আর্সেনিকোসিস


আর্সেনিকোসিস (Arsenicosis) আর্সেনিক বিষাক্ততার কারণে সৃষ্ট রোগাক্রান্ত অবস্থা। আর্সেনিকোসিসের লক্ষণীয় উপসর্গগুলির মধ্যে রয়েছে মেলানোসিস (melanosis) বা ত্বকে গাঢ় দাগ, লিউকোমেলানোসিস (leukomelanosis) বা ত্বকে সাদা দাগ এবং কেরাটোসিস (keratosis) বা ত্বকে কাঠিন্য এবং হাইপারকেরাটোসিস (hyperkeratosis) বা অত্যন্ত উচ্চ মাত্রায় ত্বকের কাঠিন্য যাহা ক্যানসার এরও কারণ হতে পারে। এ রোগের লক্ষণযুক্ত প্রায় ৬,০০০ লোকের মধ্যে আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায় যে, মেলানোসিস রোগটি সর্বাধিক ব্যাপক এবং এর আনুমানিক সংঘটনের মাত্রা শতকরা প্রায় ৯৪ ভাগ। এর পরে কেরাটোসিস শতকরা প্রায় ৬৮ ভাগ, লিউকোমেলানোসিস শতকরা প্রায় ৩৯ ভাগ এবং হাইপারকেরাটোসিস এর মাত্রা প্রায় ৩৭ ভাগ। এতে বোঝা যায় একই ব্যক্তি একাধিক আর্সেনিকোসিস উপসর্গ প্রদর্শন করতে পারে।

Arsenicosis1.jpg
আর্সেনিকে আক্রান্ত হাত ও পা

মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক দ্বারা দূষিত খাবার পানির দীর্ঘকাল পানই আর্সেনিক বিষক্রিয়ার প্রধান কারণ। অগভীর নলকূপের মাধ্যমে উত্তোলিত ভূগর্ভস্থ পানি প্রায়শই এ ধরনের আর্সেনিক দূষিত পানির প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত। ভূগর্ভস্থ পানি কিভাবে আর্সেনিক দ্বারা দুষিত হয় তা এখনও সুস্পষ্ট নয়। কিন্তু এরূপ ধারণা করা হয় যে, আক্রান্ত এলাকাগুলিতে সেচ কার্যে ব্যবহারের জন্য ভূগর্ভ থেকে অত্যধিক পানি উত্তোলনের ফলে ধীরে ধীরে মাটির নিচে পানির পরিমাণ কমে যায় এবং ক্রমাগত পানি উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট শূন্যস্থানে অক্সিজেনের চলাচল শুরু হয়। মাটির নিচে অবস্থিত আর্সেনিকযুক্ত শিলাখন্ডে অক্সিজেন জারণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে পানিতে অজৈব আর্সেনিকের অবমুক্তি ঘটে।

পানির মাধ্যমে শরীরে গৃহীত আর্সেনিক অত্যন্ত দ্রুত যকৃতে পরিবাহিত হয়। অজৈব আর্সেনিক একটি ক্ষমতাসম্পন্ন বিপাকীয় বিষ যা শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় শর্করা ভাঙন বিক্রিয়াসহ কিছু কিছু জারণ বিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। সালফিড্রিল (sulphydryl, SH) গ্রুপ সমন্বিত উৎসেচক আর্সেনিকের প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। আর্সেনিকের সোডিয়াম লবণ, সোডিয়াম আর্সেনাইট অথবা ত্রিযোজী আর্সেনিকগুলি মানবদেহের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। অন্যান্য সোডিয়াম লবণ, যেমন পঞ্চযোজী আর্সেনিকের একটি যৌগ সোডিয়াম আর্সেনেট সাধারণত তুলনামূলকভাবে কম বিষাক্ত। মানুষের দেহের অভ্যন্তরে অজৈব আর্সেনিক যেমন সোডিয়াম আর্সেনাইট অথবা সোডিয়াম আর্সেনেট মিথাইল গ্রুপ সংযোজনের মাধ্যমে মিথাইলেশন বিক্রিয়া সম্পন্ন করে। মিথাইল গ্রুপযুক্ত আর্সেনিক যৌগ বা মিথাইলেটেড আর্সেনিক বিভিন্ন জৈব অণুর সঙ্গে বিক্রিয়ার মাধ্যমে জটিল যৌগের অণু গঠন করতে পারে। মিথাইল গ্রুপযুক্ত আর্সেনিকের জৈব যৌগ অজৈব আর্সেনিকের তুলনায় কম বিষাক্ত। আর্সেনিকে মিথাইলেশনের মাত্রা আপাতদৃষ্টিতে আর্সেনিকের বিষাক্ততার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। একটি মিথাইল গ্রুপ সম্বলিত আর্সেনিক তিনটি মিথাইল গ্রুপ সম্বলিত আর্সেনিকের তুলনায় বেশি বিষাক্ত। এভাবে আর্সেনিকের মিথাইলেশন বিক্রিয়ার বৃদ্ধি দেহে আর্সেনিকজনিত বিষাক্ততার পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারে। কিন্তু মানবদেহের অভ্যন্তরে এ ধরনের বিক্রিয়া কতটা ঘটছে তা জানার কোনো উপায় নেই।

