আহমদ, আববাসউদ্দীন


আহমদ, আববাসউদ্দীন (১৯০১-১৯৫৯)  কণ্ঠশিল্পী। ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা জাফর আলী আহমদ ছিলেন তুফানগঞ্জ মহকুমা আদালতের উকিল। বলরামপুর স্কুলে আববাসউদ্দীনের বাল্যশিক্ষা শুরু হয়। তুফানগঞ্জ স্কুল থেকে তিনি প্রবেশিকা (১৯১৯) এবং কুচবিহার কলেজ থেকে আইএ (১৯২১) পাশ করেন। তখন থেকেই তিনি অধ্যয়ন পরিত্যাগ করে গানের জগতে নিমগ্ন হন।

আববাসউদ্দীন আহমদ

আববাসউদ্দীনের প্রধান পরিচয় একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই। তিনি  আধুনিক গান, স্বদেশী গান, ইসলামী গান, পল্লিগীতি, উর্দুগান সবই গেয়েছেন, কিন্তু পল্লিগীতিতেই তাঁর মৌলিকতা ও সাফল্য সবচেয়ে বেশি। কোনো ওস্তাদের নিকট কিংবা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে তালিম নিয়ে তিনি গান শেখেননি। তিনি প্রথমে ছিলেন পল্লিগাঁয়ের একজন গায়ক। যাত্রা-নাটক ও স্কুল, কলেজের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান শুনে তিনি গানের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং নিজ চেষ্টায় গান গাওয়া রপ্ত করেন। পরে কলকাতায় অল্প সময়ের জন্য তিনি ওস্তাদ জমিরুদ্দীন খাঁর নিকট  উচ্চাঙ্গসঙ্গীত এ তালিম নেন।

রংপুর ও কুচবিহার অঞ্চলের ভাওয়াইয়া-ক্ষীরোল-চটকা গেয়ে আববাসউদ্দীন প্রথমে সুনাম অর্জন করেন। পরে  জারি,সারি,  ভাটিয়ালিমুর্শিদি, বিচ্ছেদী, দেহতত্ত্ব, মর্সিয়া,  পালাগান ইত্যাদি পল্লিগানের নানা শাখার গান গেয়ে ও রেকর্ড করে তিনি জনপ্রিয় হন। তাঁর দরদভরা সুরেলা কণ্ঠে পল্লিগানের সুর যেভাবে ফুটে উঠত, অন্য কোনো গায়কের কণ্ঠে তেমনটি হতো না। এ ক্ষেত্রে তিনি আজও অদ্বিতীয়। তিনি  কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, গোলাম মোস্তফা প্রমুখের ইসলামী ভাবধারায় রচিত গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন।

আববাসউদ্দীনের গান প্রথম রেকর্ড করে ১৯৩০ সালে হিজ মাস্টার্স ভয়েস; পরে মেগাফোন, টুইন, রিগ্যাল প্রভৃতি কোম্পানিও তাঁর বহু গান রেকর্ড করে। গ্রাম-গঞ্জ-শহরের আসর-অনুষ্ঠান-জলসায় গান গেয়ে এবং গ্রামোফোনে গান রেকর্ড করে আববাসউদ্দীন বাংলার সঙ্গীতবিরোধী মুসলমান সমাজকে সঙ্গীতানুরাগী করে তোলেন।

আববাসউদ্দীন ১৯৩১ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করেন। প্রথমে তিনি রাইটার্স বিল্ডিং-এ ডিপি আই অফিসে অস্থায়ী পদে এবং পরে কৃষি দপ্তরে স্থায়ী পদে কেরানির চাকরি করেন। এ.কে ফজলুল হকের মন্ত্রিত্বের সময় তিনি রেকডিং এক্সপার্ট হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। চল্লিশের দশকে আববাসউদ্দীনের গান পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মুসলিম জনতার সমর্থন আদায়ে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকায় এসে তিনি সরকারের প্রচারদপ্তরে এডিশনাল সং অর্গানাইজার হিসেবে চাকরি করেন। তিনি পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৫৫ সালে ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সঙ্গীত সম্মেলন, ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে আন্তর্জাতিক  লোকসঙ্গীত সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনে যোগদান করেন।

আববাসউদ্দীনের গানের রেকর্ডগুলি এক অমর কীর্তি। আমার শিল্পী জীবনের কথা (১৯৬০) তাঁর রচিত একমাত্র গ্রন্থ। তিনি সঙ্গীতে অবদানের জন্য মরণোত্তর প্রাইড অব পারফরমেন্স (১৯৬০), শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে (১৯৮১) ভূষিত হন। ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। উল্লেখ্য যে, তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র মোস্তফা জামান আববাসী এবং কন্যা ফেরদৌসী রহমান দেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী।  [ওয়াকিল আহমদ]