আলী, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ


আলী, অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউসুফ (১৯২৩-১৯৯৮)  শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক। দিনাজপুর জেলার বিরল থানার ফরাক্কাবাদ গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা গফুরউদ্দিন শাহ। ইউসুফ আলী গ্রামের স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি দিনাজপুরে একাডেমী হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। তিনি দিনাজপুরে রিপন কলেজ থেকে আই.এ এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে বি.এ পাস করেন। তিনি ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা  ও সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।

মোহাম্মদ ইউসুফ আলী

মোহাম্মদ ইউসুফ আলী নবাবগঞ্জ (রাজশাহী) কলেজে বাংলার অধ্যাপক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে বাংলার অধ্যাপক পদে যোগ দেন। সেখানে তিনি ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।

ইউসুফ আলী ১৯৬০ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে তিনি সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যাপনাকালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এল ডিগ্রি নিয়ে দিনাজপুরে আইন পেশায় নিয়োজিত হন।

অধ্যাপক ইউসুফ আলী ১৯৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বিরোধী আন্দোলন এবং উনসত্তুরের  গণআন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সে সময়ে তিনি জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের (NEC) সদস্য ছিলেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি দিনাজপুর-৮ আসন থেকে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির চিফ হুইপ মনোনিত হন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দসহ ভারতে চলে যান এবং প্রবাসী মুজিবনগর সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের ইয়ুথ কন্ট্রোল বোর্ডের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটমেন্ট এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনার এটিই ছিল সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। এ.এইচ.এম কামরুজ্জামানের পরিচালনাধীন সাহায্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের তিনি অনারারি মহাসচিব ছিলেন। কলকাতায় প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের  প্রথম লিয়াজোঁ অফিস পরিচালনায় তিনি নেতৃত্ব দেন।

অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত প্রথম মন্ত্রিসভায় শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল মন্ত্রিসভায় তিনি শ্রমমন্ত্রী নিযুক্ত হন এবং বাকশাল দলীয় শ্রমিক ফ্রন্ট পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি খোন্দকার মোশতাক আহমদ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৭ সালে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হলে মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হন। ১৯৭৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ (মিজান) প্রার্থী হিসেবে দিনাজপুর-৭ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। পরে তিনি বিএনপি-তে যোগ দেন। তিনি ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় বস্ত্রমন্ত্রী এবং ১৯৮১ সালে  বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালের মার্চ মাসে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তিনি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় শিল্পমন্ত্রী পদে বহাল ছিলেন। এরপর ১৯৮৫ সালে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন এবং ১৯৮৬ সালে প্রেসিডেন্ট এরশাদের মন্ত্রিসভায় ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। কয়েকমাস পরেই তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং রাজনীতি থেকে বিদায় নেন।

অধ্যাপক ইউসুফ আলী দিনাজপুরের বহু সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর মৃত্যু হয়।  [মুহম্মদ মনিরুজ্জামান]