনো মৌলিকত্বের দাবি করতে পারেন না। দ্বিতীয় ও তৃতীয় খন্ড অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের দাবিদার, কারণ এগুলিতে এমন এক আমলের (১৭০৭-১৭৮১) ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে যে সময়ের অন্য কোনো বিস্তারিত ঐতিহাসিক বিবরণ, বিশেষত বাংলার নিজামত সম্পর্কিত বিষয়াবলির বিবরণ ছিল না। এ ক্ষেত্রে তিনি এক শূন্যতা পূরণ করেছেন। তবে গোলাম হোসেনের এ গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির কিছু ত্রুটির কারণে এর গুরুত্ব অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। দূত হিসেবে তিনি নিজেকে অবিশ্বস্ত ও দায়সারা গোছের প্রমাণ করেছেন। তিনি তাঁর পৃষ্ঠপোষক ও শুভানুধ্যায়ী রামনারায়ণ ও মীর কাসিমের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁদের গোপন তথ্য ইংরেজদের নিকট ফাঁস করে দেন। তিনি তাঁর মনিব ও জাতির ক্ষতি সাধন করে ইংরেজদের অনুগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতা লাভের চেষ্টা করেন। তিনি গর্বভরে লিখেছেন যে, নওয়াব মীর কাসিমের গোপন উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি ইংরেজদের আগাম সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তাঁর লেখায় নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার প্রতি তাঁর বৈরিতা প্রচ্ছন্ন থাকেনি। গোলাম হুসেন ছিলেন ইংরেজ-ঘেষা লোক। তিনি নতুন প্রভু ইংরেজদের স্বাগত জানিয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্যে প্রশংসা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন এবং তাদের সকল কাজ ও নীতির ন্যায্যতা প্রতিপাদন করেছেন।

এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সিয়ার-উল-মুতাখ্খেরীন বিশেষ করে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক তথ্য ভান্ডার। এতে সেকালের সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন পাওয়া যায়। তিনি মাঝেমধ্যে সেকালের মুসলমান ও হিন্দুদের সামাজিক অনুষ্ঠান ও উৎসবাদির উল্লেখ করেছেন। গ্রন্থকারের বিচ্ছিন্ন বক্তব্য থেকে শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। তিনি আজিমাবাদ ও মুর্শিদাবাদে সাংস্কৃতিক জীবনচর্যার সুন্দর বিবরণ দিয়েছেন। রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত বহু পন্ডিত, কবি, চিকিৎসক, ধর্মতত্ত্ববিদ ও বিদ্বান ব্যক্তির নাম তিনি উল্লেখ করেছেন।

গোলাম হুসেন সেলিম জায়েদপুরী রচিত রিয়াজ-উস-সালাতীন একটি মূল্যবান গ্রন্থ। এটি বাংলার মুসলমানদের সম্পর্কে এযাবতকাল রচিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসগ্রন্থ। গ্রন্থকার ছিলেন আঠারো শতকের আশির দশকে মালদহে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক প্রতিনিধি জর্জ উডনির অধীনে ডাকমুন্সী। উডনির তাকিদে গোলাম হুসেন সলিম ১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর গ্রন্থ রচনা শেষ করেন। তিনি গ্রন্থ রচনায় তবকাত-ই-নাসিরী, তারিখ-ই-ফিরুজশাহী এবং মুগল ঐতিহাসিকদের গ্রন্থাবলিসহ ইতঃপূর্বে রচিত প্রায় সব গ্রন্থেরই সাহায্য নেন। তিনি এমন কিছু স্বল্পপরিচিত গ্রন্থেরও সাহায্য নেন যেগুলি সম্ভবত এখন আর পাওয়া যায় না। তিনি গৌড় ও পান্ডুয়ার কিছু পুরনো শিলালিপি এবং সৌধও কাজে লাগিয়েছেন। এ গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদক আবদুস সালাম (১৯০৫) তাঁর গ্রন্থে যথার্থভাবেই গোলাম হুসেনকে ‘মুসলিম বাংলার অগ্রগণ্য ঐতিহাসিক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বস্ত্তত মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাস লিখেছেন প্রথম দিকের এমন সব পন্ডিতই ‘রিয়াজ’কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। চার্লস স্টুয়ার্ট-এর হিস্ট্রি অব বেঙ্গল (১৮১৩) অনেকাংশেই এর ভিত্তিতে রচিত এবং হেনরী ফার্ডিনান্ড ব্লকম্যান এটিকে ফারসি ভাষায় রচিত বাংলার মুসলমানদের ইতিহাসের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ বিবরণরূপে বিবেচনা করেছেন। তবে অধুনা আবিষ্কৃত কিছু মুদ্রা ও লিপির আলোকে রিয়াজে উল্লেখিত কিছু তারিখ ও তথ্য সংশোধন করা প্রয়োজন।

