আন্তঃএশিয়া যোগাযোগ ব্যবস্থা


আন্তঃএশিয়া যোগাযোগ ব্যবস্থা চলমান বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট হলো বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক একত্রীকরণ অর্থাৎ অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিবিড়করণ। বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে এ ধরনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নিবিড়করণ সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত সড়ক, রেলওয়ে এবং নদীপথে ভ্রমণ ও মালামাল আদান প্রদানের ব্যবস্থা। মূলত ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণে এশিয়ায় এ বিষয়ে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত কোনো বিশেষ উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন (ইউএন-এসক্যাপ) ১৯৫৯ সালে এ বিষয়ে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে এ অঞ্চলের ১৫টি দেশের জন্য এশিয়ায় রাজপথ প্রকল্প-বাস্তবায়নের চেষ্টা নেওয়া হয়। এক বছর পরে আন্তঃএশিয়া রেল যোগাযোগ প্রকল্পও প্রণীত হয় যার মাধ্যমে এশিয়াব্যাপী যোগাযোগ অবকাঠামো সৃষ্টির উদ্যোগ অধিকতর প্রসারিত হয়।

কোনো কোনো দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা অথবা যু্দ্ধকালীন অবস্থার কারণে প্রায় দুই যুগেরও অধিক সময় পর্যন্ত এ প্রকল্প দুটির দ্রুত বাস্তবায়ন ব্যাহত হয়। ১৯৯২ সালে উপর্যুক্ত দুটি প্রকল্পকে একীভূত করে একটি নূতন প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়। এ প্রকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ভূপরিস্থ পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন যা ইংরেজিতে Land Transport Infrastructure Development (ALTID) নামে পরিচিত। এর উদ্দেশ্য ছিল পরিবহণ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতার উন্নয়ন।

পরবর্তী পর্যায়ে বঙ্গোপসাগর বহুমুখি কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা যা ইংরেজিতে Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation (BIMSTEC) নামে পরিচিতি লাভ করে। বাংলাদেশ এবং সার্কভুক্ত অন্যান্য দেশসহ দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশ এ চুক্তিতে সম্মত হয়। এ ধরনের আঞ্চলিক চুক্তির ফলে ALTID এর সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করে। এর মাধ্যমে এশিয়ার দেশসমূহ যথা বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ইরান, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, সিংগাপুর, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড ও তুরস্ক রেল ও রাজপথের যোগাযোগের অংশ চিহ্নিত করে। যে কাজটি অসম্পূর্ণ রয়েছে তা হলো ১৯৯২ সালের আন্তঃএশীয় যোগাযোগ অবকাঠামোর দ্র্ুত বাস্তবায়ন যাতে করে আঞ্চলিক ও উপআঞ্চলিক দেশসমূহের পরিবহণ ব্যবস্থা বাস্তব রূপ লাভ করে। বিশ্বব্যাংক প্রণীত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, আন্তঃএশীয় রেল যোগাযোগ প্রকল্প বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি করেছে।

প্রণীত রেল যোগাযোগে দুটি সম্ভাব্য পথ নির্দেশিত হয়েছে। একটি সিলেটের এবং অন্যটি কক্সবাজারের মাধ্যমে। এর ফলে  থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর, ভারত ও মধ্য এশিয়ার সাথে যুক্ত হবে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশ যদি তার বর্তমান রেলপথ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করে তাহলে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করতেও সক্ষম হবে।

এখন পর্যন্ত দক্ষিণপূর্ব এশীয় অর্থাৎ আশিয়ান গোষ্ঠীভুক্ত দেশসমূহে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি সার্কভুক্ত অঞ্চলের তুলনায় এগিয়ে আছে। আশিয়ানের দেশসমূহ রূপকল্প ২০২০ (ভিশন ২০২০) প্রণয়ন ও গ্রহণ করেছে। এ  রূপকল্প গ্রহণের মাধ্যমে অক্টোবর ২০০০ সালে মালমাল পরিবহনের জন্য একটি চুক্তি আশিয়ান গোষ্ঠীভুক্ত দেশসমূহ স্বাক্ষর করে। এ চুক্তি ইংরেজিতে ASEAN Framework Agreement on Facilitation of Goods in Transit নামে পরিচিত। এ চুক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মালামাল পরিবহণ সংক্রান্ত সমন্বিত পরিবহণ ব্যবস্থা। এ চুক্তির এক বছর পূর্বে আশিয়ান রাজপথ সংক্রান্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। মোট ৩৮৪০০ কিলোমিটার সম্বলিত ২৩টি রাজপথে বিভক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থাই এ উদ্যোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ ধরনের উপআঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উদ্যোগ ALTID এর লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম করে দেয়। এর ফলে আন্তঃএশীয় সমন্বিত পরিবহণ ব্যবস্থা অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ নিবিড় হবে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯৯২ সালে বৃহত্তর মেকং উপঅঞ্চলের যোগাযোগ নিবিড় করার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছিল। এ পরিকল্পনায় ওই অঞ্চলভুক্ত ছয়টি দেশ অংশগ্রহণ করে। দেশগুলো হচ্ছে কম্বোডিয়া, চীন প্রজাতন্ত্র, লাওপিডিআর, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। এ পরিকল্পনার মাধ্যমে ত্রিমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রেলপথ, রাজপথ ও জলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা। এ ধরনের ভৌত অবকাঠামোর ব্যবহার সহজ করার লক্ষ্যে আন্তঃসীমানা মালামাল পরিবহণ ও যোগাযোগ শক্তিশালী করা হয়।

