ইটাখোলামুড়া


ইটাখোলামুড়া  নামের এ প্রত্নস্থল কুটিলামুড়ার মতো ময়নামতীর অন্যতম সেরা সৌধস্থল। কুমিল্লার কাছে কোটবাড়ি সড়কের ওপারে রূপবানমুড়ার ঠিক উল্টোদিকে ছোট পাহাড়ের গায়ের তিনটি স্তরে এটি বিদ্যমান। এটি বহুদিন ধরে প্রাচীন ইটের এক ‘খনি’ হিসেবে কাজ করেছে বলেই এ নামকরণ। একাধিক খননের ফলে এখানে একটি বিশালাকার বৌদ্ধস্তূপ কমপ্লেক্স ও এর ৪২ মিটার উত্তরে সংলগ্ন একটি বৌদ্ধ মঠের সন্ধান পাওয়া গেছে। কালপরিক্রমায় এ পুরাকীর্তিস্থলটির স্থাপনা কাল থেকে পাঁচটি সাংস্কৃতিক স্তর অতিক্রান্ত করেছে বলে তথ্য সূত্রে উল্লেখ করা হয়। পূর্ববর্তী তিন সাংস্কৃতিক কালপর্যায়ের নিদর্শন পরবর্তীকালের ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে।

ইটাখোলামুড়া

স্তূপ কমপ্লেক্স আদিতে স্তূপটি ১৩.১ বর্গমিটার ভিতের উপর ঐতিহ্যিক শৈলীতে নিরেটভাবে নির্মিত হয়েছিল। এ স্তূপের অন্যতম ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একটি ক্ষুদ্রায়তন পীঠস্থান (২.৪ মি  ২.১ মি)। এটি স্তূপের পূর্ব বা সম্মুখভাগের মধ্যস্থলে নির্মিত। এখানেই মূল অবস্থান স্থলে (in situ) স্থাপিত এক চূণ-সুরকি নির্মিত পূর্ণাবয়ব অক্ষোভ্যের ক্ষতিগ্রস্থ মূর্তি পাওয়া গেছে। সৌধের এ অংশ বেশ সুসংরক্ষিত। তবে, দুর্ভাগ্যের বিষয় এর আগাছায় ছাওয়া উপরিভাগের মাটি কয়েক দশক আগে সামরিক কর্তৃপক্ষ ফেলে দিয়ে সমতল করে সেখানে এক রেস্ট হাউস নির্মাণ করে।

পরে, নানা নির্মাণ কাঠামো যোগ করে ও রদবদলের মাধ্যমে এ মন্দিরসৌধের বিশদ সম্প্রসারণ করা হয়। বিশেষ করে, পুরনো পীঠস্থান বা দেবমূর্তির অধিষ্ঠানস্থলটি বন্ধ করে দিয়ে পূর্বদিকে তিনটি নতুন লম্বা ও সঙ্কীর্ণ ভজনালয় নির্মাণ করা হয়। আর তার ফলে গোটা সৌধ কাঠামোটির আকৃতি আয়তাকার (৪১.৪ মি  ২৪ মি) হয়ে ওঠে। এ বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি অত্যন্ত লক্ষণীয়ভাবে রূপবানমুড়া মন্দিরের অনুরূপ। পার্শ্ববর্তী ভজনালয়গুলি অবশ্য একসময় বন্ধ করে দেওয়া হয়, কেবল মন্দিরের অন্যান্য অংশের মতো এখানেও বিশেষ ধর্মীয় মতবাদপন্থিদের পূজ্য দেবমূর্তি রাখার জন্য কয়েকটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ রাখা হয়। এ স্থাপনার চারদিকে পরিবেষ্টিত ২.৬ মিটার চওড়া বৃত্তাকার এক পরিক্রমণপথ (circumambulatory passage) রয়েছে ও এর বাইরে দিয়ে রয়েছে ১.২ মিটার সীমানা প্রাচীর।