পূর্বোক্ত আলোচনা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, মুগল-বিজয়ের পূর্বে এ প্রদেশের চৌহদ্দিতে কোনো ইতিহাসগ্রন্থ রচিত হয়েছিল বলে জানা যায় না। মুগল আমলে এ প্রদেশে কর্মরত কর্মকর্তাদের রচিত বহু বিবরণ পাওয়া যায়। মধ্যযুগ থেকে আধুনিক (ব্রিটিশ) যুগে উত্তরণকালে বাংলার ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ সম্বলিত মাত্র কয়েকটি গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সমগ্র মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাস রচনায় থুকিডাইডেস নির্দেশিত উচ্চাদর্শে উজ্জীবিত এবং সত্য নিরূপণে কঠোর পরীক্ষা প্রয়োগকারী, অথবা পলিবিয়াসের দৃষ্টিতে ঘটনাবলির মূল্যায়নকারী বিচারকরূপে বিবেচিত একজন ঐতিহাসিকও খুঁজে পাওয়া যায় না। এ সময়ে রচিত অধিকাংশ ইতিহাসগ্রন্থকে ঘটনাবলির উৎসরূপে গ্রহণ করা যায় এবং আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে আমরা মধ্যযুগের বাংলার যথার্থ ইতিহাস পেতে পারি।  [দেলোয়ার হোসেন]

ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশোত্তর যুগ  মধ্যযুগের ইতিহাস লিখন পদ্ধতি পাল্টে গেল ঔপনিবেশিক যুগের শুরু থেকেই। মধ্যযুগের ইতিহাস ছিল মূলত রাজদরবারভিত্তিক এবং রাজকীয় শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতায়ই বিদ্বানেরা ইতিহাস লিখনে প্রবৃত্ত হতেন। আঠারো শতকের শেষভাগে সে পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলেও কতিপয় উচুমানের ইতিহাস লেখা হয়েছে, যেমন গোলাম হুসেন সেলিমের রিয়াজ-উস-সালাতীন, সৈয়দ গোলাম হোসেন খান তবাতবাঈর সিয়ার-উল-মুতাখ্খেরীন ও মুনশী সলিমুল্লাহর তাওয়ারিখ-ই-বাঙ্গালাহ। ইতিহাস শাস্ত্রের চর্চায় এরাই মধ্যযুগীয় ধারার শেষ প্রতিনিধি।

ঔপনিবেশিক যুগে ইতিহাস লিখনধারা  কাল এবং বিষয় উভয় দিক থেকে বিচার করলে ঔপনিবেশিক যুগের ইতিহাস লিখনধারাকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। আঠারো শতকের বাণিজ্যিক উপনিবেশবাদ, উনিশ শতকের রাজনৈতিক উপনিবেশবাদ এবং বিশ শতকের সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ।

