আহমদ, তোফায়েল


আহমদ, তোফায়েল (১৯১৯-২০০২)  শিক্ষাবিদ, লোকসংস্কৃতি গবেষক, লোকশিল্প সংগ্রাহক। ১৩২৬ বঙ্গাব্দের ১০ ফাল্গুন  লক্ষ্মীপুর জেলার বড়ালিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। গ্রামের স্কুলে প্রবেশিকা পর্যায় শেষ করে তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন। ছাত্রজীবনে তিনি বেকার হোস্টেলের সাধারণ সম্পাদক এবং কারমাইকেল হোস্টেলের সহসভাপতি ছিলেন।

তোফায়েল আহমদ

কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে তোফায়েল আহমদের কর্মজীবন শুরু। কিছুদিন তিনি চাখার এ.কে ফজলুল হক কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি টাঙ্গাইল করটিয়া সাদত কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং একটানা সতেরো বছর উক্ত কলেজের অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরে তৎকালীন বাংলাদেশ পরিষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ১৯৮০ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির জগতে তোফায়েল আহমদ ছিলেন একজন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব। অধ্যাপনার পাশাপাশি জীবনের সুদীর্ঘ সময় তিনি অতিবাহিত করেন গবেষণা, লোকসংস্কৃতিচর্চা ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের লুপ্তপ্রায় অসংখ্য নিদর্শন সংগ্রহ করে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় সংরক্ষণ করেছেন। সোনারগাঁও লোকশিল্প জাদুঘরের মূল পরিকল্পনা প্রণয়ন তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি। বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ গঠনে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল। তিনি দুবার এ পরিষদের সভাপতি ছিলেন।

তোফায়েল আহমদের সংগ্রহশালায় লোক ও কারুশিল্পের এক হাজারের বেশি নিদর্শন স্থান পেয়েছে। এসব সামগ্রীর অধিকাংশই তিনি সংগ্রহ করেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। এছাড়া বিদেশ সফরকালে তিনি ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিশর, আবুধাবি, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের লোকশিল্পের বৈচিত্র্যপূর্ণ নিদর্শনও সংগ্রহ করেছেন, যা তাঁর সংগ্রহশালায় রক্ষিত আছে। বাংলাদেশের লুপ্ত লোকশিল্পের কিছু কিছু নিদর্শন তিনি কারিগর দিয়ে নতুনভাবে তৈরি করিয়ে সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর সংগ্রহে রিচ্যুয়াল বা ধর্মজ লোকশিল্প, ডেকোরেটিভ লোকশিল্প এবং প্রয়োজনীয় লোকশিল্পের নিদর্শনের সমাহার বাংলাদেশের চিরায়ত লোকঐতিহ্যের মূল্যবান স্মারক হিসেবে বিবেচিত। লোকঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং দেশজ শিল্পের প্রচারে আগ্রহই তাঁর লোকশিল্প সংগ্রহের মূল প্রেরণা ছিল। শিল্পাচার্য  জয়নুল আবেদিন তোফায়েল আহমদের এ সংগ্রহশালাকে ‘মিনি মিউজিয়াম’ নামে অভিহিত করেছেন।

১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তোফায়েল আহমদ ফোর্ড ফাউন্ডেশনের অর্থানুকূল্যে এবং ‘কারিকা’র উদ্যোগে পরিচালিত ‘ফোক ক্রাফট সার্ভে অ্যান্ড ডিজাইন ডক্যুমেন্টেশন’ প্রকল্পে গবেষক হিসেবে কাজ করেন। এ সময় তিনি ১৩৬টি থানার প্রায় দেড় হাজার গ্রাম পরিভ্রমণ করে ওইসব এলাকার লোক ও কারুশিল্প, শিল্পীদের জীবন ও কর্মকান্ড নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করেন। এছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহু গ্রাম পরিদর্শন করে তিনি লোক ও কারুশিল্পের নমুনা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেন।

বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শনকালে তোফায়েল আহমদ লোকশিল্পের কয়েকটি দুর্লভ নিদর্শন আবিষ্কার করেন। সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো  মুন্সিগঞ্জ থেকে সংগৃহীত  গাজীর পট। এর আগে ধারণা করা হতো যে, সারা বাংলায় একটি মাত্র গাজীর পটই আছে যা কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত; কিন্তু তোফায়েল আহমদের আবিষ্কারের ফলে সে ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। তোফায়েল আহমদের গবেষণাকর্ম লোকশিল্পের ভুবনে (১৯৯৩) শিরোনামে  বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

তোফায়েল আহমদ রচিত অন্যান্য গ্রন্থ এবং অসংখ্য প্রবন্ধে লোকশিল্পের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ, অনুসন্ধিৎসা এবং এ বিষয়ে একনিষ্ঠ গবেষণার পরিচয় বিধৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: আমাদের প্রাচীন শিল্প (১৯৬৪), লোকশিল্প (১৯৮৫), যুগে যুগে বাংলাদেশ (১৯৯২), ঢাকার বাণিজ্যিক কারুকলা (১৯৯৩), আটিয়ার চাঁদ, লোকঐতিহ্যের দশ দিগন্ত (১৯৯৯) প্রভৃতি। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ তোফায়েল আহমদের লোক ও কারুশিল্প সংগ্রহের বিবরণমূলক একটি তালিকা তৈরি করেছে। বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান  ব্র্যাক তাঁকে কারুশিল্পের উন্নয়নে গবেষণামূলক অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে ‘শীলু আবেদ কারুশিল্প পদক’ প্রদান করে। মোবিল এশিয়া মার্কেটিং প্রাইভেট লিমিটেড তাদের ১৯৯৯ সালের ক্যালেন্ডারে তোফায়েল আহমদের সংগ্রহশালার কয়েকটি নিদর্শন ব্যবহার করে। তাঁর জীবনব্যাপী লোকসংস্কৃতিচর্চা ও গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ  বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ২০০০ সালে তাঁকে সম্মাননা প্রদান করে। ২০০১ সালে তোফায়েল আহমদ বাংলা একাডেমীর সম্মানসূচক ফেলোশিপ লাভ করেন। তাঁর সংগ্রহশালা থেকে নির্বাচিত ১২৮টি নিদর্শন নিয়ে বাংলা একাডেমী ২০০৪ সালে ‘লোকশিল্প অ্যালবাম: তোফায়েল আহমদের বাংলা ঘর থেকে নির্বাচিত সংগ্রহ’ শিরোনামে একটি দ্বিভাষিক অ্যালবাম প্রকাশ করে।

১৯৯৯ সালে তোফায়েল আহমদ তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালাটি ‘বাংলা ঘর লোক ও কারুশিল্প সংগ্রহ’ নামে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে একটি প্রযত্ন পরিষদের ওপর এর পরিচালনা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব ন্যস্ত করেন।  তাঁর মৃত্যুর পর ২০০৮ সালে সংগ্রহশালাটি যথাযথভাবে সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির নিকট হস্তান্তর করা হয়। ২০০২ সালের ২৮ মার্চ (১৪ চৈত্র ১৪০৮) ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়। [শাহীদা আখতার]