গত ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশের দক্ষিনপশ্চিমাঞ্চলে আর্সেনিকজনিত সমস্যা চিহ্নিতকরণ শুরু হয়। এর অল্প কয়েক বছর আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে একই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে প্রায় ৫২টি জেলার ৫ কোটি মানুষ আর্সেনিকজনিত সমস্যার ঝুঁকির সম্মুখীন এবং এক হিসেবে দেশে আর্সেনিকজনিত রোগের ঘটনার সংখ্যা প্রায় ৪০ লক্ষ।

বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ (UNICEF), জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, ব্রিটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভে এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আর্সেনিক দূষণের মাত্রা এবং ব্যাপ্তি পরিমাপের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আর্সেনিকোসিস পাঁচ থেকে পনেরো বছর অথবা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে, কিন্তু প্রায় সর্বদাই একটি ক্রমবর্ধমান এবং মারাত্মক রোগের আকার ধারণ করে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন যকৃত এবং বৃক্কের (kidney) মারাত্মক ক্ষতি হয় এবং প্রায়শই অত্যন্ত কঠিন অবস্থাসহ ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের খাবার পানিতে আর্সেনিকের গ্রহণীয় মাত্রা হলো ০.০৫ মি গ্রাম/লিটার। এটি লক্ষ্য করা যায় ১৫০ থেকে ২০০ মিটারেরও নিচে খননকৃত মাটিতে স্থাপিত নলকূপের পানি অপরিহার্যভাবেই আর্সেনিকের দূষণ থেকে মুক্ত। অন্যদিকে দশ মিটারেরও কম গভীরতাসম্পন্ন অগভীর নলকূপ বহুলাংশে আর্সেনিক পদার্থ দ্বারা দূষিত।

রান্না এবং পান করার কাজে আর্সেনিক দ্বারা দূষিত পানি ব্যবহার বর্জন করার মাধ্যমে আর্সেনিকজনিত বিষাক্ততার কবল থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকা যায়। ভূপৃষ্ঠের পানি যেমন পুকুর, হ্রদ এবং নদীর পানি আর্সেনিকমুক্ত। কিন্তু এসব জলাশয়ের পানি ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসসহ পানিবাহিত জীবানু দ্বারা দূষিত হওয়ার ঝুঁকি বহুলাংশে রয়েছে। এ ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের কারণে ডায়রিয়া, টাইফয়েড এবং কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিস রোগের উৎপত্তি হয়। এ ধরনের অধিকাংশ জীবাণু পানি ফুটানোর মাধ্যমে দূর করা যায় এবং এ পদ্ধতিটিই ভূপৃষ্ঠের পানিকে নিরাপদ হিসেবে নিশ্চিত করার জন্য সাধারণ প্রচলিত অনুমোদিত ব্যবস্থা। অবশ্য গ্রামাঞ্চলে খরচের কারণে ফুটানো পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা খুব একটা সহজ কাজ নয়। গ্রামাঞ্চলে এখনও জ্বালানি হিসেবে কাঠ এবং শুকনো খড়কুটো ব্যবহার করা হয় যার সরবরাহ অত্যন্ত সীমিত। আর্সেনিক দ্বারা দূষিত পানি থেকে পরিস্রাবন (filtration) প্রণালীর মাধ্যমে আর্সেনিক মুক্ত করা যায়। এ পদ্ধতিতে দূষিত পানিকে এক ধরনের কলামের মধ্য দিয়ে চালনা করা হয়। এ কলামে বিশেষ ধরনের পদার্থ থাকে যেগুলির আর্সেনিকের প্রতি আসক্তি রয়েছে। ফলে কলামের মধ্য দিয়ে পরিচালনার সময় আর্সেনিক ঐ পদার্থগুলির দ্বারা শোষিত হয় এবং বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যায়। তবে এ পদ্ধতিটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বাংলাদেশী আমেরিকান বিজ্ঞানি ড. আবু হুসসাম কর্ত্তৃক সম্প্রতি আবিষ্কৃত সনো ফিল্টার সুলভে পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্চে এবং ইতিমধ্যে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। পান করার কাজে যথাযথভাবে শোধনকৃত পুকুরের পানি ব্যবহার করা এখনও নিরাপদ এবং সহজ পদ্ধতি বলে মনে করা হয়। সমষ্টিগতভাবে অথবা ব্যক্তি পর্যায়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার আর্সেনিকোসিস প্রতিরোধের একটি উপায় হতে পারে, কারণ বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব। [জিয়াউদ্দিন আহমেদ এবং এম সিরাজুল ইসলাম]