আফিম


আফিম (Opium)  Papaveraceae গোত্রের ওপিয়াম পপি (opium poppy), Papaver somniferum নামক উদ্ভিদের রস থেকে তৈরী মাদকাসক্তি সৃষ্টিকারী দ্রব্য। এটি সম্ভবত ইউরোপের দক্ষিণে ও পশ্চিম এশিয়ার দেশসমূহের স্থানীয় উদ্ভিদ, কিন্তু বর্তমানে এর চাষ এত ব্যাপক যে এর নির্দিষ্ট আদি আবাস নিশ্চিত করে বলা কঠিন। গ্রিক শব্দ opos থেকে ‘ওপিয়াম’ শব্দের উৎপত্তি। ওপোস মানে রস। উদ্ভিদটি খাড়া হয়ে জন্মায় এবং এটি বীরুৎ সদৃশ ও বর্ষজীবী। ফুল নানা রঙের, সেসঙ্গে ফলের আকার এবং বীজের বর্ণও নানা ধরনের। উদ্ভিদের সকল অঙ্গে এক ধরনের সাদা কষবাহী নালিকা থাকে। নালিকাগুলি সাদা কষে (white latex) পূর্ণ থাকে। ফুল বিশুদ্ধ সাদা থেকে কিছুটা লালচে রক্তবর্ণের হয়ে থাকে। বনে জন্মানো উদ্ভিদের ফুলের রং ফ্যাকাশে বেগুনি এবং প্রতিটি পাপড়ির গোড়ায় রক্তবর্ণের দাগ থাকে।

ঐতিহাসিক পটভূমি  পারস্য, মিশর ও মেসোপটেমিয়ায় প্রাচীন সভ্যযুগে আফিমের চাষ হতো। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও অশ্মীভূত পপি বীজ সাক্ষ্য দেয় যে নিয়ান্ডারথাল মানুষেরা ত্রিশ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে আফিম ব্যবহার করে। খ্রিস্টপূর্ব চার হাজার বছরের কাছাকাছি সময়ের সুমেরীয় গ্রন্থে পপির উল্লেখ আছে। শবের পাশে পপির তৈরি কৃত্রিম উপাদান রেখে মিশরীয় ফেরাওদের সমাধিস্থ করা হতো। মিশরীয় চিত্রের মাধ্যমে লিখন পদ্ধতিতে ও রোমক ভাস্কর্যে পপির  ছায়াপাত ঘটেছে। গ্রিক ও রোমকদের নিদ্রা দেবতার প্রতিনিধি হিপনোস ও সোমনোসকে পপি পরিধানরত বা বহনরত অবস্থায় দেখা যায়। হোমারের -  ইলিয়াড এ আফিমকে ব্যথা উপশমের ও ক্ষত নিরাময়ের উৎস হিসেবে উল্লেখ আছে। পপির রসকে পৌরাণিক বীর অ্যাপোলো ও মিউজেসের শক্তির গোপন রহস্য বলে মনে করা হয়। মধ্যযুগের চিকিৎসাশাস্ত্রের জনক আবু-আলী-ইবনে-সিনা (৯৮০-১০৩৬ খ্রি.) তাঁর চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা গ্রন্থে মানসিক ও শারীরিক, বিশেষ করে চোখের রোগসহ বহু ধরনের রোগ আরোগ্যে আফিম ব্যবহারের ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন।

সিন্ধু জয়ের পর আরব বণিকরা দক্ষিণ এশিয়ায় আফিমের প্রবর্তন করে। মুগল অভিজাতদের অপেক্ষাকৃত বেশি আসক্তি ছিল আফিমে, এমনকি চিকিৎসা-বহির্ভূত ব্যবহারের ক্ষেত্রেও। আবুল ফজল তাঁর আকবরনামায় মুগল অভিজাতদের ‘কুকনার’ (আফিম ও গাঁজার একটি মিশ্রণ) ব্যবহারের উল্লেখ করেছেন। রাজপুত যোদ্ধারাও আফিমে আসক্ত ছিলেন।

বঙ্গদেশে আফিম চাষ  পর্তুগিজ পর্যটক পাইরেসের (Pyres, ১৫১৬) লেখায় সর্বপ্রথম আফিমের উল্লেখ দেখা যায়। আরবীয় ও পারসিকদের আগমনের সঙ্গে বঙ্গদেশে আফিম প্রবর্তনের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করা হয়। আবগারির মাধ্যমে মুগল শাসকেরা আফিমকে তাদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার করতেন। সমুদ্রপথে যাতায়াতকারী ইংরেজ, পর্তুগিজ, ফরাসি ও অন্যান্য কোম্পানি বঙ্গদেশ থেকে আফিম রপ্তানি শুরু করলে এখানে ব্যাপকভাবে পপি চাষের বিস্তার ঘটে।  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৭৩ সালে এ ব্যবসায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। এ ব্যবসায়ে রাষ্ট্রীয় একচ্ছত্র আধিপত্য ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল যতদিন না আফিম উৎপাদন দাপ্তরিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল।