কিছুটা নিচে পাহাড়ের দ্বিতীয় স্তর বা সোপানে আরও দীর্ঘ, সুচিহ্নিত ও সুসংরক্ষিত (৭৯ মি  ৫৬ মি) এক সীমানা প্রাচীরে পরিবেষ্টিত রয়েছে এ পবিত্র মাহাত্মযুক্ত এলাকাটি। দ্বিতীয় সোপান স্তরে রয়েছে তিনটি কৌতূহলোদ্দীপক গৌণ মন্দির। এগুলির দুটির অবস্থান পূর্বদিকের দুকোণায় ও অপেক্ষাকৃত বড়ো আকারের মন্দিরটি পশ্চিমে, পেছনে। পূর্বদিকে মধ্যস্থলে ২২ সোপানের সিঁড়িযুক্ত সুপরিসর প্রবেশপথ রয়েছে। এ সিঁড়িপথ চলে গেছে আরও নিচের তৃতীয় সোপান বা স্তরে। তৃতীয় স্তরে সামনের দিকে একটি ক্ষতিগ্রস্ত বেষ্টনী দেওয়াল লক্ষ করা যায়। এর বহির্ভাগে রয়েছে অন্তর্লম্বী, ভেতরের দিকে বসানো প্যানেল (খোপাকৃত নকশা), ও নানা ডিজাইনের অলঙ্করণ।

দীর্ঘ সিঁড়ির শেষে রয়েছে পাঁচটি পূজা স্তূপ। সবগুলির আকৃতি আধা ক্রুশাকার। এর তিনটি রয়েছে এক সুচিহ্নিত বেষ্টনীর মধ্যে উত্তর-দক্ষিণে সারিবিন্যস্তভাবে- দ্বিতীয় সোপান স্তরে পশ্চিম দিকের অপেক্ষাকৃত বড় আকারের গৌণ মন্দিরটির মতো করে। সুনিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এগুলি বৌদ্ধ স্থাপত্যের ক্রুশাকার শৈলীর বিকাশের আদি পর্যায়ের নিরীক্ষার সাক্ষ্য। শালবন বিহার, পাহাড়পুর, বিক্রমশীলা ও আরও অনেক প্রত্নস্থলে এ নির্মাণশৈলীরই পরিণত ও বিকশিত রূপ পরিলক্ষিত হয়। এখানকার নির্মাণকাঠামোগুলিকে সঙ্গতভাবেই ৭-৮ খ্রিস্টীয় শতকের বলে ধারণা করা যায়।

মাঝারি আকারের বৌদ্ধ মঠটি একটি খোলা আঙিনার চারদিকে ১৯ টি কক্ষ এবং হলঘরের মতো একটি প্রবেশকক্ষ সম্বলিত গতানুগতিক রীতিতে বর্গাকার (১৬.২ বর্গমিটার)। এটি একটি স্বতন্ত্র ঢিবির উপরে নির্মাণ করা হয়েছে। পূর্বশাখার মধ্যস্থলে সামনের দিকে প্রক্ষেপিত প্রবেশপথটি রীতিমতো এক বিশাল নির্মাণ কাঠামো (১৭.৬ মি  ৮.৫ মি)। মঠের কয়েকটি কক্ষে ইটনির্মিত শয়ন খাট রয়েছে। এ মঠটি ১৯৪৪-৪৫ সালে ইটচোরদের উৎপাতে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এ প্রত্নস্থল থেকে খননের পর আবর্জনা সরানোর সময় যে সব উল্লেখযোগ্য প্রত্ননির্দশন পাওয়া গেছে সেগুলি হলো: খাঁটি নিরেট সোনার ৩টি গোলাকার গুটিকা (১৯ তোলা) ও একটি তাম্রশাসন, যার পাঠোদ্ধার এখনও হয়নি। এ ছাড়া চুণ-সুরকির তৈরী মূর্তিও পাওয়া গেছে।  [এম হারুনর রশিদ]