দক্ষিণ এশীয় উপঅঞ্চলের জন্য পরিবহণ ব্যবস্থা বহু পূর্ব থেকেই বিদ্যমান। কিন্তু রাজনৈতিক ও অন্যান্য কারণে এর সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে এ সমস্ত বাধাগুলো দূর করা গেলে এ ব্যবস্থা থেকে অধিকতর সুফল লাভ করা সম্ভব। এছাড়া একই কারণে ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে বিদ্যমান যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অটুট রেখে আন্তঃদক্ষিণএশীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতি দৃষ্টি দেওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যান্য পরিপূরক কার্যক্রম যথা সুসঙ্গতি, অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির সমমান নিশ্চিত না করার ফলে আন্তঃদক্ষিণএশীয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি।

জানুয়ারি ২০০৪ সালে ইসলামাবাদে অনু&&ষ্ঠত ১২তম সার্ক শীর্ষ বৈঠকে উপর্যুক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ সমাধানের জন্য এক উৎসাহব্যঞ্জক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, এ অঞ্চলে সমন্বিত পরিবহণ ব্যবস্থা সৃষ্টি করা হবে। ওই বছরের একই মাসে সপ্তাহে দুদিনের জন্য ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হয়। রেলপথের মাধ্যমে যাত্রীবাহী রেল সমঝোতা এক্রপ্রেস নামে পরিচিতি লাভ করে। এ যাত্রীবাহী রেল পাকিস্তানের লাহোরের সাথে ভারতের আটারীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি ১৪ মালামালসহ যাত্রী পরিবহণের জন্য করাচী-খোকরাপুর-মুনাবাও-যোধপুর রেল সংযোগের প্রবর্তন করা হয়। এ সংযোগ সাপ্তাহিক ভিত্তিতে হয়। এর ফলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মালামাল পরিবহণ উল্ল্যেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। উল্ল্যেখ্য যে একই ধরনের যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে চালু হয়েছে। পণ্য পরিবহনের এই যোগাযোগ ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল তারিখে চালু হয়।

সড়কপথে নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে মালামাল পরিবহণ ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে। এ ব্যবস্থা কাকরাভিটা (নেপাল)-পানিটাস্কি (ভারত)-ফুলবাড়ী (ভারত)-বাংলাবান্ধা (বাংলাদেশ) পথে মালামাল পরিবহন করে। তবে এ ব্যবস্থা কেবলমাত্র দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের জন্য সীমিত। বিদ্যমান ব্যবস্থায় ট্রাকের চলাচল সংখ্যায় খুবই কম। মাত্র চারটি ট্রাক প্রতি সপ্তাহে এই মালামাল পরিবহণ করছে। অধিকতর পরিবহণ নিশ্চিত করা হলে নেপাল কলকাতা সমুদ্রবন্দর ব্যতিত বাংলাদেশের মংলা বন্দর ব্যবহার করতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশ ও ভূটানের মধ্যে একই ধরনের সংযোগ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের জন্য সীমিত এ পরিবহণ ব্যবস্থা ফুনটমহোলডিং (ভূটান)-চ্যাংরাবানদ (ভারত)- বুড়িমারী (বাংলাদেশ) সংযোগ সড়ক ব্যবহার করে। তবে এই বাণিজ্য সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।

১৯৯৯ সালে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে যাত্রীবাহী বাস যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। এ ব্যবস্থা কেবলমাত্র ঢাকা-কলকাতার মধ্যে সীমিত। ২০০৩ সালে ঢাকা-আগরতলা সংযোগ করা হয়। এছাড়া ঢাকা-শিলিগুড়ির মধ্যেও এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রাপ্ত থেকে জানা যায় যে, ভিসা প্রদান ব্যবস্থা সহজীকরণ ও ত্বরান্বিত করলে যাত্রী পরিবহণ সংখ্যা উল্ল্যেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।

নদীপথে মালামাল পরিবহণ ব্যবস্থা ১৯৭২ সাল থেকেই চালু রয়েছে। তবে এ সংক্রান্ত চুক্তি ওই সময় থেকেই দু বছর পরপর নবায়ন করতে হয়। স্থলপথে ট্রানজিট নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও নৌপথে পণ্য পরিবহণের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ২০০৯ সালে এ চুক্তি পুনরায় নবায়ন করা হয়েছে। এ চুক্তিটি সাধারনত ট্রানজিট চুক্তি নামে পরিচিত।

রাজনৈতিক মতভেদ ছাড়াও আঞ্চলিক যোগাযোগ অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহারের অন্যান্য কারণও রয়েছে। যেমন সহায়ক সুবিধাদির অভাব, কাস্টম ও ভিসা প্রদানের জটিলতা, আগমন ও বহির্গমন বন্দরে অনানুষ্ঠানিক অর্থের আদান প্রদান, ব্যাংকের সেবার জটিলতা এবং অপ্রতুল ট্রাক টার্মিনাল।

[এএমএম শওকত আলী]

গ্রন্থপঞ্জি M Rahamatullah, 'Promoting Transport Cooperation in South Asia in Regional Cooperation in South Asia : A Review of Bangladesh's Development 2004', Centre for Policy Dialogue, The University Press Ltd 2006, p. 373-396; 'Bangladesh 2020: A Long-term Perspective Study', The World Bank and Bangladesh Centre for Advanced Studies, The University Press Ltd 2003 (3rd  Edition), 88-89.