বাণিজ্যিক উপনিবেশবাদের ইতিহাস লিখন  ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত কোম্পানির কর্মকর্তারা ইতিহাস বিষয় বাছাই করেছে তাদের নিজেদের আশু স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে, যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজস্ব, স্থানীয় শাসকশ্রেণীর সমস্যা ও অবস্থান ইত্যাদি। এ বৈশিষ্ট্যের লেখাগুলির মধ্যে প্রধানগুলি হলো: William Watts- Memoirs of the Revolution in Bengal (1764); JA. Caillaud- A Narrative of what happened in Bengal in 1760 (1764); Luke Scrafton- Reflections on the Government of Indostan (1770); Alexander Dow- History of Hindoostan, 3 vols. (1770-72); William Bolts- Considerations of Indian Affairs (1772); Pattulu- An Essay upon the cultivation of lands and improvement of the Revenues of Bengal (1772); Robert Orme- Historical Fragments of the Mogul Empire (1782); James Grant-Historical and Comparative Account of the Finances of Bengal (1786); F. Gladwin- Transactions in Bengal (1791) and Ges Boughton Rous- Dissertations concerning the Landed Property of Bengal. এ সকল লেখার উদ্দেশ্য ছিল বাংলার সম্পদ নিরূপণ করা, এদেশের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা বিচার করা। এছাড়া, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও ছিল বাণিজ্যিক ঔপনিবেশিক পর্বের ইতিহাস লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য।

সব লেখকের একই সিদ্ধান্ত ছিল। তাঁদের মতে, এখানে একটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ জাতির প্রভূত সুবিধা হবে। ব্রিটিশ জনমতকে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তাঁরা বলতে চেয়েছেন যে, এদেশের সাধারণ মানুষ কোম্পানিকে তাঁদের শাসক হিসেবে মেনে নিতে আগ্রহী, কেননা তাঁদের মতে, দেশের মানুষ মুগল শাসকদের নির্যাতন নিপীড়ন থেকে রক্ষা পেতে চায়।

ইতিহাস লেখার বিষয় ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন আসল ওয়েলেসলী কর্তৃক ভারতব্যাপী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর। উনিশ শতকের প্রথম থেকে ইতিহাস লেখার ক্ষেত্র ভৌগোলিকভাবে বাংলা থেকে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতব্যাপী প্রসারিত হলো। ইতিহাসের বিষয় হিসেবে বাংলা এখন পরিত্যক্ত।

রাজনৈতিক উপনিবেশবাদের ইতিহাস লিখন  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্ব শেষ হলো উনিশ শতকের প্রথম পাদে। এর সঙ্গে শুরু হলো ইতিহাস লেখার নতুন ধারা। এ ধারার প্রধান সুর হলো ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের যথার্থতা ও এর সুফল প্রচার। ব্রিটিশ উপযোগবাদের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান নিরীক্ষক জেমস মিল (১৭৭৩-১৮৩৬) এ ধারার প্রবর্তক।  তাঁর History of British India, 3 vols. (1817) দীর্ঘকাল ভারত ও ব্রিটিশ জনমতকে প্রভাবিত করেছিল। মিলের মতে, ব্রিটিশ কর্তৃক ভারত শাসন একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ারই অঙ্গ। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাকে জোরালোভাবে সমর্থন করেন। তবে এর শাসন ব্যবস্থাকে তিনি সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, ভারতকে শাসন করা উচিত ব্রিটিশ শাসনতন্ত্র মোতাবেক, প্রাচ্য স্বৈরতান্ত্রিকভাবে নয়। তবে ভারত শাসনে ব্রিটিশ শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুপারিশ করলেও মিল ওই শাসনে ভারতীয়দের জড়িত করাতে অপ্রস্ত্তত। মিলের এ মনোভাব পরবর্তী লিখনের একটি নিয়মিত ধারায় পরিণত হয়। মার্শম্যান, উইলসন, এলফিনস্টোন, মার্টিন, থর্নটন, কীন, বিভারীজ ও কেই (Kaye) প্রভৃতি উদারপন্থি ঐতিহাসিক মিলের পথ ধরে ভারতের ইতিহাস লিখেন ওই একই সুপারিশে যে, ভারত শাসন করতে হবে ব্রিটিশ পদ্ধতিতে এবং শুধু ব্রিটিশদের দ্বারা। তাঁদের যুক্তি হলো, পাশ্চাত্য শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতীয়দের সংযুক্ত করতে হবে তখনই যখন এরা ওই ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। মিল ও তাঁর অনুসারীদের আরেকটি অবদান হচ্ছে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে ভারতকে একটি স্বত্ব হিসেবে গণ্য করা। মিল ও তাঁর অনুসারীদের ভারতচিন্তা পরবর্তীকালে বাঙালি ইতিহাসবেত্তাদের ওপরও প্রভাব ফেলে। রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রথম বাঙালি যিনি ইউরোপীয়দের ভারততত্ত্ব গ্রহণ করেন, তবে ইউরোপীয়দের দেওয়া ভারত-চিন্তা বাঙালি ইতিহাসবেত্তাদের আকৃষ্ট করতে শুরু করে উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই।

সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের ইতিহাস লিখন  মহান সিপাহি বিপ্লব চলতি ইতিহাস লিখনের ধারা পাল্টে দেয়। এ বিদ্রোহ একদিকে যেমন ভারতের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটালো, অপরদিকে ব্রিটিশদের মধ্যেও একটি নীতিগত পরিবর্তন আনল এ মর্মে যে, ভারতকে ব্রিটিশ সভ্যতার আদলে গড়ে তোলার চেষ্টা বন্ধ করে এর নিজস্ব ঐতিহ্যে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং ভারতীয় সভ্যতার বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে ব্রিটিশের প্রতি ভারতীয়দের সমর্থন ও আনুগত্য আদায় করা। এ নীতির বাস্তবায়নে অঘোষিতভাবে ঔপনিবেশিক সরকার একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নীতি গ্রহণ করে যার মূল লক্ষ্য ছিল ভারতকে এর নিজস্ব ইতিহাস ঐতিহ্যের ওপর উপস্থাপন করা এবং একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে ভারতীয়দের নিকট গ্রহণযোগ্য করে তোলা। এ সাংস্কৃতিক-সাম্রাজ্যিক নীতির অঙ্গ ছিল ব্রিটিশ ও ভারতীয় সভ্যতার মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন রচনা করা। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই ব্যক্তিগতভাবে স্যার উইলিয়ম জোন্স তা উপলব্ধি করেছিলেন এবং তার চর্চা করেছিলেন।

সাংস্কৃতিক-সাম্রাজ্যিক নীতি বাস্তবায়ন লক্ষ্যে সরকার একটি আলাদা তহবিল গঠন করে। দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য গবেষণা করার জন্য ব্রিটিশ সিভিলিয়নদের উৎসাহিত করা হয়। বলা হয় যে, ব্রিটিশ ও ভারতীয় সভ্যতার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। আরও ঘোষিত হয় যে, সমগ্র মানব জাতির লক্ষ্য এক, পৃথিবীর সকল সংস্কৃতি ও সভ্যতা জানা ও সংরক্ষণ করা সকল সভ্য জাতির কাম্য। গবেষণার মাধ্যমে ভারতীয় সভ্যতার বিভিন্ন দিক উম্মোচনে যুক্তি প্রদান করা হয় যে, ব্রিটিশদের প্রশাসন ব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধন, কল্যাণকর শিক্ষাদান প্রভৃতি বিষয়ের অস্তিত্ব প্রাচীন ভারতেও বর্তমান ছিল। এ হেন ধ্যান ধারণা ছিল নেহাতই ঔপনিবেশিক মনগড়া সৃষ্টি যার অন্তর্নিহিত লক্ষ্য ছিল দু সভ্যতার সাংস্কৃতিক সংযুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে কায়েমি ভিত্তিতে স্থাপন করা। যেমন হেনরী মেইন তাঁর Lectures on the Early History of Institutions (1875) গ্রন্থে যুক্তি দেন যে, স্থানীয় প্রশাসন পদ্ধতি প্রাচীন ভারতে বর্তমান ছিল এবং তা কোনোক্রমেই ব্রিটিশ স্থানীয় শাসনের চেয়ে কম দক্ষ ছিল না। তিনি তত্ত্ব দেন যে, ভারতীয় পদ্ধতিতে স্থানীয় শাসন পরিচালনা করতে পারলে এবং এর মাধ্যমে ভারতীয়দেরকে প্রশাসনে শরিক করাতে পারলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বুনিয়াদ আরও শক্তভাবে স্থাপিত হতে পারে। উল্লেখ্য যে, মেইনের আমলের ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা শুধু প্রশাসনে অংশীদারিত্ব চেয়েছিল, স্বাধীনতা চায় নি।

সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের অংশ হিসেবে নতুন ইতিহাস লেখা শুরু হলো উনিশ শতকের শেষার্ধে। প্রত্যেক জেলার ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, যোগাযোগ, ভৌগোলিক প্রভৃতি বিবরণ সম্বলিত করে জেলা গেজেটিয়ার সংকলন এবং জেলা গেজেটিয়ারকে ভারত পর্যায়ে তৈরি করার বিশাল প্রকল্প ছিল সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের অঙ্গ। স্যার উইলিয়ম উইলসন হান্টার এ প্রকল্পের নেতৃত্ব দেন। বিশ খন্ডে A Statistical Account of Bengal এ প্রকল্পের সেরা নিদর্শন। তবে হান্টারের Statistical Account ইতিহাসের উপাদানের বিষয়, ইতিহাস নয়। যথার্থ ইতিহাস না লিখে ইতিহাসের উপাদান উপকরণের সন্ধান ও সংরক্ষণ ও ইতিহাস প্রণয়নের প্রতিষ্ঠান তৈরিও ছিল ওই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। হান্টার ছাড়াও যারা গেজেটিয়ার ধারার ইতিহাস প্রণয়ন করেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হেনরী বেভারীজ, জেমস টেলর, বি.সি অ্যালেন, ও’মেলী, জেক ও সাকসে।

জেলা গেজেটিয়ারগুলি এমন তথ্যপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্যভাবে সংকলিত হলো যে, গেজেটিয়ার লেখকদের প্রতি এবং সে সুবাধে, এমনকি ব্রিটিশ জাতির প্রতি, দেশি শিক্ষিত লোকদের শ্রদ্ধাভক্তির সঞ্চার হয়েছে। দেশি শিক্ষিত সমাজের শ্রদ্ধা কুড়াতে সবচেয়ে বেশি সক্ষম হয়েছিল সরকারের পুরাতত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্ব প্রকল্প। এগুলি ছিল সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে বিভিন্ন বিষয়ে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় উনিশ শতকের শেষার্ধে, যেমন, কানিংহামের Archaeological Survey, গ্রিয়ার্সনের Linguistic Survey, ডেল্টনের Ethnological Survey, ইত্যাদি। তাছাড়া রাজস্ব জরিপ, ভূমি জরিপ ও আদমশুমারি প্রভৃতি ব্যবস্থা একদিকে যেমন প্রশাসনকে উন্নততর করেছিল, অপরদিকে এসব প্রতিবেদন দেশের ইতিহাস প্রণয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বাঙালি ভদ্রসমাজ এসব ব্যবস্থার গুরুত্ব অনুধাবন করে এবং ব্যাপকভাবে এসবের প্রশংসা করে যা কিনা ছিল সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের লক্ষ্য।

সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের প্রভাবে উনিশ শতকের শেষার্ধে ইতিহাস জ্ঞানচর্চার একটি শাখা হিসেবে এর একটি আলাদা সত্তা নিয়ে আবির্ভূত হলো। অন্য কথায় ওই সময় ইতিহাস ব্রিটিশ সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে ইতিহাস এর আধুনিক সংজ্ঞা লাভ করল, প্রকৃত ইতিহাস লেখার পথ সুগম হলো। নতুন ইতিহাস লেখার পথিকৃত জার্মান পন্ডিত ও কলকাতা মাদ্রাসার অধ্যাপক হেনরী ফার্ডিনান্ড ব্লকম্যান। আধুনিক ঐতিহাসিকরূপে তিনিই প্রথম মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস লেখার সূত্রপাত করেন। তাঁর প্রণীত ইতিহাস পেশাগত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা অর্জন করেছে। ঔপনিবেশিক সিভিল-মিলিটারি লেখকদের প্রভাব কাটিয়ে তিনিই সর্বপ্রথম আধুনিক ইতিহাস লিখন পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন করেন। ব্লকম্যান তাঁর পেশাগত দক্ষতা ও কৌশল প্রয়োগ করে অনেক মূল্যবান ফারসি ঐতিহাসিক পান্ডুলিপি আবিষ্কার করেন এবং এগুলির ওপর ভিত্তি করে আধুনিক মানের মৌলিক ইতিহাস রচনা করেন। তাঁর গবেষণার বাহন ছিল প্রধানত এশিয়াটিক সোসাইটি ও এর পত্রিকা জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল যেখান থেকে তাঁর প্রধান প্রধান গবেষণাকর্মগুলি প্রকাশিত হয়। ১৮৭০-এর দশকে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালের বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর প্রকাশনাক্রম ইতিহাস লিখন পদ্ধতিতে যুগান্তর আনয়ন করল। ব্লকম্যানের গবেষণা থেকে আমরা সর্বপ্রথম মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসের, বিশেষ করে মুগল বাংলার ইতিহাসের বস্ত্তনিষ্ঠ চিত্র পাই। ব্লকম্যান ইতিহাস লিখনে যে ঘরানা তৈরি করেন তার সুযোগ্য উত্তরসুরি হলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র ও অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়

সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদের একটি সচেতন দিক ছিল ভারতীয় সত্তার পাশাপাশি প্রাদেশিক সত্তাকেও তুলে ধরা। এ নীতির ফলে একদিকে যেমন ভারত সত্তার ওপর ইতিহাস তৈরি হয়, অপরদিকে প্রাদেশিক পর্যায়েও ইতিহাস তৈরিতে উৎসাহিত করা হয় এবং সে ইতিহাস প্রধানত লিখিত হয় স্থানীয় ভাষায়। প্রাদেশিক ইতিহাস লিখনের এ ধারার সাংস্কৃতিক ভিত্তি স্থাপন করেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকিশোরীচাঁদ মিত্রসঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং বষ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু তাঁদের কেউই ইতিহাস লিখনের আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন নি। তাঁদের লেখায় বৈজ্ঞানিক ঐতিহাসিকতার চেয়ে জাতিবোধ প্রাধান্য পায়। ব্লকম্যানের পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রথম বাংলা ভাষায় বাংলার ইতিহাস লিখেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র ও অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। তাঁদের লেখায় বাংলা ভাষায় বাংলার ইতিহাস এমনভাবে প্রতিভাত হলো যেন বাংলা একটি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। প্রকৃতই বাংলা একটি স্বতন্ত্র সত্তা যা ঔপনিবেশিক কারণে ভারতীয় সত্তার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হলো। তবে এ পরিকল্পনার প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও অক্ষয়কুমার মৈত্রয়ের ঘরানার লেখকগণ বঙ্গভূমির প্রতিও তাঁদের অম্লান আনুগত্য দেখিয়েছেন।

বাংলায় বঙ্গদেশের ইতিহাস লেখার বড় প্রবক্তা অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। তাঁর রচিত গৌড় লেখমালা (১৯১২) বাংলার ইতিহাস লিখনে একটি নতুন ধারার প্রবর্তন করে। সে ধারাটি হচ্ছে উৎস ও ভাষা সংক্রান্ত, কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা জাতি সংক্রান্ত নয়। মৈত্রেয় পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করেন যে, সবকিছুর মতো ইতিহাসের একটি দাবি আছে। সেটি হলো ইতিহাস হতে হবে নিজ ভূমি ও মানুষ সম্পর্কে নিজ ভাষায় এবং নিজ উপাদান উপকরণের ওপর ভিত্তি করে। একই বাণী উচ্চারণ করেন গৌড় রাজমালার (১৯১২) লেখক রমাপ্রসাদ চন্দ এবং বাংলার ইতিহাস (১৩১৫ বঙ্গাব্দ)-এর লেখক কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়। উভয়ই একাধারে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ও বঙ্গপ্রিয়। একাধারে ভারতীয় ও প্রদেশ সচেতন হওয়া ছিল সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদী নীতির লক্ষ্য। এ নীতির সঙ্গে সুর মিলিয়ে মৈত্রেয় গৌড় রাজমালা-এর মুখবন্ধে ঘোষণা করেন যে, আঞ্চলিক ইতিহাস লেখা মানে আঞ্চলিক হয়ে যাওয়া নয়। তাঁর মতে, আঞ্চলিক ইতিহাস বিশ্ব ইতিহাসেরই অঙ্গ। বাংলার ইতিহাস রচনা শৈলীর পরিপক্কতার প্রমাণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত ও  রমেশচন্দ্র মজুমদারযদুনাথ সরকার কর্তৃক সম্পাদিত History of Bengal, 2 vols (1948)।