এক সময় পৃথিবীব্যাপী আফিম সেবন প্রায় সার্বজনীনতা লাভ করে এবং আঠারো শতকের শেষে এটির সেবন একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়। বঙ্গসমাজে ‘আপনার উদ্দেশ্যে রাখা আফিম অনুগ্রহ করে গ্রহণ করুন’ ধরনের অনুরোধ প্রমিতমানের সম্ভাষণ হিসেবে আদৃত হতো। এমনকি উৎপাতকারী শিশুকেও আফিম খাইয়ে শান্ত করা হতো। সেনাবাহিনী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আফিম ব্যবহার ছিল অতি সাধারণ ব্যাপার। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আফিম উৎপাদনে বঙ্গদেশের নির্দিষ্ট জেলাগুলিতে বিশেষ করে যশোর, নদীয়া (বাংলাদেশ অংশে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা) ও রাজশাহী অঞ্চলসমূহে পর্যাপ্ত পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উনিশ শতকের গোড়া থেকে চীনের সঙ্গে ব্যবসায়ে ঘাটতি মেটাতে বঙ্গদেশ থেকে চীনে আফিম রপ্তানি শুরু করে। চীনা শাসকরা ১৮৩৯ সালে আফিম আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অবৈধ উপায়ে এ ব্যবসা অব্যাহত রাখে। কোম্পানির অবৈধ আফিম ব্যবসার কারণে চীন ও ব্রিটেনের মধ্যে যুদ্ধ বাধে। চীনারা পরাজিত হয় এবং চীন ১৮৪২ সালে নানজিং চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। ব্রিটেনের প্রয়োজন ছিল আফিম ব্যবসা অব্যাহত রাখার অনুমতি লাভ করা। আফিমের বাজার সম্প্রসারণের দাবির প্রশ্নে ব্রিটিশের সঙ্গে চীনাদের দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ (১৮৫৮) শুরু হয়। চীন আবারও পরাজিত হয়। ১৮৫৮ সালে সম্পাদিত তিয়েনসিন চুক্তি অনুসারে আনুষ্ঠানিকভাবে চীনে আফিম রপ্তানি বৈধতা লাভ করে। শীঘ্রই আফিমে চীন সয়লাব হয়ে যায়। এ চুক্তির ফলে বঙ্গদেশে লক্ষণীয়ভাবে আফিম উৎপাদন বেড়ে যায়।

ঔপনিবেশিক সরকারের নিকট আফিম আয়ের এমনই গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয় যে, রয়াল কমিশন অব ওপিয়াম অব ১৮৯৫ মানুষের নৈতিক ও শারীরিক বিপর্যয়কে অগ্রাহ্য করে ব্রিটিশের আফিম ব্যবসাকে সমর্থন দান করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে আফিমের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ সূচিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টির প্রয়াস অব্যাহত থাকার ফলে ১৯০৯, ১৯১২-১৪ ও ১৯২৪-২৫ সালে আফিমের ওপর বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের অধীনে ঔপনিবেশিক ভারত শেষ পর্যন্ত আফিম ব্যবসা সীমিত ও নিয়ন্ত্রণ করায় সম্মত হয়। ১৯৩৫ সালের সংবিধানের অধীনে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৩৭ সালে আফিমের উৎপাদন ও ব্যবসা পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়।

বাংলাদেশ সরকার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন অনুসরণ করে। বিপজ্জনক মাদক আইন, ১৯৫১ (Dangerous Drugs Act 1951) ও পরবর্তীকালে জারীকৃত অন্যান্য আইন এবং আন্তর্জাতিকভাবে আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (International Narcotics Control Board) আফিমজাত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশ সরকার যদিও অবৈধ মাদক পাচার ব্যবসা নির্মূল করায় খুবই আগ্রহী, তবু ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য অবৈধভাবে বাংলাদেশের বাজারে আসছে। মে অ্যান্ড বেকার (ভারত) কোম্পানি উৎপাদিত কফ সিরাপ ফেনসিডিলে রয়েছে কোডেইন (codeine), যা পপি থেকে নির্যাস হিসেবে সংগৃহীত হয়। কোডেইনের ব্যবহারকারী মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮২ সালের মাদক বিধির (Drug Ordinance of 1982) অধীনে আমদানি তালিকা থেকে কোডেইন বাদ দেয়। কিন্তু এটির বাংলাদেশে আসা কখনও বন্ধ হয় নি, কারণ অধিক ব্যয়সাপেক্ষ মাদকের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের ফেনসিডিল বিকল্প নেশা হিসেবে ব্যবহূত হতে থাকে। আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (১৯৯৫) লক্ষ্য করে যে রপ্তানির উদ্দেশ্যে তৈরি ভারতীয় ফেনসিডিলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিমাণে কোডেইন থাকে এবং মাদকাসক্তদের কাছ থেকে বেশি অর্থ আদায়ের লক্ষ্যে এরকম করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারতের আফিম কবলিত ফেনসিডিলের অবৈধ ব্যবসায়ের কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে। [সিরাজুল ইসলাম]

আরও দেখুন গাঁজা; তামাক; মাদকদ্রব্য