আমীন, নূরুল


আমীন, নূরুল (১৮৯৩-১৯৭৪)  আইনজীবী, রাজনীতিক ও পূর্ববাংলার মূখ্যমন্ত্রী। নূরুল আমীন ১৮৯৩ সালে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার শাহবাজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ময়মনসিংহ জেলার বাহাদুরপুরে। তিনি বাহাদুরপুর এম.ই স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং ১৯১৫ সালে ময়মনসিংহ জেলাস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে ১৯১৭ সালে আই.এ এবং ১৯১৯ সালে বি.এ পাস করেন। অতঃপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এল ডিগ্রি লাভের পর তিনি ১৯২৪ সালে ময়মনসিংহ জজকোর্টে আইনব্যবসা শুরু করেন।

নূরুল আমীন

ময়মনসিংহ লোক্যাল বোর্ডের সদস্য (১৯২৯) হিসেবে নূরুল আমীনের গণপ্রতিনিধিত্বমূলক জীবনের সূচনা হয়। পরে তিনি ময়মনসিংহ জেলা বোর্ডের সদস্য (১৯৩০) ও ময়মনসিংহ পৌরসভার কমিশনার (১৯৩২) নির্বাচিত হন এবং ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। দীর্ঘকাল তিনি মুসলিম লীগের ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন এবং ১৯৪৪ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। নূরুল আমীন ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য এবং অতঃপর আইনসভার স্পিকার নির্বাচিত হন। পাকিস্তান আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তিনি খাজা নাজিমুদ্দীনের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন। নূরুল আমীন ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হন এবং পাঁচ বছর এ পদে বহাল ছিলেন। তিনি বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করেন এবং তাঁরই সময়ে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রজনতার মিছিলের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণে চারজন শহীদ হন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীর নিকট পরাজিত হন।

নূরুল আমীন ১৯৬২ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টে (এন.ডি.এফ) যোগ দেন এবং আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী শাসন বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর ১৯৬৪ সালে তিনি ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে নূরুল আমীন জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি পরিষদে সম্মিলিত বিরোধী সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন (১৯৬৫-৬৯)। ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট, জামায়াতে-ইসলামী, নেজামে ইসলাম, কাউন্সিল মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগ (৮-দফা পন্থী) সমন্বয়ে ১৯৬৭ সালে গঠিত রাজনৈতিক মোর্চা পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের (পি.ডি.এম) তিনি চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৬৯ সালে ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি (ডাক) গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ফোরামের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যকার রাজনৈতিক সংকট নিরসনের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান কর্তৃক রাওয়ালপিন্ডিতে আহূত গোলটেবিল বৈঠকে (১৯৬৯) তিনি এনডিএফ-এর প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং এ দলের সভাপতি হন। ১৯৭০ সালে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয়দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগঠিত বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন নূরুল আমীন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা এবং পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থান করছিলেন এবং স্বাধীনতার পরপরই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পাকিস্তানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। নূরুল আমীন ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন এবং ১৯৭৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত এ পদে বহাল ছিলেন। ১৯৭৪ সালের ২ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডিতে তাঁর মৃত্যু হয়।

[মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]