বাংলা ভাষায় বাংলার ইতিহাস লেখার ধারাকে এক নবযুগে নিয়ে আসলেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কৃত বাঙ্গালার ইতিহাস (১৯১৫, ১৯১৭) ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ধারাকে চ্যালেঞ্জ করল। রাখালদাসের ধারাকে অনুসরণ করলেন রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুকুমার সেন, সুখময় বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনেশচন্দ্র সেন, যদুনাথ সরকার, মুহম্মদ এনামুল হক, নীহাররঞ্জন রায় প্রমুখ।

এ ধারারই ফসল একই মানের অনেক আঞ্চলিক ইতিহাস। যেমন শতীষচন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস (১৩২৯ বাং),  কেদারনাথ মজুমদার-এর ময়মনসিংহের ইতিহাস (১৯০৬), যামিনীমোহন রায়ের ঢাকার ইতিহাস (১৩১৯ বাং)।

১৯৪৭ থেকে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব বিগতকালের ইতিহাস লিখন ধারাকে লক্ষণীয়ভাবে ঘুরিয়ে দিল। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান জাতীয়তাবাদকে পশ্চাতে রেখে নানা ভঙ্গিমায় রচিত হয়েছে ‘মুসলিম’ বাংলার ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলে যা ছিল ‘মধ্যযুগীয় বাংলা’, পাকিস্তান আমলে এরই চিত্রায়ন হয়েছে ‘মুসলিম বাংলা’ নামে। যেমন, আবদুল করিমের Social History of the Muslims of Bengal (1959), এফ.এ. খানের Muslim Architecture (1965), আহমদ হাসান দানীর Muslim Architecture in Bengal (1961), মুহম্মদ এনামুল হকের Muslim Bangla Sahitya (1957), সুফিয়া আহমেদের Muslim Community in Bengal (1974).

কিন্তু ১৯৬০-এর দশক থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উম্মেষ ঘটে এবং এর সাথে মুসলিম জাতীয়তাবাদভিত্তিক ইতিহাস লিখনে ভাটা দেখা যায়। চরম ডানপন্থি গবেষক ছাড়া অন্য সব ঐতিহাসিককে দেখা যায় ধর্মনিরপেক্ষভাবে ইতিহাস চর্চায় লিপ্ত হতে। এ সময়ে রাজনৈতিক বিষয়ের চেয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিষয়গুলি ঐতিহাসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ইতিহাস লিখনের এ ধারা থেকেই উদ্ভূত হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ইতিহাস। জাতীয়তাবাদী ধারার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হারুণ-অর-রশিদের Foreshadowing of Bangladesh (১৯৮৭) ও বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি-র History of Bangladesh 1704-1971 (১৯৯১, ১৯৯৭)।

সব সমাজ, সব জাতিরই ইতিহাস রয়েছে। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বাংলাদেশেরও তেমনি ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু কিভাবে লিখা হয় সে ইতিহাস? বলা হয়ে থাকে যে, সব ইতিহাসই আসলে সমকালীন ইতিহাস। ইতিহাসের মূল সুর তৈরি বর্তমানের বাস্তবতা, ধ্যানধারণাকে কেন্দ্র করে। যে জন্য এক যুগের ইতিহাস লিখনধারা আরেক যুগে অচল। ঐতিহাসিক অতীতের ইতিহাস রচনা করেন বর্তমানে বসে। অতএব বর্তমানের প্রয়োজন, আদর্শ, রাজনৈতিক অবস্থান ঐতিহাসিককে অনেকটা অবচেতনভাবেই প্রভাবিত করে অতীতের ইতিহাস বর্তমানের মতো করে লিখতে। অতএব, এটা মোটেই বিস্ময়ের বিষয় নয় যে, একই ঘটনাকে ঔপনিবেশিক যুগ, উপনিবেশ উত্তর যুগ এবং পাকিস্তান উত্তর যুগের ঐতিহাসিকগণ নিজ নিজ যুগ অনুযায়ী করে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন।  [সিরাজুল ইসলাম]