আলী, এম কোরবান


আলী, এম কোরবান (১৯২৪-১৯৯০)  আইনজীবী, রাজনীতিক। মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার কান্দিপাড়া গ্রামে ১৯২৪ সালে তাঁর জন্ম।  কোরবান আলী ১৯৪৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএল ডিগ্রি লাভের পর তিনি ঢাকা জেলা আদালতে আইন ব্যবসা শুরু করেন।

এম কোরবান আলী

এম কোরবান আলী ১৯৫০ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। এ সময় তাঁকে বৃহত্তর ঢাকা জেলায় দলকে সংগঠিত করার দায়িত্ব দেয়া হয়। ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯৪৮ সাল থেকেই কোরবান আলী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং ১৯৫২ সালে কারাবরণ করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের ঢাকা জেলা কমিটির সভাপতি ছিলেন।

এম কোরবান আলী যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৫৪ সালে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং-টঙ্গীবাড়ী নির্বাচনী এলাকা থেকে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ওই বছর ২৯ মে দেশে ৯২-ক ধারা জারীর পর তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি চীফ হুইপ ছিলেন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর দেশে সামরিক শাসন জারীর পর কোরবান আলী গ্রেফতার হন এবং প্রায় দুই বছর কারাভোগ করেন।

১৯৬২ সালে আইউব বিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংগঠনে তাঁর ভূমিকার জন্য পুনরায় তিনি গ্রেফতার হন। ১৯৬৬ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয়দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯৭০ সালে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের সময় কোরবান আলী আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা ও প্রচার সেলের প্রধান ছিলেন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলনে কোরবান আলী বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনীর নৃশংস হত্যাকান্ড শুরু হলে তিনি অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ভারতে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কোরবান আলী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান-টঙ্গীবাড়ী নির্বাচনী এলাকা থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় তথ্য ও বেতার সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হলে তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনোনীত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দসহ তিনি গ্রেফতার হন এবং প্রায় দুই বছর কারান্তরিণ থাকেন। কোরবান আলী ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। ১৯৮১ সালে তিনি আওয়ামী লীগ প্রিসিডিয়ামের সদস্য নির্বাচিত হন।

এম কোরবান আলী ১৯৮৪ সালে সামরিক শাসক লে. জেনারেল হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। তিনি প্রথমে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের এবং পরে পূর্ত ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন।

একজন উদার গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা কোরবান আলী এদেশের জনগণের স্বাধিকার আন্দোলনে অসামান্য অবদান রাখেন। ১৯৯০ সালের ২৩ জুলাই ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়। [মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]