আলী মর্দান খলজী


আলী মর্দান খলজী   বখতিয়ার খলজীর সামরিক সহযোগী ৬০৬ হিজরি থেকে ৬০৮ হিজরি পর্যন্ত (১২১০-১২১২ খ্রি.) লখনৌতির শাসনকর্তা ছিলেন। তিনি আফগানিস্তানের খলজি গোত্রের লোক ছিলেন। আলী মর্দান উপমহাদেশে এসে বখতিয়ার খলজীর সৈন্যদলে তাঁর নাম তালিকাভুক্ত করেন এবং তাঁর সঙ্গে নদীয়া অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন। লখনৌতিতে মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি উত্তরাঞ্চলের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। তাঁর প্রধান কার্যালয় ছিল ঘোড়াঘাটে।

৬০২ হিজরিতে (১২০৬ খ্রি.) বখতিয়ার খলজীর মৃত্যু হয় এবং তাঁর অন্যতম প্রধান অমাত্য  মোহাম্মদ শিরাণ খলজী নগৌর হতে এসে লখনৌতির শাসনভার গ্রহন করেন এবং আলী মর্দানের ইকতা বরসৌল আক্রমণ করে তাঁকে বন্দী করেন। কিন্তু কারাবাস থেকে পালিয়ে গিয়ে শিরাণ খলজী দিল্লিতে আশ্রয় নেন এবং সেখানে অবস্থান করেন। শীরাণ খলজী প্রকাশ্যে স্বাধীনতা ঘোষনা না করলেও অভ্যন্তরীণ শাসনের ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন। দিল্লীর সুলতানের নির্দেশে ১২০৭ খ্রিস্টাব্দে অযোদ্ধার গভর্নর কায়েমাজ রুমী বাংলা আক্রমণ করেন এবং ১২০৮ খ্রিস্টাব্দে শিরাণ খলজী পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেলে হুসামউদ্দিন ইওজ খলজী দেওকোটের শাসক হন এবং তিনি দিল্লীর সুলতানের গভর্ণর হিসেবে লখনৌতির মুসলিম রাজ্য শাসন করতে থাকেন। ইতিমধ্যে আলী মর্দান সুলতান কুতুবুদ্দিনের সঙ্গে গজনী অধিকারে যুদ্ধ যাত্রার সঙ্গী হয়েছিলে এবং আলী মর্দান সেখানে আটকা পড়েছিলেন। তিনি অবশ্য গজনী থেকে দিল্লী ফিরে আসতে সক্ষম হন এবং কুতুবুদ্দিন আইবক কর্তৃক লখনৌতির গভর্নর নিযুক্ত হয়ে সৈন্য বাহিনী নিয়ে লখনৌতি উপস্থিত হলে ইওজ খলজী বিনা বাধায় তাঁকে প্রদেশের দায়িত্বভার বুঝিয়ে দিয়ে নিজস্ব কর্মস্থলে ফিরে যান।

খলজীদের মধ্যেকার অন্তর্দ্বন্দ্ব দমন করে আলী মর্দান বাংলায় রাজনৈতিক ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি কুতুবউদ্দীন আইবকের কর্তৃত্বকে স্বীকার করে নিয়ে শাসনকার্য শুরু করলেও, ১২১০ খ্রিস্টাব্দে আইবকের মৃত্যুর পর তিনি বাংলায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ‘সুলতান আলাউদ্দীন’ উপাধি গ্রহণ করে মুদ্রা জারি করেন। তাঁর মুদ্রা কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয়।

সুলতান হিসেবে আলী মর্দান যোগ্য এবং শক্তিশালী ছিলেন। ধারনা করা হয় যে, স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর তিনি যথেচ্ছ ব্যবহার করতে থাকেন। তাঁর রাজত্বকালের প্রথম দিকে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। তাঁর এ বাহিনী অধিক সংখ্যক খলজী অভিজাতকে হত্যা করেছিল। তাছাড়াও তিনি বিচক্ষণতার সাথে উচ্চাভিলাষী ও প্রতিদ্বন্দ্বী খলজী অভিজাতদেরকে নির্বাসিত করেছিলেন।

আলী মর্দান খলজীর রাজ্যের বিস্তৃতি সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো বর্ণনা পাওয়া না গেলেও, মনে করা হয় তিনি শিরাণ খলজী কর্তৃক পরিত্যক্ত লখনৌতি পুনর্দখল করেছিলেন। আলী মর্দানের রাজত্বকালে বিহারও লখনৌতি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরও জানা যায় যে, রায়গণ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে তাঁর নিকট রাজস্ব প্রেরণ করেছিলেন। এতে মনে হয় যে, তিনি বঙ্গ, কামরূপ ও ত্রিহুত রাজ্যের শাসনকর্তাদের মনে ভয় ও শ্রদ্ধা জাগাতে সচেষ্ট ছিলেন। শীঘ্রই তাঁর শাসন পদ্ধতি তাঁকে অপ্রিয় করে তোলে এবং অসন্তুষ্ট অভিজাতবর্গ ইওজ খলজীর নেতৃত্বে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১২১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি নিহত হন।  [এ.বি.এম শামসুদ্দীন আহমদ]