আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার


আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। শিল্পপতি শেখ আকিজউদ্দীন এর প্রেরণায় এবং অধ্যাপক মোহম্মদ শরীফ হোসেন (১৯৩৪-২০০৭)-এর উদ্যোগে ১৯৮০ সালে যশোরে এতিম শিশুদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়। আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার ১৯৮৯ সালে সমাজ কল্যাণ বিভাগ, এনজিও বিষয়ক ব্যুরো এবং  পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ কর্তৃক নিবন্ধনভুক্ত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ২,২৪২ জন।

আদ-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার এতিম শিশুদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৮০ সালে যশোর শহরে আদ্-দ্বীন শিশু-কিশোর নিকেতন এবং দেশের নারী  শিক্ষার উন্নয়নে ১৯৯৯ সালে যশোরের পূর্ব বারান্দিপাড়ার লিচুতলায় সখিনা মডেল বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৮৫ সালে আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার মুসলিম ছেলেমেয়েদের জন্য কুরআন শিক্ষা প্রদান প্রকল্প চালু করে। দরিদ্র শিশুকিশোরদের শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে যশোর সদর উপজেলায় উপ-আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচি শুরু করা হয়। যশোর সদর থানার বলরামপুর গ্রামে ১৯৮৯ সালে স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র স্থাপন করে আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি শুরু করে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ আদ্-দ্বীনকে কর্মএলাকা বরাদ্দ দেয়। কর্ম এলাকায় স্যাটেলাইট ক্লিনিকের মাধ্যমে সংস্থার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্যারামেডিকরা মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিচ্ছেন। বর্তমানে সংস্থার কর্ম এলাকায় প্রতিমাসে ৩৯৮টি স্যাটেলাইট ক্লিনিক অনুষ্ঠিত হয়। কর্মএলাকায় ডায়রিয়াসহ অন্যান্য পানিবাহিত রোগের হাত থেকে জনগণকে রক্ষার জন্য ১৯৯১ সালে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। ইউনিসেফের সহযোগিতায় ৬ মাসব্যাপী স্যানিটেশন কার্যক্রম বাস্তবায়নসহ বর্তমানে যশোর ও মাগুরা জেলায় ৪টি গ্রামীণ স্যানিটেশন কেন্দ্রের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন এবং পরিচ্ছন্নতা প্রসার নামে একটি প্রকল্পের কাজ মাগুরা পৌরসভায় চলছে। ২০০১ সাল থেকে কেয়ার বাংলাদেশের সহযোগিতায় আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার যশোর, বেনাপোল, নওয়াপাড়া, সাতক্ষীরা, মাগুরা ও গোয়ালন্দ এলাকায়  এইডস প্রতিরোধে কাজ করছে। ২০০৪ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ইউনিসেফের সহযোগিতায় এইচআইভি/এইড্স ইন্টারভেনশন ফান্ড নামে একটি প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়িত হয়। আদ-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার ১৯৯০ সাল থেকে গ্রামাঞ্চলের মহিলাদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে ৫৭টি ইউনিট এবং ১১টি এরিয়া অফিসের মাধ্যমে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এছাড়া মহিলারা স্বাস্থ্য, জন্মনিয়ন্ত্রণ, পুষ্টি, হস্তশিল্প এবং শাকসবজি ও মৌসুমি শস্যোৎপাদন সম্পর্কে শিক্ষা, উপকরণ এবং উৎসাহ পেয়ে থাকে। ১৯৯৪ সাল থেকে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহযোগিতায় আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার এই ঋণ কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে। ২০০৩ সালে আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার যশোর, নড়াইল ও ঝিনাইদহ জেলায় ভ্রাম্যমাণ চক্ষুসেবা কার্যক্রম চালু করে। এই প্রকল্পে সাইট সেভারস ইন্টারন্যাশনাল/রয়্যাল কমনওয়েলথ সোসাইটি ফর দ্য ব্লাইন্ড সহযোগিতা করছে। ২০০৭ সালে মাগুরা জেলায় ‘সমাজভিত্তিক পুনর্বাসন’ এবং ২০০৮ সালে ‘ঢাকা নগর সমন্বিত চক্ষুসেবা প্রকল্প’ নামে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য দুটি প্রকল্প চালু হয়েছে।

আদ্-দ্বীন ওয়েলফেয়ার সেন্টার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে  রয়েছে  হাসপাতাল, মহিলা মেডিকেল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট, উইমেন্স ইনস্টিটিউট অব হেলথ্ টেকনোলজি, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ফার্মাসিউটিক্যালস্ লিঃ। আদ্-দ্বীন হাসপাতাল মূলত মহিলা ও শিশুদের স্বাস্থ্য সেবার জন্য পরিচিত হলেও ২০০৮ সাল থেকে ঢাকা ও যশোর হাসপাতালে পুরুষ রুগিদেরও চিকিৎসাসেবার কাজ শুরু হয়েছে। ঢাকার বড় মগবাজারে-এ ২০০৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় অনুমোদিত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত আদ্-দ্বীন মহিলা মেডিকেল কলেজ চালু হয়। ১৯৯৭ সালে যশোর আদ্-দ্বীন নার্সিং সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৪ সালে কুষ্টিয়ায় সাফিনা নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং ২০০৬ সালে ঢাকায় ফাতেমা নার্সিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। নার্সিং ইনিস্টিটিউটগুলিতে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স ও মিডওয়াইফারি কোর্স চালু রয়েছে। যশোরে ২০০৭ সালে আদ্-দ্বীন উইমেন্স ইনস্টিটিউট অব হেলথ্ টেকনোলজি চালু হয়। এখানে বর্তমানে ৩ বছর মেয়াদি হেলথ্ টেকনোলজি-ল্যাবরেটরী এবং হেলথ্ টেকনোলজি-ডেন্টাল কোর্স চালু আছে। এটি বাংলাদেশের একমাত্র মহিলা মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট।

যশোরে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আদ্-দ্বীন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ১০০-১২০ জন প্রশিক্ষণার্থীকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। মা ও শিশু স্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা, ধাত্রীবিদ্যা, ক্লিনিক্যাল কার্যক্রম, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, জেন্ডার ইস্যু, অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবা প্যাকেজ এবং আয়বৃদ্ধিমূলক বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ১৯৯৭ সালে যশোর বিসিক শিল্প নগরী এলাকায় আদ্-দ্বীন ফার্মাসিউটিক্যালস্-এর কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে আদ্-দ্বীন ফার্মাসিউটিক্যালস্ লিমিটেডের ৪৩টি ঔষধ দেশের ৩১টি জেলায় বাজারজাত হচ্ছে। সংস্থাটির ১টি অফসেট প্রিন্টিং প্রেস এবং ১টি ডেইরি ফার্ম রয়েছে।  [মোহাম্মদ আবদুল মজিদ]