আসাম


আসাম  ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি রাজ্য। এটি পশ্চিমে সংকোশ নদী থেকে পূর্বে সাদিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। আসাম হচ্ছে উত্তরে হিমালয় পর্বতমালার পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণে আসাম অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদের দান, এবং দক্ষিণমুখী স্রোতে পলি পড়ে যে বিশাল সমতল ভূমি সৃষ্টি হয়েছে তাই এখন আসাম নামে পরিচিত। এ ভূখন্ডকে মহাকাব্যে প্রাগজোতিষ এবং পুরাণে কামরূপ বলা হয়েছে। মুসলিম ঐতিহাসিকরাও একে কামরূপ বলেছেন। অহমীয়রা এ ভূখন্ডের কর্তৃত্ব গ্রহণ করার কিছুকাল পর এটি আসাম নামে পরিচিতি লাভ করে। সবদিক দিয়েই আসামে প্রবেশ করা সহজ। এ কারণে এ ভূখন্ড সকল যুগে পার্শ্ববর্তী এলাকার ক্ষুধিত মানুষ ও দুঃসাহসী অভিযাত্রীদের জন্য ছিল একটি আকর্ষণীয় এলাকা। ফলে এখানে অস্ট্রিক, মঙ্গোলীয়, দ্রাবিড় বংশোদ্ভূত ও আর্যদের বেশ কয়েক ধরনের উপজাতি সৃষ্টি হয়েছে। আসামের আধুনিক জনগণ ভারতের অন্যান্য অংশের মতোই সংমিশ্রিত এবং কথা বলে নানা ধরনের ভাষা ও উপ-ভাষায়। এদের মধ্যে কেবল অহমীয় ও বাঙালিদেরই রয়েছে নিজস্ব লিখন পদ্ধতি ও সাহিত্য। অন্যান্য ভাষাভাষীরা রোমান হরফে লিখে থাকেন এবং তাদের নিজস্ব কোনো সাহিত্য নেই।

আসামের ইতিহাসকে মোটামুটি চারটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়, যথা পৌরাণিক আমল, প্রাথমিক আমল, অহমীয় আমল এবং আধুনিক আমল। পৌরাণিক আমলে আসাম ছিল অনার্য জাতি ‘দানব ও অসুরদের’ নিয়ন্ত্রণে। পরে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আর্যরা এসে এ ভূখন্ড দখল করে নেয়। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক থেকে শুরু হয় প্রাথমিক যুগ। গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের (আনু ৩৩০-৩৮০ খ্রি) এলাহাবাদ লিপিতেই প্রথম আসামের (কামরূপ) উল্লেখ পাওয়া যায়। পূর্বদিক থেকে অহমীয়দের এবং পশ্চিমদিক থেকে তেরো শতকে মুসলমানদের আসাম দখল করার পূর্ব পর্যন্ত প্রারম্ভিক আমল অব্যাহত ছিল। অহমীয়রা আসাম জয় করে প্রায় ছয় শ বছর দেশটি শাসন করে। কিছু সময়ের জন্য বর্মীরা আসাম দখল করে রেখেছিল। ১৮২৬ সালে আসাম ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত আসাম শাসিত হয় বাংলা প্রদেশের একটি অংশরূপে। এসময় এর প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে আসামকে বাংলা প্রদেশ থেকে পৃথক করে একজন চীফ কমিশনারের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। একই সময়ে সিলেট, কাছাড়, গোয়ালপাড়া জেলা ও গারো হিলস জেলার উত্তর অংশকে আসাম প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং বাংলা ভাষাভাষী বিপুলসংখ্যক লোককে আসামের নাগরিক করা হয়। ইতঃপূর্বে কামরূপ, দারাং, নওগং, শিবসাগর ও লখিমপুর জেলা সমন্বয়ে গঠিত যে আসাম রাজ্য অহমদের দ্বারা শাসিত হতো এসময়ে তার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। পার্বত্য জেলা খাসী ও জৈন্তিয়া, সিলেট ও কাছাড় জেলার সমম্বয়ে গঠিত সুরমা উপত্যকা এবং বাংলার গারো পাহাড় ও গোয়ালপাড়া জেলা সমন্বয়ে সাদিয়া থেকে গোয়ালপাড়া পর্যন্ত সমগ্র অঞ্চল এ সময় আসাম নামে পরিচিতি লাভ করে। এ অবস্থায় আসামের মিশ্র জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক হারে নতুন করে সংমিশ্রণ ঘটে। এ সংমিশ্রণে যোগ হয় তুলনামূলকভাবে পশ্চাৎপদ পাহাড়ি এবং বিপুল সংখ্যক বাংলা ভাষাভাষী উন্নততর জনগণের। এতে করে সৃষ্টি হয় ভাষা ও সংস্কৃতিগত প্রকট সমস্যার যা সাম্প্রতিক কালে আসামে অস্থিরতার সৃষ্টি করে। ১৯০৫ সালে আসামকে বাংলা প্রদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগের সঙ্গে যুক্ত করে পূর্ববাংলা এবং আসাম নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। নবগঠিত এ প্রদেশকে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। ছয় বছর পর এ গঠন প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা হয়। বঙ্গভঙ্গ রদ করে পূর্ব বাংলাকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করা হয় এবং আসামকে আবার ন্যস্ত করা হয় একজন চিফ কমিশনারের অধীনে। শুধু পার্বত্য জেলা খাসী ও জৈন্তিয়াই নয়, সিলেট, কাছাড়, গারো হিলস ও গোয়ালপাড়া জেলাও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৯১২ সালে আসামকে গভর্নরের প্রদেশ করা হয় এবং সেখানে একটি নির্বাহি পরিষদ ও একটি আইনসভা গঠিত হয়। স্বাধীনতা লাভের পরও গভর্নরের প্রদেশ হিসেবে আসামের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ ছিল। তবে দেশ বিভাগের (১৯৪৭) ফলে করিমগঞ্জ মহকুমার একাংশ ব্যতীত সমগ্র সিলেট জেলা আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন করে পূর্ববাংলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।  [সিরাজুল ইসলাম]

গ্রন্থপঞ্জি KL Barua, History of Kamarupa; P Bhattacharya,  Kamarupa-sasanavali; BK Barua, Cultural History of Assam;  Sir Edward Gait, History of Assam