আহমদ, মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন


আহমদ, মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দীন (১৮৬১-১৯৩৩)  সাংবাদিক, সাহিত্যিক। বরিশাল শহরের উপকণ্ঠে কাউনিয়ায় জন্ম। রেয়াজউদ্দীন মাত্র আট বছর বয়সে পিতাকে হারান। ফলে বিদ্যাশিক্ষা ও জীবিকার্জনের জন্য তাঁকে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়। বাল্যকালে শেরে বাংলার পিতৃব্যের আশ্রয়ে থেকে তিনি বরিশাল বঙ্গ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। পরে ত্রিপুরা জেলার রূপসা গ্রামের জমিদার চৌধুরী মোহাম্মদ গাজীর আশ্রয়ে তিনি কিছুদিন আরবি ও ফারসি শেখেন। ১৮৭৬ সালে রেয়াজউদ্দীন বাজাপ্তি সার্কেল স্কুলে ভর্তি হয়ে ত্রিপুরা জেলার মধ্যে প্রথম ছাত্রবৃত্তি পাস করেন। পরে রূপসার এক পাঠশালায় শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। এই পাঠশালার সঙ্গে তিনি একটি পাঠাগার স্থাপন করেন। পাঠাগারে এডুকেশন গেজেট, হুগলী দৈনিক, বঙ্গবাসী, সঞ্জীবনী,  ঢাকা, প্রকাশ প্রভৃতি দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রপত্রিকা রাখা হতো। এ থেকেই পত্রপত্রিকার প্রতি রেয়াজউদ্দীনের আগ্রহের সৃষ্টি হয়।

রেয়াজউদ্দীন কিছুদিন স্থানীয় ডাকঘরে পোস্টমাস্টারের কাজ করেন এবং রূপসা বাজারে একটি মনোহারীর দোকানও পরিচালনা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পত্রিকা প্রকাশের অদম্য বাসনা নিয়ে তিনি ১৮৮৩ সালে  কলকাতা চলে যান। সেখানে প্রথমে তিনি শশিভূষণ মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত মুসলমান পত্রিকা সম্পাদনা করেন। পরে ঢাকার শ্রীমন্ত সওদাগর নামক একটি বাণিজ্য পত্রিকার সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। তাঁর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক নব সুধাকর পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যাও প্রকাশিত হয়েছিল।

কলকাতায় থাকা অবস্থায়  শেখ আবদুর রহিমরেয়াজুদ্দীন আহমদ মাশহাদী এবং মেয়রাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে রেয়াজউদ্দীনের পরিচয় হয়। তখন চবিবশ পরগনা, যশোর, খুলনা ও ঢাকায় কিছু সংখ্যক মুসলমান  ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিস্ট ও ব্রাহ্ম ধর্ম গ্রহণ করে। এই ধর্মত্যাগ রোধের উদ্দেশ্যে তাঁরা চারজন ইসলাম ধর্মের সারসংগ্রহরূপে দুখন্ডে এসলামতত্ত্ব (১৮৮৮ ও ১৮৮৯) প্রকাশ করেন। এ সময়েই তিনি মাসিক  ইসলাম প্রচারক প্রকাশ করেন। পত্রিকাটি প্রথম পর্যায়ে বছর খানেক (১৮৯১-৯২) চললেও দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় সাত বছর (১৮৯৯-১৯০৬) স্থায়ী হয়েছিল। পরে তাঁর সম্পাদনায়  সোলতাননবযুগ ও রায়তবন্ধু  পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

রেয়াজউদ্দীন মনেপ্রাণে বাংলার মুসলমান সমাজের সমৃদ্ধি কামনা করতেন। তাঁর স্বসমাজ ও প্যান-ইসলামিক চিন্তাধারা তাঁর রচিত গ্রন্থে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হলো: বোধোদয়তত্ত্ব (১৮৭৯), পদ্যপ্রসূন (১৮৮০), তোহফাতুল মোসলেমিন (১৮৮৫), বৃহৎ মহম্মদীয়া পঞ্জিকা (১৮৯৫), উপদেশ রত্নাবলী (১৮৯৬), জঙ্গে রুস ও ইউনান (১৮৯৭), গ্রীস-তুরস্ক যুদ্ধ (২ খন্ড, ১৮৯৯, ১৯০৮), বিলাতি মুসলমান (১৯০০), বোতলে মা সূরেশ্বরী (১৯০০), জোবেদা খাতুনের রোজনামচা (১৯০৭), হক নসিহত (১৯২৭), পাক-পাঞ্জাতন (১৯২৯) প্রভৃতি।  [খোন্দকার সিরাজুল হক]