আন্ডারপ্রিভিলেজড্ চিলড্রেনস্ এডুকেশনাল প্রোগ্রামস্


আন্ডারপ্রিভিলেজড্ চিলড্রেনস্ এডুকেশনাল প্রোগ্রামস্ বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয়  এনজিও। এর লক্ষ্য দরিদ্র ও কর্মজীবী শিশুকিশোরদের সাধারণ শিক্ষাদানের পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রদান এবং তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। ইউসেপ এসক্যাপের তালিকাভুক্ত একটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। ১৯৭০ সালে ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব উপকূল দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন এলাকার মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার জন্য নিউজিল্যান্ড থেকে লিন্ডসে অ্যালেন চেইনী নামে একজন সেবাকর্মী একটি ব্রিটিশ ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে এ দেশে আসেন। ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি গৃহহীন ও দরিদ্র শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য তাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে ডেনমার্ক সরকার আর্থিক সহায়তাসহ একটি তিনবছর মেয়াদি প্রকল্প অনুমোদন করে। শুরুর দিকে ইউসেপ কমিউনিটি স্কুলের মডেল অনুযায়ী দরিদ্র ও কর্মজীবী শিশুদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে। স্কুলবহির্ভূত দরিদ্র শিশুদের জন্য ইউসেপ মডেল সমাদৃত হয়। ইউসেপ ১৯৮৩ সালে সাধারণ শিক্ষাদান কর্মসূচির সাথে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করে এবং এ লক্ষ্যে ঢাকায় একটি কারিগরি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। এই সময়ের মধ্যে ইউসেপের শিক্ষা কার্যক্রম চট্টগ্রাম এবং খুলনা শহরে সম্প্রসারিত হয়। সমাজকল্যাণ (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর অধীনে ১৯৯০ সালে ইউসেপ একটি জাতীয় এনজিও হিসেবে নিবন্ধিত হয়।

ইউসেপ ২০০০ সালে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা এবং রাজশাহীতে ৩০টি সাধারণ বিদ্যালয় এবং ৩টি কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন করে। সাধারণ ও কারিগরি  শিক্ষা শেষে ছাত্রছাত্রীরা যাতে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে সেজন্য ইউসেপ বিভিন্ন চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। ২০০৩ সাল থেকে ইউসেপ দেশের বাইরেও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। এরই মধ্যে ১১৬ জন ইউসেপ থেকে শিক্ষাগ্রহণ শেষে বিদেশে চাকুরি নেয়। ইউসেপ ২০০৪ সাল থেকে ’লেট চিল্ড্রেন স্পিক’ নামে শিশু অধিকার বিষয়ে একটি এ্যাডভোকেসি প্রোগ্রাম চালু করে। এই প্রোগ্রামের মূল উদ্দেশ্য সকল শিশুকে স্কুলমুখী করা ও সব ধরনের শিশু নির্যাতন বন্ধে শিশুদের এবং অভিভাবকদের সচেতন করা। ২৪টি পার্টনার এনজিওর মাধ্যমে ১০টি জেলায় এ প্রোগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে। ২০০৫ সাল থেকে ইউসেপ শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগ প্রকল্প শুরু করে যার মাধ্যমে ইউসেপ থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করে এরা  নিজেরাই ব্যবসা করে স্বনির্ভর হতে পারে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড-এর অধীনে ইউসেপের এসএসসি ভোকেশনাল প্রোগ্রামে এ পর্যন্ত ৩৭৮ জন ছাত্র পাশ করে। এসএসসি  ভকেশনাল শিক্ষা শেষে যেসব মেধাবী ছাত্রছাত্রী আরো পড়াশোনা করতে চায় তাদের জন্য ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং স্পনসরশিপ প্রোগ্রাম-এর ব্যবস্থা রয়েছে। ২০০৭ সালে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম চালু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ১২৫ জন এর অধীনে শিক্ষা সম্পন্ন করে। ২০০৯ সাল থেকে ইউসেপ সাধারণ কারিগরি সমন্বিত বিদ্যালয়সমূহে প্রথম শ্রেণি থেকে ইংলিশ ইন অ্যাকশন প্রোগ্রাম  এবং কম্পিউটার ক্লাস শুরু করে। ২০১০ সালের মধ্যে ইউসেপ বালাদেশের সকল বিভাগীয় শহরে এবং গাজীপুর জেলা শহরে এর কর্মকান্ড বিস্তৃত করে। প্রতিষ্ঠানটি ৫২টি সমন্বিত সাধারণ ও কারিগরি বিদ্যালয় ও ১০টি কারিগরি বিদ্যালয় পরিচালনা করে যেখানে ৩৭,০০০ দরিদ্র ও কর্মজীবী শিশুকিশোর  উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করছে। প্ল্যান বাংলাদেশের সহায়তায় ইউসেপ ঢাকায় ২টি এবং বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ১টি কারিগরি বিদ্যালয় পরিচালনা করছে।

