আমলা ও মন্ত্রীবর্গ


আমলা ও মন্ত্রীবর্গ বেসামরিক আমলা বিশেষত সচিবদের স্ব স্ব ভূমিকা এবং মন্ত্রীদের সঙ্গে দায়িত্বগত সম্পর্ক সরকারের রুল্স অব বিজিনেস বা  কার্যবিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে এ সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয়। এ আইনে মন্ত্রীদের দায়িত্ব ছিল ভারত সরকারের প্রধান নির্বাহি হিসেবে কার্য সম্পাদনের জন্য গভর্নর জেনারেলকে সহায়তা করা ও পরামর্শ দেওয়া। এ আইনে বলা হয় যে, গভর্নর জেনারেল সরাসরি বা তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন। এ শাসন কাঠামোর আওতায় মন্ত্রণালয়ের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে সচিবদের গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অধিকার ছিল। একজন নির্বাচিত মন্ত্রী এবং একজন বেসামরিক কর্মকর্তার মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনুরূপ রীতি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পরও অব্যাহত ছিল। পাকিস্তান সরকারের কার্যবিধিতে সচিবদের যথেষ্ট কর্তৃত্ব দেওয়া হয় এবং তারা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের পরামর্শকের দায়িত্বও লাভ করেন।

বাংলাদেশের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী সরকারের মুখ্য নির্বাহি, এবং প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ব্যতীত রাষ্ট্রপতিকে সব ব্যাপারে প্রধানন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। ১৯৭৫ সালের প্রথম দিকে সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন এবং একটি পরামর্শক মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা হয়। এ সংশোধনীতে একদলীয় শাসন প্রবর্তন করা হয়। মন্ত্রীদের ভূমিকা ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের বিধানের পর্যায়ে অবনমিত করা হয়। এ ব্যবস্থা ছিল স্বল্পস্থায়ী। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সরকার পদ্ধতিরও পরিবর্তন ঘটে।

১৯৭৫ সালে সামরিক শাসনকালে প্রথম কার্যবিধি প্রণীত হয়। এ বিধিতে মন্ত্রীদের অবস্থান ছিল ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অনুরূপ। তবে নীতি নির্ধারণ সংক্রান্ত বিষয় এবং তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব মন্ত্রীদের ওপর ন্যস্ত ছিল। সংসদে তাদের স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বও তাদের উপর ন্যস্ত ছিল, অবশ্য যদি এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অন্য কোনো নির্দেশ না থাকে।

১৯৭৫ সালের কার্যবিধিতে সচিবকে মন্ত্রণালয়/বিভাগের প্রধান ঘোষণা করা হয়। নীতি নির্ধারণী বিষয় ও নীতির বাস্তবায়ন ছিল মন্ত্রীর দায়িত্ব। প্রশাসন শৃঙ্খলা এবং মন্ত্রণালয়/বিভাগের কার্যক্রম সম্পাদনের দায়িত্ব ছিল সচিবের। সচিব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, এর অধিদপ্তর এবং অধীনস্থ দপ্তরের মুখ্য হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাও ছিলেন। তার আরও দায়িত্ব ছিল মন্ত্রণালয়/বিভাগের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী/উপমন্ত্রীর অবগতি ব্যতিরেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে মন্ত্রীকে অবহিত করা।

এ কার্যবিধিতে বলা হয়েছে যে, যুগ্মসচিব পদমর্যাদার নিচের কোনো কর্মকর্তা সরকারি কোনো কাজে মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নিতে পারবেন না। তবে মন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে আলোচনার জন্য ডাকতে পারবেন। কোনো অধিদপ্তর বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রধান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে কোনো বিষয়ে আলোচনা করতে পারেন। তবে তার সম্ভাব্য প্রথম সুযোগেই আলোচনার বিষয়বস্ত্ত সম্পর্কে সচিবকে অবহিত করতে হবে।

এছাড়া সচিবালয় কার্যপ্রণালীর আওতায় সুনির্দিষ্ট বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত বা যুগ্মসচিব সরাসরি মন্ত্রীর কাছে কোনো ফাইল প্রেরণ করতে পারবেন। তবে মন্ত্রী কর্তৃক বিষয়টির নিষ্পত্তির পর ফাইলটি সচিবের মাধ্যমে ফেরত পাঠাতে হবে। অবশ্য এধরনের ফাইল সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে চেয়ে পাঠানোর অধিকার সচিবের রয়েছে। কোনো ফাইল মন্ত্রীর কাছে পাঠানোর আগে তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে তার সঙ্গে আলোচনার জন্য অনুরোধ করতে পারেন।

১৯৮৭ সালের জুন মাসে গঠিত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি সরকারি কর্মচারী ও মন্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কের কাঠামো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে। ওই কমিটি প্রধানত সচিবের কর্তৃত্ব সংকোচন এবং মন্ত্রীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করাসহ যেসব সুপারিশ করে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা গৃহীত ও অনুমোদিত হয় নি। তবে কার্যবিধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন অন্তর্ভুক্ত হয়। ইতোপূর্বে সচিবকে মন্ত্রণালয়/বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণত মন্ত্রীকে অবহিত করতে হতো। সংশোধনীতে ‘সাধারণত অবহিত করা’ কথাটি বাদ দিয়ে তদস্থলে বলা হয়, ‘সচিব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীকে মন্ত্রণালয়/বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করবেন এবং তার তত্ত্বাবধানে কাজ করবেন’।

১৯৯৬ সালে জারিকৃত সর্বশেষ কার্যবিধিতে সচিবকে মন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে কাজ করার বাধ্যবাধকতা পরিহার করা হয়। সচিবের কর্তৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত অপর সব দায়িত্ব অপরিবর্তিত থাকে। কার্যবিধিতে সচিব তার অধীনস্থ মন্ত্রণালয়ের/বিভাগের ‘দাপ্তরিক প্রধান’ কথার স্থলে ‘প্রশাসনিক প্রধান’ কথাটি প্রতিস্থাপন করা হয়।

কার্যবিধি ও সচিবালয় কার্যপ্রণালীতে মন্ত্রী ও সচিবের মধ্যকার যে সম্পর্ক দেখানো হয়েছে তা সম্পূর্ণরূপে ওই আইন-কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত যা উভয়ের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সরকার ও রাজনীতির বাস্তবতার নিরীখে এ সম্পর্ক অনেকটা নির্ভর করে ব্যক্তিগত সমীকরণ, যথার্থ সমঝোতা ও পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ের ওপর।  [এ.এম.এম শওকত আলী]

গ্রন্থপঞ্জি AMM Shawkat Ali, Aspects of Public Administration, Nikhil Prokashan, 1996; Rules of Business, 1996।