ইউসেপের সাধারণ বিদ্যালয়সমূহ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক বোর্ড অনুমোদিত শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই অনুসরণ করে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সমাজ ও বিজ্ঞান বিষয়ের সাথে ইউসেপ প্রণীত নিজস্ব বই পড়ানো হয়। ভর্তির পূর্বে পরিবারে গিয়ে শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করার পর তাদের শিক্ষা চাহিদা নিরূপণ করা  হয়। এভাবে চার দশকের অভিজ্ঞতা, জরিপ ও গবেষণার মাধ্যমে ইউসেপ শহরের দরিদ্র শিশুদের শিক্ষাচাহিদার একটি সাধারণ রূপরেখা তৈরি করে। ইউসেপের স্কুল ব্যবস্থা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার জন্য সমর্থন ও সহযোগিতা দানে উদ্বুদ্ধ করে। ইউসেপের স্কুলসমূহের  নিজস্ব স্ট্র্যাটেজি রয়েছে যা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাকাঠামোকে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। ইউসেপের নীতি হচ্ছে সংক্ষিপ্ত সেমিস্টার আয়োজন, সংক্ষেপিত পাঠ্যক্রম ব্যবহার এবং শিক্ষার পাশাপাশি কাজে অংশগ্রহণ। ইউসেপ পরিচালিত সকল বিদ্যালয় বস্তি ও কারখানা এলাকাতে শিশুর কাজের জায়গা নির্ধারণ করে। শিশুর শিক্ষা নির্বিঘ্ন ও কার্যকর রাখতে ইউসেপের শিক্ষকরা সংশ্লিষ্ট পরিবারের লোকজন ও তাদের কর্মস্থলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, রংপুর এবং গাজীপুরে দশটি কারিগরি বিদ্যালয়ের মাধমে ইউসেপ বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ইউসেপের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ব্যয় সাশ্রয়ী এবং একটি কর্মজীবী শিশুকে ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ১৮ মাসের মধ্যে মৌলিক  কারিগরি শিক্ষায় পারদর্শী করে তোলে। ইউসেপের ১৭টি বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কোর্সের মধ্যে রয়েছে অটো মেকানিক্স, ওয়েলডিং এন্ড ফেব্রিকেশন, মেশিনিষ্ট, প্লাম্বিং এন্ড পাইপ ফিটিং, ইন্ডাষ্ট্রিয়াল ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল, ইলেকট্রনিক টেকনলজি, রেফ্রিজারেশন এন্ড এয়ার কন্ডিশনিং, অফসেট প্রিন্টিং টেকনলজি, ইন্ডাসট্রিয়াল উড ওয়ার্কিং, টেইলরিং এন্ড ইন্ডাসট্রিয়াল সিউইং অপারেশন, ইন্ডাসট্রিয়াল উল নিটিং অপারেশন, গারমেন্টস ফিনিসিং এন্ড কোয়ালিটি কন্ট্রোল, ইন্ডাসট্রিয়াল গার্মেন্টস মেশিন মেকানিক্স, টেক্সটাইল ওয়েভিং মেকানিক্স, টেক্সটাইল স্পিনিং মেকানিক্স, টেক্সটাইল নিটিং মেকানিক্স এবং এইড টু নার্স।

ইউসেপের মূল লক্ষ্য শহরাঞ্চলের দরিদ্র ও কর্মজীবী শিশুদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও  দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখা। ইউসেপ ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি বোর্ড অব গভর্নরস দ্বারা পরিচালিত। বোর্ড ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট ইউসেপ এসোসিয়েশন সদস্যের মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়। ইউসেপের প্রধান একজন নির্বাহী পরিচালক এবং তাকে সহায়তা করেন দুজন পরিচালক ও সাতজন ব্যবস্থাপক। ১৬৭৬ জন কর্মী নিয়ে ইউসেপ গঠিত। ইউসেপ কর্মীদের  ৩০ শতাংশ মহিলা। ইউসেপ বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকে। এই সকল বিদেশি সংস্থার একটি কনসোর্টিয়াম আছে যা প্রকল্প দলিলের মাধ্যমে ইউসেপকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। ২০১০ সালে এই কনসোর্টিয়ামের সদস্য হলো ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশানাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি), দি রয়েল ড্যানিস এম্ব্যাসি (ডানিডা), সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (এসডিসি) এবং সেইভ দ্য চিলড্রেন সুইডেন-ডেনমার্ক (এসসিএসডি)। ইউসেপের তহবিলের অন্যান্য উৎসের মধ্যে রয়েছে ইউসেপ বেনিফিসিয়ারিদের আর্থিক সাহায্য, স্টুডেন্ট স্পন্সরশিপ, সেবামূলক অনুদান এবং সরকার, সিটি কর্পোরেশন ও ব্যক্তি কর্তৃক দানকৃত জমি।

১৯৭২-২০১০ সালে ইউসেপ শহর এলাকার ১,৭১,০১৬ জন কর্মজীবী দরিদ্র শিশুকে সাহায্য করেছে। এদের মধ্যে ইউসেপের সাধারণ বিদ্যালয় থেকে ৯৫,০২৬ জন ছাত্র ৫ম শ্রেণি এবং ৭১,৫৩৬ ছাত্র অষ্টম শ্রেণি পাস করেছে। ১৯৮৩ সাল থেকে এই পর্যন্ত বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ শেষ করেছে ৩৮,৩১৮ জন শিশু। ২০১০ সালে ইউসেপের বিভিন্ন বিদ্যালয় ও বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৩৭,০০০। ২০১০ সালের জন্য ইউসেপের বাজেট ২,০৪০,৮৭৩,৬৬ টাকা। এসক্যাপ ইউসেপকে ১৯৯৫ এবং ১৯৯৭ সালে মানবসম্পদ উন্নয়ন সংস্থাসমূহের প্রতিযোগিতায় রানারস আপ ঘোষণা করে।  [শামসুল হুদা]